Feeds:
Posts
Comments

Archive for February, 2017

কি ডিসিশন নিয়েছেন আপনারা?

ডক্টর তাকিয়ে আছেন মামুনের দিকে। দাড়িয়ে ও। ওকেই প্রশ্ন করেছেন আমাদের ডক্টর। আমার দিকে তাকিয়েছিলেন একবার। এক সেকেন্ডের মতো হবে হয়তো। ভেতর দিয়ে দেখার মতো। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘সি থ্রু মি’। ঘরে মানুষ না থাকলে যেভাবে তাকায় সবাই। অথবা তাকাচ্ছেন না ইচ্ছে করেই। কোন একটা কারণে। পলক পড়ছে না মহিলার।

রাস্তা খোলা তিনটা। আমাদের সামনে। এ মুহুর্তে। খারাপ সবগুলোই। সময় দেয়া হয়েছে দশ মিনিট। দশ মিনিটের ওই সিদ্ধান্ত পাল্টে দেবে আমাদেরকে। সারাজীবনের জন্য। এতোই কমপ্লেক্স ব্যাপারটা – মনে হচ্ছে, ডক্টরের সারাজীবনের পড়াশোনার মুখোমুখি দাড়িয়ে আমরা।

শেষ হয়ে গেছে ওই মিনিট দশ। কিছুক্ষণ আগেই।

***

দশ দিন আগের ঘটনা। প্রচন্ড ব্লিডিং হচ্ছিলো আমার। হঠাৎ করেই।

‘ঘাবড়াবেন না তো এতো!’ বলেছিলেন আরেক ডক্টর। ‘প্রেগন্যান্ট মহিলাদের কমন সিম্পটম জিনিসটা।’ কয়েকটা পরীক্ষা দিলেন বরং। আমাকে।

এতো ঘাবড়ালে মানুষ করবেন কি বাচ্চাদের? মনে হলো, সাহস দিলেন মামুনকে। ওই ডক্টর। আসলেই ঘাবড়ে গিয়েছিলো মামুন। এতো বিচলিত হতে দেখিনি আগে ওকে।

আলট্রাসাউন্ডের রেজাল্ট পারফেক্ট। হার্ট মনিটরেও এলো সবকিছু। ভালো। ভালো সবই। তবে ভালো ছিলো না কিছু একটা।

দশ ঘন্টা আগে ধরা পড়ল সমস্যাটা। ঠিকমতো সাপ্লাই পাচ্ছে না। বাচ্চা দুটো। আমার প্ল্যাসেন্টা থেকে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওজন বেড়েছে আমার। বিশেষ করে তলপেটের ওজন। ফুলেছেও বেশ। ব্যথা অনেক বাড়লেও বলিনি মামুনকে। কাঁদছিলাম মাঝে মধ্যেই। একা একা। নিতে পারছিলাম না আর। ধরে ফেললো মামুন এক রাতে।

কি করবো আমরা? জিগ্গেস করেছিলো মামুন। ‘আপনি আমার মেয়ে হলে’, ডাক্তার তাকালেন আমার দিকে। এবার ভালোভাবে। দম নিলেন কয়েক সেকেন্ড। ‘বলতাম টার্মিনেট করতে।’

দশ মিনিট আগের ঘটনা। আমাদের নতুন স্পেশালিস্ট মহিলা বুঝিয়েছিলেন ব্যাপারটা। এক বাবুমনি পাচ্ছে যা, অন্যজন পাচ্ছে না সেটাও। আমার নাড়ি থেকে। ব্যাপারটা এমন – একজন বাঁচলেও পারবে না পরের বাবু। স্টেজ তিন চলছে। চার হলে শেষ সব। মারা যাবে দুজনই।

দুটো জিনিস হতে পারে আমাদের সামনে। ইশারায় হাত দিয়ে দেখালেন ডক্টর। ‘অ্যাবর্ট করতে পারি আমরা। একজনকে।’ চোখ সরিয়ে নিলেন আমার থেকে। উপচে এলো আমার কান্না। ‘আশা করছি’ দম নিলেন মহিলা, ‘এই সিলেক্টিভ টার্মিনেশনে নরমাল লাইফ পাবার সম্ভাবনা আছে একটা বাচ্চার।’ আটকাতে পারলাম না আর।  হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম আমি। ধরে রইলো মামুন আমাকে। শক্ত করে।  

‘শেষ চেষ্টা হিসেবে সার্জারির একটা অপশন আছে আমাদের। রিপেয়ার করার চেষ্টা করতে পারি আপনার প্ল্যাসেন্টাকে। যদি বাঁচে দুজন ..’ থামলেন ডক্টর। ‘তবে, সেটা ঠিক না হলে বিপদের সম্ভাবনা বেশি। বিপদে পড়বে সবাই।’ তাকালেন আমার দিকে। বুঝলাম আমি। স্ট্রেস দিলেন শেষে। ‘মা সহ’।

মামুন তাকালো আমার দিকে। বোঝা গেল রাজি না সে। সার্জারিতে। ডক্টর জানালেন, আমরা সার্জারি চাইলে করতে হবে তাড়াতাড়ি। আজই।

‘কথা বলুন আপনারা’ উনি বললেন, ‘দশ মিনিট পর আসছি আমি। জানাবেন কি চাচ্ছেন আপনারা?’ বেরিয়ে গেলেন ডক্টর।

বাবু দুটোই আমার ভেতর। দুজনের নড়াচড়ার রিদম বুঝতে পারি আমি। ডক্টর দুটো রাস্তার কথা বললেও আমি দেখছি না কিছু। বাচ্চাদের ছবি ভাসছে এখনো। সামনের স্ক্রিনে। সেগুলোর প্রিন্টআউটও আমাদের হাতে। ১৮ সপ্তাহেই চলে এসেছে তাদের চেহারার অবয়ব। এক বাবুর নাক দেখা যাচ্ছে। ভালোভাবে। হাতের শেপও দেখা যাচ্ছে চিবুকের কাছে। মনে হচ্ছে ভাবছে কিছু। বাবুটা। শেপগুলো মুখস্ত আমার। দেখছি তো কয়েকদিন ধরে। গেঁথে গেছে মাথায়।

কাঁদছে মামুন। ধরে আছে আমাকে। শক্ত করে। ও বুঝে গেছে এর মধ্যেই। মানুষকে বুঝতে পারে  ও দেখেই। ব্যতিক্রম হয়নি এখানে। ও বুঝতে পারছে কি ঘুরছে মাথায় আমার। মানা করছে আমাকে। বার বার।

জেদি নই আমি। সবাই জানে সেটা। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ আমাদের। বিয়ের আগেই বলেছিলো ওর সমস্যার কথা। চোখের। আমার বাবা মাকে। সবাই সরে গেলেও সরিনি আমি।

হাত ছাড়ছে না মামুন। চোখ মুছলো ও। তাকালো আমার দিকে।

আরেক হাত বাড়ালাম ওর দিকে। ধরতে ওকে। দুহাতে। এতো নিশ্চিত মনে হয়নি আমার কখনো। এই নিজেকে।

বললাম, ‘খবর দাও ডক্টরকে। তৈরি আমি।’

Advertisements

Read Full Post »

Sometimes even to live is an act of courage.

― Seneca

এটা সত্যি, চাপ বেড়েছে আমাদের ওপর। মানসিকভাবে। হাজারো জিনিস চলছে আমাদের আশেপাশে। একসাথে। এটাও ঠিক, মুহুর্তে জানতে পারছি সবকিছু। এই দুনিয়ার। ইন্টারনেটের কল্যাণে। তবে, সবকিছুই কেমন জানি বেশি বেশি। কথা ছিলো, প্রযুক্তির সাহায্য করবে আমাদের। উল্টোটা নয়। আমরা ডিক্টেট করবো প্রযুক্তিকে। কি কাজ দরকার। কিন্তু, প্রযুক্তি যদি পেয়ে বসে আমাদের? উল্টাপাল্টা করে ফেলে আমাদের জীবনকে?

রিসার্চ বলে, সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ নিতে পারে না আমাদের সন্তানেরা। নিতে পারার কথাও না। বড়রাই পারে না। ‘কগনিটিভ রিসার্চ’ বলে, ২১-২৪ বছরের আগে ‘ভালো মন্দ’ আর ‘রিজনিং ক্যাপাবিলিটি’ তৈরী হয় না মানুষের মাথায়। সেখানে হাজারো ফীড নিতে হচ্ছে আমাদের। আমাদের সন্তানদের। কেউ কেউ বলবেন, সার্ভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট। যে টিকবে সে থাকবে। মানছি না সেটা। ওদেরকে তৈরি করবো আমরা। ‘ও যে টিকবে’ সেই ভাবধারা তৈরী করে দেবো আমরা। আর সেটা দিতে হবে আমাদেরই। বাচ্চাদের পাড়ার মানুষ বকুনি দিলে যেভাবে আগলে রাখি, ওই নিয়মও চলবে সোশ্যাল মিডিয়াতে।

অন্য রোগের মতো মানসিক সমস্যাও সেরে যায় পরিচর্যা পেলে। খুব ভালোভাবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ‘কনস্ট্যান্ট’ ফীড নষ্ট করে দেয় কাজ করার স্পৃহা। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ তার পুরো সময়ের কোন না কোন সময়ে ‘ডিপ্রেশন’য়ে ভোগে। এটাই স্বাভাবিক। মানুষের চাওয়া পাওয়ার মধ্যে হিসেব না মিললে হতেই পারে এই বিষন্নতা। সবারই হয় জিনিসটা। পরিবার, বন্ধু বান্ধব হাত বাড়ায় তখন।

স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যে ‘পপুলার’ হবার ব্যাপারটা এখন গড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আর তখনি যোগ হয় ‘সাইবার বুলিং’। স্কুলের ‘রটনা’ আগে থাকতো স্কুলের ক্যাম্পাসে। এখন সেটা চলে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আগে, রটনা ভুলে যেতো মানুষ। সময়ের সাথে সাথে। অথচ, এখন – সেটা থেকে যায় অনলাইনে। ‘কনটেন্ট শেয়ারিং’ একটা ক্লিকে আসার ফলে সবাই বিপদে।

‘বাংলাদেশ কম্পিউটার সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমে’ থাকার সময় দেখেছি অভিভাবকদের। তাদের সন্তানদের। কতোটা অসহায় তারা। যারা পেরেছেন তারা পাঠিয়ে দিয়েছেন বাইরে। তাদের সন্তানদের। বাকিদের থাকতে হয়েছে নরকে, ‘ডে ইন ডে আউট।’ বাইরে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি কারো কারো। অথচ, সমাধান আছে সবকিছুর। সব সমস্যার। তার আগে দরকার ‘অ্যাওয়ারনেস’। কতটুকু দরকার জীবনে। চলতে।

কয়েকটা ঘটনার পর মনে হচ্ছে একটা জিনিস। ‘আত্মহত্যা’ জিনিসটাকে একটা ‘অপশন’ হিসেবে নিচ্ছে কেউ কেউ। অথচ, কোন ভাবেই এটা একটা ‘অপশন’ না। চেয়ে দেখুন, প্রতিটা সমস্যার আছে সমাধান। এই পৃথিবীতে। যে একটা সমস্যায় আছে, তার কাছে সেটাই সবচেয়ে বড়। সেটাই স্বাভাবিক, তাই না? কিন্তু সে জানে না সমাধান আছে এটার। কোথাও আশেপাশে। সে তার সমস্যা বলছে। পুরো পৃথিবীকে। কাছের মানুষকে ছাড়া। এটা তার সমস্যা নয়, বরং আমাদের। আমরা ‘কানেক্ট’ করছি না তাকে। পরিবারে।

মানুষ যখন ওরকম ‘ভার্নারেবল’ অবস্থায় থাকে – সামান্য কথাবার্তাও কাজ করে তখন। ফিরিয়ে আনতে পারে ওই অবস্থা থেকে। ফোনেও সম্ভব। আর তাই, ‘সুইসাইড প্রিভেনশন হটলাইন’গুলোর সাফল্য অনেক অনেক বেশি। সামান্য কথা যে মানুষকে কি করতে পারে সেটা বোঝা যায় ওখানকার স্ট্যাটিসটিক্স থেকে। প্রচুর প্রযুক্তি এসেছে মানুষকে বাঁচাতে, তবে সেটা আজকের বিষয় নয়।

একজন মানুষ বলছে – ‘আত্মহত্যা’ করবে সে। সোশ্যাল মিডিয়াতে। এবং সেটা সে বলছে কয়েকদিন ধরে। লক্ষাধিক মানুষ দেখছে সেটা। মজা হচ্ছে জিনিসটা নিয়ে। কোথায় গেল সহমর্মিতা? কেউ কি জানাতে পারতেন না তার পরিবারের মানুষগুলোকে? কাছের বন্ধুদের? অথবা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে? অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতা। সুতো কেঁটে গেছে কোথায় জানি। খারাপ একটা ইনডিকেটর ব্যাপারটা।

অনেকে বলেন ‘আত্মহত্যা’ বা মানসিক সমস্যা ছোঁয়াচে নয়। ব্যাপারটা ভুল। এটা খুবই ‘কন্টেজিয়াস’। বিশেষ করে এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে। এর ‘ইনফ্লুয়েন্স’ অনেক বেশি। অনেক মানুষ জানতে পারছে মুহুর্তেই। একটা অপশন হিসেবে। ও পারলে – পারি তো আমিও। বিশাল ভুল মেসেজ চলে যাচ্ছে আমাদের ভেতরে। বের হতে হবে আমাদেরই।

‘মানসিক সমস্যা’ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা আছে আমাদের ভেতরে। ছোটবেলার রাস্তাঘাটে পাগলকে মারার ঘটনা এখনো ভাসে চোখে। এতো অমানবিক কেন আমরা? এটা অন্য যে কোন রোগের মতো আরেকটা রোগ। ঔষুধে, পরিচর্যায় সারে। পেটে যেভাবে বদহজম হয়, মাথার সামান্য ‘কেমিক্যাল ইমব্যালান্স’ মানুষকে করে তোলে অন্য মানুষ। ওই ‘কেমিক্যাল ইমব্যালান্স’ সারানো এখন অনেক অনেক সহজ।

সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষমতা অনেক। সেটাকে ব্যবহার করি বাঁচাতে। মানুষকে। আমাদের আশেপাশে। প্রতিটা জীবনই মূল্যবান। ‘সুইসাইড ক্যান নট বি অ্যান অপশন।’

Read Full Post »

%d bloggers like this: