Feeds:
Posts
Comments

Posts Tagged ‘লিখালিখি’

“If you want a picture of the future, imagine a boot stamping on a human face—for ever.”

George Orwell, 1984

৩৭.

ভুরু কুঁচকে রইলো তো ঠিক হলো না আর। হাজারো সমস্যার মধ্যে এটা একটা বড় সমস্যা আমার। মনের ভেতরে কি চলছে তা প্রিন্ট হয়ে যায় মুখে নিমিষেই। হালের থ্রিডি প্রিন্টার ছাড়াই কিন্তু। হলাম কারো উপর বিরক্ত, শুধুমাত্র সে কেন, পুরো এলাকার আশেপাশের লোকজন জেনে যায় আমার মনের অবস্থা।

দোস্ত, ব্যবস্যায় আসবি না খবরদার! ভাত পাবি না একদম।

ক্যাডেট কলেজের সাড়ে ছয় বছরের বন্ধুদের সদয় পরামর্শ।

কি করবো তাহলে? ভাত পাবো কই?

ধরা খাওয়ার পর যে টোন হয় সেই টোনে প্রশ্ন আমার।

ধর, রাগী অভিনেতা? অথবা কামলা। যার মুখের অভিব্যক্তি নিয়ে সমস্যা হবার কথা নয় কারো।

চেহারা পাল্টেছিল কিনা তখন জানিনা, বন্ধু আমার নিমিষেই চলে গেলো অন্য বিষয়ে।

ফিরে আসি ভুরু কুঁচকানো নিয়ে।

৩৮.

সমস্যা, বাডি? উদ্বিগ্ন উইলিয়াম, ড্রাইভিং সিটটা এডজাস্ট করলো সে।

“না, মানে”, সহজ হতে চাইলাম।

উইলিয়াম চোখে চোখ রাখলো আমার। সবুজাভ নীল চোখ বলে কথা। চার্লিজ থেরনের ভাই নাকি আবার?

‘হ্যানোভার থেকে ব্রানসউইক – সোজা মানে একটাই রাস্তা।’ কুন্ঠিত গলা আমার।

‘আই’ম অল ইয়ার্স।’ সিটবেল্ট লাগানোর কায়দাটা দেখার মতো বটে।

‘এতো সোজা রাস্তা – কিন্তু চালু করলে জিপিএস ন্যাভিগেশন, দরকার ছিলো কি?’ মুখে হাসি আনলাম জোর করে।

‘ওহ, তাই বলো।’ উইলিয়াম হাফ ছাড়লো বলে মনে হলো।

জিপিএস ন্যাভিগেশনের ব্রিফিংয়ে হারিয়ে গেলাম পরের কয়েক মিনিট। পঞ্চাশ মিনিটের রাস্তা, কোথায় ট্রাফিক কম বেশি, রেস্টুরেন্ট কোথায় – ব্রিফিং বাদ দিয়ে বরং মাথায় আটকে গেলো অন্যকিছু। চমত্‍কার উত্চারনের গলা জার্মান মেয়েটার। অসাধারণ মানে অ-অসাধারণ ভয়েস ওভার। ইংরেজিতে ‘সালট্রি ভয়েস’ শব্দটার কথা মনে হলো তখন।

কি হতে পারে ‘সালট্রি’র বাংলা? হট এন্ড হিউমিড? ভেজা গলা?

৩৯.

ঘোর কেটে গেলো উইলিয়ামের ব্রিফিংয়ে। ড্রাইভিংয়ে মাথা না খাটিয়ে অন্য কিছু করে সময়ের যথাযথ ব্যবহারটাই ওর প্রায়োরিটি। লম্বা রাস্তায় অডিও বুকের বিকল্প তৈরী হয়নি এখনো। বই পড়ার জন্য যতটুকু মনোযোগ দেবার দরকার তার থেকে বেশি দিতে পারছে ও। শুধুমাত্র প্রযুক্তির উপর ডিপেন্ডেন্সির কারণে। ন্যাভিগেশন সিস্টেম প্রয়োজনীয় সংশোধনী দিচ্ছে দরকার মতো। প্রচুর বই পড়ে ও। রথ দেখা আর কলা বেচার মতো ড্রাইভিংয়ের সময় পড়ে শোনায় প্রযুক্তি – বেস্টসেলার বইগুলো। অপেক্ষায় থাকতে হয়না আর উইকেন্ডের।

৪০.

দিন যাচ্ছে যত, কাজ বাড়ছে মানুষের ততোই। আবার চব্বিশ ঘন্টা বাড়েনি এক চিলতেও। প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল না হয়ে যাবেন কোথায়? দশ তালার অফিসে এলিভেটর বাদ দিয়ে সিড়ি ব্যবহার করা যায় বটে, তাতে সময় আর শ্রমের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বটে। কয়েক দশক প্রযুক্তির সাথে থাকার ফলে একটা ‘লাভ হেইট’ সম্পর্ক দাড়িয়ে গেছে এর মধ্যে। জি, আমার।

এখনো অন্যের চাকুরী করি বলে ইচ্ছামতো ফেলে দিতে পারছি না মোবাইলটাকে। ঘন্টায় ঘন্টায় ইমেইল চেক করার মতো বাজে স্বভাবটাও যাচ্ছে না একেবারে। এর মধ্যে যোগ দিয়েছে গুগল নাউ। নির্ভরশীল না হয়ে যাবেন কোথায়?

নোট নেবার অ্যাপ মানে হাতির মাথার ‘এভারনোট’ আমার নোট নেবার আগে নোট লেখার সাজেশন দিচ্ছে সমানে। মন আমার পড়তে শিখলো কবে থেকে? কোথায় যেনো পড়েছিলাম, হাতি ভুললেও ভোলে না এভারনোট। কি সাংঘাতিক!

৪১.

মিটিংয়ে বসার আগে মোবাইলটার কন্ঠরোধ করতে ভুলে যাই প্রায়ই। বেরসিক মোবাইলটা বিপদে ফেলার জন্যই চিত্কার করতো মাঝে মধ্যে। ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট থেকে ‘রিকল’ অ্যাপটা মিটিং বুঝে বেয়াদপ মোবাইলটাকে লাইনে এনে ফেললো কিছুদিনের মধ্যে। এমনই ভালো হয়ে গেলো যে আমার বাসার চাকুরীটা বেঘোরে হারিয়ে ফেলার আগে বাঁচিয়েছিলো এই ‘রিকল’ অ্যাপ। দুষ্ট লোকেরা মেশিন লার্নিং বলে কেমন জানি ভয় দেখায় ইদানিং। যতই দিন যাচ্ছে ততই আমার বাসার চাকুরী বাঁচাচ্ছে সে। বউকে ভয় পান না এমন কেউ নেই বলেই এই গল্পের অবতারণা। বউতো জানে না যে আমি মিটিংয়ে। এক ইমার্জেন্সিতে ফোন, মিটিংয়ে মধ্যে। দুইবার পরপর কল দেয়াতে ‘রিকল’ মাথা ঘামাতে শুরু করলো তখনই। কল লিস্ট চেক করা শুরু করলো এরই মধ্যে। লজিক এক, মহিলা ফ্রিকোয়েন্টেড কলার। লজিক দুই, পড়েছে ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি গ্রূপে। গলা ছেড়ে দিলো মোবাইলের। কি যে গলা ছেড়ে গাইলো মোবাইলটা, আমার অফিসে চায়ের দাওয়াতে আসলে সেটা শোনানো যাবেখন!

৪২.

এক্সচেঞ্জ সার্ভার আর গুগল ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট আমার অজান্তে পড়ছে গুগল নাউ। টাস্ক লিস্টই বা বাদ থাকবে কেন? আমার বাসা চেনে ছয়মাস আগে থেকেই। ফোন দিনে আর রাতে থাকে কোথায় সেটা থেকে বাসা আর অফিসের অবস্থান বের করা ব্যাপারই না কোনো গুগলের। কি ধরনের খবর সচরাচর পড়ি আমি, ফেইসবুক আর লিংকডইনে কি বলি ও জানে সব। আমার ভিজিটিং কার্ড সব মুখস্ত ‘ক্যামকার্ডের’, কাকে ফোন করি বেশি সেটা জানা কি খুব কষ্টের?

অফিসের বাইরের মিটিংয়ে যাবার ঘন্টা খানেক আগে থেকেই তাড়া দিতে থাকে বেটা গুগল নাউ।

আছি রমনাতে। মিটিং আগারগাঁওয়ে – এগারোটায়। সাড়ে নয়টায় মিষ্টি করে রিমাইন্ডার।

পনেরো মিনিটের মধ্যে বের হলে মিটিং ধরতে পারবা সময়মতো।

দশটায় রীতিমতো হুমকি।

ইটিএ মানে ‘এক্সপেকটেড টাইম অফ এরাইভাল’ কিন্তু এগারোটা। বের হও শিগগির! ধরো কাওরান বাজারের রাস্তা।

সব ইফতারির দাওয়াতের আগে প্রশ্ন আরেকটা, বলতে গেলে নিরীহ গোছের কিছুটা।

বাসা না রূপসী বাংলা? বাসায় গেলে ইটিএ এতো আর ইফতারির দাওয়াতে গেলে হবে এতো। ভুতুড়ে কান্ড কারখানা।

ইফতারি শেষ। বাসায় যাবার ছোট রিমাইন্ডার। ট্রাফিক কম, বিজয় স্বরণী ধরো, লাগবে মিনিট পনেরো।

৪৩.

বিদেশ যাত্রার ভাগ্য খুলছে না বলে রক্ষা আপনাদের। না হলে ওই গল্পে ধরাশায়ী হয়ে যেতেন সবাই আপনারা। বউ যাবে পেনাং – ট্রেনিংয়ে – তিন দিন পর। পাগল হয়ে গেলো মোবাইলটা ওর, সেই রাতে। বিদেশ ভ্রমন বলে কথা। বিদেশ যাত্রার কথা শুনলে মানুষই হয়ে যায় পাগল। আর ওতো সামান্য মোবাইল একটা। ভালই ছিলো অ্যান্ড্রয়েডটা দিন কয়েক আগে। ব্যাটারিটা বার কয়েক খুলে লাগলাম। কিসের কি?

পেনাংয়ের রৌদ্রভরা দিন, বৃষ্টি আর ঝড়ের খবর দিতে থাকলো সেই তিন দিন, টানা। ফ্লাইট নম্বর, কবে পৌছাবে সে, মানি এক্সচেঞ্জ রেট – বাদ থাকলো কি। নাহ, ডলার না নিয়ে মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতই নিতে হলো শেষে। ভাগ্গিস, বউ ছিলো ব্যাঙ্কে। নইলে হতচ্ছাড়া অ্যান্ড্রয়েডটার জন্য মানি এক্সচেঞ্জে দৌড়াতে হতো খোদ আমাকেই।

বউ পেনাং, বাড়ির বাজার আমার ঘাড়ে। গেলাম আগের মতো – স্বপ্নে। ওই স্বপ্ন না, চেইন স্টোরের নামে যে স্বপ্ন।

বলে কি হতচ্ছাড়াটা? জিপিএসে বুঝে গেছে আমি এসেছি কোথায়। টাকা খসানোর ধান্দা যতো।

টাইম ফর সাম চিকেন এন্ড ভেজিটেবল!

Advertisements

Read Full Post »

No problem can be solved from the same level of consciousness that created it.

– Albert Einstein

২৯.

কিছুটা সময় পেলাম ঘর গোছানোর জন্য। গোছাতে গিয়ে হাতে পড়লো ব্রডব্যান্ড কমিশনের একটা রিপোর্ট। ছোট কিন্তু মন ভালো করা রিপোর্ট। হাজার মানুষের প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরী করা হয়েছে দুহাজার দশের লিডারশিপ মানে নীতি নির্ধারণীদের জন্য এই ডিক্লারেশন। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের সাথে এর সংযুক্তিটাই বোঝানো হয়েছে প্রতিটা পাতায় পাতায়। প্রযুক্তির ‘প’ নেই এ রিপোর্টে। দারিদ্র্যতা, স্বাস্থ্যসেবা, সবার জন্য শিক্ষা, জেন্ডার ইকুয়ালিটি আর জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে ব্রডব্যান্ড কিভাবে সাহায্য করতে পারে সেটাই বলা আছে এখানে। বাংলাদেশকে পাল্টাতে হলে যে প্রজ্ঞা দরকার তার প্রায় সবটাই দেয়া আছে এখানে। বাকিটা হোমগ্রোন। ব্রডব্যান্ড কমিশনে কমিশনার হিসেবে আছেন পৃথিবীর হু’জ হুর সবাই – যারা পৃথিবীকে পাল্টাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। সেই পঞ্চাশের লিস্টে আছেন বাংলাদেশ থেকে একজন।

৩০.

মন ভালো হয়েছে আরেকটা কারণে। এক্সিকিউটিভ সামারি শুরু হয়েছে যে বাণী দিয়ে সেটা ব্যবহার করা হয়েছে উপরে। এই চরম সত্য কথাটার প্রতিফলন দেখি আমার কাজের পদে পদে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো সমস্যার সমাধানে আগের নলেজবেস খাটিয়ে সাময়িকভাবে উতরে গেলেও লম্বা দৌড়ে সেটা বিফলে পর্যবসিত হয়। রিসার্চে কোনো পয়সা খরচ না করে আগের বিদ্যায় অল্প সময়ে সমস্যার উত্ড়ানোর ব্যবস্থা করে বরং তা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। ‘জিরো এরর সিন্ড্রোমে’ বিফলতার স্বাদ নিতে পারিনা বলে সফলতার কিভাবে আনতে হবে তাও জানি না আমরা। কোথায় যেনো পড়েছিলাম যে ব্যবস্যা আর নিজের জীবনে হোক – সমস্যা মানুষকে মারে না, বরং সেই সমস্যাকে অগ্রাহ্য বা অস্বীকার করেই মরে।

৩১.

ফিরে আসি আইনস্টাইনের কথায়। যেকোনো সমস্যার সমাধান কখনই যে লেভেলে সেটা তৈরী হয়েছে সেই একই লেভেলে সমাধান সম্ভব নয়। সমাধান চাইলে সমস্যাটা থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে নিজেকে – পুরোপুরি। আর অন্য লেভেলে গেলে সেটার সমাধানের চেষ্টাটা ব্যর্থ হলেই জানা যাবে তার আন্টিডোট। সমস্যাটার মধ্যে সমাধান লুকিয়ে থাকে বলে সমস্যায় থাকা অবস্থায় সেটা দেখা যায় না। তার জন্য বের হয়ে আসতে হবে সমস্যার অঞ্চল থেকে। অবজার্ভারের ভুমিকায় আসতে হবে নিজেকে। তাহলেই দেখতে পারবেন তার সমাধান – নিরপেক্ষভাবে। সেই জিনিসটার সাথে ভালবাসায় থাকি বলে সেটা থেকে বিযুক্ত হতে পারি না। ফলে, সমস্যাটার আসল সমাধান পাওয়া যায় না সে মুহুর্তে। যে জাতি সেলফ ক্রিটিসিজম নিতে পারে তারা থাকবে সব সময় উপরে। পয়সার অপর পিঠ দেখতে চাইলেই দেখতে পারবেন, তার আগে নয়। সেলফ ক্রিটিসিজম মানে হচ্ছে নিজেকে অন্য লেভেলে বা পার্সপেক্টিভে নিয়ে বিচার করা। এনালজি নিয়ে আসি কি বলেন? গাছের লতাপাতার জন্য আপনি পুরো বনটাকে দেখতে পাচ্ছেন না বলেই আপনাকে বের হতে হবে গাছের নীচ হতে। গাছের উপরে উঠুন – অন্য গাছের সাথে তুলনা করতে পারবেন তখনি!

৩২.

প্রযুক্তিবিদগণ নীতি নির্ধারণীতে থাকলে কিছু ভীতিকর কাজ হয় বলে আমি এ বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে বিব্রত বোধ করি কিছুটা। নীতি নির্ধারণীতে অর্থনীতির ধারণাসম্পন্ন মানুষ দেশের ভালো করে বেশি। প্রযুক্তিবিদরা সমস্যার সমাধানে তার তৈরী করা সেই প্রসেসের ভালবাসায় পড়েন বলে সেটার সমাধান এড়িয়ে যেতে পারে তাদের চোখ। নিরপেক্ষ মানুষের কাছে সমস্যাটা ধরা পড়বে সহসায়। শিক্ষা সবার থাকা জরুরী, তবে প্রজ্ঞা নয়। উৎকর্ষতার শীর্ষে থাকা দেশগুলো চালান কজন? বেশি কি? আমাদের দরকার কতজন? প্রজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারছেন যতোজন। আমার ধারনা, সমস্যা সমাধানে ভালবাসা কাজ করে না। ভালবাসার কাঙ্গাল হিসেবে আমরা খুবই আবেগপ্রবণ জাতি। সেটার প্রয়োগক্ষেত্র কিন্তু ভিন্ন।

আমি কোন জন?

প্রযুক্তিবিদ না অর্থনীতিবিদ? অথবা ভালবাসায় অবিশ্বাসী কেউ?

চমৎকার বৃষ্টি পড়ছে বাইরে।

যাবেন নাকি আমার সাথে?

Read Full Post »

‘Who controls the past,’ ran the Party slogan, ‘controls the future: who controls the present controls the past.

– George Orwell, Nineteen Eighty-Four, 1948

Because sometimes things happen to people, and they’re not equipped to deal with them.

– Suzanne Collins, The Hunger Games trilogy

২৭.

বই লিখছি দুটো একসাথে। এর মধ্যে কিভাবে যেনো ঢুকে গেলো বিগ ডাটার গল্প। হাত ঘুরছে বিলিয়ন ডাটা আমাদের – প্রতিনিয়ত, করছি কি কিছু আমরা? এই বিলিয়ন ডাটার তথ্যভান্ডারের ব্যবহারের উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যত। যতো তাড়াতাড়ি একে আত্মস্থ করতে পারবো ততো উপরে উঠবো আমরা। আমার হাতের এক্সেল সীট যদি দুতিন বছর পরের প্রজেকশন দিতে পারে তাহলে দেশ চাইলে পারবে না কেন তিরিশ থেকে পঞ্চাশ বছর পরের ভবিষ্যতদ্বানী করতে – এই বিগ ডাটার সাহায্যে। দক্ষতার বিকল্প নেই আজকে। মনটা ভালো যাচ্ছিলো না গত কয়েকদিন ধরে। এর মাঝে ঢুকে গেলো ‘স্কাইলার গ্রে’| মানে তার ডেমো টেপ। গানটার নাম ‘লাভ দ্য ওয়ে ইউ লাই’| রিপিট মোড: ফরএভার! ঘরে নিগৃহীত হবার কষ্টকর গান এটা। আমাদের দেশে এর হার বেশি বটে।

২৮.

ফিরছি বই লেখায়। সাহায্য নেবার কথা ভাবছিলাম বিগ ডাটার। অন্যভাবে নেবেন না অনুগ্রহ করে। বই পড়ছেন আপনি, মনের ভেতরে ঢুকতে পারলে বইটাকে আপনার পছন্দমতো লিখতে পারতাম আমি। আমি জর্জ অরঅয়েলের ‘নাইনটিন এইটিফোরে’র টেলিস্ক্রীনের কথা বলছি না এখানে। ‘বিগ ব্রাদার’এর নজরদারী না চাইলেও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আপনার মনের অবস্থা জানতে পারছি – প্রতিমুহুর্তে। কোন বইটা পড়ছেন সে ব্যাপারে স্টেটাসও পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। ধরে নিচ্ছি আমার বইয়ের প্রোটাগনিস্টএর নাম দীপ্তি। তার প্রথম সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করতে পারেন আপনারাই। দ্বিতীয় সম্পর্ক নিয়ে অতি সাবধানী হতে যেয়ে শান্তুনু ভুল বুঝলো দীপ্তিকে। সরে গেলো সে। আপনিও অসহিষ্ণু হয়ে পড়লেন দীপ্তির ভুলের মাত্রা নিয়ে। দীপ্তির কষ্ট নিতে পারছেন না আর। মনে মনে চাইলেন তৃতীয় সম্পর্কটা নিয়ে অন্ততঃ ঠিক সিদ্ধান্তে পৌছাবে দীপ্তি। সেটা কি পারবে দীপ্তি?

২৯.

কোটি লোকের মতো আমিও ঝাঁপ দিয়েছি ই-বুক রিডারে। বিলিয়ন বিলিয়ন বই ডাউনলোড হয়ে গেছে এর মধ্যেই। কি বই পড়ছি আমি, কার বই পড়ছি সেটা জানে আমাজন, কোবো আর বার্নস এন্ড নোবল। আমার উইশলিস্ট ঘেঁটে বের করেছে কি পছন্দ করছি এমুহুর্তে। কোন বইটা পড়তে গিয়ে আরেকটা বই ধরেছি আমি। জর্জ অরঅয়েলের বইটা পড়তে গিয়ে কতোবার ব্রেক নিয়েছি বা কোন বইটা এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলেছি সব জানে আমাজন। কোন বইয়ের ‘মুখবন্ধ’ না পড়েই পরের অধ্যায়ে গিয়েছি আর কোন বই কতো সিটিংয়ে পড়েছি সেটা আর বাদ থাকবে কেন? কোন পাতাটা মানুষকে সেই বইটা ছুড়ে ফেলে দিতে বাধ্য করেছে সেটা জানতে আপত্তি থাকার কথা নয়। বই পড়তে গিয়ে দাগাদাগি করি বলি বন্ধুরা ধার দেবার আগে সতর্ক করলেও কিন্ডলে সেটা করা যায় ইচ্ছামতো। হাঙ্গার গেমসের দ্বিতীয় বই ‘ক্যাচিং ফায়ারে’ আমার পছন্দের লাইন হাইলাইট করতে গিয়ে দেখি মারাত্মক অবস্থা। আমার আগে বিশ হাজার লোক দাগিয়েছে ওই লাইনটা। টের পেলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দাগাদাগি করা প্রথম দশটা লাইনের ভেতরে আটটাই হচ্ছে কষ্টের! কোন বইটা পড়ছি বার বার আর কোনটাতে দশ পাতাও এগোইনি সেটা জানে আমার ইলেকট্রনিক পাবলিশিং কোম্পানি।

৩০.

ধারণা করছি দীপ্তির গল্পের এন্ডিং হতে পারে চারটা। এটা নতুন কিছু নয়। ‘দ্য বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ মুভিটাতে দ্বিতীয় এন্ডিংটাই বরং কাঁদিয়েছে মানুষকে বেশি। ইভান, গল্পের নায়ক যাই করে তার ফলাফল তার কাছের মানুষকে ভোগ করতে হয়। আসল এন্ডিংয়ে ইভান ইচ্ছা করেই বান্ধবী কেইলীকে তার ওপর খেপিয়ে তোলে যাতে সে নিজে থেকে দুরে সরে যায় তার কাছ থেকে। ইভানের এই বিসর্জন বাঁচিয়ে দেয় কেইলীকে তার অসুস্থ মানসিকতার ভাই আর বাবার নিষ্ঠুরতা থেকে। অন্য এন্ডিং আরো ভয়ঙ্কর। ইভান তার জন্মের সময়ই মায়ের আম্বিলিক্যাল কর্ডে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। পরবর্তিতে তার মা আর বাবার চমত্কার মেয়ে হয় আরেকটা। সেখানে তারা একটা ভালো জীবন পায় ফিরে। নাম ‘কলোকুই’, নতুন ডিজিটাল পাবলিশিং হাউস – যার বইয়ের সিরিজগুলো পাল্টে যায় পাঠকদের মনস্তাত্ত্বিক আচরণের উপরে। লেখিকা টনা ফেন্সকের ‘গেটিং ডাম্পড’ সিরিজ উপন্যাসটার গল্প পাঠকদের মর্জির উপরে নির্ভর করে এগিয়ে চলে। গল্পের নায়িকা তার তিন ছেলে বন্ধুর কার সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটাবে তার ধারনাটা পাঠকদের কাছ থেকে পেয়ে সে এগোয়। পাঠকও খুশি, লেখিকাও। তিন নায়কের মধ্যে কে ‘জেজে’কে পাবে আর কাকে জেলে পাঠাতে হবে সেটা লেখিকা লিখে ফেলেছেন প্রায়। পরে দেখা গেলো জেজে’র বয়ফ্রেন্ড ডানিয়েলকে পছন্দ করছে তিরিশ শতাংশের বেশি পাঠক। ডানিয়েলকে বাদ দেয়া সম্ভব হলো না পরের বইয়ে। ‘গ্রেট এস্কেপস’ সিরিজের বইগুলোতে পাঠকদের পছন্দের [বিগ ডাটার কাজ] কারণে নায়ককে শুধুমাত্র লম্বাই করা হয়নি তার চুলের রঙ আমাদের মতো কালো, সবুজাভ চোখ আর আরো অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। ধন্যবাদ, বিগ ডাটা!

৩১.

হ্যারি পটার খ্যাত জেকে রোলিং হ্যারিকে বাদ দিয়ে ‘ক্যাজুয়াল ভ্যাকেন্সী’ বইটা লিখেছিলেন নিজেকে চেখে দেখার জন্য। পরের চেষ্টাটা আরো ভয়ঙ্কর! রবার্ট গ্যালব্রেইদ ছদ্দনামে একটা ক্রাইম নভেল লিখেছিলেন রোলিং – নাম “কুকু’স কলিং”| যা হবার তাই হলো। বেশ কয়েকটা রিজেকশন লেটার, পরে এক পাবলিশিং হাউস চেষ্টা করে দেখতে চাইলো। বিক্রিও হলো  কোন রকমে পনেরশো কপি। এক রিপোর্টারের সন্দেহ হলো। লেখার প্যাটার্ন আর লেখকের শব্দ বাছাই করার ধারণা থেকে যোগাযোগ করা হলো এধরনের একটা সফটওয়ারের লেখকের সাথে যিনি একাধারে ইউনিভার্সিটিরও প্রফেসর। সিগনেচার, নামেই যার পরিচয় – সফটওয়্যারটা একটা বাক্যের তার শব্দের ব্যবহার, বাক্যগুলো কতো বড় ছোট, প্যারাগ্রাফগুলো কি ধরনের, যতিচিহ্ন মানে দাড়ি, কমা, সেমিকোলন কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা বের করতে ওস্তাদ। আর তার সাথে একেকটা লেখকের প্যাটার্নের ধারণা পাওয়া যায় এ ধরনের শব্দব্যাঙ্কের সাহায্য নিয়ে শুরু হলো তার প্যাটার্ন এনালাইসিস। বিগ ডাটা দিয়ে পাওয়া গেলো আসল লেখিকার নাম। পত্রিকায় খবরটা বের হলো সেদিনই। জেকে রোলিংও সেটা মেনে নিলেন তার ওয়েবসাইটে। সেদিনই চলে গেলো বেস্টসেলার লিস্টে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের হিসেব মতে ‘মকিংজে’, হাঙ্গার গেমসের তৃতীয় বইটা মানুষ পড়েছে সাত ঘন্টায়। মানে, সাতান্ন পাতা প্রতি ঘন্টায়। আর এই বইটা পড়ার আগে প্রায় সবাই প্রথম বইটা ডাউনলোড করে পড়েছে। এর চেয়ে আরো অন্তরঙ্গ মানে ভেতরের ডাটা নিয়ে কাজ করছে পাবলিশিং হাউসগুলো। চমকে দেবার মতো লেখা নিয়ে আসব শিগগিরই!

অনুরোধ করবো কি একটা?

পড়বেন নাকি ‘নাইনটিন এইটিফোর’ বইটা?

Read Full Post »

%d bloggers like this: