Feeds:
Posts
Comments

Archive for September, 2014

It [is] that courage that Africa most desperately needs.

― Barack Obama, Dreams from My Father: A Story of Race and Inheritance

০৭.

‘মাছের ঝোল লাগবে, কর্নেল?’

ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম ওই মুহূর্তটাতে। ‘পীস কীপার’ রোলের পাশাপাশি ‘এবোলা’ ভাইরাস ঘাড়ের ওপর চড়ে থাকলেও ভুল শোনার মতো মানসিক অবস্থা ছিলো না ওই দিনে দুপুরে। বেশি হয়ে গেলো নাকি? ক্লান্ত? তাও না। আঠারো উনিশ ঘন্টার ইউএন ফ্লাইট তো পানিভাত। আইভোরিয়ান মেয়েটা দাড়ানো আমার সামনে। কথা বলছে – স্পষ্ট বাংলায়। একদম কুষ্টিয়া’র শুদ্ধ অ্যাকসেন্টে। হাতে গ্লাভস, সাদা টুপি, ক্যাটেরিংয়ের ড্রেস পরা। গিলে ফেললাম নিজের কথা। আগের কঙ্গো মিশনে শেখা ভাঙ্গা ফ্রেঞ্চ খানিকটা বের হলো মুখ থেকে।

‘সিল ভ্যু প্লে’। মানে, অনুগ্রহ করে দিলে ভালো আরকি। পুরোটাই অস্ফুট থাকলো মুখের ভেতর। বুঝলো কিনা জানি না।

‘আমি বাংলা জানি, ভালো বাংলা। ধন্যবাদ আপনাকে।’ সপ্রতিভ উত্তর মেয়েটার।

সুপ্রীমের সবাই এদেশীয় স্টাফ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে এধরনের ‘প্রফেশনাল’ আচরণ আশা করিনি আমি।

০৮.

বিটিআরসিতে থাকার সময়েই পেলাম পোস্টিং অর্ডারটা। নিউ অ্যাসাইনমেণ্ট। কোতে দে’ভোয়া। আইভোরিয়ানদের ভাষায় না বললে দেশটার নাম ‘আইভোরি কোস্ট’। নতুন দেশ – নতুন অভিজ্ঞতা। উড়াল দিলো মনটা আগেই। দেশটার নাম নিয়ে অনেক ভাষায় অনেক ধরনের অনুবাদ হবার ফলে তাদের সরকার ‘কোতে দে’ভোয়া’ ছাড়া মানেনি কোনটাই। আমাদের অপারেশনের ইংরেজি নামটাও ওটাই। ইউনাইটেড নেশনস অপারেশন ইন কোতে দে’ভোয়া। এসেছি স্টাফ হয়ে। মাল্টি-ন্যাশন্যাল সেক্টর হেডকোয়ার্টার। থাকা খাওয়ার দ্বায়িত্ব ‘ইউএন’এর ওপর। যোগাযোগের মানুষ আমি। নতুন এলাকা। মাথাটাকে ‘ডিফ্র্যাগমেন্ট’ করে নিলাম প্রথম কয়েকদিনে। খালি হলো কিছু যায়গা। মুখ বন্ধ, চলে গেলাম ‘অবজার্ভার’ রোলে। নতুন পরিবেশে এই টেকনিক কাজ করে ভালো। থাকতে হবে নয় দশটা দেশের লোকের সাথে। এজন্য এই সেক্টরের নাম শুরু হয়েছে ‘মাল্টি-ন্যাশন্যাল’ দিয়ে। আমার তো পোয়াবারো। জানবো নতুন কালচার। বন্ধুত্বটা শুরু হলো বেনিনের আরেক কর্নেলকে দিয়ে।

০৯.

পোস্টিং অর্ডার পাবার পরের ঘটনা। সবার কথা একটাই। সব ভালো। খালি – খেতে পারবে না ‘সুপ্রীমে’। কি যে রাঁধে – ওরাই জানে ভালো। দেশ থেকে মশলা, আচার, রাইস কূকার না নিলে বিপদ। দেশ থেকে কথা হতো আগের অফিসারদের সাথে। এই ‘কোতে দে’ভোয়া’তে। মিশন এরিয়াতে ওই একটা ‘অ্যাপ’ই আমাদের লাইফলাইন। মাঝে মধ্যে স্বাতীর কানে যেতো কিছু কিছু জিনিস। চাল ডাল নেবার জন্য জোড়াজুড়ি শুরু করলো সে। আমার ধারনা হলো ‘সুপ্রীম’ হলো ডাইনিং হলের মতো কিছু একটা। চালাচ্ছে এদেশীয় কোন কনট্রাক্টর।

১০.

শেষমেষ ‘কোতে দে’ভোয়া’তে চলে এলাম আবিদজান হয়ে। আফ্রিকার ‘প্যারিস’ খ্যাত এই আবিদজান অনেকখানি মলিন – গৃহযুদ্ধের ফলে। দেখলাম তো আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ। দেশ ‘ডিভাইডেড’ থাকলে যে কি হয় সেটা দেখছি নিজের চোখে। আমার কাজের জায়গাটা হচ্ছে পশ্চিম সেক্টরে। এটার ‘এরিয়া অফ রেস্পন্সিবিলিটি’ আমাদের দেশ থেকেও বড়। পাশেই লাইবেরিয়া আর গিনি। মাল্টি-ন্যাশন্যাল সেক্টর বলে অনেকগুলো দেশ কাজ করছে এখানে। আর আমাদের খাওয়া দাওয়ার দ্বায়িত্ব হচ্ছে এই সুপ্রীমের ওপর। ছোট পরিপাটি ডাইনিং হল – নিরীহ মনে হলো প্রথম দেখায়। অলিভ অয়েলে আসক্তি চলে এলো কিছুদিনেই। খাওয়া দাওয়া, সেটা না হয় আরেকদিন? ওয়ান লাইনার? আই অ্যাম লাভিং ইট!

১১.

নতুন দেশ দেখা নেশা হলেও তাদের কাজের ধারা নিয়ে লেখার অভ্যাসটা ঢুকে গেছে রক্তে। পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা জ্ঞানগুলোর ডটগুলোকে কানেক্ট করার মতো। পাঠকদের মধ্যে যে যেভাবে সেটা ব্যবহার করে! কাজে লাগলেই খুশি আমি। জানতে চাইলাম এই সুপ্রীমকে নিয়ে। যতোটা নিরীহ মনে করেছিলাম সেটা মনে হলো না আর। লোকাল স্টাফ দেখে বিভ্রান্ত হয়েছিলাম কিছু সময়ের জন্য। এটা রীতিমত একটা মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ক্যাটারিং কোম্পানী। দুর্গম জায়গায় খাবার, ফুয়েল আর যা দরকার সবকিছু পাঠাতে সিদ্ধহস্ত তারা। এক লাখ খাবারের প্লেট ‘ডেলিভারী’ দেয় প্রতিদিন! পাঁচ মহাদেশ মিলে ত্রিশটা দেশে কাজ করছে গত পঞ্চাশ বছর ধরে। কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার, গাড়ি বোমা, এক্সপ্লোসিভ আর বুলেট ফাঁকি দিয়ে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে আফগানিস্তান, সুদান, ইরাক, লাইবেরিয়া, মালী সহ আরো অনেক দেশে। রুয়াণ্ডা, সোমালিয়া আর কোতে দে’ভোয়া বাদ দেই কেন? তুখোড় কাজের ডাউনসাইডটা অনেক কষ্টের। শুধু আফগানিস্তানে গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত হারিয়েছে তারা ৩১২ জন বেসামরিক কনট্রাক্টর। মন খারাপ করার মতো খবর বটে।

১২.

আজ আর নয়। এই তুখোড় কোম্পানীর গল্প নিয়ে আসবো আরেকদিন! সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের জাদুর চাবিকাঠি মনে হয় আছে তাদের কাছে! সমস্যাকে নিজের অনুকূলে নিয়ে এনে ব্যবসা – এটা নিয়েই কথা হবে সামনে।

[ক্রমশ:]

Read Full Post »

Do you know what my favorite renewable fuel is? An ecosystem for innovation.

– Thomas Friedman

৬১৩.

ছোটবেলায় ইকোসিষ্টেম নিয়ে ভাবলেই মনে আসতো মানুষ, গরু, ছাগল, ঘাসপাতা, গাছের ছবি। ওগুলো ছিলো ডাঙার অংশে। বাতাস সূর্য আর পানি ছিলো ‘জীবনহীন’ কম্পোনেণ্ট। পানির অংশে তাকাতেই ভয় লাগতো আমার। কুমির, তিমি – ছবির আকারে বেশ বড়ই ছিলো আঁকাগুলো। আসল কথা হচ্ছে সবাই মিলে একটা ইকোসিষ্টেম। লাগবে সবাইকে। মানে ওই ব্যাকটেরিয়াটাকেও। কোন একটা কম্পোনেট বাদ পড়লেই বিপদ। ‘ফীডব্যাক লূপে’ হবে সমস্যা। খাদ্য চেইনেও একই সমস্যা। কেউ উত্পাদক – কেউ ভোক্তা। ঘাস ছাড়া চলে না গরুর। আবার গরু ছাড়া চলে না মানুষের। এই ‘ইন্টার-ডিপেনডেন্সি’ চিরকালের। ব্রডব্যান্ডের ইকোসিষ্টেম তো আরো ভয়াবহ। প্রতিটা কম্পোনেণ্ট শুধু একটা আরেকটার ওপর শুধু ‘ডিপেনডেন্ট’ না, একটা আরেকটার প্রবৃদ্ধির সহায়ক। বইয়ের ভাষায় বলে ফেললাম মনে হচ্ছে।

৬১৪.

ব্রডব্যান্ড ইকোসিষ্টেমে আছে কি? শুরুতেই নিয়ে আসি হাই-স্পীড নেটওয়ার্ককে। আমাদের নীতিনির্ধারকরা এটা বোঝেন ভালো। ইন্টারনেট ছড়াতে এটার পেছনেই খরচ করছেন কোটি কোটি টাকা। তাও আবার দিচ্ছেন বিটিসিএলকে। এই ইকোসিষ্টেমের ‘ইনভেস্টমেন্ট’ আসবে কিভাবে? ওই ‘পাজল’টা মেলাতে লেখা হয়েছে আরেকটা চ্যাপ্টার। পাইপ তো হলো, ভেতর দিয়ে আসা যাওয়ার জিনিস কোথায়? সেটা হচ্ছে সার্ভিস, যা তৈরি করতে আমরা আসলেই দুর্বল। কোটি টাকা দিয়ে বানালাম স্কুল, বই ছাড়া। অথচ এই ‘সেবা’র জন্যই সবকিছু। এই সার্ভিস হচ্ছে আমাদের ব্রডব্যান্ড ইকোসিষ্টেমের দ্বিতীয় কম্পোনেণ্ট। আবার সার্ভিসগুলো কিন্তু অ্যাপ্লিকেশন ভিত্তিক। অ্যাপ্লিকেশন প্রোভাইডাররা বসবেন কোথায়? ভুল বুঝবেন না, এই কম্পোনেণ্টটাই বাঁচিয়ে রেখেছে নেটওয়ার্ক প্রোভাইডারকে। অ্যাপ্লিকেশন ছাড়া ইন্টারনেট কেন, আপনার স্মার্টফোনই তো অচল। এই বিলিয়ন ডলারের অ্যাপ্লিকেশন (নাকি অ্যাপ) হচ্ছে তিন নম্বর কম্পোনেণ্ট। টেলকো’রা প্রায় অভিযোগ করেন – কমছে তাদের আয়। টেলকো’র ব্যবসা আগে ছিলো ‘ওয়ালড গার্ডেন’ ধাঁচের। নিজ নিজ অ্যাপ্লিকেশন শুধুমাত্র নিজ গ্রাহকের জন্য। ইন্টারনেট ভেঙে ফেলেছে ওই ‘ওয়ালড গার্ডেন’য়ের ব্যবসা, থমাস ফ্রীডম্যানের ভাষায়, ওয়ার্ল্ড হ্যাজ বিকাম ফ্ল্যাট! একেবারে ফ্ল্যাট! ভিসা লাগে না আয় করতে। পাশাপাশি আয় বাড়ছে টেলকো’র হু হু করে। আর যতো বাড়ছে অ্যাপ্লিকেশন, ততো মোটা হচ্ছে পাইপ। মানে ব্যবসা হচ্ছে পাইপেরও। আর যাই করেন – মিটার লাগানো আছে তো পাইপে। তবে ‘নেট নিউট্রালিটি’র একটা ধকল যাবে সামনে। ওটা আরেকদিন!

কোনটা ফেলনা নয়। একটা ছাড়া চলবে না আরেকটা। নেটওয়ার্কে পয়সা ফেললেই হবে না - বাকিগুলোকে দেখভাল করতে হবে।

কোনটা ফেলনা নয়। একটা ছাড়া চলবে না আরেকটা। নেটওয়ার্কে পয়সা ফেললেই হবে না – বাকিগুলোকে দেখভাল করতে হবে।

৬১৫.

চার নম্বর কম্পোনেণ্টের কথা ভুলে যায় সবাই। আমরা মানে ‘ব্যবহারকারীরা’। গ্রাহক। ফেসবুকের ভাষায় ‘আম জনতা’। যে যাই বলুক – ভোক্তা ছাড়া ব্রডব্যান্ড ইকোসিষ্টেমের পুরোটাই অচল। দিচ্ছে কে পয়সাটা – দিনের শেষে? ভোক্তা। আমার ভাষায় ‘প্রাইস সেনসেটিভ’ ভোক্তা। ব্রডব্যান্ড ইকোসিস্টেমের সবচেয়ে নামী দামী কম্পোনেণ্টকে নিয়ে ভাবেন কম – নীতিনির্ধারণীতে বসা মানুষেরা। আমি নিজেই ওখানে ছিলাম বলেই বলছি ব্যাপারটা। বিশ্বাস করুন, সার্ভিসের দাম আর তার সহজলভ্যতাকে ঠিকমতো ‘টুইকিং’ করতে পারলে এটাই মোড় ঘুড়িয়ে দেবে পুরো ইকোসিস্টেমের। গ্রাহকের সাথে অ্যাপ্লিকেশনের সম্পর্ককে বাদ দিলে চলবে না কিন্তু। ইন্দোনেশিয়ায় যে ধরনের অ্যাপ্লিকেশন চলে বেশি সেটা আমাদের দেশে যে চলবে সেটার গ্যারান্টি দেবে কে? বাড়বে গ্রাহক একসময়। বাড়বে গ্রাহকের চাহিদা, বাড়বে ‘সফিস্টিকেশন’, আর সেটাই বাড়াবে ডিমান্ড। ডিমান্ড বাড়লে আসবে ‘ইনভেস্টমেন্ট’ নেটওয়ার্কে। তখন, পয়সা আসবে উড়ে উড়ে। মানে ঘুরতে থাকবে ইকোসিস্টেমের বৃত্তটা। একেকটা ‘কম্পোনেণ্ট’ ঠেলে ওপরে ওঠাবে তার পরের কম্পোনেণ্টটাকে। প্রতিটা কম্পোনেণ্টকে ঠিকমতো দেখভাল করলে আর তাকাতে হবে না পেছনে।

[ক্রমশ:]

Read Full Post »

In a minimum subsidy auction, the government identifies a project and a maximum subsidy. Companies compete for the project by bidding down the value of the subsidy. The bidder requiring the lowest subsidy wins.

– FCC Staff Working Paper 2 (Oct 2010)

৬০৮.

এখন আসুন আসল প্রশ্নে – কোথা থেকে আসবে টাকা? ‘ক্লু’ হিসেবে আরেকটা টুল নিয়ে আসি এখানে। নাম হচ্ছে ‘রিভার্স সাবসিডি অকশন’। শিখেছিলাম পেরুর একটা ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি থেকে। ফিরে আসি ডোমারের গল্পে। ওই পাঁচশো এমবিপিএস/সেকেন্ড ব্যান্ডউইডথ দিতে হবে পঞ্চাশটা সরকারী স্থাপনায়। একেক স্থাপনায় চার পাঁচটা করে সংযোগ দিলে মোট সংযোগের সংখ্যা দাড়াচ্ছে দেড়শোতে। শুধু ডোমার অথবা পুরো বিভাগ ধরে ‘উল্টো’ সাবসিডির অকশন করবো একটা। যার যতো কম খরচ তাকে দেবো এলাকাটা। না পারলে শক্ত পেনাল্টি!

৬০৯.

ধরা যাক আমার হিসেবে ওই দেড়শো সংযোগের জন্য সরকারকে খরচ করতে হবে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। কিন্তু একটা অপারেটর ওই ডোমারের জন্য শুধুমাত্র ওই পাঁচশো এমবিপিএস/সেকেন্ড ব্যান্ডউইডথ নিয়ে থাকবে না বসে। তার ব্যবসার জন্য নেবে আরো এক জিবিপিএস সংযোগ। ফলে দাম কমবে আরো বেশি। আমার অকশনে থাকবে সবাই। বিটিসিএল সহ। ওই দেড়শো সংযোগের জন্য একটা অপারেটরকে কতো ভর্তুকি দিতে হবে সেটাই নির্ধারণ হবে এই অকশনে। সবচেয়ে কম টাকা চাইবে যে অপারেটর তাকে দিয়ে দেয়া হবে এলাকাটা।

৬১০.

ধরা যাক অপারেটর ‘ক’ চাইলো ষাট লক্ষ টাকা। ‘খ’ চাইলো চল্লিশ। ‘গ’ চাইলো আরো কম। অপারেটর ‘ক’ বিড শেষ করে দিলো দশ লক্ষ টাকা চেয়ে। যেহেতু অনেক ব্যান্ডউইডথ একসাথে কিনছে সরকার, কমবে দামও। এছাড়া হাজারো ভ্যালু এডেড সার্ভিস যাবে ওই নেটওয়ার্কের ওপর দিয়ে। দেখা যাবে নিজের অন্যান্য সার্ভিসের সাথে দশ পনেরো বছরের ‘অ্যামোর্টাইজেশন কস্ট’ ধরে সরকারকে দিতে হবে না বেশি ভর্তুকি। বেশি ভলিউম হওয়াতে খুশি অপারেটর। টাকা পাবে এক জায়গা থেকে। খুশি সরকার, তিন চার ভাগের এক ভাগ দিয়ে কিনছে রাষ্ট্রের সার্ভিস।

৬১১.

এই ভর্তুকিটা যাতে সরকারকে না দিতে হয় সেটার ব্যবস্থাও করা হয়েছে দুহাজার নয়ে। মানে সরকারী সংযোগ হবে বিনামূল্যে! পলিসি ড্রাফটিংয়ের সাথে ছিলাম আমিও। তবে মন মতো হয়নি পুরোটা। বিশ্বব্যাপী এটাকে বলা হয় ইউনিভার্সাল সার্ভিসেস অবলিগেশন ফান্ড। গুগল করুন ‘ইউএসওএফ’ দিয়ে। নিজের আগ্রহে তিন তিনটা অনলাইন ট্রেনিং করেছিলাম এই ইউনিভার্সাল সার্ভিসেস আর তার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। ভয়ংকর জিনিসটা হচ্ছে ফান্ড ম্যানেজমেন্ট। হতে হবে স্বচ্ছ!

৬১২.

প্রতিটা জনগনের জন্য নিদেনপক্ষে একটা সংযোগ নিশ্চিত করার দ্বায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেকারণেই তৈরী করা হয়েছে একটা ফান্ড। এমুহুর্তে এখানে পয়সা দিচ্ছে মোবাইল অপারেটরগুলো। তাদের রেভিনিউয়ের এক শতাংশ যাচ্ছে এই ফান্ডে। মোবাইল অপারেটররা আশা করছেন এই ভর্তুকির পয়সাটা তাদের দিলে কাজ হবে ভালো। তবে, ধীরে ধীরে যোগ হবে বড় বড় সব অপারেটর। তখন অনেক বড় হবে ফান্ড। তবে যে যাই বলুক, ফান্ড খরচ করতে হলে ‘নূন্যতম সাবসিডি অকশন’ ছাড়া টাকাটা কাউকে দিয়ে দিলে ব্যাহত হবে এর মহত্‍ উদ্দেশ্যটা। দক্ষতার মূল্যায়ন না হবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। তাই দেখেছি আশেপাশের দেশে। ভুল থেকেই তো শেখে বুদ্ধিমানরা, তাই নয় কি?

ডিমান্ড এগ্রিগেশনের সবচেয়ে বড় উদাহরন আছে কোরিয়াতে। মারাত্মক টুল! গল্পটাও বিশাল।

আসছি সামনে।

[ক্রমশঃ]

Read Full Post »

Success is just a war of attrition. Sure, there’s an element of talent you should probably possess. But if you just stick around long enough, eventually something is going to happen.

– Dax Shepard

৬০২.

ফিরে আসি ইন্টারনেটের দাম কমানোর গল্প নিয়ে। যেকোনো দেশের ব্রডব্যান্ডের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে সরকার নিজে। যারা বুঝতে পেরেছে আগে, তারা আজ উঠে গেছে ওপরে। সরকারের হাজারো অফিস, স্কুল, কলেজ আর হাসপাতাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দুরদুরান্তে। ওখানের ইন্টারনেটের সংযোগ দেবে কে? কমদামে? ধরুন, আমি ডোমারের একটা স্কুলের ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে আছি। আমার স্কুলে দরকার পাঁচশো বারোর (কেবিপিএস) একটা সংযোগ। ওই একটা সংযোগের জন্য বিজনেস কেস হবে না কিন্তু কোন প্রোভাইডারের। তাও আবার মাত্র পাঁচশো বারো! ওটা ওখানে নিতে যে খরচ – সেটাতে অল্প টাকা যোগ করলে সংযুক্ত করা যাবে পুরো ডোমারের সব সরকারী অফিসগুলোকে।

৬০৩.

ফিরে আসি ওই স্কুলের গল্পে। ওই একটা সংযোগ হলেও তার যা দাম হবে সেটা দিতে পারবে না সরকার। আমার স্কুলের ইন্টারনেটের বিলটা দেবে হয়তোবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেটা পাস করাতেও ওই প্রোভাইডারের যে সময় ক্ষেপন হবে তাতে রাজি হবে না সে পরের মাস থেকে। মনে করুন আমি সরকার। প্রথমেই তৈরী করবো একটা ব্রডব্যান্ড কমিশন। চার পাঁচ জনের একটা অফিস। যার জায়গা হবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে। ওই অফিসের পেটে বসে সব মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাইবো কার দরকার কতো ব্যান্ডউইডথ। দরকার কি কাজে? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হিসেব দেবে তার সব রিজিওনাল অফিস আর হাসপাতালগুলোর ইন্টারনেটের চাহিদা। ভিডিও কনফারেন্স সহ। জেলা ভিত্তিক।

৬০৪.

ধরুন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়ত্তে দুরদুরান্তের স্কুলসহ পুরো ব্যান্ডউইডথের হিসেব পাওয়া গেল পাঁচ গিগাবিট/সেকেন্ডের। আবার, জনপ্রশাসন থেকে ডিসি অফিস ধরে সবার চাহিদা পাওয়া গেল আরো তিন গিগাবিট/সেকেন্ডের। এভাবে পুরো বাংলাদেশের সরকারী সব অফিস, পুলিশ স্টেশন, স্কুল কলেজ, হাসপাতালের চাহিদা পাওয়া গেলো পঞ্চাশ গিগাবিট/সেকেন্ডের। হিসেব নিলাম সম্ভাব্য কোথায় কোথায় সংযোগটা লাগবে সেটা সহ। ব্রডব্যান্ড কমিশনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বসলাম আমি। এই পঞ্চাশ গিগাবিট/সেকেন্ডের মধ্যে তিরিশই হচ্ছে ভেতরে ব্যান্ডউইডথ। মানে সরকারী সার্ভারগুলো তো দেশের ভেতরে। নাকি তাও নেই? যুক্ত করে দিলাম দেশের ভেতরের ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জে। তিরিশ গিগাবিট/সেকেন্ড গতি কিনবো না আর। তারমানে কিনতে হচ্ছে মাত্র বিশ গিগাবিট/সেকেন্ড। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ হিসেবে। সরকারের কতো দরকার তার একটা ‘এগ্রিগেটেড’ ডিমান্ড চলে আসলো আমার হাতে। গুগল আর ফেইসবুকের কিছু প্রাইভেট ব্যান্ডউইডথ চাইলে সেটা নেমে আসবে দশ গিগাবিট/সেকেন্ডে। সরু করে তাকালেন মনে হচ্ছে? আচ্ছা, বাদ দিলাম আজ।

৬০৫.

বিজ্ঞাপন দেয়া হলো ওয়েবসাইট আর পত্রিকায়। বিশ গিগাবিট/সেকেন্ডের কতো ব্যান্ডউইডথ দরকার – দেশের কোথায় কোথায়, সেটার হিসেব সহ। এক্সেল টেবিল আকারে দেয়া হলে দেখা যাবে ওই ডোমারের পুরো ‘এগ্রিগেটেড’ ব্যান্ডউইডথ দরকার হচ্ছে প্রায় পাঁচশো এমবিপিএস! আর ওই পাঁচশো এমবিপিএস ওখানে নিতে আরো উপজেলা হয়ে যাবার সময় ওই একই পরিমানের মতো ব্যান্ডউইডথ প্রতি উপজেলায় নামিয়ে যেতে যেতে তার বিজনেস কেস উঠে যাবে অনেক আগেই। সেখান থেকে পাঁচশো বারো কেবিপিএস নেমে যাবে স্কুলে। আশেপাশের অনেকগুলো সরকারী স্থাপনা নিয়ে। পানির দামে।

৬০৬.

ভলিউমের খেলা। আন্তর্জাতিক বাজারে একটা ভলিউমের ওপর বেশি মাত্রায় ব্যান্ডউইডথ মানে ‘আইপি ট্রানজিট’ কিনলে সেটার দাম হয়ে যায় পানির মতো। কে কতো দিয়ে কিনছে সেটা নিয়ে গবেষণা করতাম বিটিআরসিতে বসে। একটা আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে যা খরচ পড়তো সেটাকে ভাগ করেছিলাম ষোলটা কস্ট কম্পোনেন্টে। হ্যা, ষোলটা। দুঃখজনক হলেও সত্যি এর মধ্যে লোকাল ব্যাকহল মানে দেশের ভেতরের ট্রান্সমিশন খরচটা সবচেয়ে বেশি।

৬০৭.

বিজ্ঞাপনের টেন্ডারের উত্তরে বিশাল সাড়া পড়বে ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক অপারেটরদের পক্ষ থেকে। লাস্ট মাইল মানে শেষ সংযোগটা দেবার জন্য হুড়াহুড়ি পড়ে যাবে আইএসপি আর মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে। যেখানে ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক অপারেটরদের নেটওয়ার্ক নেই – তবে যাদের নেটওয়ার্ক আছে তাদের সাথে ‘মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ করে নিয়ে টেন্ডারে আসবেন তারা। সরকার টাকা দেবে একটা জায়গা থেকে। ওএসএস, ওয়ান স্টপ শপ! আগের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে নয়। বিল পাশ করাতে হবে না প্রোভাইডারদের – নিজের গাটের পয়সা খরচ করে।

[ক্রমশ:]

Read Full Post »

“That’s what education should be,” I said, “the art of orientation. Educators should devise the simplest and most effective methods of turning minds around. It shouldn’t be the art of implanting sight in the organ, but should proceed on the understanding that the organ already has the capacity, but is improperly aligned and isn’t facing the right way.”

― Plato, The Republic

৫৯৭.

আসলো তো ইনভেস্টমেন্ট। পয়সা কার? ইনভেস্টরদের। বললেন আপনি। ব্যবসা যেখানে আছে সেখানেই তৈরী হবে কাভারেজ। ব্রডব্যান্ডের। মানে ঢাকা, চট্টগ্রাম আর বিভাগীয় শহরগুলোতে। বাকি জায়গা কি থাকবে খালি? তারা মানুষ নয় দেশের? মনে রাখতে হবে ইনভেস্টররা আসেননি ‘চ্যারিটি’ করতে। করবে না কেউ। করবো না আমি আপনিও। এটাই নীতি ব্যবসার। যেখানে টাকা আসবে সেখানে নিয়ে যাবেন ব্যবসা। এর বাইরে নয়। সেখানে কাজ করতে হয় রাষ্ট্রকে। এই ‘ব্যালান্সড’ কাজের জন্য দরকার ‘মেধাভিত্তিক’ পার্টনারশীপ। বলতে দ্বিধা নেই – আমাদের মেধার একটা বড় অংশ আছে ইন্ডাস্ট্রিতে। মেলাতে হবে হাত। চতুর্থ প্রজন্মের রেগুলেশনে এই পার্টনারশীপটার কথাটা এসেছে বার বার। যেখানে ব্যবসা নেই সেখানে কেন যাবেন তারা? ওখানেই দরকার ইনোভেশন!

৫৯৮.

রাষ্ট্রের কাজেই ইনভেস্টরকে ওই ব্যবসাহীন জায়গায় নেবার মেধাভিত্তিক ‘কারুকাজ’ করতে হবে সরকারকে। যেখানে ভালো ব্যবসা নেই সেখানে নেবার একটা ভালো টুল হচ্ছে ‘ডিমান্ড এগ্রিগেশন’। গল্পটা শুনেছিলাম এফসিসি’র আন্তর্জাতিক ব্যুরোর চীফের কাছ থেকে। দুহাজার নয়ে। ফেডারাল কমিউনিকেশন কমিশনের চেয়ারম্যানের সাথে প্রথম পরিচয় ওই লেবাননেই। লিংকডইনে এক ডিগ্রীতেই আছেন উনি। ব্যুরোর চীফ মহিলা ভীষণ মিশুক। গ্লোবাল ‘সিম্পোজিয়াম ফর রেগুলেটর’ মিটিংয়ে চেয়ারম্যানের সাথে এসেছিলেন উনি। লাঞ্চ ব্রেকে কথা হলো মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ব্রডব্যান্ড প্ল্যান নিয়ে।

৫৯৯.

ওই দুহাজার দশে বের হলো ওদের ন্যাশনাল ব্রডব্যান্ড প্ল্যান, ‘কানেক্টিং আমেরিকা’। যেই পড়বে – অবাক হবে এর বিশালতা নিয়ে। কি নেই এতে? সোশ্যাল সার্ভিস থেকে হেলথকেয়ার, কর্মক্ষেত্র তৈরী, শিক্ষাব্যবস্থা, এনার্জি ম্যানেজমেন্ট আর রাজনীতি – কি নেই এতে? পাবলিক সেফটি নেটওয়ার্ক? বিপদে মানুষ। ডাকবে কাকে? রাষ্ট্রকে। সবকিছুর একটা প্যাকেজ – এই প্ল্যান। ওর ছয়টা ‘গোল’ পড়লে পরিস্কার হবে সবকিছু। উনিই ধরিয়ে দিলেন কয়েকটা টুল। আমাকে। তার একটা – ডিমান্ড এগ্রিগেশন। ইনভেস্টরদের দেখিয়ে দিতে হবে বিজনেস কেস। তাহলে সরকার যা চায় হবে তাই। সরকারের দরকার সংযোগ আর ওদের দরকার বিজনেস কেস। উইন উইন সিচুয়েশন!

৬০০.

মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে ব্রডব্যান্ডের চ্যালেঞ্জ ভয়াবহ। বিশাল দেশ, মানুষ আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। হাজারো রাস্তা আছে যেখানে মানুষ যায় কালেভদ্রে। কবে মানুষ আসবে একটা, আর তার জন্য বিটিএসগুলো হাওয়া খেতে থাকবে বছরের পর বছর। এর ইনভেস্টমেন্ট ওঠা তো দুরের কথা, হয় না কোন বিজনেস কেসই। সে তুলনায় এশিয়া প্যাসিসিক হচ্ছে মোবাইলের আড্ডাখানা! জিএসএমএ’র রিপোর্ট অনুযায়ী পৃথিবীর অর্ধেক মোবাইল সংযোগ আছে এই এশিয়া প্যাসিসিকে! চোখ সরু করে দেখছে পুরো দুনিয়া। এই ছোট জায়গাটাকে।

৬০১.

বুদ্ধিমান ‘গুগল’ সবার ট্রাফিক এনালাইসিস করে পয়সা ঢেলেছে ‘ইউনিটি’ সাবমেরিন ক্যাবলে। ভারতী এয়ারটেল, সিংটেল, কেডিডিআই, প্যাকনেট আর গুগল মিলে তৈরী করেছিলো ওই ক্যাবল। বছর পাঁচেক আগে। আরেকটা সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে আসছে গুগল। পয়সা তো সব এখানে। এশিয়া প্যাসিফিক হচ্ছে ‘হ্যাপেনিং প্লেস’। সেকারণে বাংলাদেশে বিজনেস কেস অনেক সোজা। নীতিনির্ধারকদের ঠিক করতে হবে কি চান তারা। আমাদের এখানে একটা বিটিএসের সিগন্যাল অনেকদুরে গেলেও স্বল্প জায়গায় হাজারো মোবাইল থাকায় সাপ্লাইয়ের থেকে ডিমান্ড বেশি! মানে ছাড়তে হবে আরো ফ্রিকোয়েন্সি! আমাদের লিডিং মোবাইল অপারেটর দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্টিকে সংযোগ করছে মাত্র বিশ শতাংশ ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে। এটার টুল হচ্ছে ‘স্পেকট্রাম ক্যাপ’। আলাপ করবো সামনে।

[ক্রমশ:]

Read Full Post »

Careers are here and they’re gone. No matter how great we think we are, we’re nothing but the temples of Ozymandias—we’re ruins in the making.

– William Shatner

৫৯২.

আসলে এই টেলিযোগাযোগ বিভাগটা নিজেই একসময়ে ‘রেগুলেটর’ থাকায় নতুন রেগুলেটরকে মানতে চায় না মনে মনে। আবার রেগুলেটরের সঠিক সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই সরকারী কোম্পানি। সরকারী কোম্পানিটা দক্ষতার সাথে না চলার ফলে এর প্রয়োজনের তুলনায় কর্মসংস্থান করে বেশি। কোম্পানিটার দক্ষতা বাড়ানো আর খরচ কমাতে গিয়ে সরকার ওই কর্মসংস্থানকে রাজনৈতিকভাবে সমাধান না করে রেখে দেয় আগের মতো। মানুষ অসন্তুষ্ট হতে পারে বলে ওদিকে এগোয় না আর।

৫৯৩.

ফলে সরকার অনেকাংশে দ্বৈত ভূমিকায় চলে যায় সরকারী কোম্পানির জন্য। এটাই সবচেয়ে বড় ভুল সিগন্যাল – এফডিআই কমিউনিটির কাছে। এদিকে বুদ্ধিমান দেশগুলো এই বেসরকারিকরণ শুরু করেছে নিজের কোম্পানিটার কিছু অংশ ‘প্রাইভেটাইজেশন’ করে। শুরু করেছে ওই নব্বইয়ের দিকে। এখন পুরোপুরি ‘প্রাইভেটাইজেড’ হয়ে গেছে ওই অদক্ষ কোম্পানিগুলো। অনেক আগে শুরু করাতে সুফল পাচ্ছে দেশগুলো। এতে ম্যানেজমেন্ট চলে যায় দক্ষ কর্পোরেট গভর্নেন্সের কাছে। চুক্তি থাকে সরকারের সাথে – কিভাবে কতো বছরে মানুষের চাকরি না খেয়ে দক্ষ লোক নিয়োগ দেবে ম্যানেজমেন্ট।

৫৯৪.

আস্তে আস্তে দক্ষতা ফিরে পায় পুরনো ‘ইনকামবেন্ট’। রেগুলেটর হাফ ছেড়ে বাঁচে ওই দ্বৈত ‘রোল’ মানে ভুমিকা থেকে। রেগুলেটরের একটা স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন আসে ভেতরে। সরকারী কোম্পানির প্রভাব কমে আসে কমিশনে। ইনভেস্টররা আস্থা ফিরে পায় রেগুলেটরের ওপর। ইনভেস্টমেন্ট আসতে থাকে ব্রডব্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচারে। শুরু হয় সুস্থ প্রতিযোগিতা। দাম কমে আসে আসল দামের কাছে। মানে প্রোডাকশন কষ্টের কাছাকাছি। এটাইতো চায় গ্রাহক।

৫৯৫.

প্রস্তাব দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি না আমি। সরকারী কোম্পানিকে কিভাবে ‘প্রাইভেটাইজেড’ করতে হয় সেটার রোডম্যাপ আমার মুখস্ত। শুরু করবো ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ দিয়ে। কোম্পানির মূল্যমান নির্ধারণ করাটা সমস্যা নয় আর। আজও মনে পড়ে মানুষ কিভাবে লাইন ধরে প্রথম টেলিটকের সংযোগ কিনেছিলো। ভিয়েতনামের ভিয়েতটেল এসেছিলো বাংলাদেশে। ইনভেস্ট করতে। কথা হয়েছিলো তাদের সাথে। কয়েক দফায়। শতভাগ মালিকানা আর অপারেশন্স হচ্ছে ওদের মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্সের হাতে।

৫৯৬.

ওদের মোবাইল ভেঞ্চার ‘ভিয়েতটেল মোবাইল’ আসে বাজারে সবার শেষে। সবার শেষে এসে এখন সেটা এক নম্বর অপারেটর। ফিক্সড লাইন মানে টিএন্ডটিতে তাদের ‘রীচ’ প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অনেক আগে থেকেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের বিনামূল্যে ফোন আর ইন্টারনেট দিয়ে মন জয় করে আসছে এই ভিয়েতটেল। আফ্রিকায় তাদের অপারেশন্সে স্থানীয়দের মন জয় করছে একই ভাবে। সরকারী এই ‘ভিয়েতটেল’এর সাকসেস স্টোরি নিয়ে গবেষণা হয়েছে অনেক। ওদের মার্কেটিং স্ট্রাটেজি মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো। এরমধ্যে ইনভেস্ট করেছে আরো দশ বারোটা দেশে।

এসেছিলো বাংলাদেশেও। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কিভাবে একটা কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজার দখল করছে সেটা জানতে চোখ রাখতে হবে সামনের সংখ্যাগুলোতে।

[ক্রমশ:]

Read Full Post »

If the world is cold, make it your business to build fires.

– Horace Traubel

৫৮৮.

স্বাধীন, শক্তিশালী রেগুলেটরি সংস্থা সবসময় চেয়েছে ডাব্লিউটিও। ইন্ডাস্ট্রির আর রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নয় এমন সংস্থা। সরকারী বেসিক টেলিযোগাযোগ সেবা দিচ্ছে এমন কোম্পানিকেও ছাড় দিতে পারবে না এই রেগুলেটর। বাজারে অন্য কোম্পানিগুলোকে দেখভাল করতে হবে এক নীতিমালা দিয়ে। টেলিযোগাযোগে স্পেকট্রাম, ‘রাইট অফ ওয়ে’ আর নাম্বারিং হচ্ছে দেশের সীমিত সম্পদ। স্পেকট্রাম হচ্ছে আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য লাইফলাইন। ভবিষ্যত ব্রডব্যান্ড নির্ভর করছে এর ওপর অনেকাংশে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর সাত শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি নির্ভর করছে এর ওপর।

৫৮৯.

আর নাম্বারিং হচ্ছে সবার জন্য ভয়েস কল করার নিশ্চয়তা। ইউনিভার্সাল এক্সেস। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বসাতে গেলে রাস্তার ‘রাইট অফ ওয়ে’র মতো তাদের ‘লিগাল এক্সেস প্রভিশনিং’য়ে সরকার কিছু টাকা পায়। আবার সেটা ঠিকমতো না বলা থাকলে সমস্যায় পড়ে ইনভেস্টররা। দক্ষতার সাথে সম্পদগুলোর ‘অ্যালোকেশন’ না হলে দেশ হারায় প্রবৃদ্ধির সুযোগ। সম্পদগুলোর ‘অ্যালোকেশন প্রসিডিউর’ হতে হবে স্বচ্ছ, পক্ষপাতিত্ব ছাড়া। ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডগুলোর বর্তমান ‘অ্যালোকেশন’ উন্মুক্ত থাকতে হবে সবার জন্য। সবাই জানবে কে কি পাচ্ছে। তবে সরকারী ‘অ্যালোকেশনে’র বিস্তারিত দরকার নেই এই চুক্তিতে।

৫৯০.

দেশগুলোর ডাব্লিউটিও’র এইসব ‘কমিটমেন্ট’ বিশ্ববাজারে একটা শক্ত সিগন্যাল দেয়। মানে সেক্টরে রিফর্ম চাচ্ছে দেশটা। আবার চুক্তিতে সাক্ষর করেছেন কিন্তু মানছেন না – তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে। মেষপালকের ওই নেকড়ে আসার গল্পে আসবে আর না কেউ। ইনভেস্টমেন্ট ‘ক্রেডিবিলিটি’ মানে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে দেশ। কয়েকটা কনসাল্টিং ফার্মের রিপোর্ট দেখে যা বোঝা গেল যারা ডাব্লিউটিও’র রেফারেন্স পেপারে সত্যিকারে ‘কমিট’ করেছিলেন – তাদের দেশে এফডিআই এসেছে অনেকগুণ।

৫৯১.

আসলেই অনেকগুণ। আর বেশি এফডিআই মানে বেশি প্রতিযোগিতা। নতুন নতুন টেলিযোগাযোগ ইনফ্রাস্ট্রাকচার। নতুন প্রোডাক্ট, হাজারো বিকল্প – দাম না কমে যাবে কোথায়? মানে আসল (প্রোডাকশন কস্ট) দামের কাছাকাছি চলে আসবে ইন্টারনেটের দাম। অথবা এখনকার দামে অনেকগুণ বেশি ইন্টারনেট। তবে এফডিআই আনার জন্য সবচেয়ে বড় কাজ করে দেশটা যখন তার নিজ টেলিযোগাযোগ কোম্পানিটা বেসরকারি করে দেয়। এটা ইনভেস্টরদের জন্য সবচেয়ে বড় সিগন্যাল। মানে, সরকারী কোম্পানিকে বাঁচাতে অন্যায় কিছু করবে না দেশটা।

[ক্রমশ:]

Read Full Post »

Outstanding leaders go out of their way to boost the self-esteem of their personnel. If people believe in themselves, it’s amazing what they can accomplish.

— Sam Walton

৬০৮.

ইন্টারনেটের সফল দেশগুলোর নাম তো জানেন সবাই। ওদের ইতিহাস পড়ছিলাম এক এক করে। এদের প্রায় প্রত্যেকেই ইন্টারনেটের শুরুর দিকে জোর দেয় ডিমান্ড ‘ফ্যাসিলিটেশন’ – ইন্টারনেটের চাহিদা বাড়ানো গল্প নিয়ে। সে কারণে তাদের আগের নীতিমালাগুলো ‘সাপ্লাই সাইড’ থেকে ‘ডিমান্ড তৈরি’ নিয়ে ব্যস্ত ছিলো বেশি। বাজার তৈরি করা থেকে শুরু করে ইন্টারনেট মানুষের কি কি সুবিধা দিচ্ছে সেটা নিয়ে জোর প্রচারনা ছিলো সবসময়ে। সরকারী প্রতিটা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে গিয়েছিলো ইন্টারনেটে। ইন্টারনেট মানে স্বচ্ছতা – নয় কোন দালালী – মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের নিশ্চিহ্ন করার যা যা ব্যবস্থা নিতে হয় সব করেছিলো দেশগুলো। ইন্টারনেটকে সহজলভ্য করার হাজারো পন্থা বের করেছিলো গনশুনানী করে। পার্টনার করে নিয়েছিলো ইনডাস্ট্রি স্টেকহোল্ডারদের। বলেছে – কমিয়ে দাও ইন্টারনেটের দাম – কি লাগবে তোমাদের? কোথায় কোথায় পাল্টাতে হবে নীতিমালাগুলোকে? দেখিয়ে দাও, ঠিক করে দিচ্ছি এক এক করে। যা যা পেরেছে ঠিক করে দিয়েছে রেগুলেটর।

৬০৯.

নিয়ে আসো আরো গ্রাহক বান্ধব সেবা, নিয়ে যাও ওই ‘বটম অফ দ্য পিরামিডে’র লোকটার কাছে। ওর কাছে পৌছানো মানে হচ্ছে সবার কাছে পৌছানো’র কাজটা হয়েছে ভালোভাবেই। পিরামিডের সবচেয়ে নিচের স্তরে যে মানুষগুলো আছে তাদের দেখভাল করবে কে? ওই দেখভাল করার জন্য ছাড় দাও অপারেটরদের, উইন উইন সিচ্যুয়েশন। আমরা দেখবো অপারেটরের কিছু দিক, তখন সেও দেখবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষটকে। কত ছাড়ে কতো সুবিধা – সেটা আবার দেখবে রেগুলেটর। রেগুলেটরের রোল পাল্টে গেছে অনেক আগেই – বুদ্ধিমান দেশগুলোতে। টেলিকম রেগুলেটর ইদানিং দেখছে শুধুমাত্র স্পেকট্রাম আর নাম্বারিং। বাকি সব চলে গেছে ‘কনজ্যুমার প্রোটেকশন’ আর ‘কম্পিটিশন’ এজেন্সির কাছে। গ্রাহকস্বার্থ ব্যাপারটা কতো বড় জিনিস সেটা বুঝেছি অনেকগুলো রেগুলেটরের ‘অ্যানুয়াল রিপোর্ট’ দেখে। সাইটে আছে দেয়া। ‘বুদ্ধিমান’ দেশগুলোতে গেলে ওটা ছিলো একটা ‘মাস্ট’ আইটেম – নিয়ে আসার।

৬১০.

আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি ভালো করেই – ইন্টারনেটে সফল দেশগুলোর অনেকেই মুখাপেক্ষী হয়ে ছিলো না অপারেটরদের ওপর। সরকারী টাকা খরচ হয়েছে ‘এসপিভি’র ওপর। তৈরি করেছে ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাক্চার। যুক্ত করেছে গ্রামগুলোকে শহরের সাথে, বিছিয়েছে হাজারো কিলোমিটারের ফাইবার অপটিক কেবল। এসপিভি, স্পেশাল পারপাজ ভেহিকেল। সবার অংশগ্রহণে একটা কোম্পানী। সরকারের একটা ‘স্টেক’ থাকলেও ম্যানেজমেন্টে হাত দেয় না। ওটা ছেড়ে দেয়া থাকে দক্ষ ম্যানেজমেন্টের ওপর। এটা নিয়ে লিখেছি অনেকবার। মনে আছে বিটি, ব্রিটিশ টেলিকমের কথা? ইনফ্রাস্ট্রাক্চার কোম্পানীর সংখ্যা দুটোই যথেষ্ট। পুরো দেশকে যুক্ত করবে ‘ব্যাক টু ব্যাক’ – সব ব্যাকবোনে। অ্যাক্সেস কোম্পানীগুলো, হতে পারে মোবাইল, পিএসটিএন অথবা আইএসপি – তাদের ‘লাস্ট মাইলের’ আগের ‘মিডল মাইল’ নেবে ইনফ্রাস্ট্রাক্চার কোম্পানী থেকে। লাস্ট মাইলে এখনো দারুন কাজ করছে স্পেকট্রাম।

৬১১.

আসল কথাটা বলিনি এখনো। সরকারী ফান্ডের একটা বড় অংশ যায় ‘আর এণ্ড ডি’তে। মানে, ইউনিভার্সিটিতে। রিসার্চ ছাড়া দুনিয়া অচল। ইন্টারনেটকে কিভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে পুরো দেশে – এটা নিয়েই তৈরি হয় বিশাল বিশাল প্রজেক্ট। নীতিমালা বানানোর প্রজেক্ট। কোন নীতিমালায় পয়সা নষ্ট হবে কম। ওর মধ্যে থাকবে দেশীয় কনটেন্ট তৈরির জন্য বিশাল প্রণোদনা, কারণ তাহলে সবই ‘হোস্ট’ হবে দেশের ভেতর। এছাড়া ওই কনটেন্টগুলো পড়তে পারবে সবাই। মনে আছে জিপিটি’র কথা? ‘জেনারেল পার্পাজ টেকনোলজি’। বললে হবে না যে – “বুঝি না ইন্টারনেট”। দরকার পড়লে হাসপাতালের উচ্চপ্রযুক্তির জিনিসপত্র বুঝতে পারছি কিন্তু আমরা – তাহলে সাধারণ মোবাইল ব্যবহার করে পরীক্ষার ফী দিতে পারবো না কেন?

দরকার প্রযুক্তি ব্যবহার করার প্রায়োগিক বিদ্যা। এই প্রশিক্ষণ দিয়েছে ওই দেশগুলো – তাদের বয়স্কদের। চালিয়েছে ‘ডিজিটাল লিটারেসী প্রোগ্রাম’। ওর কিছু ‘স্যাম্পল’ও ছিলো আমার কাছে। দূরে নয়, সিঙ্গাপুরে গেলে পাবেন ভুরি ভুরি।

[ক্রমশ:]

Read Full Post »

Effective leadership is not about making speeches or being liked; leadership is defined by results not attributes.

— Peter Drucker

৬০৩.

একটা কথা বলে রাখি চুপি চুপি, ‘ওয়ারলেস অ্যাক্সেস’ রাজত্ব করবে আরো অনেক বছর। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে। ফিক্সড ইনফ্রাস্ট্রাক্চার যেখানে তৈরি হয়নি শুরুর প্ল্যানিংয়ের অভাবে। আমার মতে, ‘ওয়ারলেস অ্যাক্সেস’ হচ্ছে একটা ‘স্টপ গ্যাপ’ সলিউশন। মানে পুরো সলিউশন না আসা পর্যন্ত একটা ‘মেকানিজম’। বসে তো থাকবে না কেউ। তবে, এটা চলবে না শত বছর ধরে। ওয়ারলেস সারাজীবন রাজত্ব করবে ‘গ্যাপে’ – বাসা থেকে যাচ্ছেন অফিস, অফিস থেকে বাসা, ট্রিপে যাচ্ছেন শহরের বাইরে। অথবা বিদেশে। আর, বাসায় থাকবে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড। অফিসে কথা আর নাই বা বলি। স্পেকট্রামের কিছু ‘ইনহেরেন্ট’ সমস্যার কারণে এটা ফিক্সড এর মতো অতো ‘রেজিলিয়েণ্ট’ পারে না হতে। মাল্টিপল বিমফর্মিং ছাড়াও আরো অনেক প্রযুক্তি আসলেও ‘ফিক্সড’ হচ্ছে ‘গ্যারানটিড’ ধরনের জিনিস। স্ট্রীমিং ভিডিও দেখছেন ওয়ারলেস ইন্টারফেসে। চলছে ভালই, আবহাওয়া খারাপের কারণে হোক আর সিগন্যাল দুর্বলের জন্য হোক – দরকারী ‘থ্রু-পুট’ না পেলে সবই মাটি। ভিডিও কণফারেন্সে সমস্যা করলে তো ব্যবসাই শেষ।

৬০৪.

‘ওইয়ার্ড’ মানে তারের ইনফ্রাস্ট্রাক্চারে তার না কাটা পর্যন্ত চলতে থাকবে আজীবন। অফিসে, বাসায় মূল লাইনটা আসছে ওই তারের ইনফ্রাস্ট্রাক্চার দিয়ে, বাকিটা হয়তোবা শর্ট রেঞ্জ অ্যাক্সেস পয়েন্ট নিচ্ছেন কেউ কেউ। ‘ওয়াই-ফাই’কে আমরা তারের ইনফ্রাস্ট্রাক্চারেই ধরে নেই। তবে বাসার আর অফিসের ডেস্কটপ তারেই যুক্ত। ভিডিও কণফারেন্স চলে তারের ওপর। বিদেশে গেলেও অফিসে পাচ্ছেন কেবল। হোটেলেও পাচ্ছেন ওয়াই-ফাই, যার পেছনে রয়েছে শক্ত ‘কেবল’ ইনফ্রাস্ট্রাক্চার। মানে হচ্ছে – রাস্তায়, বাসে, বিমানে, গ্রামাঞ্চলে প্রয়োজন পড়ছে এই ওয়ারলেস অ্যাক্সেস। ভবিষ্যতের কথা বলছি কিন্তু। বাসে, বিমানেও পাওয়া যাচ্ছে ওয়াই-ফাই, বড় বড় শহরেও আসছে মেট্রো-ওয়াই-ফাই। মোবাইল অপারেটরের স্পেকট্রামের বহুল ব্যবহার হবে আরো দশ বছর, এই বাংলাদেশে। সংখ্যায় বলবো সামনে।

৬০৫.

বড় বড় ইনভেস্টমেন্ট আসবে এই ফিক্সড ইনফ্রাস্ট্রাক্চারে। আমাদের এই বাংলাদেশে। আসতেই হবে। টাকা উড়ে বেড়াচ্ছে পুরো পৃথিবীতে, আফ্রিকাতে, আসতে চাইছে বাংলাদেশে। অনেকে জানে না নীতিমালা। বিশ্ব ব্যাংকের একটা স্টাডি পড়ছিলাম কাল রাতে। বুদ্ধিমান দেশগুলো খুঁজে বের করছে ‘নেক্সট জেনারেশন নেটওয়ার্ক গ্যাপ’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটাকে বলছে ‘নেটওয়ার্ক অ্যাভেইলিবিলিটি গ্যাপ’। ওই অংশটার দাম কয়েক বিলিয়ন ডলার। মানে এখানে উদ্যোক্তারা বের করে নিতে পারেন তাদের বিজনেস কেস। ‘পয়সাঅলা’ দেশের গল্প আলাদা। এনবিএন, ন্যাশন্যাল ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক তৈরি করতে বের করছেন ‘স্টিমুলাস’ মানে প্রণোদনা প্যাকেজ। অস্ট্রেলিয়ার গল্প বলতে বলতে হয়রান করে ফেলেছি আপনাদের। সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের একই অবস্থা। ভুললে চলবে না, ব্রডব্যান্ড কিন্তু একটা ইনফ্রাস্ট্রাক্চার।

৬০৬.

ভুল বুঝবেন না, ব্রডব্যান্ড বোঝাতে ‘কেবল’কেই বোঝায় উন্নত দেশগুলোতে। তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হলেও লাগবে স্পেকট্রাম, আমাদের মতো দেশে। দশ মেগাহার্টজের নিচে একেকটা চ্যানেল প্ল্যান? উহু, ওটাকে বলা যায় না ব্রডব্যান্ড। এজন্য দরকার আরো স্পেকট্রাম – দিতে হবে অপারেটরদের। হিসেব কিন্তু দিয়েছিলাম আগে। প্রথম ‘থ্রীজি’ লাইসেন্সটা ড্রাফট করার সময় নূন্যতম ব্যান্ডউইডথ দেবার কথা বলেছিলাম দশ। চার দশে চল্লিশ। চারটা অপারেটর। একজন নিতে পারে পনেরো। আমার দেশকে চিনি ভালোভাবে। এখানে ‘কাভারেজ’ ইস্যু নয়, বরং অপারেটরদের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে ক্যাপাসিটি’র সমস্যা। ইন-বিল্ডিং সলিউশন নিয়ে আসছেন ফেমটোসেল দিয়ে। বিল্ডিং কোডে রাজউককে বলে দিতে হবে এগুলোর ‘প্রোভিশনিং’য়ের কথা। দশের নিচে চ্যানেল প্ল্যানে বিটিএস কিনতে কিনতে পাগল হয়ে যাবে অপারেটর। মাঝখান দিয়ে গ্রাহক পাবে না দরকারী গতি। এমন নয় যে আমাদের ঘাটতি আছে স্পেকট্রামের। পড়ে আছে এখনো বেশ কিছু। ওটা ব্যবহার না হলে ক্ষতি সবার। ওটার এনপিভি মানে ‘নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু’ যাচ্ছে কমে দিন দিন। আবার অপারেটরদের ‘স্পেকট্রাল এফিশিয়েণ্ট’ করতে লাগবে ‘বুদ্ধিমান’ রেগুলেটর। দরকার ভারসাম্যতা। প্রতিটা নেটওয়ার্ক ইকুইপমেন্ট কিনতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। উপায়?

৬০৭.

বুদ্ধিমান দেশগুলো ফাইবার নেটওয়ার্ক দিয়ে ভরে ফেলছে মেট্রো এরিয়াগুলোকে। সরিয়ে ফেলছে পুরোনো ‘পয়েন্ট টু পয়েন্ট’ স্পেকট্রাম ব্যাক-হল। দেয়া লাগছে না আগের মতো স্পেকট্রাম চার্জ। ওই স্পেকট্রাম বরং দেয়া যেতে পারে নতুন অপারেটরদের। এই স্পেকট্রাম ‘রিভোকেশন প্ল্যান’ করতে হবে রেগুলেটরকে। প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে না বাজারে? লাস্ট মাইলে থাকবে স্পেকট্রাম – আরো অনেক বছর। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে। তাই মোবাইল অপারেটররাও তারের স্বাদ দিতে চাচ্ছেন তাদের গ্রাহকদের। যুক্ত করছেন তাদের থ্রীজি/এইচএসপিএ+/এলটিই বিটিএসগুলোকে একেবারে ফাইবার দিয়ে। গিগাবিট ইথারনেট। মালয়েশিয়াতে তো এটা একটা লাইসেন্সিং শর্ত। থ্রীজি’র ব্যপারে। এলো থ্রীজি এতদিন পর, মন ভরাতে হবে গ্রাহকদের। অনেক গ্রাহক হলেই না দাম কমবে ইন্টারনেটের। দুই শার্টে একটা ফ্রী, একহাজার শার্টে দাম অর্ধেক। প্রত্যেকটার। জানতে হবে ওই ‘ক্রিটিক্যাল মাস’টার কথা।

[ক্রমশ:]

Read Full Post »

A leader is best when people barely know he exists, when his work is done, his aim fulfilled, they will say: we did it ourselves.

— Lao Tzu

৫৮৮.

প্রশ্ন করি একটা?

আপনার ইন্টারনেট ব্যবহারের কতোটুকু আসে বাইরে থেকে? মানে দেশের বাইরে?

পুরোটাই?

বোধহয় না। দেশের পত্রিকাগুলোর অনলাইন ভার্সন দিয়ে শুরু করতে দেখেছি আমার বন্ধুদের। পত্রিকাগুলোর অফিস কি নিউ ইয়র্কে? অবশ্যই না। তারা * আছেন বাংলাদেশে।

৫৮৯.

আপনার মেইলের প্রাপকের কতো শতাংশ থাকেন বাইরে?

আপনার অফিসের মেইলের কথা চিন্তা করুন তো একবার। প্রেরক আর প্রাপক সবাই আছেন দেশে। পাঠাচ্ছেনও বড় বড় অ্যাটাচমেন্ট। আমার ট্রাভেল এজেন্ট আমাকে তার টিকেট পাঠান তার জিমেইল অ্যাকাউন্ট থেকে। আমিও পাঠাই ইয়া ভারি পাসপোর্টের অ্যাটাচমেন্ট। অবাক ব্যাপার হচ্ছে আমরা সবাই আছি দেশেই। অথচ মেইলগুলো ঘুরে আসছে দেশের বাইরে থেকে। চিন্তা করুন – ওই মেইলটা আমাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কেনা ব্যান্ডউইডধ খরচ করে – যাচ্ছে একবার দেশের বাইরে। আবার, ফিরছে আরেকটা দামী লিঙ্ক দিয়ে। অনেকদেশ ধারনা করে – আমাদের মনে হয় অনেক পয়সা, পেট্রোডলারের মতো খানিকটা, খরচ করার যায়গা পাচ্ছে না বলে এই পদ্ধতি। সত্যি কি তাই?

৫৯০.

ছিয়ানব্বই-আটানব্বই সালের ঘটনা একটা। ফ্রীবিএসডি, লিনাক্স আর উইনডোজ ৩.১ নিয়ে অনেক মেশিনের ছড়াছড়ি ছিলো আমার অফিসে। একেক অ্যাপ্লিকেশন একেকটাতে। ভাগ্যিস ভিএমএস ছিলো না তখনো। কয়েকটা মেশিন এই অফিসে থাকলেও জায়গার সংকুলান না হওয়ায় বাকিগুলোকে পাঠানো হলো অন্য অফিসে। পাশাপাশি দু অফিস হলেও ইন্টারনেট নেয়া ছিলো দুটো আইএসপি থেকে। অফিস দুটোর মধ্যে নেটওয়ার্কটা সমস্যা দেয়াতে শিখলাম একটা নতুন জিনিস। প্যাকেট ট্রেসিং করে দেখা গেলো ট্রাফিক ঘুরে আসছে আমস্টারড্যাম আর হংকংয়ের রাউটার হয়ে। পাশের অফিস, কিন্তু ঘুরে আসছে সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে – বিশ ত্রিশটা ‘এজ’ রাউটারে সময় নষ্ট করে।

দুনিয়া ঘুরে যাচ্ছে ট্রাফিক। যাচ্ছে গ্রাহকের পয়সা, গতি হারাচ্ছে ইন্টারনেট। পয়সা পাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারগুলো।

দুনিয়া ঘুরে যাচ্ছে ট্রাফিক। যাচ্ছে গ্রাহকের পয়সা, গতি হারাচ্ছে ইন্টারনেট। বাড়ছে ল্যাটেন্সি। পয়সা পাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারগুলো। দাম বাড়ছে ইন্টারনেটের।

৫৯১.

ওটা একটা অফিসের চিত্র হলেও দেশের বড় বড় সার্ভিস প্রোভাইডারদের ভেতর ট্রাফিক ঘুরে আসতো ওই দেশের বাইরে থেকে। দেশের ‘আপ-স্ট্রীম’ ** ব্যান্ডউইডথ প্রোভাইডাররা বুঝতো ব্যাপারটা। তারা মনে করতো – ভালোই তো, আমার কি? আপ-স্ট্রীম আর ডাউন-স্ট্রীমের জন্য পয়সা পাচ্ছি খালি খালি। কারণ, আমরা কথা বলছি না নিজেদের মধ্যে। এভাবেই চলেছে অনেক অনেক বছর। বুদ্ধিমান আইএসপিরা নিজেদের মধ্যে একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছিল এর মধ্যে। চাহিদা বাড়ছিলো লোকাল ব্যান্ডউইডথের। কোন কোন আইএসপি’র দেশের ভেতরের চাহিদা বেড়ে দাড়ালো পঞ্চাশ শতাংশের ওপর। ধরা যাক ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার ‘ক’য়ের গ্রাহক হাজার দুয়েক। হিসেব করে করে দেখা গেলো – তার আইপি ট্রানজিট মানে ব্যান্ডউইডথ কিনতে হয় দু গিগাবিটস/সেকেন্ড। সিষ্টেম অ্যাডমিনিষ্ট্রেটর প্যাকেট অ্যানালাইসিস করে দেখলেন সিংগাপুর বা ইতালিতে পাঠানো ট্রাফিকের মধ্যে অর্ধেকেরই ডেস্টিনেশন কিন্তু বাংলাদেশের অন্যান্য আইএসপিতে। দেশে অন্যেরা যুক্ত থাকলে ব্যান্ডউইডথ কিনতে হতো মাত্র এক গিগাবিটস/সেকেন্ডের। মানে বাকিটা সিষ্টেম লস।

সব ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার + বিডাব্লিউএ + মোবাইল অপারেটর ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জে এলে কমে আসবে দাম, ল্যাটেন্সি। চলে আসবে আকামাই, স্পীডেরা, গুগল, ফেসবুক।

সব ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার + বিডাব্লিউএ + মোবাইল অপারেটর ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জে এলে কমে আসবে দাম, ল্যাটেন্সি। চলে আসবে আকামাই, স্পীডেরা, গুগল, ফেসবুক।

৫৯২.

এর সহজ ‘ট্রান্সলেশন’ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রায় দামী আইপি ট্রানজিট কিনতে হচ্ছে অর্ধেকটা ***। কষ্টের কথা হচ্ছে বাকিরাও পাঠাচ্ছেন ওই বাইরে। সমস্যা একটাই। সবাই যুক্ত নেই দেশের ভেতর। সরকার নয়, ইউএনডিপি প্রজেক্টের পয়সায় তৈরি হলো যুক্ত হবার একটা প্ল্যাটফর্ম। এটাকে বলা হয় ‘ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ’। দেশীয় ইন্টারনেট ট্রাফিক ‘এক্সচেঞ্জ’ হয় যেখানে সেটাই হচ্ছে সংক্ষেপে আই-এক্স, ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ। ধারনা করা যায়, বাংলাদেশ যদি সর্বসাকুল্যে চল্লিশ গিগাবিটস/সেকেন্ডের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডধ কেনে, সেটা হয়ে যাবে আসলে – বিশ গিগাবিটস/সেকেন্ডে। দেশের ভেতরে যেই পরিমাণ অডিও ভিডিও আর ডাটা ফাইল শেয়ার করছেন নিজেদের মধ্যে, এই ট্রাফিক বাড়তে বাধ্য। আমাদের বাংলা কনটেন্ট প্রোভাইডাররা, মূলত: পত্রিকাগুলো দেশের ভেতরে হোস্টিং করলে – বাইরের ব্যান্ডউইডথ কিনতে হবে আরো কম। যেমনটি, কোরিয়াকে বাইরের ব্যান্ডউইডথ কিনতে হয় খুবই কম।

৫৯৩.

পরের সমস্যা আরো গুরুতর। টেলিকম রেগুলেটরের ‘এনডোর্সমেন্ট’ না থাকায় এলো না বড় বড় প্রোভাইডাররা। ওই আই-এক্সয়ে। অথচ, বিশাল ট্রাফিক বহন করছে তারা। দেশের ভেতরের সাইটে যেতেও হাজারো ল্যাগ। দেশের ভেতর ন্যাশন্যাল পোর্টাল – সেটাও আসছে ঢিমে তালে। দেশের ভেতর থেকে। মিটিংয়ে ডাকা হলো তাদের। আলাপ হলো অনেক কিছু। এধরনের পিয়ারিং অন্যান্য দেশে হয় সমঝোতার ভিত্তিতে। আপনাদের করতে সমস্যা কোথায়? রেগুলেটর বললে করবেন তারা। তাদের উত্তর। যেহেতু এটাতে একটা লাইসেন্সিং রেজিম আছে, তাই ‘নন’ লাইসেন্সড পিয়ারিং পয়েন্টে যুক্ত হয়ে রেগুলেটরের বিরাগভাজন হতে চান না বাইরের অপারেটররা। কথা ঠিক। মিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্ট তাদের। তাই সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আছেন রেগুলেটরের ওপর। এখানেই কাজ হচ্ছে রেগুলেটরের। যাই করতে চাইবেন – সবকিছুতে লাইসেন্স, বের হয়ে আসতে হবে ব্যাপারটা থেকে।

৫৯৪.

ব্যক্তিগতভাবে আইএসপি’র পিয়ারিং পয়েন্ট নিয়ে ‘লাইসেন্স’ দেবার পক্ষপাতি ছিলাম না মোটেই। এগুলো সাধারণত: কোম্পানীগুলো নিজেদের মধ্যে ‘মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ ওপর করে থাকে। এক আইএসপি’র গ্রাহক যদি তার বন্ধুর সাথে অনলাইন গেম খেলতে চায় – তাহলে সেটাকে কেন ঘুরে আসতে হবে ইটালী থেকে? অথচ দুজনই বসে আছেন ঢাকায়। ‘সাচ আ ওয়েস্ট অফ এক্সপেনসিভ ব্যান্ডউইডথ’। ন্যাশন্যাল পিয়ারিং পয়েন্ট নিয়ে সচরাচর কোন রেগুলেশন দেখা যায় না। আমার জানামতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যাপারটা রয়েছে। ওই একটাই। টেলিযোগাযোগ রেগুলেশনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে এই পিয়ারিংকে ছেড়ে দিয়ে রেখেছে কোম্পানীগুলোর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে ওপর। চলে যাচ্ছে কোম্পানী অ্যাক্টে। পিয়ারিং করে অর্ধেক আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ বাঁচাতে চাইবে সবাই।

৫৯৫.

আমাদের টেলিযোগাযোগ অ্যাক্টটা যুগোপযোগী হয়নি এখনো। ওখানে বলা হয়েছে – সব মানে সব ধরনের টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য লাগবে ‘লাইসেন্স’। এব্যাপারটা আটকে রেখেছে অনেক ইনোভেশনকে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ নীতিমালাগুলো পাল্টে গেছে অনেক আগেই। ডি-রেগুলেশন ওপরে তুলছে বুদ্ধিমান দেশগুলোকে। লাইসেন্সের দরকার নেই সবকিছুতে। ভেবে দেখুন ওয়াই-ফাই স্পেকট্রামের কথা? ডি-রেগুলেটেড স্পেকট্রাম, ব্যবহার করো ইচ্ছেমতো। মনে আছে – বিশ বছর আগের এফসিসি’র  **** যুগান্তকারী ওই সিদ্ধান্তের কথা? উদ্ভাবনার জন্য ছেড়ে দাও এই দুশো মেগাহার্টজের ফ্রিকুয়েন্সী। অথচ এই ফ্রিকুয়েন্সী বেচলে পেতো বিলিয়ন ডলার।

৫৯৬.

কি হলো পরে? এই ‘ডি-রেগুলেটেড’ স্পেকট্রামকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ট্রিলিয়ন ডলারের ইনডাস্ট্রি। এফসিসি ওই টাকাটা ছেড়ে দেয়াতে তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল টেলিযোগাযোগ ম্যানুফ্যাক্চারিং ইনডাস্ট্রি। শুধু ওয়াই-ফাই রাউটার নয়, নন-লাইসেন্সড ব্যান্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে হাজারো প্রোডাক্ট। তৈরি হয়েছে হাজারো কর্মসংস্থান, বেড়েছে জিডিপি – বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্যতা। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ পেয়েছে স্বাধীনতা। মনে চাইলো, কিনে লাগিয়ে ফেললেন একটা রাউটার। লাগছে না কোন এনওসি *****। কম ঝামেলা হয়নি মানুষকে বোঝাতে। নন-লাইসেন্সড ব্যান্ডের সম্পর্কিত সুবিধা দেখে বুদ্ধিমান দেশগুলো বাড়াচ্ছে ওই স্পেকট্রামের রেঞ্জ। আমারো প্রস্তাবনা থাকবে ওখানে। সরকার তো মানুষের জন্য, তাই নয় কি? আর সেকারণে আরো ১০০ মেগাহার্টজ নন-লাইসেন্সড স্পেকট্রাম ছেড়েছে এই মার্চে, ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ডে। ৫-০ ভোটে কমিশন ছেড়ে দেয় ওই বহুমূল্যের স্পেকট্রাম – বিনামূল্যে। আরো ছাড়বে পাঁচশো মেগাহার্টজ! আর সেকারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বর্গরাজ্য। আমাদের কাজ করেছি ওই দুহাজার নয়ে। দেখুন, সেটার প্রতিফলন আমাদের ন্যাশন্যাল ফ্রিকুয়েন্সী অ্যালোকেশন টেবিল। চেষ্টা করেছিলাম ৫ গিগাহার্টজ খুলতে, সম্ভব হয়নি ওই সময়ে। আশা করছি হবে এখন। 

৫৯৭.

যখন ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) লাইসেন্সটা ড্রাফট করা হয়, সেখানে জোর করেই ঢুকিয়েছিলাম পিয়ারিংয়ের ব্যাপারটা। বলা হয়েছিল পিয়ারিং করতে হবে আইআইজি’দের মধ্যে। তবে সেখানে এক নীতিনির্ধারণী কর্তাব্যক্তি সেটাকে কমিশনের নির্দেশনার ওপর ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। ফলাফল, যা হবার তাই হলো। নির্দেশনা গেলো না আর। অনেক কষ্টে পরে সেই নির্দেশনা দেয়া স্বত্বেও বিটিসিএল এলো না প্রাইভেট আইআইজি’র সাথে পিয়ারিং করতে। কথা বললাম। বিটিসিএলের ভয়, তাদের ব্যান্ডউইডথ যদি নিয়ে নেয় প্রাইভেট আইআইজি? ওদের বুদ্ধি বেশি! অথচ, ন্যাশন্যাল ‘পিয়ারিং’ হচ্ছে দেশের ভেতরের ব্যান্ডউইডথ নিয়ে, আন্তর্জাতিক আইপি ট্রানজিট নিয়ে নয়। তারা অবশ্য ‘নতুন প্রযুক্তি’ বলে এড়িয়ে গিয়েছিলো ব্যাপারটা। অথচ, পুরো আফ্রিকাতেই এই ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ রয়েছে পচিশটার বেশি। আহা, দেখতে পেতেন যদি – আফ্রিকা পাল্টাচ্ছে কতো দ্রুত?

৫৯৮.

দেশের ভেতরে হোস্টিং সার্ভিস নিয়ে একই সমস্যা। হাজারো মানুষ জিজ্ঞাসা করছে একটা জিনিস। ভাই, ডাটা সেন্টার করবো – লাইসেন্স দেন একটা। আমার কথা, শুরু করেন। নীতিমালা তৈরি হলে ‘কনসাল্ট’ করা হবে আপনার সাথে। নীতিমালা তৈরি করতে লাগবে দুবছর, তার জন্য তো বসে থাকবেন না উদ্যোক্তারা। পরে নীতিমালা বানানোর সময় গনশুনানীতে – নেয়া হবে উনার অভিজ্ঞতা। কোম্পানী নীতিমালা অনুযায়ী ‘আর্টিকেল অফ অ্যাসোশিয়েশন’ আর ‘মেমোরান্ড্যাম অফ অ্যাসোশিয়েশনে’ কি কি করতে চান সেটা লিখে আবেদন করুন আরজেএসসি’তে। উদ্ভাবনাকে ব্যাহত না করার জন্য রয়েছে ‘ফার্স্ট রাইট অফ রিফিউজাল’। বিপদে পড়বেন না আপনি।

৫৯৯.

আরেকটা প্রশ্ন, বাংলাদেশ থেকে অনলাইন পত্রিকা পড়ছেন যারা, তাদেরকে বের হতে হবে কেন দেশ থেকে? কেনই বা পাড়ি দিতে হবে সাবমেরিন কেবল? দেশে হোস্টিং হলে এক ক্লিকেই চলে আসবে ‘প্রথম আলো’ আর ‘ইত্তেফাক’। দেশে হোস্টিংয়ে খরচ বেশি, অনুযোগ অনেকের। ব্যবহার শুরু না করলে দাম কমবে কিভাবে? ইকোনোমি অফ স্কেলের ব্যাপার জড়িত না? আরো কয়েকটা সাবমেরিন কেবল না আসা পর্যন্ত একটা সস্তা ‘মিরর’ হোস্টিং রাখতে পারেন বিদেশে। আবার সাবমেরিন কেবল কাটলে সবাই আগের মতোই অ্যাক্সেস পাবেন পত্রিকাগুলোতে। মনেই হবে না কেটেছে কেবল। বিদেশের ইন্টারনেট নেই তো হয়েছে কি? দেশে তো আছে।

৬০০.

ধারনা করুন বাংলা কনটেন্ট বেড়েছে কতো? অনেক! নিয়ে আসুন আপনার বাংলা কনটেন্টকে। দেশে। ইন্টারনেটের দাম কমানো সম্ভব এখানেই। এজন্যই ‘পিয়ারিং’ দরকার দেশে। সাইটগুলোর অ্যাডমিনিষ্ট্রেটরদের দেখা পাবেন রাস্তায়, বাজারে, দেশের ভেতর। দেখা হবে কফিশপে। কথা হবে মুখোমুখি। গুগল আর ফেসবুক নিজেই চলে আসবে তাদের ‘মিরর’ সার্ভার নিয়ে ঢাকায়। পুরো ইন্টারফেস হবে বাংলায়। ওরা আর যাই বুঝুক, ব্যবসা বোঝে ভালো – আমাদের চেয়ে। ইন্টারনেট দাম কমবে না মানে? বরং, বাইরে থেকে মানুষ কিনতে আসবে আমাদের আইপি ট্রানজিট। সমান সমান ট্রাফিক হলে কাটাকাটি। আমার বিশ গিগাবিট ট্রাফিক নিয়ে দাও তোমার বিশ গিগাবিট ট্রাফিক। ব্যবসার ভাষায় একে বলে ‘ফ্রী সেটলমেন্ট’। চমত্কার একটা মার্কেটপ্লেস তৈরি হয়ে যাবে এই বাংলাদেশে। টায়ার ১ না হলেও টায়ার ২ লেভেলের ট্রাফিক জেনারেট করবে এই বাংলাদেশ। ‘অ্যানালাইসিস’ দেখে বলছি। পৃথিবীব্যাপী বাংলাভাষাভাষীদের চাহিদার ফলে আন্তর্জাতিক টায়ার ১, ২ লেভেলের ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট তাদের বাড়তি ট্রাফিক কিনতে আসবে বাংলাদেশে।

৬০১.

বাংলাদেশের ইন্টারনেটের গতি নিয়ে অনেক কথা শুনি। সেটা অনেকটাই সত্যি। অনেকদেশ ঘুরেছি। আমাদের ‘প্রদর্শিত’ গতি এই যুদ্ধবিদ্ধস্ত আইভরি কোস্ট থেকে যে ভালো নয়, সেটা বলতে পারি হলফ করে। এই গতির মূলে রয়েছে দেশের ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ পয়েন্টগুলো। সবাই যুক্ত থাকলে এক ক্লিকেই চলে আসে দেশের কনটেন্ট। টাইম-আউট ব্যাপারটাও দেখবেন না কখনো। ‘পিং’ মানে নেটওয়ার্ক ঠিক আছে কি না – দেখার ওই টূলটা ফেরত দেবে কয়েকশো মিলিসেকেন্ডে। ইউটিউব বিশাল ‘ক্যাশে’ ইঞ্জিন বসাবে আই-এক্সয়ে। আকামাই, স্পীডেরা, তাদের কনটেন্ট ডিসট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক নিয়ে আসবে আমাদের দেশেই। কথা দিচ্ছি! ইন্টারনেট সাবস্ক্রিপশনে ‘হকিস্টিক ফেনোমেনন’ উপেক্ষা করতে পারছে না কেউ!

৬০২.

আমাদের সবকিছুতে লাইসেন্স লাগে বলে এই ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট নিয়েও তৈরি হয়েছে লাইসেন্স। সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতাম লাইসেন্সটা নেবার ব্যপারে। বিজনেস কেস ওভাবে না থাকায় এগিয়ে আসছিলেন না উদ্যোক্তারা। এটা নিয়ে প্রথমদিকে সমস্যা থাকলেও সেটা মেটানো হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। লাইসেন্স নিয়েছেন দুটো কোম্পানী। সংখ্যা দিয়ে কথা বলি বরং। কে কতো আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ বাঁচাচ্ছে তাদের দেশের আই-এক্স দিয়ে।

কোরিয়ার ‘কেআইএনএক্স’ বাঁচাচ্ছে ৫৬২ গিগাবিটস আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ, প্রতি সেকেন্ডে।
জাপানের ‘জে-আই-এক্স’ ২৫০ গিগাবিটস বাঁচাচ্ছে – প্রতি সেকেন্ডে।
হংকংয়ের ‘এইচকে-আই-এক্স’ প্রতি সেকেন্ডে কম কিনছে ৫৬২ গিগাবিটস।
অ্যামস্টারডামের অ্যাম-আই-এক্স ২৮০০ গিগাবিটসের নিচে কথাই বলছে না! হ্যা, প্রতি সেকেন্ডে কিন্তু!

আর বাংলাদেশ বাঁচাচ্ছে কত – আপনারাই বলবেন আমাকে। না হলে আমি তো আছিই। 

[ক্রমশ:]

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাগুলো আমার আগের আর বর্তমান প্রতিষ্ঠানের ভিউ পয়েন্ট নয়। নিতান্তই ব্যক্তিগত। 


* তাদের কতজন দেশের বাইরে হোস্টিং করছেন সেই তর্কে যাব না আমি। আসল কথা, তাদের তৈরি কনটেন্টের ভোক্তা কোথায় বেশি? বাংলাভাষাবাসী দেশের ভেতর না বাইরে বেশি সেটা জানি সবাই। খরচ কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য দেশের ভেতর আর বাইরে কনটেন্ট 'রেপ্লিকশন' থাকা জরুরী
** যাদের মধ্যমে আইপি ট্রানজিট ব্যান্ডউইডথ আসা যাওয়া করছে দেশের বাইরে
*** ওই উদাহরণের আইএসপি'র ক্ষেত্রে
**** ফেডারেল কম্যুনিকেশন কমিশন
***** নো অবজেক্টশন সার্টিফিকেট, ওটা যোগাড় করতে গিয়ে ভুলেও কিনতেন না রাউটার

Read Full Post »

Older Posts »

%d bloggers like this: