Feeds:
Posts
Comments

Posts Tagged ‘গুগল নাউ’

“If you want a picture of the future, imagine a boot stamping on a human face—for ever.”

George Orwell, 1984

৩৭.

ভুরু কুঁচকে রইলো তো ঠিক হলো না আর। হাজারো সমস্যার মধ্যে এটা একটা বড় সমস্যা আমার। মনের ভেতরে কি চলছে তা প্রিন্ট হয়ে যায় মুখে নিমিষেই। হালের থ্রিডি প্রিন্টার ছাড়াই কিন্তু। হলাম কারো উপর বিরক্ত, শুধুমাত্র সে কেন, পুরো এলাকার আশেপাশের লোকজন জেনে যায় আমার মনের অবস্থা।

দোস্ত, ব্যবস্যায় আসবি না খবরদার! ভাত পাবি না একদম।

ক্যাডেট কলেজের সাড়ে ছয় বছরের বন্ধুদের সদয় পরামর্শ।

কি করবো তাহলে? ভাত পাবো কই?

ধরা খাওয়ার পর যে টোন হয় সেই টোনে প্রশ্ন আমার।

ধর, রাগী অভিনেতা? অথবা কামলা। যার মুখের অভিব্যক্তি নিয়ে সমস্যা হবার কথা নয় কারো।

চেহারা পাল্টেছিল কিনা তখন জানিনা, বন্ধু আমার নিমিষেই চলে গেলো অন্য বিষয়ে।

ফিরে আসি ভুরু কুঁচকানো নিয়ে।

৩৮.

সমস্যা, বাডি? উদ্বিগ্ন উইলিয়াম, ড্রাইভিং সিটটা এডজাস্ট করলো সে।

“না, মানে”, সহজ হতে চাইলাম।

উইলিয়াম চোখে চোখ রাখলো আমার। সবুজাভ নীল চোখ বলে কথা। চার্লিজ থেরনের ভাই নাকি আবার?

‘হ্যানোভার থেকে ব্রানসউইক – সোজা মানে একটাই রাস্তা।’ কুন্ঠিত গলা আমার।

‘আই’ম অল ইয়ার্স।’ সিটবেল্ট লাগানোর কায়দাটা দেখার মতো বটে।

‘এতো সোজা রাস্তা – কিন্তু চালু করলে জিপিএস ন্যাভিগেশন, দরকার ছিলো কি?’ মুখে হাসি আনলাম জোর করে।

‘ওহ, তাই বলো।’ উইলিয়াম হাফ ছাড়লো বলে মনে হলো।

জিপিএস ন্যাভিগেশনের ব্রিফিংয়ে হারিয়ে গেলাম পরের কয়েক মিনিট। পঞ্চাশ মিনিটের রাস্তা, কোথায় ট্রাফিক কম বেশি, রেস্টুরেন্ট কোথায় – ব্রিফিং বাদ দিয়ে বরং মাথায় আটকে গেলো অন্যকিছু। চমত্‍কার উত্চারনের গলা জার্মান মেয়েটার। অসাধারণ মানে অ-অসাধারণ ভয়েস ওভার। ইংরেজিতে ‘সালট্রি ভয়েস’ শব্দটার কথা মনে হলো তখন।

কি হতে পারে ‘সালট্রি’র বাংলা? হট এন্ড হিউমিড? ভেজা গলা?

৩৯.

ঘোর কেটে গেলো উইলিয়ামের ব্রিফিংয়ে। ড্রাইভিংয়ে মাথা না খাটিয়ে অন্য কিছু করে সময়ের যথাযথ ব্যবহারটাই ওর প্রায়োরিটি। লম্বা রাস্তায় অডিও বুকের বিকল্প তৈরী হয়নি এখনো। বই পড়ার জন্য যতটুকু মনোযোগ দেবার দরকার তার থেকে বেশি দিতে পারছে ও। শুধুমাত্র প্রযুক্তির উপর ডিপেন্ডেন্সির কারণে। ন্যাভিগেশন সিস্টেম প্রয়োজনীয় সংশোধনী দিচ্ছে দরকার মতো। প্রচুর বই পড়ে ও। রথ দেখা আর কলা বেচার মতো ড্রাইভিংয়ের সময় পড়ে শোনায় প্রযুক্তি – বেস্টসেলার বইগুলো। অপেক্ষায় থাকতে হয়না আর উইকেন্ডের।

৪০.

দিন যাচ্ছে যত, কাজ বাড়ছে মানুষের ততোই। আবার চব্বিশ ঘন্টা বাড়েনি এক চিলতেও। প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল না হয়ে যাবেন কোথায়? দশ তালার অফিসে এলিভেটর বাদ দিয়ে সিড়ি ব্যবহার করা যায় বটে, তাতে সময় আর শ্রমের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বটে। কয়েক দশক প্রযুক্তির সাথে থাকার ফলে একটা ‘লাভ হেইট’ সম্পর্ক দাড়িয়ে গেছে এর মধ্যে। জি, আমার।

এখনো অন্যের চাকুরী করি বলে ইচ্ছামতো ফেলে দিতে পারছি না মোবাইলটাকে। ঘন্টায় ঘন্টায় ইমেইল চেক করার মতো বাজে স্বভাবটাও যাচ্ছে না একেবারে। এর মধ্যে যোগ দিয়েছে গুগল নাউ। নির্ভরশীল না হয়ে যাবেন কোথায়?

নোট নেবার অ্যাপ মানে হাতির মাথার ‘এভারনোট’ আমার নোট নেবার আগে নোট লেখার সাজেশন দিচ্ছে সমানে। মন আমার পড়তে শিখলো কবে থেকে? কোথায় যেনো পড়েছিলাম, হাতি ভুললেও ভোলে না এভারনোট। কি সাংঘাতিক!

৪১.

মিটিংয়ে বসার আগে মোবাইলটার কন্ঠরোধ করতে ভুলে যাই প্রায়ই। বেরসিক মোবাইলটা বিপদে ফেলার জন্যই চিত্কার করতো মাঝে মধ্যে। ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট থেকে ‘রিকল’ অ্যাপটা মিটিং বুঝে বেয়াদপ মোবাইলটাকে লাইনে এনে ফেললো কিছুদিনের মধ্যে। এমনই ভালো হয়ে গেলো যে আমার বাসার চাকুরীটা বেঘোরে হারিয়ে ফেলার আগে বাঁচিয়েছিলো এই ‘রিকল’ অ্যাপ। দুষ্ট লোকেরা মেশিন লার্নিং বলে কেমন জানি ভয় দেখায় ইদানিং। যতই দিন যাচ্ছে ততই আমার বাসার চাকুরী বাঁচাচ্ছে সে। বউকে ভয় পান না এমন কেউ নেই বলেই এই গল্পের অবতারণা। বউতো জানে না যে আমি মিটিংয়ে। এক ইমার্জেন্সিতে ফোন, মিটিংয়ে মধ্যে। দুইবার পরপর কল দেয়াতে ‘রিকল’ মাথা ঘামাতে শুরু করলো তখনই। কল লিস্ট চেক করা শুরু করলো এরই মধ্যে। লজিক এক, মহিলা ফ্রিকোয়েন্টেড কলার। লজিক দুই, পড়েছে ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি গ্রূপে। গলা ছেড়ে দিলো মোবাইলের। কি যে গলা ছেড়ে গাইলো মোবাইলটা, আমার অফিসে চায়ের দাওয়াতে আসলে সেটা শোনানো যাবেখন!

৪২.

এক্সচেঞ্জ সার্ভার আর গুগল ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট আমার অজান্তে পড়ছে গুগল নাউ। টাস্ক লিস্টই বা বাদ থাকবে কেন? আমার বাসা চেনে ছয়মাস আগে থেকেই। ফোন দিনে আর রাতে থাকে কোথায় সেটা থেকে বাসা আর অফিসের অবস্থান বের করা ব্যাপারই না কোনো গুগলের। কি ধরনের খবর সচরাচর পড়ি আমি, ফেইসবুক আর লিংকডইনে কি বলি ও জানে সব। আমার ভিজিটিং কার্ড সব মুখস্ত ‘ক্যামকার্ডের’, কাকে ফোন করি বেশি সেটা জানা কি খুব কষ্টের?

অফিসের বাইরের মিটিংয়ে যাবার ঘন্টা খানেক আগে থেকেই তাড়া দিতে থাকে বেটা গুগল নাউ।

আছি রমনাতে। মিটিং আগারগাঁওয়ে – এগারোটায়। সাড়ে নয়টায় মিষ্টি করে রিমাইন্ডার।

পনেরো মিনিটের মধ্যে বের হলে মিটিং ধরতে পারবা সময়মতো।

দশটায় রীতিমতো হুমকি।

ইটিএ মানে ‘এক্সপেকটেড টাইম অফ এরাইভাল’ কিন্তু এগারোটা। বের হও শিগগির! ধরো কাওরান বাজারের রাস্তা।

সব ইফতারির দাওয়াতের আগে প্রশ্ন আরেকটা, বলতে গেলে নিরীহ গোছের কিছুটা।

বাসা না রূপসী বাংলা? বাসায় গেলে ইটিএ এতো আর ইফতারির দাওয়াতে গেলে হবে এতো। ভুতুড়ে কান্ড কারখানা।

ইফতারি শেষ। বাসায় যাবার ছোট রিমাইন্ডার। ট্রাফিক কম, বিজয় স্বরণী ধরো, লাগবে মিনিট পনেরো।

৪৩.

বিদেশ যাত্রার ভাগ্য খুলছে না বলে রক্ষা আপনাদের। না হলে ওই গল্পে ধরাশায়ী হয়ে যেতেন সবাই আপনারা। বউ যাবে পেনাং – ট্রেনিংয়ে – তিন দিন পর। পাগল হয়ে গেলো মোবাইলটা ওর, সেই রাতে। বিদেশ ভ্রমন বলে কথা। বিদেশ যাত্রার কথা শুনলে মানুষই হয়ে যায় পাগল। আর ওতো সামান্য মোবাইল একটা। ভালই ছিলো অ্যান্ড্রয়েডটা দিন কয়েক আগে। ব্যাটারিটা বার কয়েক খুলে লাগলাম। কিসের কি?

পেনাংয়ের রৌদ্রভরা দিন, বৃষ্টি আর ঝড়ের খবর দিতে থাকলো সেই তিন দিন, টানা। ফ্লাইট নম্বর, কবে পৌছাবে সে, মানি এক্সচেঞ্জ রেট – বাদ থাকলো কি। নাহ, ডলার না নিয়ে মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতই নিতে হলো শেষে। ভাগ্গিস, বউ ছিলো ব্যাঙ্কে। নইলে হতচ্ছাড়া অ্যান্ড্রয়েডটার জন্য মানি এক্সচেঞ্জে দৌড়াতে হতো খোদ আমাকেই।

বউ পেনাং, বাড়ির বাজার আমার ঘাড়ে। গেলাম আগের মতো – স্বপ্নে। ওই স্বপ্ন না, চেইন স্টোরের নামে যে স্বপ্ন।

বলে কি হতচ্ছাড়াটা? জিপিএসে বুঝে গেছে আমি এসেছি কোথায়। টাকা খসানোর ধান্দা যতো।

টাইম ফর সাম চিকেন এন্ড ভেজিটেবল!

Advertisements

Read Full Post »

%d bloggers like this: