Feeds:
Posts
Comments

Posts Tagged ‘উত্কর্ষতা’

As we will show, poor countries are poor because those who have power make choices that create poverty. They get it wrong not by mistake or ignorance but on purpose.

― Daron Acemoğlu, Why Nations Fail: The Origins of Power, Prosperity, and Poverty

০১.

বয়স পয়তাল্লিশ হলো গত মাসে। লুকিং ব্যাক, সময় খারাপ কাটে নি কিন্তু। তবে, এর মধ্যে পাল্টেছে দেখার আর বোঝার ‘পার্সপেক্টিভ’। বলতে গেলে অনেক অনেক বেশিই। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেতেই হয়তোবা। দেখা হয়েছে অনেক বেশি। যাই দেখি এখন, ‘ডট কানেক্ট’ হয়ে যায় মুহুর্তে। আগের জ্ঞানের ছিটেফোঁটা থেকে চলে আসে ‘বিগ পিকচার’। ‘বিগিন এন্ড ইন মাইন্ড’ ব্যাপারটাও কাজ করছে সমান তালে। আর সেটার ‘এনালাইটিক্যাল ইঞ্জিন’ চলে ব্যাকগ্রাউন্ডে। চব্বিশ বছর ছুতে চললো চাকরির বয়স। কম তো ভুল করিনি এ পর্যন্ত! একেক ভুল থেকে তিনটা করে লেসন! আর সেটা নিয়েই আরেকটা সিরিজ। “পয়তাল্লিশ – ফিরে দেখা”। কিছুটা ‘স্ট্যান্ডিং অন দ্য শোল্ডার অফ জায়ান্টস’ মোডে। আগের গুনীজনদের প্রজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে।

০২.

বই পড়ছিলাম একটা। গতকাল। অর্থনীতিবিদ টাইলার কোয়েনের লেখা। ‘অ্যাভারেজ ইজ ওভার’। ফারাক বাড়ছে ধনী আর দরিদ্রের। কমছে আমাদের মতো ‘ষ্টিডি’ মধ্য আয়ের রিজিওন। আর বেশি আয়ের মানুষগুলো কিন্তু বসে নেই। আয় করেই যাচ্ছে তারা। চমকটা কোথায়? পিরামিডের ওপরে থাকা মানুষগুলোর সাথে বাকিদের পার্থক্য একটা জায়গায়। পার্সপেক্টিভে। দুদলের মানুষের কাজের মধ্যে বিরাট ফারাক। পিরামিডের নিচের মানুষগুলো বসে আছেন পুরোনো প্রজ্ঞা নিয়েই। ডট যুক্ত করছেন কম। বেশি আয় করা মানুষ আর কোম্পানিগুলো শিখছে প্রতিনিয়ত। সঠিক সিধান্ত নেবার মেট্রিক্স, ডাটা এনালাইসিস, মেশিন ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে সময় কমিয়ে নিয়ে আসছেন প্রথাগত কাজের লিডটাইম। আমাদের মাথার পাশাপাশি অনেক ছোট ছোট কাজ ছেড়ে দেয়া হয়েছে ‘স্ট্রাকচারড ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেমে’। আর না হলে সেটাকেও আউটসোর্স করে দেয়া হয়েছে আমাদের মতো দেশগুলোতে। সেই সময় বাঁচিয়ে সেটাকে ইনভেস্ট করছে পরের লার্নিংয়ে। ‘লো-টেক’ রুটিনমাফিক কাজে সময় নষ্ট করার বিলাসিতা সাজে না পিরামিডের ওপরের মানুষগুলোর।

০৩.

চব্বিশ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা বলে কয়েকটা জিনিস। আমাদের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানগুলো আটকে আছে প্রথাগত রুটিনমাফিক কাজ নিয়ে। ৮০ শতাংশ সময় নষ্ট হয় রুটিন আর ‘রিপিটেটিভ’ কাজগুলোর পেছনে। যে কাজটা আগেও হয়েছে আর সেটার কি ধরনের সিধান্ত হয়েছে সেটা জানা সত্ত্বেও সেটাকে প্রসেস করছি প্রতিদিন। নতুন করে। রুটিনমাফিক কাজগুলোর সিদ্ধান্তের পেছনে আগের মতো সময় দিচ্ছে আমাদের ম্যানেজাররা। ম্যানেজারদের সময় নষ্টের টাকা গুনছে প্রতিষ্ঠানগুলো। রুটিন কাজগুলো সাধারণত: চলে কিছু ‘প্রিডিফাইনড’ রুলসেটের ওপর। আর সেগুলো আসে প্রতিষ্ঠানের ‘স্ট্যান্ডিং অপারেটিং প্রোসিডিউর’ (এসওপি) থেকে। আর সেটাকে স্ট্যান্ডার্ড ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেমের ‘ডিসিশন ট্রি’তে ফেলে বিভিন্ন ইনপুটের দরকারী সিদ্ধান্তের সিকোয়েন্স আর তার কাজের আউটকাম নিয়ে আগে এনালাইসিস না করাতে এক কাজে আটকে থাকছি বছরের পর বছর।

০৪.

প্রতিদিনের ডে-টু-ডে অপারেশন্সে ব্যবহার করছি না আগের শেখা ‘প্রজ্ঞা’। কার্বন কপি সিস্টেমে ‘আগে কিভাবে হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা করলেও সেই জ্ঞানটাকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক মেমরি’তে না রাখার জন্য নিতে হচ্ছে নতুন নতুন সিদ্ধান্ত। ফলে পুরো প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট ব্যস্ত থাকছে একই কাজে। মজার কথা হচ্ছে একই কাজে, এক ধরনের উপাত্তের ওপর সিধান্ত হচ্ছে একেক রকম। রুটিন কাজেই। আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে। সিদ্ধান্ত নেবার সময়ক্ষেপনের খরচ না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু কি হবে ভুল সিদ্ধান্তের? কে দায়ভার নেবে ওই বাড়তি খরচের? ‘রুল ভিত্তিক সিধান্ত’ মানে ‘এই’ ‘এই’ জিনিস হলে এই কাজ করতে হবে জেনেও সেটার পেছনে সময় নস্ট করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থা হলে নতুন নতুন উদ্ভাবনাতে সময় বের করবে কে? উদ্ভাবনা ছাড়া উপায় নেই বাঁচার।

মনে এলো আরেকটা বইয়ের কথা। ‘হোয়াই নেশনস ফেইল?’

উপায় কি এখন?

০৫.

উপায় বের করার আগে একটু ভেতরে ঢুকি কি বলেন? বিমান চালাতে পাইলটকে কত ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেটা নিয়েই আলাপ করি বরং। বিমান টেকঅফ থেকে শুরু করে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো পর্যন্ত হাজারো ইনপুট প্যারামিটার থেকে ‘মানুষ পাইলট’রা যদি নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে যান, তাহলে বিমানের ওড়া হবে না আর। তাই বলে কি উড়ছে না বিমান? মানুষের জীবনের হাজারো ঝুঁকি ছেড়ে দেয়া হয়েছে এই ‘অটোমেটেড ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেমে’র ওপর। সম্ভাব্য কি কি ইনপুটে কি কি সিদ্ধান্ত হতে পারে, আর তার মধ্যে তার ফাইনাল ‘অবজেক্টিভ’ বিচার করে ওই সময়ের জন্য কোনটা ‘অপটিমাল’ হবে সেটার প্রসেস ফ্লো কিন্তু তৈরী করে দিয়েছে এই মানুষই। মানুষ তৈরী করে দিয়েছে পুরো রাস্তা, তবে সেটাকে চালানোর দ্বায়িত্ব দিয়েছে একটা সিস্টেমকে। যন্ত্রকে তো আর বলা হয়নি আমাদেরকে চালাতে, কি বলেন? আর যন্ত্রকে যদি আমার ‘লো-টেক’ কাজ আউটসোর্স না করি তাহলে ওটাকে তৈরী করলাম কেন?

০৬.

এদিকে দুবাই বা লন্ডন এয়ারপোর্টের ম্যানেজমেন্টকে ‘ম্যানুয়ালি’ প্রতিটা বিমান ওঠা নামার সিদ্ধান্ত নিতে বলা হলে কি যে হবে সেটা ‘ভিজ্যুয়ালাইজ’ আর নাই বা করি। অনেক দেশে মেট্রো আর সাবওয়ে সিস্টেমে দেয়া হচ্ছে না ড্রাইভার। কারণ, মানুষই ভুল করবে বরং। সামনে যতই চেষ্টা করুন, ‘ড্রাইভারলেস’ গাড়ি তো ঠেকাতে পারবো না আমি আপনি। আর সেটা কথা নয়, এই লো-টেক ‘শারীরিক’ জিনিস আর কতো দিন করবে মানুষ? অনেক জিনিসেরই বাজারে কি দাম কতো হবে সেটা কিন্তু তৈরী করে দেয় না মানুষ। বর্তমান সময়ে। বিমানের টিকেটের দাম কে ঠিক করে সেটাই দেখুন না চেখে? ব্যাংক তো বসে থাকে না আমার জন্য সারা রাত – তার অফিস খুলে? টাকা দেবার দ্বায়িত্বও ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু এটিএমএর ওপর। আমাকে যারা চেনেন, তারা বলবেন, ‘আপনি তো কম্পিউটারের লোক, এ কথা তো বলবেনই আপনি। সব সিদ্ধান্ত তো আর ছাড়া যাবে না মেশিনের ওপর।’

০৭.

মানছি আপনার কথা। তবে, আমাদের প্রতিষ্টানগুলো প্রতিদিন হাজারো ঘন্টা নষ্ট করছে এমন কিছু ‘অপারেশনাল’ সিদ্ধান্ত নিতে যেটা সহজেই ছেড়ে দেয়া যায় কিছু ‘রুল বেসড’ সিস্টেমের ওপর। ভুল বুঝবেন না, কম্পিউটারের কথা বলছি না এখানে। বরং, কম্পিউটার ধরতেও হবে না ওটা তৈরী করতে। যেগুলো আমাদের ম্যানেজারদের মাথায় আছে অথবা ‘আগে কিভাবে করা হয়েছে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে’ সেটাকে কাগজে সিকোয়েন্স আকারে বিভিন্ন ‘সিদ্ধান্তের শাখা’ ধরে লিখে পাঠিয়ে দিন নিচের দিকে। তারা ঠিকই পারবে ওই সব সিদ্ধান্তগুলো দিয়ে কাজ করতে যেগুলো এতোদিন নিচ্ছিলেন বড় বড় ম্যানেজাররা। সত্যি বলছি! ‘ডিসিশন ট্রি’র অ্যাকশন পয়েন্টের সত্যিকারের গ্রাফিকাল রিপ্রেজেন্টেশন একবার করেই দেখুন না কাগজে, অবাক হয়ে যাবেন নিজেই। নিজের হাত কামড়াবেন – এতোদিন কতো সময় নষ্ট করেছেন ফালতু কাজে।

[ক্রমশঃ]

Advertisements

Read Full Post »

Dominate in your domain; You can do it.

― Jaachynma N.E. Agu, The Prince and the Pauper

১৩৩.

ঈদের দিন আজ! মন ভালো করার একটা গল্প নিয়ে আসি, কি বলেন? সবার জন্য। তুলনার গল্প। পালাবেন না প্লিজ। দেশকে উপরে তোলার গল্প।

আমি আপনার থেকে ভালো, বললেন আপনি।

প্রমান করুন কোথায় কোথায় ভালো আপনি? আমার সহজাত উত্তর।

একশো মিটার স্প্রিন্টে আপনাকে হারিয়েছি, মনে নেই?

মেনে নিলাম। আসলেই হারিয়েছেন আমাকে।

মেট্রিকে আমি স্ট্যান্ড করেছি। আর আপনি?

সত্যি। স্ট্যান্ড করিনি আমি।

ইন্টার ক্যাডেট কলেজ বক্তৃতায় আমি ছিলাম চ্যাম্পিয়ন।

একদম সত্যি কথা। বোমা মারলেও আমার মুখ থেকে বেরুতো না কথা, তখন।

এখন, আপনারাই বলবেন ভালো।

১৩৪.

ছোটবেলায় বাবা মা চাইতেন ডাক্তার হই। বয়সের দোষ ফেলে দিলো অন্য দিকে। এমনই কাজ করলাম যাতে মেডিক্যাল পড়তে না হয় কখনো। মেট্রিকের বায়োলজিতে ভালোই করছিলাম। ইন্টারমিডিয়েটের সময় কিভাবে যেনো বায়োলজি ফেলে পরিসংখ্যান নিয়ে নিলাম, সেটা নিয়ে ভাবি এখনো। হয়েছিলো কি আমার? সে যাই হোক – ইন্টারমিডিয়েটের পরিসংখ্যানই বাঁচিয়ে দিলো আমাকে। তুলনার গল্পে আপনি আমার থেকে দৌড়ে, পরীক্ষায় আর বক্তৃতায় ভালো। স্ট্যাটিসটিকাল ইনডিকেটরের ভাষায় ওই তিনটা বিষয়ে আপনি এগিয়ে। তুলনা করছিলাম আপনার সাথে আমার।

১৩৫.

এখন দেশগুলোই দৌড়াচ্ছে নিজেদেরকে এগিয়ে নেবার জন্য – প্রতিনিয়ত:| নিজের তাগিদেই। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই বলে যাকে আর কি। একেক দেশ একেকদিকে ভালো। কেউ ভালো পড়াশোনায়, কেউ আইসিটিতে, আবার কেউ খাদ্য উত্‍পাদনে। আবার অনেকে প্রায় সবকিছুতেই! আফ্রিকার দেশগুলো তাদের ইনডিকেটরগুলোকে ভালো দেখানোর জন্য হেন কাজ নেই করছে না। ইনফ্রাস্ট্রাকচার সম্পর্কিত যতো ইনডিকেটর আছে সেগুলো ভালো হলে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) আনার জন্য অত রোডশো করতে হয় না। কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেদেশের ইনডিকেটর দেখেই মনকে তৈরী করে ইনভেস্টররা। আমরা ভুলে যাই, আইসিটি নিজেই একটা বড় ইনফ্রাস্ট্রাকচার! মায়ানমারকে দেখে মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলছি ইদানিং। চেখে দেখবেন না কি রিপোর্ট একটা? অন্যেরটা না পড়লে আমাদের অবস্থান জানা দুঃসাধ্য! নিজে ঠেকে না শিখে অন্যের ভুল থেকে শেখা ভালো নয়? আমার কথা, হোয়াই রি-ইনভেন্টিং হুইল!

১৩৬.

কিছু কিছু ইনডিকেটর খালি চোখে দেখা যায়, এর জন্য স্ট্যাটিসটিসিয়ান হবার প্রয়োজন হয় না। যেকোনো দেশের একটা শহরের উদাহরণে আসি বরং। শহরের রাস্তা আর তার পাবলিক ট্রানজিট সিস্টেমস দেখলেই খালি চোখে ওর উন্নতি বোঝা যায়। বাকি জিনিসগুলোর তুলনা করার উপায় কি? আইসিটি আমার বিষয় হবার ফলে ফিরে আসি ওর গল্পেই। আইসিটিতে কোন দেশগুলো ভালো করছে? ওটার পরিমাপ কি? তুলনার বিষয়গুলো কি কি হতে পারে? সবাই সেটা মানবে কিনা? সেগুলোর তথ্য কিভাবে নেয়া হবে?

১৩৭.

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে কে করবে?

ইউ এন অর্গানাইজেশন, আপনার উত্তর।

আপনি আসলেই ভালো, অন্ততঃ, আমার থেকে। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) একাজটার ধারণা নিয়ে বসে আছে প্রায় বিশ বছর আগে থেকে। সবদেশের সম্মতির ভিত্তিতে আশির বেশি ইনডিকেটর ঠিক করা হলো বিশ্বের আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ট্র্যাক করার জন্য। রিপোর্ট বের করা শুরু করলো দুহাজার নয় থেকে। এছাড়াও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নেটওয়ার্ক রেডিনেস ইনডেক্স (এনআরআই) আর ইউএন ই-গভর্নমেন্ট সার্ভের ডাটা একাজে ব্যবহার হয়।

১৩৮.

ভালো কথা, আইসিটির দরকার কেন? আইসিটি ব্যবহার করেই দেশগুলো উঠছে উপরে। যারা পারছে না উঠতে তাদের ঘাটতি আছে এই আইসিটি ব্যবহারে। ভালো গভার্নেসের জন্য দরকার আইসিটির বহুল ব্যবহার। ইনফরমেশন উইথহেল্ড নয়, তথ্য দিয়েই এগুচ্ছে সরকারগুলো। আর সেকারণে আইসিটি। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন আঠারোশো পসট্টি সালে উত্পত্তি হলেও ইউএনের স্পেশালাইজড এজেন্সি হিসেবে নাম লেখায় উনিশশো সাতচল্লিশে। আইসিটি নিয়ে সব কাজ কারবার করতে হয় ওকেই। একশো বিরানব্বইটা দেশ ওর সদস্য হলেও ওর জ্ঞানের আঁধার হচ্ছে সাতশোর বেশি বেসরকারী কোম্পানিগুলো। টেলিযোগাযোগ, স্পেকট্রাম, স্যাটেলাইট আর ইন্টারনেটের ইনফ্রাস্ট্রাকচার নিয়ে যতো পলিসি আর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন, ওর সবকিছুই আসে ওর থেকে। তিউনিস কমিটমেন্টের আওতায় ওয়ার্ল্ড ‘সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি’ (উইসিস)র পর অনেক দিন গেছে চলে।

১৩৯.

ডাটা কালেকশন হ্যান্ডবুক, টেলিযোগাযোগ/আইসিটি

ডাটা কালেকশন হ্যান্ডবুক, টেলিযোগাযোগ/আইসিটি

ডাটা এক্সট্রাপলেশনের ধারণা পাবার জন্য মনটা আইটাই করছিলো বেশ কিছুদিন। জেনেভাতে ই-হেলথের উপর এক বক্তৃতা দিতে যেয়ে সুযোগটা গেল বাতলে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের অফিস থেকে এক লাঞ্চ ব্রেকে চলে এলাম আইটিইউর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেলের সাথে দেখা করতে। জেনেভায় নেমেই আউটলুক মিটিং রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম ওনার কাছে। মিটিং শেষে নামতেই করিডোরে চোখে পড়ল ডাটা সংগ্রহ করার চমত্কার একটা হ্যান্ডবুক। আইটিইউ এর পাবলিকেশন্স এটা। চেয়ে নিলাম কপিটা। পড়ে ফেললাম নিমিষেই। মানে ওই রাতেই – হোটেলে বসে। মাথায় এন্ডরফিনসের সরবরাহ বেড়ে গেলো বলে মনে হলো। দরকার আপনার? নামিয়ে নিন আজই। জানালাম অফিসে। আইটিইউ’র রিজিওনাল অফিসের সাথে খোচাখুচি করে একাউন্ট তৈরী হলো সে মাসেই। কাজে নামতে সময় লাগলেও ছোট একটা কমিটি তৈরী করে ফেললাম। চেকলিস্ট যোগ হলো সঙ্গে। ধাক্কা খেলাম ডাটা টানতে যেয়ে। বিশাল কাজ। কমিটির অন্যদের আইটিইউ’র বিভিন্ন স্ট্যাটিসটিকাল মিটিংগুলোতে পাঠাবার জন্য উত্‍যোগ গ্রহণ করলাম। তার একজন যাচ্ছে মেক্সিকোতে, এই ডিসেম্বরে। থাইল্যান্ডের টাও মিস যায়নি। এগুচ্ছে বাংলাদেশ।

১৪০.

মিটিং ডাকলাম সবাইকে নিয়ে। পর পর কয়েকটা। সব লাইসেন্সড অপারেটর, বুরো অফ স্ট্যাটিসটিক্স সহ। ইনডিকেটর নিয়ে বসলাম, একটা একটা করে। একশোর বেশি ফিল্ড। ইনডিকেটর ডেফিনেশনেই কাবু হয়ে যাচ্ছিলাম বার বার।একেকজন একেকভাবে ডেফিনেশন বুঝলে তো আমাদের অবস্থা খারাপ। চাইলাম এক ডাটা, দিলেন আরেকটা। সমস্যাটা তো মিটলো না। আবার ডাটা দরকার দু-হাজার দশ, এগারো আর বারোর। সবাই সাহায্য করতে চাইলেন। চ্যালেঞ্জ একটাই। এতো ডাটা, পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। দরকার সহসাই। নতুন ডাটাই রেডিমেড থাকছে না, পুরনো ডাটা তো আরো সমস্যা। কিছু কিছু ডাটা প্রজেকশন করলাম। চিঠি, ই-মেইল, ফোন আর তাগাদা পত্র, চলতে থাকলো একাধারে। ডাটা না থাকলে তো তৈরী করা যাবে না, বললেন অনেকে। অনেকেই সাহায্য করলেন আগ বাড়িয়ে। কাজের প্রসেস ডেভেলপ করে ফেললাম – নতুন ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল প্রসেস।

১৪১.

আইটিইউ’র স্ট্যাটিসটিকাল ডিপার্টমেন্টের সাথে লিয়াজোঁ বাড়িয়ে দিলাম এর পাশাপাশি। ডক্টর সুসান আর ভানেসা গ্রে নিজ থেকে সাহায্য করতে শুরু করলেন। আইটিইউ’র রিজিওনাল হেডকোয়ার্টারের সাহায্য চাইলাম। দেশকে উপরে উঠাতে হলে যা যা করা দরকার তার স্কিম তৈরী করে ফেললাম সে মাসেই। চমত্‍কার সম্পর্ক তৈরী করে ফেললাম ওদের সাথে। ডেডলাইন পার হয়ে গেলেও এক্সেস পাওয়া গেলো আপডেট করার। কিছু কিছু জিনিস ওরাই আপডেট করলো, আমাদের পরে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে। অসাধ্য সাধন করে ফেললো, আমার টীম! বলতে গেলে ক্রস ফাংশনাল টীম। সমস্যা শুরু হলো অন্যখানে। ডাটা টানা শুরু করলো আইটিইউর অন্যান্য ডিপার্টমেন্টগুলো। জেনে গেছে ওরা, বাংলাদেশের কোন লোকটাকে মেইল করলে রেসপন্স পাওয়া যায় ঘন্টার মধ্যে। ট্যারিফের ডাটা রিকোয়েস্ট চলে আসলো এর মধ্যে। আমার মনও ভালো, কাজ বাড়ছে, ছোট ছোট কমিটি করছি। প্রসেস তৈরী করছি মনের আনন্দে। কাজ হবে প্রসেস ডিপেন্ডেন্ট, মানুষ ডিপেন্ডেন্ট নয়। মানুষ চলে গেলে কাজ যাতে থমকে না যায় সেজন্য এই প্রসেস তৈরী করা। নিজের দেশ বলে কথা। এসক্যাপও কথা বলছে আমাদের সাথে। মন খারাপ হয়ে আছে – আইসিটি ডাটার বাইরের ডাটাগুলো পাচ্ছি না। টীমও লেগে আছে আমার পেছনে। নাছোড় বান্দা বসের নাছোড় বান্দা টীম প্লেয়ার! ভালোই আছি। চমত্‍কার এই ছেলেমেয়েগুলোকে পাবো কোথায়?

১৪২.

ডাটা দেবার পর শুরু হয় আসল সমস্যা, ভ্যালিডেশন। ডাটা ঠিক আছে কিনা, সেটার জন্য হাজার কোয়েরি। স্বাভাবিক। আমি দেশের ইন্টারনেট পেনিট্রেশনের হার পঞ্চাশ শতাংশ বললেই তো আর সেটা হবে না। ওর সপক্ষে যুক্তি না দিলে সেটা টিকানো মুশকিল। ওরা অন্য ডাটা সোর্স থেকে সেটা ভেরিফাই করে – সবসময়। দুঃখের কথা, বিশ্বব্যাপী আমাদের সাপোর্ট করার ডাটা খুবই কম। আমরা ডাটা দিলে অন্য সোর্স সেটা কনফার্ম না করলে সেটা যায় কেঁচে। তখন ধরি অন্য পন্থা। বৈধভাবেই। সেদিকে আর নাই বা গেলাম। মজার কথা, ভয় নেই ডাটা হারানোর। সবই আছে আইটিইউ’র আইসিটি-আই ক্লাউডে। আপডেট করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কয়েক দফা ডাটা দিয়ে শিখেছি অনেক কিছু। সেটা আরেকদিন।

মোস্ট ডাইনামিক কান্ট্রিজ - বাংলাদেশ এগিয়েছে চার চার ধাপ!

মোস্ট ডাইনামিক কান্ট্রিজ – বাংলাদেশ এগিয়েছে চার চার ধাপ! আবার, অস্ট্রেলিয়ার এনবিএন প্রজেক্ট ওকেও এগিয়েছে চার ধাপ!

১৪৩.

ঘাপটি মেরে পড়ে ছিলাম এমাসের সাত তারিখের জন্য। ‘মেজারিং দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি রিপোর্ট’ ২০১৩ বের হলো বলে। পৃথিবী তাকিয়ে আছে এই রিপোর্টটার দিকে। আমাদের কথা চিন্তা করেই, গরীবদেশগুলো জেনেভা হেডকোয়ার্টারে যেতে না পারলেও পুরো অনুষ্ঠানটাই ওরা আপলোড করেছে ইউটিউবে! এই অনুষ্ঠানটা একাধারে জেনেভার পাশাপাশি আদ্দিস আবাবা, ব্যাঙ্কক, ব্রাসিলিয়া, কায়রো, মস্কো, নিউ ইয়র্কে হয়েছে। লঙ লিভ ইউটিউব! দেখতে চান? যাদের সময় নেই তাদেরকে বলবো টেনে উনিশ মিনিটের মাথায় চলে যেতে। এবার মোস্ট ডাইনামিক কান্ট্রিজ, যারা ভালো করেছে সেখানে ‘বাংলাদেশে’র নাম বলেছেন ডক্টর সুসান – ঠিক বিশ মিনিটের মাথায়। ডক্টর সুসান তেল্শার, হেড অফ আইসিটি ডাটা এন্ড স্ট্যাটিসটিক্স ডিভিশন পুরো রিপোর্টের একটা ব্রিফ দিলেন ওখানে। আমার তুরুপের তাস ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ নোট পাঠানোর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই রেসপন্স করলেন ডক্টর সুসান, তারিফ করলেন বাংলাদেশের। শেষ লাইনে বলেছিলাম আমাদের থ্রিজির কথা। দেখা হবে সামনের বছরে। পাল্টে যাবে বাংলাদেশ। সুখের কথা, আবার ডাটা চেয়েছে আইটিইউ, ডেডলাইন তিরিশে অক্টোবর। সময় নেই একেবারেই। পরের বছর বাংলাদেশ যাবে কোথায়? প্রেডিকশন ইন্জিনিয়ারিংয়ের ধারনায় বর্তমান গ্রোথ রেটে এগোলে ‘একশো তিরিশে’র ভেতরে যাবার ইচ্ছা পোষণ করাটা খুব কি একটা ভুল হবে? আপনি বলুন।

আরো এগুবে বাংলাদেশ, পাল্টাচ্ছি আমরা, পাল্টাতে হবে সবাইকে!

আরো অনেক এগুবে বাংলাদেশ, আমার হাতের ডাটা তাই বলে। সুযোগ হাতছাড়া যাবে না করা!

১৪৪.

গত বছর থেকে এবার এগিয়েছি চার ধাপ, একবারেই। প্রথম ধাক্কায়। আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স (আইডিআই) একশো সাতান্নটা দেশের মধ্যে তুলনা করে কে কতটা এগিয়েছে সেটা দেখিয়েছে ওখানে। আবার দুহাজার বারোর আইসিটি প্রাইস বাস্কেট (আইপিবি) ইনডেক্সে গ্রাহকেরা টেলিযোগাযোগ আর ইন্টারনেট খাতে কতো ব্যয় করছে সেটারও স্নাপ্শটটা ক্যাপচার করেছে ওখানেই। ‘পারচেজ পাওয়ার প্যারিটি’ (পিপিপি) মানে গ্রাহকের কেনার ক্ষমতাতে খারাপ নেই আমরা। গ্রাহক পর্যায়ের ইন্টারনেটের দাম নিয়ে ওভাবে কিছু না এলেও এর দাম কমে আসবেই এর মধ্যে। প্রতিযোগিতায় থ্রিজির দাম কমে আসতে বাধ্য।এক্সেসে মানে ‘সংযোগ’ পাবার আইসিটি সাব ইনডেক্সে বাংলাদেশ ভালো অগ্রসর হলেও ‘ব্যবহার’ সাব ইনডেক্সে অনেক কাজ করার স্কোপ রয়েছে। ব্যবহার বাড়াতে হলে ইন্টারনেটের ‘ইউজফুল’ অ্যাপ্লিকেশন আনতে হবে আগে। সরকারী বেসরকারী সার্ভিস ডেলিভারি প্লাটফর্মে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কাজ নেয়া দেয়া বাধ্যতামূলক করলে ‘ব্যবহার’ আইসিটি সাব ইনডেক্স বাড়তে বাধ্য। ইলেকট্রনিকভাবে টিআইএন নেবার পদ্ধতিটা এর ভালো উদাহরণ। খালি ফেইসবুক আর ব্লগিং করে কতো আর? ইলেকট্রনিক ট্রানজাকশানের উপর উন্নত বিশ্বের মতো প্রনোদনা দিলে ভালো করবে বাংলাদেশ। মোস্ট ডাইনামিক কান্ট্রিজের মধ্যে বাংলাদেশকে নিয়ে কি লিখেছে ওরা, পড়তে ইচ্ছা করছে নিশ্চয়ই!

সব তথ্যই সরবরাহ করা হয়েছে একটা ভালো রাইট-আপের জন্য, ভালো লাগছে না?

সব তথ্যই সরবরাহ করা হয়েছে একটা ভালো রাইট-আপের জন্য, ভালো লাগছে না?

১৪৫.

আজ এ পর্যন্তই। ঘুমানোর সময় হলো বলে। বাকি সাব-ইনডেক্সগুলোর মধ্যে আইসিটি “এক্সেস”, “ইউজ” আর “স্কিল” নিয়ে আসছি সামনে। ফেলে দিন আমার বকবকানি, নামিয়ে নিন পুরো রিপোর্টটা, অ্যানেক্স চার ছাড়া। দরকার নেই ওটার আপনার! নিজেই দেখুন চেখে। হাতে নিয়েছি নতুন এক্সেলশিট, উইসিস আর এমডিজির ডাটা টানবো বলে। উইসিস, ও’ইসিডি, ইউনেস্কো, ইউএন রিজিওনাল কমিশন আর আংকটাড মিলে এক বিশাল উইসিস টার্গেট রিপোর্ট চেয়েছে দেশগুলো থেকে – দশ বছরের উপর। ওখানেও হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। পিছিয়ে পড়ে থাকার দিন নেই আর! শুরু তো করতে হবে – কোথাও। দেশকে তুলতে হবে ঠিক জায়গায়।

এগুচ্ছি আমরা, পাল্টাচ্ছে বাংলাদেশ!

Read Full Post »

You don’t have to burn books to destroy a culture. Just get people to stop reading them.

― Ray Bradbury

৯৬.

বই পড়তে ভালবাসি। অস্ফুট স্বরেই বললাম।

এ আবার নতুন কি? ভুরু কুঁচকে তাকালেন আপনি।

‘বই পড়তে ভালবাসে সবাই’, আপনার তড়িত্‍ জবাব, ‘ছোটবেলায় দেখতেন যদি আমাদের’।

বুঝলাম, ভুল হয়ে গেছে বাক্য গঠনে। বাকি পড়ে গেছে একটা শব্দ। যোগ করলাম সেটা।

৯৭.

হাউ এবাউট স্টার্টিং ওভার? এভরিওয়ান নীডস আ সেকেন্ড চান্স!

বই পড়তে ভালবাসি, এখনো।

মানি আপনার কথা। সত্যি কথা বলতে আমাদের জীবন জটিলতর হচ্ছে দিন দিন। বই পড়ার সময় কোথায়?

সত্যিই তাই। তবে সময় যে নেই এটা বললে ভুল হবে হয়তোবা।

মোবাইল ফোন আর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে আমি আপনি কতটা সময় দেই ধারণা আছে কি সেটার? পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ততম লোকটা কে বলুনতো? তার তো বই ধরারই কথা না।

৯৮.

১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯১০| তুষারপাত হচ্ছে। দিনটা বেশ ঠান্ডা। জন্ম নিলো উরসুলা টড, অ্যামবিলিক্যাল কর্ড গলায় পেঁচিয়ে। মারা গেলো সে অবস্থায়। গল্পটার শুরু এভাবে। কেইট অ্যাটকিনসনের ‘লাইফ আফটার লাইফ’ বইটা নিয়ে আটকে আছি কয়েকদিন ধরে। গতবছর ‘লাইফ অফ পাই’ বইটা পড়ে যা মজা পেয়েছি সেটা সিনেমা দিয়ে মেটানো যাবে কি? বইটার কথা যখন উঠলোই, সেটা নিয়ে আসছি সামনে।

তার আগে আসি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধারা নিয়ে। আমার মুখচোরা ব্যাপারটা সার্বজনীন সাবলাইম ইনফো হলেও ঝামেলায় কম পড়িনি জীবনে। ইন্টারভিউয়ে দশ লাইনের প্রশ্নের উত্তর হয় এক পঞ্চমাংশ! আমার থাম্ব-রুল, আপাতত:| নতুন একটা গল্প ফাদি তাহলে।

৯৯.

ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় একজন পত্রমিতা ছিলো আমার – সুদুর গ্রীস থেকে। সে তিন পাতা লিখলে আমার উত্তর এক পাতা। একবার উপহার পাঠালো বই একটা। অ্যামেরিকায় এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে গিয়েছিলো সে। মনে করে কয়েকটা বই নিয়ে এসেছে আমার জন্য। পাগলাটে ছিলো মেয়েটা। আমি পাগল ছিলাম কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর এখানে নয় বোধকরি।

টিপ্পনি কাটলো ফিরতি চিঠিতে।

‘থ্যাঙ্ক ইউ’ নোট কই?

এটা আবার কি?

এই যে তোমার জন্য বই পাঠালাম একটা, এর ধন্যবাদনামা কই?

এটা সত্যি, আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম বইটা পেয়ে। খুশি জানানোর কি আছে? তাও আবার লেখায়? পাগল নাকি? ও পাগল হলেও আমি তো নই আর।

লিখতে হয়, বুদ্ধু! না লিখলে সে জানবে কিভাবে?

তাই নাকি? আসলেই তো সত্যি। ওসময়ে ছিলো না টেলিফোনও। ছিলো হয়তোবা, কিন্তু আওতার বাইরে।

বই নিয়ে এসেছি তিনটা, তোমারই জন্য। পেতে চাও কিনা বলো?

পেতে চাই না মানে? তবে ভদ্রতা করলাম ওর সাথে। লিখতে লিখতেই অনেক ভদ্রতা শিখেছি এর মধ্যে। ওর থেকেই। ওকে আর সেটা হয়নি কখনো।

অন্য কাউকে দিয়ে দাও বরং! পোস্টেজ খরচ অনেক পড়বে তোমার। আগেরটার জন্য যে কতো খরচ করেছ সেটা জানালে না তো আর।

লাইনে এসেছো ভদ্রবাবু! ধন্যবাদ তোমাকে। তোমার জন্যই নিয়ে এসেছি এগুলো। অন্যকে দেয়া যাবে না। তবে পেতে চাইলে কষ্ট করতে হবে কিছুটা। রাজি?

আবারো ভদ্রতা করলাম কয়েকটা চিঠিতে। ব্যাক টু স্কয়ার ওয়ান! ‘কষ্টটা’ কিছুটা পরিস্কার হলো বরং। ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ নোট লিখতে হবে প্রতিটার জন্য! কি যন্ত্রণা! পত্রমিতা না প্রিন্সিপাল? যন্ত্রণা হলেও উত্তর পাবার জন্য দিন গুনতাম এই আমিই।

ফিরে আসি ‘লাইফ অফ পাই’ বইটা নিয়ে। কিছুদিন আগে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ নোট একটা হস্তগত হলো – এক লোকের। লিখেছে এক লেখককে। লোকটা তার মেয়ের সাথে পড়েছে বইটা, অনেক ব্যস্ততার মধ্যে।

'থ্যাঙ্ক ইউ' নোট - ভালোই লিখেছে লোকটা ...

‘থ্যাঙ্ক ইউ’ নোট – ভালোই লিখেছে লোকটা …

ব্যস্ততার মধ্যে বই না ধরতে পারলে মনে হয় লোকটার কথা। বন্ধ করি পিসিটা, ফোনটাকে রাখি হাতের নাগালের বাইরে। ফিরে আসি বইয়ে। মাথার কোথায় যেনো একটা ‘ইলুমিনেশন’ কাজ করে। এন্ডরফিনসের সরবরাহ বেড়ে যায় বোধহয়।

চারটা বই হস্তগত করেছি আপাতত।

এই ঈদের ছুটির জন্য। সৃষ্টিকর্তা মহান।

ঈদ মোবারক!

অক্টোবর, ১৭, ২০১৩; ঈদের পরের দিন

পুনশ্চ: অনেকেই জানতে চেয়েছেন ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ নোটটার ব্যাপারে। ভুল হয়েছে আমারই, বলা উচিত ছিলো তখনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা লিখেছিলেন চিঠিটা, লাইফ অফ পাই’য়ের লেখক ইয়ান মার্টেলকে। মুগ্ধ হয়েই। গুনীজনকে কদর দিতে জুড়ি নেই মার্কিনীদের। ভাবানুবাদ জুড়ে দেয়া হলো সঙ্গে।

জনাব মার্টেল –

‘লাইফ অফ পাই’ বইটা শেষ করে উঠলাম এইমাত্র। মেয়েকে নিয়ে পড়েছি আমি। পশুপাখিকে নিয়ে গল্পগুলো আমাদের দুজনেরই খুবই পছন্দের।

আনন্দদায়ক বইটা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে আরো সুদৃঢ় করেছে। আরো মুগ্ধ হয়েছি গল্পটা বলার ক্ষমতা দেখে।

ধন্যবাদ আপনাকে।

সাক্ষরিত,

বারাক ওবামা

Read Full Post »

It is a truth universally acknowledged, that a single man in possession of a good fortune, must be in want of a wife.

— Jane Austen, Opening line of ‘Pride and Prejudice’ (1813)

৯০.

নোটবইটা বের করতে হলো আবার। অসমাপ্ত গল্পটা শেষ করতে নয়, বরং ওর প্রথম লাইনটা ধার করতে।

অন্যান্য দিনের মতো ঘুমুতে গেলাম একই সময়ে, এবার কালাসনিকভটা মাথার কাছে নিয়ে।

এবার বের করুন আপনার প্রথম লাইনটা। না থাকলে লেখুন একটা কিছু। কৌতুহলোদ্দিপক হলে ভালো। লেখার প্রথম লাইন নিয়ে যতো সমস্যা। সারাদিন মাথায় ঘুরতে থাকে আইডিয়া, শুধুমাত্র অফিস সময় ছাড়া। অফিস সময়ে কাজের চাপে সব যাই ভুলে। নাইন টু ফাইভ, টোটালি রাইটার্স ব্লক! অফিস থেকে সবাই যাবার পর ছটার পর থেকে আস্তে আস্তে খুলতে থাকে মাথা। তবে ওসময়ে লেখার মতো মাথায় থাকে না কিচ্ছু। বাসায় ফিরি নয়টায়। লিখতে বসি এগারটায়। বসতে গেলে চলে আসে হাজারো সমস্যা। পার্থিব সমস্যা। বাসার সমস্যা, পানির সমস্যা, কাল বাচ্চাদের স্কুলের সময়ের সমস্যা, ড্রাইভারের সমস্যা। উঠে যেতে হয় মিনিট কয়েক পর পর। ছোটবেলায় পড়তে বসলেই চলে আসতো হাজারো ঘুম, এখন লিখতে বসলেই আসে হাজারো সমস্যা। আর প্রথম লাইন বের করতে গেলে শুরু হয় মাথা ব্যথা।

৯১.

তবে হলফ করে বলতে পারি একটা কথা। প্রথম লাইনটা কখনো আসেনি লিখতে বসে। চড়ুই পাখির মতো আসে আর যায় – ওসময়ে। পুরোপুরি আসে না কখনো। আমার ধারনা, প্রথম লাইনটা আসে একবারে অসময়ে। চমত্কারভাবে। বাজারে গিয়েছি ছুটির দিনে, গড়গড় করে আসছে প্রথম দিকের লাইনগুলো। রিকশায় যাচ্ছি কোথাও, রাস্তা পার হচ্ছি, করছি গোছল, উঠছি সিড়ি বেয়ে, ঘুমানোর সময় চোখ বন্ধ হবার ঠিক আগের মুহুর্তে, টিভি দেখার সময়ে। প্রথম লাইন আসে সব উদ্ভট সময়ে। হাসপাতালে গিয়েছি – লাইনের অর্গল খুলে যায় ওসময়ে। আসল কথা হচ্ছে – হাতের কাছে লেখালিখির জিনিস না থাকলেই এসে হাজির হয় প্রথম লাইন। অনেক কষ্টে পেলেন না হয় কাগজ, কলম পাবেন না কখনো। আর কলম পেলেও সেটা লিখতে চাইবে না। আর সেকারণে হাজারো প্রথম লাইন হারিয়ে যায় সময়ের সাথে।

৯২.

লেখকদের কাগজ কলম রাখতে হবে সাথে – সবসময়। বাসার সব রুমে, গাড়িতে, শোবার ঘরে বিছানার পাশে। বাজারে গেলে কাগজ কলম রাখতে হবে পকেটে। ও আমার হয় না বলে মোবাইল হ্যান্ডসেটে রেখেছি ‘গুগল কীপ’ আর ‘এভারনোট’ অ্যাপ। কাগজ কলমের মতো যুতসই না হলেও শর্টহ্যান্ডে কিছু লেখালিখি রাখা যায়। ছোট নোটবই সাথে রাখতে পারলে মন্দ নয়। মনে করে রাখাটাই সমস্যা – আর আমার মতো মিনিটে মিনিটে হারানোর অভ্যাস থাকলে তো কথাই নেই। মিলিয়ন ডলারের আইডিয়া হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত! মিটিং ওয়ার্কসপে গিয়েছি – লিখেছি ন্যাপকিনে, পোস্ট-ইটে। পরে এসে টুকে নিয়েছি কম্পিউটারে।

৯৩.

মনে আছে কি এইমি বেন্ডারের কথা? ছোটগল্পের একটা চমত্কার সংকলন নিয়ে দুনিয়া মাতিয়েছিলেন উনিশশো আটানব্বইয়ের দিকে। ‘দ্য গার্ল ইন দ্য ফ্ল্যামাবল স্কার্ট’ ছোটগল্পের এই সংকলনের লেখিকা তার ছোটগল্প শুরু করেন সেই প্রথম লাইন দিয়েই। তার কথায় অনেক লাইনই কাজ করে না প্রথম লাইন হিসেবে, সেগুলো কার্যকর নয় হয়তোবা। তবে যে লাইনটা তার পরের লাইনগুলোকে এমনিতেই টেনে নিয়ে আসে সেগুলো নিয়ে কাজ করেন এইমি। অনেক সময় সেই প্রথম লাইনেই একটা চরিত্রের স্বর ফুটে ওঠে – ফলে প্রথম লাইন থেকে একটা চরিত্র বের করা অসম্ভব কিছু না।

৯৪.

শক্তিশালী প্রথম লাইন কিন্তু একজন লেখককে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার লেখার অনুপ্রেরণা যোগায়। পাঠক যেভাবে পাতার পর পাতা উল্টাতে থাকে মনের কৌতুহল মেটানোর জন্য – তার থেকে বেশি শক্তি দরকার হয় লেখকের। আর সেকারণে প্রথম লাইনটা এতো গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি নাই বা আসে সেই প্রথম লাইনটা? বইয়ের দোকানে ঢু মারুন। বইগুলোর প্রথম লাইনগুলো লক্ষ্য করুন। প্রথম প্যারাগ্রাফটা পড়ুন। আইডিয়া আসতে বাধ্য। খবরের কাগজে অনেক গল্পের খোরাক থাকে। আমি নিজেই অনেক গল্পের প্লট পেয়েছি পুরনো খবরের পাতা থেকে। টিভির অ্যাডগুলো লক্ষ্য করুন, পাবেন সেখানে।

৯৫.

একটা সাবধানবাণী না দিলেই নয়। প্রথম লাইনটা গল্পের লিড দিলেও ওর ভালবাসায় পড়া যাবে না কিন্তু। অনেক সময় প্রথম লাইন দিয়ে শুরু করলেও পরে ওই লাইনটাকে ফেলে দিতে হতে পারে। গল্পের প্রয়োজনে প্রথম লাইনটা একটা সময়ে কাজে দিলেও পরে সেই গল্পেরই প্রয়োজনে পাল্টাতে হতে পারে। এটাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে হবে। আমি নিজেই পাল্টেছি প্রথম লাইনটাকে, অনেকবার। তবে শুরু করাটাই প্রথম লাইন জেনারেট করা থেকে অনেক কষ্টের।

শুরু তো করতে হবে কোথাও থেকে? কি বলেন?

Read Full Post »

They shoot the white girl first.

— Toni Morrison, Opening line of “Paradise” (1998)

৮৫.

কোথায় যেনো পড়েছিলাম বই পড়ুয়ারা নাকি মাছের মতো। মেজাজ গরম হলো তখনি। শেষ পর্যন্ত মাছ? টিউবলাইটই তো ভালো ছিলো। বন্ধুদের কাছে নামের কি শেষ আছে? সেদিন কে জানি দিলো নাম আরেকটা, এসএম। স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট? না, সাবমেরিন! সে গল্প আরেকদিন! তবে, বইই তো পড়ছি, কারো ক্ষতি তো করছি না। মাছের গবেষণায় বসলাম। ভুল বুঝেছি খামোকাই। বই পড়ুয়ারা সাদামাটা মাছ নয়, স্মার্ট মাছ। বলেছে আরেক স্মার্ট লেখিকা, কে এম ওয়েইল্যান্ড, আমার বই পড়ার সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ‘গুডরিডে’র বন্ধু। বই পড়ুয়ারা ভালো ভাবেই জানেন লেখকদের। বড়শি নিয়ে বসে আছে সবাই। মানে সব লেখক। লেখকদের লেখা শেখার শুরুতে যে কয়েকটা বাজ্জওয়ার্ড জানতে হয় তার মধ্যে ‘হুক’ অন্যতম। বই মেলায় পড়ুয়াদের লক্ষ্য করেছেন কখনো?

৮৬.

মাছের কথায় আসি। স্মার্ট মাছ কিন্ত জানে লেখকরা বড়শিতে আদার লাগিয়ে বসে আছে তার বইয়ে। মাছটাকে ধরতেই হবে বইয়ের প্রথম কয়েক পাতায়। সেটার জন্য বড়শির সুতা কখন ছাড়বে আর টানবে সেখানেই লেখকের মুন্সীয়ানা। ‘হুক’ লাগানোর আগেই যদি আমরা যারা স্মার্ট মাছ বইটাকে ছেড়ে দেই সেখানে লেখকের ব্যর্থতা। স্মার্ট মাছ ধরা কিন্তু সহজ নয়। এই মাছ আসলে পড়েছে অনেক বই। প্রথম কয়েক পাতায় ‘হুক’টা ঠিকমতো না গাথলে ফসকে যাবার সম্ভাবনা বেশি। স্মার্ট লেখক তার ‘হুক’টাকে কিভাবে স্মার্ট মাছের গলায় আটকাবেন শক্ত করে সেটার গল্প আজ। ‘স্মার্ট’ মাছ বুঝতেই পারবেনা যে ও কখন পুরো ‘হুক’টা গিলে ফেলেছে – খেসারত দিতে হবে পুরো বইটা শেষ করে। তার মানে বইয়ের প্রথম কয়েক পাতায় পাঠকদের ধরে রাখার জন্য লেখক যে ছলচাতুরী করেন সেটার নামই ‘হুক’| অফিসিয়াল নাম কিন্তু।

৮৭.

লেখা শেখার প্রথম অস্ত্র, এই ‘হুক’ ব্যবহার করেই আমাদেরকে ধরাশায়ী করেন স্মার্ট লেখকেরা। প্রথম পাতাগুলোতে আমাদেরকে ‘হুক’ড না করা গেলে বইয়ের বাকি সময়ে সাঁতার কাটতে চাইবে না কেউই। পরের দিকের গল্প যতোই চমত্কার হোক না কেন, স্মার্ট মাছ ছুড়ে ফেলবে বই। এখানেও রয়েছে অনেক গবেষণা। আর এই ‘হুক’ আসে হাজার স্টাইলে, হাজার রকমের ফর্মে। তবে, সবকিছুর পেছনে থাকে একটাই ষড়যন্ত্র। মিনিম্যালিস্ট ভার্সনে বলতে গেলে লেখক স্মার্ট মাছকে কৌতুহলী করে তোলে ওই প্রথম কয়েক পাতায়। অথবা, প্রথম লাইনেই। বলেন কি? কিউরিসিটি কিল্ড দ্য ক্যাট। পিরিয়ড। মাছ আদার খাবে কেন, কৌতুহলী না হলে? সবাই কি বেকুব আমার মতো? কিছু না পেলে কাগজের ঠোঙ্গাও পড়ে।

৮৮.

জামার পেছনে হাত পড়তেই ভেজা ভেজা লাগলো শীলার। শিউরে উঠলো সে।

নোটবইয়ের একটা অসমাপ্ত গল্পের প্রথম দুটো লাইন তুলে দিলাম এখানে। পাঠকদের এটা কৌতুহলী করে তুলবে কি? সেটা আপনারাই বলবেন ভাল করে। স্মার্ট মাছের মতো চিন্তা করলে অনেক কিছুই হতে পারে এখানে। শীলা, ও আবার কে? ওর জামাটা কেনই বা ভেজা? কিভাবে ভিজলো? কোথায় ভিজেছে ওর? বৃষ্টির পানি? শিউরে ওঠার কি আছে? না কি আবার রক্ত? রক্ত আসলো কোথা থেকে? পাঠকের কৌতুহলী হবার বেশ কিছু এলিমেন্ট আছে এখানে। আচ্ছা, আরেকটা ছোট গল্পের ওপেনিং লাইন হিসেবে কোনটা পছন্দ আপনার?

তুমি কি ভালোবাসো আমাকে? মেয়েটার প্রশ্ন।

অথবা

‘তুমি কি’ মেয়েটার অস্ফুট স্বর, ‘ভালোবাসো আমাকে?’

৮৯.

আমার ধারনায় ছোটবেলার সবচেয়ে মোটা বইটা হাতে নিয়েছিলাম সেই কৌতুহলের বসে। মোটা বইগুলোর মধ্যে এই সাতশো পাতার ওজনদার বইটা আমাকে দমাতে পারেনি – ওই প্রথম লাইনটার জন্য। দুর্দান্ত! মার্কিন সাহিত্যে অমর হয়ে আছে বইটা অনেক কিছুর জন্য। আমার মতো বেকুব মাছদের কাছে কিন্তু ওই প্রথম লাইনটার জন্য।

কল মি ইসমাইল।*

* আসল উচ্চারণ, ইসমেল। ‘আমার নাম ইসমেল’ দিয়ে শুরু করলে কি ওরকম লাগতো? প্রথম প্যারাগ্রাফটা আজ না পড়ে যাবেন না কোথাও। ভয়ঙ্করভাবে সুন্দর! ইসমেলের পুরো চরিত্রটা ফুটে এসেছে ওই প্যারাগ্রাফে। সাগর ওকে কেন ডাকে? সেটার উত্তরও ওখানে।

Read Full Post »

If you don’t learn, you can’t change, and if you aren’t changing, what’s the point of being here?

Moaning is pointless. It is unproductive and achieves nothing.

Not many people chose consciously to be loser, but that’s where they end up.

There are times when all the hard work can be devastated, destroyed, by a careless word or unguarded moment.

– Richard Templar, The Rules of Work

১২৯.

লন্ডনে বেশি না গেলেও হিথ্রো দিয়ে যেতে হয়েছে অনেকবার। আটচল্লিশ ঘন্টার নিচের ট্রানজিট ভিসা নেবার হাজারটা ঝামেলা করতামই এই ওয়াটারস্টোনসের জন্য। প্রচুর বই পড়ি, ভালো লাগে বলেই তো কষ্টটা নেই। চারিদিকে হাজারো সমস্যা, বই পড়লেই সাময়িক মুক্তি। কতো জায়গায় যেতে ইচ্ছা করে, বই উড়িয়ে নিয়ে যায় সেখানে। আপনাদের হয় কিনা জানি না – বই পড়তে গেলে মাথায় একটা ‘ইলুমিনেশন’ তৈরী হয়। ‘এন্ডরফিন্সে’র সরবরাহ বেড়ে যায় বোধহয়। পড়তেই থাকি, নেশার মতো। ভালো লাগার একটা ভাবে থাকি। সকালের ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম মাঝে মধ্যে আশির্বাদ হিসেবে কাজ করে।

Rules of life

পড়বেন নাকি বইটা?

১৩০.

এই ওয়াটারস্টোনস’ই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো ব্রিটিশ লেখক রিচার্ড টেম্পলারের সাথে। বইয়ের চেইনটা ব্রিটিশ লেখকদের সব টাইটেল ‘ক্যারি’ করে বলে এর প্রেমে পড়া। বই বিক্রি করার সহকারী হিসেবে থাকেন যারা – এক কথায় ওয়ার্ল্ড ক্লাস! বইটা কেমন হবে বললেই হলো, গড়গড় করে বলে দেবে সবকিছু। ঈর্ষা হয়েছিলো বার কয়েক, ওখানে চাকরি করলে কেমন হয়? ফাঁকে ফাঁকে হাজারটা বই পড়া যাবে কাজে বসে। মজার কথা, ছদ্মনামেই লিখেছেন অনেকগুলো ইন্টারন্যাশনাল বেস্টসেলার এই ‘রিচার্ড টেম্পলার’| সবগুলোই ‘সেল্ফ ডেভেলপমেন্টে’র উপর। সবার থিওরি একটাই, দেশ দশের উন্নতির চাবিকাঠি কিন্তু নিজের উন্নতি করেই – প্রথমে। এটা ওই এয়ারলাইন্সে বিপদের সময়ে – নিজের অক্সিজেন মাস্কটা আগে পরার মতো। আবার, যারা নিজের উন্নতি করতে গিয়ে অন্যকে তার জ্ঞান দিতে চান না, সে আসলে নিজেকেই উন্নতি করতে পারেনি। প্রিয় বিষয়টা নিয়ে এসেছি আজ। পৃথিবীর চড়াই উতরাই পাড়ি দিতে টেম্পলারের বইগুলো রীতিমত ‘গডসেন্ড’! প্রথমটা কিনেছিলাম দুহাজার তিনে। দ্য রুলস অফ ওয়ার্ক। চমত্কার স্টাইল, প্রতিটা ধারণা দেয়া হয়েছে দু পাতায়। বইটা পড়া যায় যেকোনো জায়গা থেকে – আগা মাথা ছাড়াই।

১৩১.

টেম্পলার এতো জানলেন কিভাবে? সেটা ছিলো আমারও প্রশ্ন। খুঁজতে গিয়ে কিনে ফেললাম ওর প্রায় সব বই। পরিচিত যিনিই ব্রিটেনে যান তাকে ধরে নিয়ে আসি একেকটা বই। অসাধারণ। খুব ছোট থাকতেই টেম্পলারকে থাকতে হয়েছিলো ওর নানুর বাসায়। উনি সেই গল্পের ভেতরে না যেতে চাইলেও ধারণা করা যায়, তার মা ‘খুবই ছোট’ টেম্পলারকে নিজের সাথে রাখতে পারেননি। ফলে জায়গা হয় তার নানুর বাসায়। নানুরা ছিলেন সেই ‘খেঁটে খাওয়া’ প্রজন্ম যারা অল্পতেই ছিলেন খুশি। নানার কারখানায় একটা দুর্ঘটনার ফলে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় চাকুরীর মাঝে। ট্রাকের সব ইট এসে পড়েছিলো তার পায়ে। নানু কাজ নিয়েছিলেন লন্ডনের একটা বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। টেম্পলারকে হটাত্‍ করে নানুর কাছে দেবার কারণে কিছু সমস্যার তৈরী হলো বটে। টেম্পলারের স্কুলে যাবার মতো বয়স না হবার কারণে বাসায় রাখার কথা হলো কিছুদিন। আবার, নানা ঠিকমতো দেখে রাখতে পারবেন কিনা সেটার উপর ভরসা করতে পারেন নি এই অসাধারণ মহিলা। ফলে যা হবার তাই হলো। নানু ‘খুবই ছোট’ টেম্পলারকে পাখার নিচে বেঁধে নিয়ে ছুটলেন কাজে। সেটা বাস্তবিক আর রূপক যেভাবেই ব্যবহার করুন না কেন –উপায় ছিলো না মহিলার। নানুর ম্যানেজার আর সুপারভাইজারের চোখে ফাঁকি দিয়ে স্টোরের ভেতরে ছোট টেম্পলারকে কিভাবে চালান দিতেন সেটা খুলে না বললেও মোদ্দা কথা একটাই। কাজে যেতেন একসাথেই।

১৩২.

সেই ছোট বয়সেই তার উপলব্ধি এসেছিল দুটো – যা বাচ্চাদের আচরণবিধির অনেকটাই বিপরীতে। এক, কাজের সেই লম্বা সময়গুলোতে তাকে থাকতে হবে চুপচাপ। দুই, বসে থাকতে হবে এক জায়গায়। দৌড়াদৌড়ি নয়। ছোট টেম্পলার মনে করলেন এটাই হয়তোবা পৃথিবীর রীতিনীতি। বাচ্চাটা সারাদিন ধরে সেই স্টোরের ক্রেতা আর অন্যান্যদের দেখতো তার একটা বিশাল ডেস্কের নিচে ‘হাইডআউটে’ বসে। ওখানেই বসে থাকতে ভালোই লাগতো তার। তাকে দেখছে না কেউ, সে দেখছে সবাইকে। বিশাল মজা। ওভাবেই গড়ে উঠলো দূর থেকে মানুষ দেখার আজন্ম তৃষ্ণা। মানুষ কোন পর্যায়ে কি করবে সেটা আগাম বলে দিতে পারতো সে। একটু বড় হয়ে টেম্পলার তার মার সাথে থাকতে গিয়েছিলো। মা ওর এই ‘স্কিল-সেটে’র ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। মানুষের আচার আচরণ দেখার এই অভ্যাসটা কি কাজে লাগবে জীবনে? টেম্পলার নিজেও আশাবাদী ছিলেন না এই ‘স্কিল-সেটে’র ওপর। তারপরের গল্প সবার জানা। সেই ‘স্কিল-সেটে’র কিছু ‘অসাধারণ’ নিয়ম ব্যবহার করে নিজের ক্যারিয়ারের ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ রাস্তা তৈরী করলেন তিনি। চূড়ায় উঠলেন কম সময়েই। সেই কিছু ‘অসাধারণ’ নীতিমালা নিয়ে তৈরী হলো তার প্রথম বই, ‘দ্য রুলস অফ ওয়ার্ক’, টার্নড ইনটু বেস্টসেলার!

আপনারা চাইলে তার কিছু নিয়ম নিয়ে আসবো সামনে। সেরা বইটা? পড়ছি আবার!

Read Full Post »

When you leave this world, what will you be remembered for?

Sabirul Islam #Inspire1Million

১২৪.

পিঠের ব্যথায় কষ্ট পেলেও এমআরআইটা করা হয়নি আলসেমি করেই। আসলে, মাড়াইনি অনেক দিন সে পথ। নিজের ব্যাপারেই যতো আলসেমি – অন্য কাজে নয়। নতুন এমআরআইটার কেস ফাইলটা নিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলতেই সেটা অন্যদিকে মোড় নিলো। কাল আসুন – মাথার একটা এমআরআই করলে বোঝা যাবে কিছুটা। আমতা আমতা করে অফিসের দুটো মিটিংয়ে দোহাই দিলাম। অন্যদিন হলে কেমন হয়? স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন ডাক্তার। হিমশীতল।

১২৫.

ভয় পেলাম কিনা বুঝলাম না। তবে ‘ডিস্ট্রাকশন’ খুঁজলাম মনে মনে। জ্বর নিয়ে বাসায় আছি পড়ে। ফোনের ক্যালেন্ডার উঁকি দিলো সাবিরুল ইসলামের বক্তৃতার পপ-আপ নিয়ে। বিকেল ছয়টায়। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে। গুগল করলাম ওর নাম। নামের পাশে এলো কয়েকটা কীওয়ার্ড – লেখক, উদ্যোগতা, গ্লোবাল মোটিভেশনাল স্পিকার। ইস্ট লন্ডনের অতি দরিদ্র এলাকা থেকে উঠে এসে দুনিয়া কাঁপাচ্ছেন আজ। এপিলেপ্সি রোগে আক্রান্ত এই সাবিরুল চৌদ্দ বছরেই গড়ে তোলেন নিজ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। চষে বেড়ান অনেক কোম্পানিতে – কাজের খোঁজে। ব্যর্থ হয়ে ধর্না দেন নতুন কোম্পানিগুলোর দ্বারে দ্বারে। সৃষ্টিকর্তা সবার মতো তাকেও ব্রেক দিলেন একটা। তার লেগে থাকার কারণেই চোখে পড়ে যান মেরিললিঞ্চএর এক এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের। কাজ দিলেন উনি – কিছুটা কৌতুহলের বসেই। দেখি কি করে বাচ্চাটা। পাল্টে গেলো জীবন। এপিলেপ্সি রোগ নিয়ে উড়লেন নিউ ইয়র্কে। শিখলেন স্টক এক্সচেঞ্জের কাজ – স্কুলে থাকতেই চমকিয়ে দিলেন পাড়া পড়শীদের। বাবা মার তার কাজে সন্দিহান হয়ে পড়লেন।

১২৬.

ব্যবস্যায়িক আর উদ্যোগতার যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করে ফেললেন এর মধ্যেই। সতেরো বছর বয়সে লিখে ফেললেন ‘বেস্টসেলার’ – ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট ইয়োর ফিট’| চল্লিশটা পাবলিশিং হাউস তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো তাকে। বই লেখার নাকি সময় হয়নি ওর। জ্ঞান কি হয়েছে ওর? ক্ষোভে দু:খে নিজেই পাবলিশ করার ব্যবস্থা করলেন সাবিরুল। নয় মাস ধরে স্কুলে স্কুলে তরুণ উদ্যোগতাদের জন্য বক্তৃতা দিলেন – তিনশো উনোআশিটা! বই বিক্রি হলো – পয়তাল্লিশ হাজারের বেশি! বেস্টসেলার, নিমিষেই! সেই চল্লিশটা পাবলিশিং হাউস পাগল হয়ে পিছনে লেগে গেলো তার ইনস্ট্যান্ট সাকসেসে।

১২৭.

ঘুম হারাম হয়ে গেলো তার। এর মধ্যে আমন্ত্রণ এলো খোদ নাইজেরিয়ার ফার্স্টলেডি থেকে। পাল্টে দাও আমাদের তরুণ উদ্যোগতাদের! বাবা মা পাড়লেন কথা – ইটস টু ডেঞ্জারাস! আফ্রিকাতে গিয়ে তার উপলব্ধি গেলো পাল্টে। পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ফুটছে টগবগ করে। লেখাতে আগেও বলেছি আমি। আফ্রিকা পাগল হয়ে আছে শেখার জন্য – নতুন নতুন জিনিস – প্রতিদিন! মজার কান্ড হয়েছে বতসোয়ানায় গিয়ে। হাজারটা বক্তৃতা দিতে হয়েছে তাকে। মানুষের আবেগ আপ্লুত চোখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারেননি শেষ পর্যন্ত সাবিরুল। চোখ কান দিয়ে গিলেছে তাকে – সব বক্তৃতাতে। আসল কথাটা বলা হয়নি এখনো। পুরো দেশের দশ শতাংশের মানুষ শুনেছে তার বক্তৃতা – টেলিভিশনে নয়, খোদ সমাবেশে এসে। বক্তৃতার পর ড্রাগ অ্যাডিক্ত ছেলে নিজে থেকে ভালো হয়ে দেখা করতে এসেছে লন্ডনে, ওর সাথে। সুদুর আফ্রিকা থেকে। ভিসা আর প্লেনের টিকেটের টাকা তুলে।

১২৮.

বাংলাদেশে? এসেছেন কাল। বক্তৃতা শুনে চোখে পানি এসেছে বার কয়েক। কি আবোল তাবোল বকছে ছেলেটা? পাল্টাবে কি বাংলাদেশ? ভুল স্বপ্ন দেখানোর এই সাহস কে দেখিয়েছে তাকে? গিয়েছেন আটাশটা দেশে – দেশগুলোরই আমন্ত্রণে। সবার একটাই কথা, পাল্টে দাও আমাদের ছেলেমেয়েদের! বানাও গ্লোবাল প্লেয়ার! বের করে নিয়ে আস গর্ত থেকে। দুহাজার এগারোতে লঞ্চ করেন প্রোগ্রাম ‘ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়ন’, শুরু হয়েছে মালদ্বীপ থেকে। আশা করছি আমাদেরও বের হয়ে আসবে কয়েক হাজার। আমাদের নবীও ছিলেন উদ্যোগতা।

আরো আছেন তিন দিন, শুনবেন নাকি? নিজে থেকে পাল্টে যাবেন আপনি। কয়েকজনকে তরুনকে পেলাম দৌড়াচ্ছে ওর সব বক্তৃতাতে। মন্ত্রমুগ্ধ হবার মতো বটে!

সৃষ্টিকর্তা আছেন কিন্তু সবারই সাথে। দেখি নতুন কি আছে কালকে? বোঝা যাবে সেটা মাথার এমআরআইএর পর। সব ভালো তারই জন্য।

Read Full Post »

Older Posts »

%d bloggers like this: