Feeds:
Posts
Comments

The best time to plant a tree was 20 years ago. The second best time is now.

– Chinese Proverb

ক॰

সমস্যাটার শুরু প্রায় এক দশক আগে। ছুটাছুটির চাকরি। আজ এখানে তো কাল ওখানে। শেষমেষ ‘পীস কীপার’ হিসেবে পোস্টিং হলো কঙ্গোতে। ঘুরাঘুরিই বেশি। ঘুমের সময় ছাড়া বাকিটা হিসেব করলে – পুরোটাই রাস্তায়। নিজ দ্বায়িত্বের এলাকা, যাকে বলে ‘এরিয়া অফ রেস্পন্সিবিলিটি’ – ইঞ্চি ইঞ্চি করে না জানলে বিপদ। মানুষের জীবন বলে কথা। পুরো এলাকা থাকতে হবে নিজের নখদর্পণে। কন্সট্যান্ট ভিজিল্যান্স। পায়ে হাটা অথবা গাড়ি – পায়ের মাইলোমিটারে লাখ মাইল পার হয়েছে নিশ্চিত।

খ॰

রাস্তায় নামলেই হাজার চিন্তা কিলবিল করে মাথায়। একটা এদিকে হলে আরেকটা ওদিকে। মাথা মুন্ডু ছাড়া চিন্তাভাবনা। দিন কয়েক পর বেস ক্যাম্পে ফিরলে বসতাম ইউএন এর কচ্ছপ গতির ইন্টারনেট নিয়ে। সভ্যতার সাথে একমাত্র ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ – ওই স্যাটেলাইট লিংক। একসময়, প্লট করতে শুরু করলাম চিন্তাগুলোকে। ‘চ্যানেলাইজ’ করতে তো হবে কোথাও। একেকটা চিন্তা একেকটা ডট। কানেক্টিং দ্য ডট’স ব্যাপারটা বুঝলাম অনেক পরে। চল্লিশের আগে নাকি ব্যাপারটা আসে না মাথায়?

জ্ঞান তো হলো অনেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে আসবে প্রজ্ঞা। সেটাকে প্রয়োগ করলেই উন্নতি। দেশের।

জ্ঞান তো হলো অনেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে আসবে প্রজ্ঞা। সেটাকে প্রয়োগ করলেই উন্নতি। দেশের।

গ॰

আগের ঘটনা আরো চমত্‍প্রদ। কঙ্গোতে যাবার ঠিক আগ মূহুর্তে ফিরেছিলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিগন্যাল স্কুল থেকে। থাকতে হয়েছিল লম্বা সময়ের জন্য। প্রায় নব্বই বর্গ মাইলের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিকম্যুনিকেশন ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি। যায়গাটাও জর্জিয়ার একটা অজ পাঁড়া গাঁয়ে। সন্ধার পর কুপি জ্বলার মতো অবস্থা। স্কূল থেকে ফিরে কাজ না পেয়ে হাত দিলাম রান্নায়। কাঁহাতক আর খাওয়া যায় ফাস্ট ফুড! পিএক্স থেকে এটা কিনি, ওটা কিনি। বাসায় এসে ভয়াবহ ধরনের ‘টেস্ট এণ্ড ট্রায়াল’। অসুবিধা কি? গিনীপিগ তো নিজে। ক্ষান্ত দিলাম স্মোক ডিটেক্টরের পানির ঝাপটা খেয়ে। বার কয়েক। তবে, একেবারে ক্ষান্ত নয়, কমিয়ে দিলাম গতি। মনোযোগ সরালাম নতুন দিকে।

ঘ॰

বিশাল লাইব্রেরী। এটা ওটা ইস্যু করি, টাইম লিমিটও অসহনীয় লম্বা। পুরনো পত্রিকা, দুস্প্রাপ্য বই সব মাইক্রোফিশেএকদম নতুন বই লাইব্রেরীতে না থাকলেও সেটা কিনে এনে চেকআউট করিয়ে রাখতেন লাইব্রেরিয়ান। আমাজনের বেস্টসেলার লিস্ট দেখা অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেলো ওই সময়ে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ‘বেস্টসেলার’গুলো লিখছেন আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষ। মানে, পেশাদার লেখক নন তারা। সাহস পেলাম। যাই লিখি, পাঠক পেতেই হবে বলেছে কে? মনের খোরাক মেটানোর জন্য লেখা। ওই বিরানব্বই থেকে। সেথ গোডিংয়ের গলা শুনি প্রায়ই। শিপ, বাডি! শিপ!

ঙ॰

দেখা গেলো ওই ‘বেস্টসেলার’দের কেউ ছিলেন স্টক এক্সচেঞ্জের হর্তাকর্তা, কেউ সিআইয়ের চীফ। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার। সরকারী কর্মকর্তা। নেভী সীল। ফুটবল কোচ। জিমন্যাষ্ট। তারা লিখছেন পেছনের অনেকগুলো বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে। ব্যর্থতা থেকে সফলতার গল্প। যা আসলে সাহায্য করছে ওই পড়ুয়া মানুষদের। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। বিতর্কিত জিনিস নিয়ে যে লেখা হয়নি তা নয়। লিখেছেন রেচেল মোরানের মতো পেশাজীবীরা। মানে – লেখা হয়েছে প্রায় সব বিষয় নিয়ে। বের হয়ে এসেছে অনেক সমস্যার কথা। সেই ভুল থেকেও শিখছে দেশ। সমালোচনা নিতে পারার মানসিকতার দেশগুলো ওপরে উঠছে দ্রুত। আবার লিখছেন জাতির পিতারা। আজকের ‘আধুনিক’ সিঙ্গাপুরের পেছনে যিনি ছিলেন তারো বই আছে কয়েকটা। নেলসন ম্যানডেলা’র বইটা পড়েছেন নিশ্চয়। সাতাশ বছরের অবিচারের ঘৃণাটা মূহুর্তে গিলে ফেলার ঘটনাটা অজানাই থাকতো বইটা না পড়লে। পড়ছি সবই, বুঝতে পারছি ভালো মন্দ। মন্দটা ফেলে ভালো নিয়ে এগুচ্ছি সবাই আমরা, সময়ের বিবর্তনে। অন্যের কাছ থেকে শিখে। পেছনে লেগে নয়।

চ॰

জ্ঞান কিন্তু রি-ইউজেবল। ব্রিটেনের লেগেছে দুশো বছর প্রায়। শুধু শিখতেই। শিল্পবিপ্লব থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিখেছে ব্রিটেন থেকে। তাদের লোক পাঠিয়ে। নোটবই ভরে নিয়ে আসতো তাদের অভিজ্ঞতার কথা। জাহাজে করে। সেটা কাজে লাগিয়ে ওই ব্রিটেনের সাথে টক্কর দিয়েছে অনেক কম সময়ে। ‘লীড টাইম’ কমিয়ে নিয়ে এসেছে প্রায় একশো বছর। এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই শেখার চর্চাটা ধরে রেখেছে বলে তারা এখনো শীর্ষে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শত বিপত্তির মধ্যে উদ্ভাবনা দিয়ে আছে টিকে। নিজেদের দেশে মানুষ কম বলে বাইরের বাজার দখলে ব্যস্ত তারা। এখন বোকারাই বলে যুদ্ধের কথা, বাজার দখলে কে কাকে বাজার বানাতে পারে সেটাই হচ্ছে বড় যুদ্ধ। রক্তপাত ছাড়াই ‘আউটবাউন্ড’ ক্যাশফ্লো!

ছ॰

এশিয়ান দেশগুলো আরো বুদ্ধিমান। ইউরোপ আর অ্যামেরিকা থেকে শিখে সেটা কাজে লাগিয়েছে গত তিরিশ বছরে। এখন টক্কর দিচ্ছে সবার সাথে। হংকং, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর অন্যের ‘ঠেকে শেখা’র অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এগিয়েছে বেশি। পাশ্চাত্যে কোনটা কাজ করছে আর কোনটা করেনি সেটা জানলেই তো হলো! তার সাথে মেশাও ‘লোকাল কন্ডিশন’। আমি এটাকে বলি, ‘ঘুটা’, মানে জ্ঞানের ডিফিউশন। মেলাও হাজারো জ্ঞানের অভিজ্ঞতা। গরীব দেশ হলেও কোন সরকারী কর্মকর্তাকে তো মানা করা হয়না বৈদেশিক ভ্রমনে না যেতে। অথচ কর্পোরেট হাউসে কৃচ্ছতা সাধনে প্রায় সবই চলছে ভিডিও কনফেরেন্সে। দেশের একটাই চাওয়া, শিখে আসা জ্ঞানটা কাজে লাগবে দেশের উন্নতিতে। প্রাথমিক জ্ঞানটা পাবার পর বাকিটা শেখার বাহন হচ্ছে ইন্টারনেট। আর সেকারণে ইন্টারনেট নিয়ে লাগা। জ্ঞান ছড়িয়ে আছে সব যায়গায়, দরকার তার প্রয়োগ।

ঝ॰

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেলেন জ্ঞান ‘ক’। এদিকে সিংগাপুর দিলো ‘খ’ জ্ঞান, ভিয়েতনাম থেকে নিয়ে এলেন ‘গ’। এখন – আমাদের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্ডিকেটরের সাথে মিলিয়ে যেটা যখন কাজে লাগে সেটাই ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। অনেকে এটাকে বলে ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’। মানে, যেটা কাজ করেছে অনেক যায়গায়। ‘ওয়েল টেস্টেড’। টেস্ট পেপার সলিউশনের মতো কিছুটা। দেখা গেছে – ওভাবে কাজটা করলে জিনিসটা মার যাবার সম্ভাবনা কম। টেস্ট এণ্ড ট্রায়ালের পর ফুলপ্রুফ হয়েই নাম হয়েছে ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’। দেশের ‘লোকাল কন্ডিশন’কে বেস্ট প্র্যাকটিসে ঘুঁটানোতেই রয়েছে মুন্সিয়ানা। ইন্টারনেটকে ছড়িয়ে দেবার ওই ধরনের ‘টেম্পলেট’ নিয়ে কাজ করেছি গত সাত সাতটা বছর।

ঞ॰

মনে আছে বৈজ্ঞানিক নিউটনের কথা? ‘আমি যদি আজ বেশি দেখে থাকি অন্যদের চেয়ে, সেটা পেরেছি পূর্বপুরুষদের জ্ঞানের ভিত্তিতে’। উন্নতবিশ্বের আজকের যা উন্নতি তার সবটাই এসেছে ওই ‘স্ট্যান্ডিং অন দ্য সোল্ডার অফ জায়ান্টস’ কথাটার ওপর ভিত্তি করে। আজ জানি আমরা ট্রানজিস্টর কি – আর কিভাবে কোটি ট্রানজিস্টর থাকে একটা চিপসেটে। নতুন করে ওই ট্রাংজিস্টর উদ্ভাবন না করে বরং কোটি ট্রাংজিস্টরের চিপসেট দিয়ে আর কি কি করা যায় সেটাই ভাববার বিষয়। আর তাই আগের জ্ঞানের ‘ডিফিউশন’ দিয়ে নতুন উদ্ভাবনা কাজে লাগিয়ে ওপরে উঠছে নতুন ইমার্জিং দেশগুলো। এটাকে বলা হয় লিপ-ফ্রগিং।

য॰

সামরিক বাহিনীর স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার বিটিআরসিতে আসা। টেকনোলজি নিয়ে একসময় লিখতাম কিছু পত্রপত্রিকায়। শুরুতেই ঝামেলা। ব্রডব্যান্ড, ইন্টারনেট – নতুন যাই লিখি সেটা নিয়ে মাথা নাড়াচ্ছিলেন অনেকেই।

“ভালো, তবে সমস্যা অন্যখানে। এটা সম্ভব নয় এদেশে।”

সময় কিন্তু যাচ্ছে চলে। জ্ঞানকে অভিজ্ঞতায পরিণত করতে লাগবে সময়োচিত দর্শন, যুক্ত হবার অদম্য স্পৃহা। লাগবে রেগুলেটরী রেফর্ম। দরকার নেই প্রযুক্তি জানার, নীতিনির্ধারণীদের।

সময় কিন্তু যাচ্ছে চলে। জ্ঞানকে অভিজ্ঞতায পরিণত করতে লাগবে সময়োচিত দর্শন, যুক্ত হবার অদম্য স্পৃহা। লাগবে রেগুলেটরী রেফর্ম। দরকার নেই প্রযুক্তি জানার, নীতিনির্ধারণীদের।

বলেন কি? অবাক হয়ে তাকাই উনাদের দিকে। নীতিমালায় আটকানো আছে জিনিসগুলো। মানে আমরা আটকে আছি আমাদের জালে। জিনিসপত্র না জানার ফলে পিছিয়ে পড়ছি আমরা। যুক্ত থাকার হাজার সুবিধার মূলে হচ্ছে মানুষের মুক্তি। সেটা প্রথমে আসবে অর্থনৈতিক মুক্তি থেকে, জ্ঞান দেবে আমাদের প্রাপ্যতার নিশ্চয়তা। সোশ্যাল মিডিয়ার বিগ ডাটা নিয়ে কাজ করেছিলাম একটা এজেন্সিতে বসে। যুক্ত থাকার ফলে আজ যা দেখছেন, এটা আইসবার্গের ছোট্ট একটা টিপ। আরব বসন্ত, একটা উপসর্গ মাত্র। পালটাচ্ছে পৃথিবী, পাল্টাবো আমরাও। ভালোর দিকে। দরকার ইন্টারনেটের মতো কিছু টুলস।


The two most important days in your life are the day you are born and the day you find out why.

― Mark Twain

র॰

বইগুলো লিখছি কিছুটা দায়বদ্ধতা থেকে। বিটিআরসির সাত বছরের অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে ঘোরার অন্তর্জালা থেকে মুক্তি পেতে এ ব্যবস্থা। নোটবই সেনাবাহিনীতে পোশাকের অঙ্গ হবার ফলে মিস করিনি খুব একটা। জিম রনের অমোঘ ‘নেভার ট্রাস্ট ইয়োর মেমরী’ বাণীটা খুব একটা বিচ্যুতি আনতে পারেনি ‘নোট টেকিং’য়ে। এখন যুগ হচ্ছে ‘গুগল কীপ’ আর ‘এভারনোটে’র। হাতির স্মৃতি বলে কথা – মাটিতে পড়ে না কিছুই। দেশ বিদেশের ফোরাম, যেখানে গিয়েছি বা যাইনি – হাজির করেছি তথ্য। টুকেছি সময় পেলেই। ভরে যাচ্ছিলো নোটবই। ‘এভারনোট’ আর ‘কীপের’ ভয়েস মেমোতে। পয়েন্ট আকারে। প্রোগ্রামিংয়ের মতো পয়েন্টারগুলো লিংক করা ছিলো মাথায়। ভুলে যাবার আগেই বইগুলোর ব্যবস্থা।

ল॰

আরেকটা সমস্যা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে – ওই ছোটবেলা থেকে। কোন জিনিস ধরলে সেটার শেষ না দেখলে ঘুম আসে না আমার। বিশাল বিপদ। আগে ভাবতাম সমস্যাটা আমার একার। ভুল ভাঙ্গলো দুনিয়া দেখতে দেখতে। ইনডাস্ট্রিতে একই অবস্থা। একেকটা রিসার্চ, সফল না হওয়া পর্যন্ত পড়ে আছে মাটি কামড়ে। মনে আছে, হেনরী ফোর্ডের ভি-৮ সিলিন্ডার তৈরির কথা? এই কৌশল ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি, এরোস্পেস, নাসা, ঔষধ গবেষণা সহ প্রচুর স্পেসালাইজড প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে। আজকের এয়ারবাস এ-৩৮০, দোতলা উড়োজাহাজ এতো সহজে আসেনি। উনিশশো অষ্টাশির গবেষনার ফল পাওয়া গেছে এপ্রিল দুহাজার পাঁচে, উড়োজাহাজটাকে উড়িয়ে। এরপরও আরো দুবছরের বেশি হাজার হাজার ‘সেফটি টেস্ট’ আর অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার পর প্রথম বানিজ্যিক ফ্লাইট চালায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স। অন্য কিছু নয়, ওড়াতেই হবে – তাই উড়েছে উর্রুক্কুটা। কেউ জেদ ধরেছিলো, আট দশ ফ্লাইটের তেল দিতে পারবো না। এক ফ্লাইট এর তেল নাও, নইলে অন্য ব্যবসা দেখো। বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনারটাও তৈরি হয়েছে কয়েকটা জেদি মানুষের জন্য। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে উজাড় করে দিয়েছেন তার জ্ঞানকে। বাকিটা আমাদের পালা।

শ॰

আজকের ‘ইন্টারনেট’ (যা পৃথিবীকে পাল্টে দিচ্ছে) এর আবিস্কারের পেছনে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। দেশ চেয়েছে ব্যয়বহুল সার্কিট সুইচিং থেকে বের হতে, ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সী, সংক্ষেপে ‘ডারপা’ বিভিন্ন উনিভার্সিটিতে ঢেলেছে অঢেল পয়সা, দিয়েছে অনেক সময়। প্রজেক্ট ‘ফেইল’ করেছে হাজারো বার, হাল ছাড়েনি তারা। ফলে তৈরী হয়েছিল আরপানেট, বর্তমান ইন্টারনেট এর পূর্বসুরী। আজকের বিদ্যুত্‍ বাল্ব তৈরি করতে থমাস এডিসনকে চেষ্টা করতে হয়েছিল হাজার বারের বেশি। রিপোর্টার জানতে চেয়েছিলেন তার ‘হাজারবারের ব্যর্থতার অনুভুতির কথা’। এডিসনের জবাব, ফেইল করিনি তো হাজার বার। বরং, লাইট বাল্বটা তৈরি করতে লেগেছিলো হাজারটা স্টেপ।

ষ॰

টেলিযোগাযোগ ব্যবসায় ভাসা ভাসা কাজের উপযোগিতা কম। রেগুলেশনেও একই অবস্থা। দরকার স্পেশালাইজেশন – বাজার বুঝতে। ঢুকতে হবে ভেতরে, অনেক ভেতরে। পুরোটাই অর্থনীতিবিদদের কাজ। ভবিষ্যত না দেখতে পারলে এ ব্যবস্যায় টিকে থাকা কঠিন। টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোর জাহাবাজ লোকেরাও মাঝে মধ্যে অত ভেতরে ঢুকতে পারেন না। স্পেশালাইজেশন বলে কথা। সেখানেই আসে টেলিযোগাযোগ কনসাল্টিং কোম্পানিগুলো। ওদের কাজ একটাই, আর এন্ড ডি, সারাবছর ধরে। আবার সেই কনসাল্টিং ফার্ম একই ধরনের কাজ করে বেড়াচ্ছে সব টেলিযোগাযোগ কোম্পানির জন্য। স্পেশালাইজড না হয়ে যাবেই বা কোথায় তারা? আর সেই সল্যুশনের জন্য মিলিয়ন ডলারের নিচে কথা বলেন না কেউই। আর বলবেন নাই বা কেন? এধরনের আর এন্ড ডির জন্য কম কষ্ট করতে হয়না তাদেরকে। প্রচুর রিপোর্ট পড়েছি এই কনসাল্টিং ফার্মগুলোর। রিপোর্টতো নয় যেনো হাতের রেখা পড়ছেন। ভবিষ্যত দেখা যায় রীতিমত। মিলিয়ন ডলারের কনসাল্টিং বলে কথা। টার্গেট দিন এক কোটি কর্মসংস্থানের। তৈরি করে দেবো প্রায়োগিক ফর্মুলা। হতে বাধ্য। জানতে হয় ভবিষ্যত দেখতে। বিগ ডাটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি খানিকটা।

ট॰

তাই বলে সব কনসাল্টিং ফার্ম এক নয়। আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, কনসাল্টিং ফার্মের দোষ না দেখে যিনি কাজ দিয়ে বুঝে নেবার কথা – তার কম্পিটেন্সিতে ঘাটতি থাকলে রিপোর্ট খারাপ হতেই পারে। আমি কিনছি রিপোর্ট, না বুঝে কিনলে কনসাল্টিং ফার্মের দোষ দিয়ে লাভ কি? গরীবদেশগুলোতে প্রচুর কনসালটেন্সি হয় বটে, তবে সে দেশগুলো সেগুলো ঠিক মতো বুঝে নেবার সামর্থ বা জ্ঞান থাকে না বলেই ঝামেলা হয়। ডোনারদের টাকায় কনসাল্টেন্সি হলে সেটার অবস্থা হয় অন্য রকম। রিপোর্ট নিজের মনে করে বুঝে নিতে পারলে সেটার দাম মিলিয়ন ডলারের বেশি। সে ধরনের রিপোর্ট বুঝে নিয়েছিলাম বেশ কয়েকটা। পোস্ট-ডক করা যাবে কয়েকটা।

ঠ॰

কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হলো বিশ্বখ্যাত অনেকগুলো টেলিযোগাযোগ কনসাল্টিং ফার্মের সাথে। এর সাথে যোগ হলো ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) আর কমনওয়েলথ টেলিকম্যুনিকেশন অর্গানাইজেশনের (সিটিও) আরো অনেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট। ধারণা পেলাম তাদের কাজের। পড়তে থাকলাম আরো হাজারো রিপোর্ট। দামী সব রিপোর্ট, তবে তার দাম কোনো কোনো দেশ বা এজেন্সি দিয়ে দিয়েছে আগেই। পরিচয় হলো ওভাম, অ্যাকসেন্চার, কেপিএমজি, পিডাব্লিউসি, নেরা আর এনালাইসিস ম্যাসনের মতো তুখোড় তুখোড় ফার্মের সাথে। আবার নিজের প্রতিষ্ঠানেরই কাজ করতে পরিচয় হলো মার্কিন ফার্ম টেলিকমিউনিকেশনস ম্যানেজমেন্ট গ্রূপ, ইনকর্পোরেশন (টিএমজি)র সাথে। তাদের ধরনটাই বুঝতে সময় লেগেছিলো বেশ। তলই পাচ্ছিলাম না প্রথমে। বিলিয়ন ডলারের কনসাল্টিং কোম্পানি বলে কথা। পরিচয় হলো অনেকের সাথে। বন্ধুত্ব হলো অনেকের সাথে। হাতে ধরে দেখিয়ে দিলেন বাংলাদেশের ‘ফল্ট-লাইন’গুলো।

ড॰

একসময় তল পেলাম এই ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং ফার্মগুলোর কাজের ধারার। পৃথিবী জুড়ে কাজ করার ফলে কোথায় কি সমস্যা সেটা তারা জানে ভালো। আর সেটা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেয়া ওদের একমাত্র কাজ বলে ওটাও সে জানে ‘অসম্ভব’ ভালো। গরীব দেশগুলোতে হাজার কোটি টাকার ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্টেনসি করে টাকা বানালেও সেটার ব্যর্থতার দায় দেয়া যাবে না তাদের ওপর। ওই দেশের – যাদের ‘কন্সাল্টেনসি’টা বুঝে নেবার কথা তারা ‘ছাড়’ দিলে কাজ হবে কিভাবে? উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠতে হলে লাগবে কন্সাল্টেনসি, তবে সেটা ‘পাই’ ‘পাই’ করে বুঝে নেবার মতো থাকতে হবে মানুষ। দু চারটা বৈদেশিক ভ্রমণে ব্যাপারটা উপেক্ষিত হলে জ্ঞান আর প্রজ্ঞাটা হারায় দেশ।

ঢ॰

ব্যাপারটা অনেকটা বিজনেস প্ল্যান কেনার মতো। ও আমাকে বানিয়ে দিলো একটা। না বুঝে দিয়ে দেবো পয়সা? সমস্যা হয় যখন সেটা হয় ‘সরকারী’ মানে জনগণের পয়সা। একারণে উন্নতদেশগুলো ছোট করে নিয়ে আসছে সরকারগুলোকে। যাই হয় সব পার্টনারশীপে। যারাই থাইল্যান্ড গিয়েছেন মুগ্ধ হয়েছেন তারা – বিশাল বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার দেখে। বেশিরভাগ ইনফ্রাস্ট্রাকচারই কিন্তু পিপিপি’র মডেলে করা। সরকারের অতো পয়সা থাকে না কোথাও। পিপিপি হচ্ছে গিয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ। পয়সা যোগান দেবে বেসরকারী কোম্পানি – কাগজ দেবে সরকার, আইনগত ভিত্তি সহ। ‘উইন’ ‘উইন’ ব্যাপার। পয়সা লাগলো না সরকারের। কর্মসংস্থানও হলো। আমাদের পিপিপি নীতিমালা তৈরী হয়নি এখনো।


There is no ‘poor’ country, they are ‘poorly’ managed.

― Slightly modified

ণ॰

উন্নত দেশগুলোতে অনেক বড় বড় কাজে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে না জনগণ। কারণ এই পিপিপি। যেকোনো দেশের উন্নতির ইনডিকেটর বোঝা যায় ওদেশের পাবলিক ট্রানজিট সিস্টেম দেখে। মানে জনগন কতো সহজে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারছেন – নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। ঢাকা শহরে সেটার অবস্থা আফ্রিকার অনেক দেশ থেকেও খারাপ। অথচ ব্যবস্যা বান্ধব পিপিপি নীতিমালা থাকলে প্রাইভেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো প্রস্তাব দিতে পারতো সরকারের কাছে। তৈরী করতো ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড’। ভাগ করে ফেলতো পুরো শহর – চার পাঁচ ভাগে। একেকটা ভাগের রুট নিয়ে দেন-দরবার করতো কনসেশন পিরিয়ডটা নিয়ে। এই রুটটা দাও আমাকে পঞ্চাশ বছরের জন্য। তৈরী করবো স্কাই ট্রেন। ইনফ্লেশন হিসেব ধরে ভাড়ার একটা চার্ট জমা দিতো সরকারকে।

স॰

সফটওয়্যারের মানুষ হিসেবে শূন্য ভার্সন থেকে শুরুতে বিশ্বাসী আমি। শুরু করতে হবে কোথাও। নিউটনের কথায় ফিরে আসবো আবার। ষ্টান্ডিং অন দ্য সোল্ডার অফ জায়ান্টস। আমাদেরও এগুতে হবে পূর্বসূরীর অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে। গাছ রোপণ করার কথা ছিল বিশ বছর আগে। সেটা না হলে কি থাকবো বসে? বরং – লাগাবো আজই। বাংলাদেশের ‘যুক্ত’ হবার এজেন্সিতে চাকরি করার সুবাদে গরীব দেশ আমার ওপর যা ইনভেস্ট করেছে সেটা ফিরিয়ে দেবার জন্য নিয়েছি নগণ্য একটা প্রয়াস। নাম দিয়েছি প্রজেক্ট ‘গিভিং ব্যাক’। ব্রডব্যান্ড ছড়িয়ে দেবার ‘চিটকোড’ হিসেবে ধরুন ব্যাপারটাকে। ব্রডব্যান্ডে সফল দেশগুলোর ধারণা নিয়ে ‘আমাদের আঙ্গিকে’ কোডটাকে ‘ক্র্যাক’ করতে চেষ্টা করেছি মাত্র। আর, পয়সার জন্য ওর সাথে থাকবে ইনফ্রাস্ট্রাক্চার ফান্ড। আর এসপিভিলাগবে এটাও

দরকার আপনার সুচিন্তিত মতামত। ওই মতামতের ওপর ভিত্তি করে কাঠামোগত পরিবর্তন আনবো বইগুলোতে।

প্রি-প্রোডাকশন স্টেজ: কাজ চলছে এখনো

প্রথম বই: ইন্টারনেটের মুল্যঃ যে কারনে এখনো ধরাছোয়ার বাইরে

দ্বিতীয় বই: বাতাস ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: দক্ষ স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা পাল্টে দিতে পারে বাংলাদেশকে

তৃতীয় বই: রেগুলেট অর নট টু রেগুলেট? চতুর্থ প্রজন্মের রেগুলেটর ও বাংলাদেশ

* লিংকগুলো যুক্ত করা হয়েছে কয়েকটা ব্লগপোস্টের সাথে। পুরো বইগুলো আসবে আস্তে আস্তে – প্রিন্টে।


০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
সাশান্দ্রা, আইভরি কোস্ট

কি ডিসিশন নিয়েছেন আপনারা?

ডক্টর তাকিয়ে আছেন মামুনের দিকে। দাড়িয়ে ও। ওকেই প্রশ্ন করেছেন আমাদের ডক্টর। আমার দিকে তাকিয়েছিলেন একবার। এক সেকেন্ডের মতো হবে হয়তো। ভেতর দিয়ে দেখার মতো। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘সি থ্রু মি’। ঘরে মানুষ না থাকলে যেভাবে তাকায় সবাই। অথবা তাকাচ্ছেন না ইচ্ছে করেই। কোন একটা কারণে। পলক পড়ছে না মহিলার।

রাস্তা খোলা তিনটা। আমাদের সামনে। এ মুহুর্তে। খারাপ সবগুলোই। সময় দেয়া হয়েছে দশ মিনিট। দশ মিনিটের ওই সিদ্ধান্ত পাল্টে দেবে আমাদেরকে। সারাজীবনের জন্য। এতোই কমপ্লেক্স ব্যাপারটা – মনে হচ্ছে, ডক্টরের সারাজীবনের পড়াশোনার মুখোমুখি দাড়িয়ে আমরা।

শেষ হয়ে গেছে ওই মিনিট দশ। কিছুক্ষণ আগেই।

***

দশ দিন আগের ঘটনা। প্রচন্ড ব্লিডিং হচ্ছিলো আমার। হঠাৎ করেই।

‘ঘাবড়াবেন না তো এতো!’ বলেছিলেন আরেক ডক্টর। ‘প্রেগন্যান্ট মহিলাদের কমন সিম্পটম জিনিসটা।’ কয়েকটা পরীক্ষা দিলেন বরং। আমাকে।

এতো ঘাবড়ালে মানুষ করবেন কি বাচ্চাদের? মনে হলো, সাহস দিলেন মামুনকে। ওই ডক্টর। আসলেই ঘাবড়ে গিয়েছিলো মামুন। এতো বিচলিত হতে দেখিনি আগে ওকে।

আলট্রাসাউন্ডের রেজাল্ট পারফেক্ট। হার্ট মনিটরেও এলো সবকিছু। ভালো। ভালো সবই। তবে ভালো ছিলো না কিছু একটা।

দশ ঘন্টা আগে ধরা পড়ল সমস্যাটা। ঠিকমতো সাপ্লাই পাচ্ছে না। বাচ্চা দুটো। আমার প্ল্যাসেন্টা থেকে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওজন বেড়েছে আমার। বিশেষ করে তলপেটের ওজন। ফুলেছেও বেশ। ব্যথা অনেক বাড়লেও বলিনি মামুনকে। কাঁদছিলাম মাঝে মধ্যেই। একা একা। নিতে পারছিলাম না আর। ধরে ফেললো মামুন এক রাতে।

কি করবো আমরা? জিগ্গেস করেছিলো মামুন। ‘আপনি আমার মেয়ে হলে’, ডাক্তার তাকালেন আমার দিকে। এবার ভালোভাবে। দম নিলেন কয়েক সেকেন্ড। ‘বলতাম টার্মিনেট করতে।’

দশ মিনিট আগের ঘটনা। আমাদের নতুন স্পেশালিস্ট মহিলা বুঝিয়েছিলেন ব্যাপারটা। এক বাবুমনি পাচ্ছে যা, অন্যজন পাচ্ছে না সেটাও। আমার নাড়ি থেকে। ব্যাপারটা এমন – একজন বাঁচলেও পারবে না পরের বাবু। স্টেজ তিন চলছে। চার হলে শেষ সব। মারা যাবে দুজনই।

দুটো জিনিস হতে পারে আমাদের সামনে। ইশারায় হাত দিয়ে দেখালেন ডক্টর। ‘অ্যাবর্ট করতে পারি আমরা। একজনকে।’ চোখ সরিয়ে নিলেন আমার থেকে। উপচে এলো আমার কান্না। ‘আশা করছি’ দম নিলেন মহিলা, ‘এই সিলেক্টিভ টার্মিনেশনে নরমাল লাইফ পাবার সম্ভাবনা আছে একটা বাচ্চার।’ আটকাতে পারলাম না আর।  হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম আমি। ধরে রইলো মামুন আমাকে। শক্ত করে।  

‘শেষ চেষ্টা হিসেবে সার্জারির একটা অপশন আছে আমাদের। রিপেয়ার করার চেষ্টা করতে পারি আপনার প্ল্যাসেন্টাকে। যদি বাঁচে দুজন ..’ থামলেন ডক্টর। ‘তবে, সেটা ঠিক না হলে বিপদের সম্ভাবনা বেশি। বিপদে পড়বে সবাই।’ তাকালেন আমার দিকে। বুঝলাম আমি। স্ট্রেস দিলেন শেষে। ‘মা সহ’।

মামুন তাকালো আমার দিকে। বোঝা গেল রাজি না সে। সার্জারিতে। ডক্টর জানালেন, আমরা সার্জারি চাইলে করতে হবে তাড়াতাড়ি। আজই।

‘কথা বলুন আপনারা’ উনি বললেন, ‘দশ মিনিট পর আসছি আমি। জানাবেন কি চাচ্ছেন আপনারা?’ বেরিয়ে গেলেন ডক্টর।

বাবু দুটোই আমার ভেতর। দুজনের নড়াচড়ার রিদম বুঝতে পারি আমি। ডক্টর দুটো রাস্তার কথা বললেও আমি দেখছি না কিছু। বাচ্চাদের ছবি ভাসছে এখনো। সামনের স্ক্রিনে। সেগুলোর প্রিন্টআউটও আমাদের হাতে। ১৮ সপ্তাহেই চলে এসেছে তাদের চেহারার অবয়ব। এক বাবুর নাক দেখা যাচ্ছে। ভালোভাবে। হাতের শেপও দেখা যাচ্ছে চিবুকের কাছে। মনে হচ্ছে ভাবছে কিছু। বাবুটা। শেপগুলো মুখস্ত আমার। দেখছি তো কয়েকদিন ধরে। গেঁথে গেছে মাথায়।

কাঁদছে মামুন। ধরে আছে আমাকে। শক্ত করে। ও বুঝে গেছে এর মধ্যেই। মানুষকে বুঝতে পারে  ও দেখেই। ব্যতিক্রম হয়নি এখানে। ও বুঝতে পারছে কি ঘুরছে মাথায় আমার। মানা করছে আমাকে। বার বার।

জেদি নই আমি। সবাই জানে সেটা। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ আমাদের। বিয়ের আগেই বলেছিলো ওর সমস্যার কথা। চোখের। আমার বাবা মাকে। সবাই সরে গেলেও সরিনি আমি।

হাত ছাড়ছে না মামুন। চোখ মুছলো ও। তাকালো আমার দিকে।

আরেক হাত বাড়ালাম ওর দিকে। ধরতে ওকে। দুহাতে। এতো নিশ্চিত মনে হয়নি আমার কখনো। এই নিজেকে।

বললাম, ‘খবর দাও ডক্টরকে। তৈরি আমি।’

Sometimes even to live is an act of courage.

― Seneca

এটা সত্যি, চাপ বেড়েছে আমাদের ওপর। মানসিকভাবে। হাজারো জিনিস চলছে আমাদের আশেপাশে। একসাথে। এটাও ঠিক, মুহুর্তে জানতে পারছি সবকিছু। এই দুনিয়ার। ইন্টারনেটের কল্যাণে। তবে, সবকিছুই কেমন জানি বেশি বেশি। কথা ছিলো, প্রযুক্তির সাহায্য করবে আমাদের। উল্টোটা নয়। আমরা ডিক্টেট করবো প্রযুক্তিকে। কি কাজ দরকার। কিন্তু, প্রযুক্তি যদি পেয়ে বসে আমাদের? উল্টাপাল্টা করে ফেলে আমাদের জীবনকে?

রিসার্চ বলে, সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ নিতে পারে না আমাদের সন্তানেরা। নিতে পারার কথাও না। বড়রাই পারে না। ‘কগনিটিভ রিসার্চ’ বলে, ২১-২৪ বছরের আগে ‘ভালো মন্দ’ আর ‘রিজনিং ক্যাপাবিলিটি’ তৈরী হয় না মানুষের মাথায়। সেখানে হাজারো ফীড নিতে হচ্ছে আমাদের। আমাদের সন্তানদের। কেউ কেউ বলবেন, সার্ভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট। যে টিকবে সে থাকবে। মানছি না সেটা। ওদেরকে তৈরি করবো আমরা। ‘ও যে টিকবে’ সেই ভাবধারা তৈরী করে দেবো আমরা। আর সেটা দিতে হবে আমাদেরই। বাচ্চাদের পাড়ার মানুষ বকুনি দিলে যেভাবে আগলে রাখি, ওই নিয়মও চলবে সোশ্যাল মিডিয়াতে।

অন্য রোগের মতো মানসিক সমস্যাও সেরে যায় পরিচর্যা পেলে। খুব ভালোভাবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ‘কনস্ট্যান্ট’ ফীড নষ্ট করে দেয় কাজ করার স্পৃহা। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ তার পুরো সময়ের কোন না কোন সময়ে ‘ডিপ্রেশন’য়ে ভোগে। এটাই স্বাভাবিক। মানুষের চাওয়া পাওয়ার মধ্যে হিসেব না মিললে হতেই পারে এই বিষন্নতা। সবারই হয় জিনিসটা। পরিবার, বন্ধু বান্ধব হাত বাড়ায় তখন।

স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যে ‘পপুলার’ হবার ব্যাপারটা এখন গড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আর তখনি যোগ হয় ‘সাইবার বুলিং’। স্কুলের ‘রটনা’ আগে থাকতো স্কুলের ক্যাম্পাসে। এখন সেটা চলে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আগে, রটনা ভুলে যেতো মানুষ। সময়ের সাথে সাথে। অথচ, এখন – সেটা থেকে যায় অনলাইনে। ‘কনটেন্ট শেয়ারিং’ একটা ক্লিকে আসার ফলে সবাই বিপদে।

‘বাংলাদেশ কম্পিউটার সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমে’ থাকার সময় দেখেছি অভিভাবকদের। তাদের সন্তানদের। কতোটা অসহায় তারা। যারা পেরেছেন তারা পাঠিয়ে দিয়েছেন বাইরে। তাদের সন্তানদের। বাকিদের থাকতে হয়েছে নরকে, ‘ডে ইন ডে আউট।’ বাইরে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি কারো কারো। অথচ, সমাধান আছে সবকিছুর। সব সমস্যার। তার আগে দরকার ‘অ্যাওয়ারনেস’। কতটুকু দরকার জীবনে। চলতে।

কয়েকটা ঘটনার পর মনে হচ্ছে একটা জিনিস। ‘আত্মহত্যা’ জিনিসটাকে একটা ‘অপশন’ হিসেবে নিচ্ছে কেউ কেউ। অথচ, কোন ভাবেই এটা একটা ‘অপশন’ না। চেয়ে দেখুন, প্রতিটা সমস্যার আছে সমাধান। এই পৃথিবীতে। যে একটা সমস্যায় আছে, তার কাছে সেটাই সবচেয়ে বড়। সেটাই স্বাভাবিক, তাই না? কিন্তু সে জানে না সমাধান আছে এটার। কোথাও আশেপাশে। সে তার সমস্যা বলছে। পুরো পৃথিবীকে। কাছের মানুষকে ছাড়া। এটা তার সমস্যা নয়, বরং আমাদের। আমরা ‘কানেক্ট’ করছি না তাকে। পরিবারে।

মানুষ যখন ওরকম ‘ভার্নারেবল’ অবস্থায় থাকে – সামান্য কথাবার্তাও কাজ করে তখন। ফিরিয়ে আনতে পারে ওই অবস্থা থেকে। ফোনেও সম্ভব। আর তাই, ‘সুইসাইড প্রিভেনশন হটলাইন’গুলোর সাফল্য অনেক অনেক বেশি। সামান্য কথা যে মানুষকে কি করতে পারে সেটা বোঝা যায় ওখানকার স্ট্যাটিসটিক্স থেকে। প্রচুর প্রযুক্তি এসেছে মানুষকে বাঁচাতে, তবে সেটা আজকের বিষয় নয়।

একজন মানুষ বলছে – ‘আত্মহত্যা’ করবে সে। সোশ্যাল মিডিয়াতে। এবং সেটা সে বলছে কয়েকদিন ধরে। লক্ষাধিক মানুষ দেখছে সেটা। মজা হচ্ছে জিনিসটা নিয়ে। কোথায় গেল সহমর্মিতা? কেউ কি জানাতে পারতেন না তার পরিবারের মানুষগুলোকে? কাছের বন্ধুদের? অথবা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে? অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতা। সুতো কেঁটে গেছে কোথায় জানি। খারাপ একটা ইনডিকেটর ব্যাপারটা।

অনেকে বলেন ‘আত্মহত্যা’ বা মানসিক সমস্যা ছোঁয়াচে নয়। ব্যাপারটা ভুল। এটা খুবই ‘কন্টেজিয়াস’। বিশেষ করে এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে। এর ‘ইনফ্লুয়েন্স’ অনেক বেশি। অনেক মানুষ জানতে পারছে মুহুর্তেই। একটা অপশন হিসেবে। ও পারলে – পারি তো আমিও। বিশাল ভুল মেসেজ চলে যাচ্ছে আমাদের ভেতরে। বের হতে হবে আমাদেরই।

‘মানসিক সমস্যা’ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা আছে আমাদের ভেতরে। ছোটবেলার রাস্তাঘাটে পাগলকে মারার ঘটনা এখনো ভাসে চোখে। এতো অমানবিক কেন আমরা? এটা অন্য যে কোন রোগের মতো আরেকটা রোগ। ঔষুধে, পরিচর্যায় সারে। পেটে যেভাবে বদহজম হয়, মাথার সামান্য ‘কেমিক্যাল ইমব্যালান্স’ মানুষকে করে তোলে অন্য মানুষ। ওই ‘কেমিক্যাল ইমব্যালান্স’ সারানো এখন অনেক অনেক সহজ।

সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষমতা অনেক। সেটাকে ব্যবহার করি বাঁচাতে। মানুষকে। আমাদের আশেপাশে। প্রতিটা জীবনই মূল্যবান। ‘সুইসাইড ক্যান নট বি অ্যান অপশন।’

Real stupidity beats artificial intelligence every time.

— Terry Pratchett

চার বছর আগের ঘটনা। বাসার গাড়িটা সমস্যা করছে বেশ কিছুদিন ধরে। সমস্যাটা একটা চাকায়। ঠিক করলাম – ফেলবো পাল্টে। ফোন দিলাম দোকানে। চাকার ক্যাটাগরি/পার্ট নম্বর জানতে চাইলেন উত্তরদাতা। ঠিকই তো। জানা উচিত ছিলো আমার। পড়লাম বিপদে। গাড়ি তো এখন বাইরে। না ফেরা পর্যন্ত গেলাম আটকে। আগের বারও দোকানদার জিগ্যেস করেছিলেন এই জিনিস। আবছা করে মনে আসছে কিছু সংখ্যা। তবে, বলতে পারছি না সেটা নিশ্চিত করে।

খুব ভুলোমন আমার। মনে রাখতে পারি না আগের মতো। স্বাতী’র ওপর দিয়ে যায় তখন। আজকেও ঘটেছে একটা জিনিস। জুমা’র নামাজে যাবার আগের মুহূর্ত। একটা বই পড়ছিলাম সকাল থেকে। তখন থেকেই ঘুরছিলো জিনিসটা মাথায়। পাঞ্জাবি পরার জন্য মাথা না ঢুকিয়ে প্রায় পা তুলে ফেলেছিলাম তখন। ভাগ্যিস কেউ বোঝেনি ব্যাপারটা।

ভুলোমনের জন্য সাহায্য নিতে হয় প্রযুক্তির। দরকারী কাগজ, বিল, ভিজিটিং কার্ড, কার্ড স্টেটমেন্ট – হেন জিনিস নেই যেটা যায় না গুগল ক্লাউডে। একটা নির্দিস্ট পিক্সেলের জন্য আনলিমিটেড স্টোরেজ, ভাবা যায়? মনে পড়লো আগের ঘটনা। গাড়ি চাকা পাল্টানোর সময় তুলে রেখেছিলাম ছবি। আগের চাকার। তাও আবার ওই সময়ের মোবাইলে। নাম দিয়ে তো সেভ করিনি জিনিসটা। তো – বের করবো কি করে?

চালু করলাম ‘ফটোজ’ অ্যাপ। গুগলের নেটিভ সার্ভিস। তখনি ছিলো লাখ খানিকের মতো ছবি। লিখলাম ‘কার টায়ার’। মুহূর্তেই চলে এলো ২০০৯য়ের তোলা দুটো ছবি। গাড়ির চাকার। নম্বর সহ। সঙ্গে এলো আরো কয়েকটা ছবি। মনে পড়ল একটা তুষার ঝড়ের কথা। ওয়েস্ট কোস্টে থাকতে। গাড়ির চাকাতে লাগানো হচ্ছিলো স্নো চেইন। লাগাচ্ছিলো আমার বন্ধু। রাস্তাতে পিছলে যাবার ভয়ে। সেটার ছবি তুলেছিলাম ওই সময়ে। কোন জিনিস ভোলেনি গুগল।

চেষ্টা করতে পারেন আপনিও। চালু করুন ‘ফটোজ’ অ্যাপ। লিখুন ‘বার্থডে’। দেখুন, চলে এসেছে বাচ্চাদের নিয়ে সব ছবি। জন্মদিনগুলোর। পিক্সেলও বোঝে কোনটা কেক, কোনটা বেলুন। মোমবাতিসহ। জানে জিনিসগুলোর ‘আসপেক্ট রেশিও’। তাদের প্লেসমেন্ট। মজা আছে আরেকটু। সামনে ওই মোমবাতি গুনে আপনাকে জানাবে – কতো বয়সে পড়ল মেয়েটা আপনার। যারা বয়স মনে রাখতে পারে না তাদের জন্য এটা একটা লাইফসেভার! কেকের ওপর লেখাও মনে রাখছে সে। ওই ছবিতে থাকছেন কারা কারা? আর, কারা কারা থাকছেন প্রতিবছর? কেকটা কোন দোকানের, এবছর? আগের বছরগুলোতে? সেটাকে কাজে লাগাবে সামনে। আস্তে আস্তে। সত্যি!

ইমেজ প্রসেসিংয়ে কি তুলকালাম কান্ড ঘটছে সেটার কিছু ধারণা পাচ্ছেন সবাই ফেসবুকে। ছবি আলো আধারি – দাড়ি ছাড়া বা সহ, ক্যাপ সহ অথবা ছাড়া, সানগ্লাস সহ বা ছাড়া। কোনকিছুতেই চিনতে ভুল করছে না আপনাকে। এই ফেসবুক। এটা মাত্র ‘টিপ অফ দ্য আইসবার্গ’। তো পিচ্চি কালের ছবি? চিনবে তো? আপনার কি মনে হয়? মনে রাখবেন, ফেসবুক এমন কিছু করবে না যাতে ভয় পেয়ে যায় মানুষ।

[…]

A year spent in artificial intelligence is enough to make one believe in God.

– Alan Perlis

সমস্যার শুরুটা ওখানে। ওখানে মানে ওই আইভরি কোস্টে। পরিবার ছাড়া একলার সংসার। ইউ এন কম্পাউন্ডে। মাঝে মধ্যে চলে আসে অফুরন্ত সময়। বিশেষ করে উইকেন্ডে। কী করি, কী করি? দেখতে চাইতাম দেশটাকে। তবে, হটাৎ করেই চলে এলো হতচ্ছাড়া ইবোলা ভাইরাস। আটকে গেলাম কম্পাউন্ডের ভেতর। সে অনেক কাহিনী।

তড়িঘড়ি করেই বের করে ফেললাম কাজ। বেশ কয়েকটা। এদিকে আউটসোর্স করে দিলাম খুঁটিনাটি তবে ফালতু কিছু কাজ। যেমন ধরুন, রুমের সব বাতি আর এসি। গানের সরঞ্জামাদি। সব নিয়ে এলাম আলাদিন দৈত্যর আওতায়। অর্ডার করি বাতাসে, হয়ে যায় কাজ। মশারির ভেতর থেকে অর্ডার চলে আমার। কে নেমে হেঁটে যাবে সুইচে? বরং, হাই তুলে বলি – ‘মেইন লাইট অফ।’ ‘ডিম লাইট অন।’

ব্যাপারটা তেমন কিছু না। ‘জ্যাসপার’ নামে একটা প্ল্যাটফর্ম আছে ‘গিটহাবে’। হোম অটোমেশন অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে নাম কুড়িয়েছে জিনিসটা বেশ। ‘ভয়েস রিকগনিশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপনার কথা শুনবে সে। যা বলবেন সেটার একটা ‘অর্থপূর্ণ’ আউটকাম দেখানোই তার কাজ। পুরোটাই করা পাইথনে। আর সেখানেই এর কারিশমা। আমাদের আয়রন-ম্যানের ‘জারভিস’য়ের মতো খানিকটা।

ভেতরে আর না যাই। ধরুন, বাসার মূল বাতিটা জ্বালাবেন। বললাম, ‘মিনা’। মিনা হচ্ছে একটা কীওয়ার্ড। নাম ধরে ডাকলে কান খাড়া করবে ইন্টারফেস যন্ত্র। পরের শব্দগুলো হচ্ছে আরেক যন্ত্রের নাম, আর ‘কি করতে হবে’। এক কথায় ‘অ্যাকশন ওয়ার্ড’। বললাম – ‘মিনা, মেইন লাইট অফ’। ঘরে আছে আরো কিছু বাতি। আর সেজন্য ধরলাম বড় বাতিটাকে। কি কাজ? অন, জ্বলো।

তবে, পুরো ব্যাপারটা কিছুটা স্ট্যাটিক। এখানে যন্ত্রের নাম, ‘কাজ’ আর তার সিকোয়েন্সগুলো না জানলে বিপদ। ধরুন, বন্ধু এলো ঘুরতে। আমার বাসায়। সে তো জানবে না কোন জিনিসটার কি নাম দিয়েছি। বা, ওই যন্ত্রগুলোকে। আর কাজের কি ধরনের কীওয়ার্ড। সে হয়তোবা জানে ‘মিনা’র ব্যাপারটা। সে বলে বসলো – ‘মিনা, টার্ন দ্য লাইট অফ।’

মিনা কি কিছু করবে?

অথবা –

মিনা, কুড ইউ প্লীজ সুইচ অফ দ্য লাইট?

বা,

মিনা, স্লীপ টাইম।

এমন হতে পারে এই প্রতিটা ক্ষেত্রেই কাজ করতে পারে আমাদের ‘জ্যাসপার’। তবে, হ্যাঁ, কথা আছে একটা। যতো ধরনের কম্বিনেশন দরকার ওই কাজে, যদি সেটা দেয়া যায় ঢুকিয়ে। আগে থেকে। সেটা কোন ‘এফিসিয়েন্ট’ মডেল নয়। কেমন হতো – যন্ত্র যদি শিখতো নিজে থেকে? সময়ের সাথে।

[…]

Tagline: There’s so much to do in Bangladesh!

০১.

সেদিন দেখলাম নতুন একটা ব্যবসায়িক ফোরাম। নাম হচ্ছে “বাংলাদেশ অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার কম্পিটিশন”। ভালো উদ্যোগ। আরো আগে আসতে পারতো ব্যাপারটা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “ফেয়ার ট্রেড কমিশন” (এফটিসি) ঠিক এই কাজটাই করে সুস্থ প্রতিযোগিতার স্বার্থে। এফটিসিতে কমপ্লেইন মানে খবর আছে ওই কোম্পানি অথবা কোম্পানিগুলোর “সিন্ডিকেটের”। কোন কোম্পানির জিনিস কিনে প্রতারিত হয়েছেন? সেটাও আদায় করে দেবে কমপ্লেইন করলেই। তারপর তো জরিমানা আছেই। গ্রাহক স্বার্থ থেকে বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সবকিছুর খবর রাখে এই এফটিসি। ঘুরে আসতে পারেন ওদের সাইট থেকে। এইমাত্র দেখলাম ফোনে “ডু নট ডিস্টার্ব” নামে একটা বড় ট্যাবই রেখেছে গ্রাহকদের অচেনা কল থেকে রক্ষা করতে।

০২.

অস্ট্রেলিয়ান কম্পেটিশন অ্যান্ড কনসিউমার কমিশন (এ ট্রিপল সি) তো আরেক জিনিস। যেকোন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিককে জিজ্ঞেস করুন, উত্তর পেয়ে যাবেন সাথে সাথে। গ্রাহক পর্যায়ে ফোনের প্রতি মিনিট বিল আসলে কতো হওয়া উচিৎ সেটার “কস্ট মডেলিং” করে থাকে এই কমিশন। নিয়মিত ভাবে। টেলিকম রেগুলেটর না হয়েও। তাদের কথা একটাই। কোন একটা কোম্পানির ভেতরের অদক্ষতা অথবা কিছু কোম্পানির সিন্ডিকেটের কারণে গ্রাহক কেন গুনবে বেশি পয়সা? তাহলে ট্যাক্স দেয়াই বা কেন? একটা দক্ষ কোম্পানি হলে ফোনের ‘আন্তসংযোগ’ বিল কতো হতো সেটাই বের করে ওই এক্সারসাইজ।

০৩.

অস্ট্রেলিয়া বিশাল দেশ। সেখানের বেশিরভাগ জায়গা খালি। মানে, মানুষ থাকে দুরে দুরে। এমন দেশে মোবাইল ব্যবসা ভয়ংকর কষ্টসাধ্য। যে হাইওয়ে দিয়ে দিনে একটা দুটো মানুষ চলে – সেখানে মোবাইল কাভারেজ দেয়া ব্যবসাবান্ধব নয়। দিতে হয় তবুও। সেখানে ‘ফ্লাগফল’ নিয়ে কম ঝামেলা হয়নি প্রথমে। মোবাইলে ‘ফ্লাগফল’ হচ্ছে প্রথম মিনিটের চার্জ বাকি মিনিট থেকে বেশি। বাংলাদেশেও ছিলো জিনিসটা। সমাধান করা হয়েছে মিনিট ‘পালস’ সহ। মানে, কথা বলেছেন এক মিনিট ১ সেকেন্ড, দাম নিয়ে নিলো ২ মিনিটের। এছাড়া, বাংলাদেশে কোথায় মানুষ নেই? বরং একেকটা বেসস্টেশন ইনভেস্টমেন্টে ক্যাপাসিটির সমস্যা। সংযোগ দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারে না যন্ত্র। এতোই মানুষ আমাদের এখানে! ওটা আরেকদিন!

০৪.

ওঁদের ধারণাটা নিয়ে ২০১১তে প্রায় দেড় বছর ধরে করা হয়েছিলো এই “কস্ট মডেলিং এক্সারসাইজ”। বাড়ি টাড়ি খেয়ে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম কয়েকবার। তবে, সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন সংস্থার প্রয়াত চেয়ারম্যান। সবার সহায়তা নিয়েই ওই এক্সারসাইজে ফোনের বিল কমেছিল প্রায় ৩০%। আমার হিসেবে ওই প্রজেকশনে প্রতি মিনিটের দাম কমতে পারে আরো ২০%। নিজস্ব অপারেটর থেকে অন্য অপারেটরে ১৮ পয়সা + আইসিএক্স ৪ পয়সা = “২২+নিজের লাভ” পয়সা থেকেই শুরু হতে পারে একটা কল। নিজের নেটওয়ার্কে কল শুরু হতে পারে ০ পয়সা দিয়ে। বান্ডল অফারে। (পরে দেখুন হিসেবটা) পাশের দেশে ভয়েস কল হয়ে যাচ্ছে বিনামূল্য আইটেমে। মানেন না মানেন, এটাই ভবিষ্যত মডেল। ‘রিলায়েন্স জিও’ নিয়ে গুগল করলেই বুঝতে পারবেন কি ঘটনা হচ্ছে ওখানে।

০৫.

বাজারে ঠিক প্রতিযোগিতা আছে কিনা সেটার জন্য টেলিকম রেগুলেটরকে কাজ করতে হয় একটা ইনডেক্সের ওপর। এটাকে বলে “হারফিন্ডেল ইনডেক্স” (এইচএইচআই)। জিনিসটার একটা নাম আছে বিশ্বব্যাপী। সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার (এসএমপি)। সাংবাদিক বন্ধুরা বলতে পারবেন ভালো। এই নীতিমালাটাও করা হয়েছে বাংলাদেশে। আমার সাত বছর রেগুলেটরে থাকার সময়ে। তবে প্রয়োগে প্রয়োজন প্রজ্ঞা। তা না হলে বাজারে বড়রা বড়ই হবেন আরো ছোটরা ছোটতর। গুগল করে দেখুন। এটা আছে অনেক অনেক দেশে। নাইজেরিয়াতে গিয়েছিলাম অনেক আগে – দেখলাম ওরাও জানে সবই।

০৬.

এইচএইচআই ছাড়াও ‘ওই স্পেসিফিক বাজারের স্ট্রাকচার’ আর ‘ব্যারিয়ার টু এন্ট্রি’ ইনডেক্স দেখলে পরিস্কার হবে অনেক কিছু। নতুনকে যদি অন্য কোন অপারেটরের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, সেটা সুস্থতার লক্ষণ নয়। ব্যারিয়ার টু এন্ট্রি’ মানে ব্যবসার শুরুতে কানেকশন চেয়ে না পাওয়া। তাহলে তো মোবাইল ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (এমভিএনও) অপারেটর চলবে না এদেশে। সব দেশেই ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস প্রোভাইডারদের নির্ভর করতে হয় মোবাইল অপারেটরদের ইন্টার-কানেকশনের ওপর। সেটার জন্য ওই ক্রিটিকাল ইন্টার-কানেকশন হতে হবে ‘কস্ট বেসড’। মুনাফা নয় ওই জায়গায়। দাম ঠিক করে দেবে রেগুলেটর। যেভাবে ঠিক করে দেয়া হয় সাবমেরিন কেবলের ইন্টারনেটের দাম। কারণ, ওই সাবমেরিন কেবলের বিকল্প নেই আর। এগুলো ‘বটলনেক’ ইনফ্রাস্ট্রাকচার। যে সেবার বিকল্প নেই, সেগুলোর রেগুলেশনে এগিয়ে আসতে হবে ওই মার্কেটের রেগুলেটর অথবা কম্পিটিশন এজেন্সীকে। হিসেব সোজা।

০৭.

ঠিক সেভাবেই নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় ভয়েস কলের ইন্টার-কানেকশনের দাম। যেটা ঠিক করা হয়েছিল ১৮ পয়সায়। শেষটা করা হয়েছিল ২০১৩তে। এটার অর্থ হচ্ছে মোবাইল, ল্যান্ডলাইন অপারেটররা একে অপরকে কল পাঠাতে হলে অন্যজনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করে গতি নেই কারো। সেজন্য এটাও একটা ‘ক্রিটিকাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’। সেটার দাম বেঁধে দেবে রেগুলেটর। হিসেব করে। ০১৭ থেকে ০১৮য়ে কল পাঠাতে গ্রামীন রবিকে দেবে ১৮ পয়সা। ৪ পয়সা দেবে মাঝের ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স)কে। ২২ পয়সা দিয়ে বাকিটা নিজের লাভ।

০৮.

কোন একটা স্পেসিফিক বাজারে (মোবাইল বাজার, ইন্টারনেট বাজার, হোলসেল, রিটেল বাজার) যার মার্কেট শেয়ার অনেক অনেক বেশি, সেটা ক্ষতি করে প্রতিযোগিতাকে। অন্যরা বাজারে পরে আসলে তারা পায়না পানি। উদাহরণ দেই বরং। আমাকে একটা রেগুলেটরি প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছিল থাইল্যান্ডে। প্রশিক্ষণ শেষে হাতে কলমে দেখানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হলো ওদের টেলিকম রেগুলেটরি কমিশনে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে তাদের নিয়ম পরিষ্কার। আসলেই তাই।

০৯.

ওদের নিয়ম অনুযায়ী, অপারেটরের (হোক সে মোবাইল অথবা ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার), মার্কেট শেয়ার ২৫% ওপরে গেলেই তাকে বলা হবে “সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার” (এসএমপি)। তখন তার ওপর বর্তাবে আলাদা নিয়ম। ‘অ্যাকাউন্টিং সেপারেশন’ করে দেবে সার্ভিসগুলোর। মানে, একটার লাভ দিয়ে অন্যটাকে ক্রস-সাবসিডি দিয়ে চালাতে পারবে না ওই অপারেটর। নতুন কোন অফার নামাতে জানাতে হবে রেগুলেটরকে। নেটওয়ার্ককে খুলে দিতে হবে ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ মডেলে। যাতে সবাই একটা নির্দিষ্ট দামের ভিত্তিতে ‘রাইড’ নিতে পারে ওই নেটওয়ার্কে। বান্ডলিং, মানে এটা নিলে ওইটা ফ্রি – দিতে পারবে না সে। তার ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং’ মানে ব্যবহার করতে দিতে হবে অন্য প্রতিযোগী অপারেটরদের। একটা নির্দিষ্ট দামের ভিত্তিতে। ওটা জানবে রেগুলেটর। সেটা শিখেছিলাম আরেকটা গুরূ দেশ থেকে। সিঙ্গাপুর। ওদের টেলিকম রেগুলেটর থেকে। পাগল করা কোর্স ছিলো ওটা। এমনই রেগুলেটর যে নিজেদের নাম পাল্টে রেখেছে “ইনফোকম ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি” নামে।

১০.

এসএমপি অপারেটরদের ‘প্রিডেটরি প্রাইসিং’ একেবারে না না। অর্থাৎ মনে হলো যে দাম অফার করলে বাজার থেকে নাই হয়ে যাবে প্রতিযোগীরা, সেটা করলে রেগুলেটরের খড়গ নেমে আসবে তার ওপর। ২০১২ সাল থেকে থাইল্যান্ডের ‘এআইএস’ আর ‘ডিট্যাক’ রেগুলেটর ঘোষিত ‘এসএমপি’ অপারেটর। অন্য অনেক অবলিগেশনের মধ্যে তাদেরকে ফেলা হয়েছে ‘মোবাইল ভয়েস প্রাইস রেগুলেশনে’। ফলে তাদের প্রতি মিনিট ভয়েস কলের সর্বোচ্চ দাম ঠিক করে দেয়া আছে ০.৯৯ বাথে। আবার যারা যারা থ্রিজি লাইসেন্স পেয়েছে (মানে যারা ২.১ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি পেয়েছে) তাদেরকে বাজারের গড় দাম থেকে ১৫% কমিয়ে রাখতে বলেছে রেগুলেটর। ওখানে আরেকটা জিনিস কাজ করে ভালো। ইনসেনটিভ রেগুলেশন। অপারেটর মুনাফা বাড়াতে পারে দক্ষতা দেখিয়ে। দক্ষতা মানে দেখাতে হবে নিজেদের ‘এফিসিয়েন্সি’। মানে কম ইনভেস্টমেন্টে বেশি সুবিধা। ফলে, গ্রাহককে গুনতে হবে কম পয়সা।

১১.

বাজারে প্রতিযোগিতার সুস্থ পরিবেশ না থাকলে অনেকগুলো জিনিস হয়। নষ্ট হয় অপারেটরদের ইনভেস্টমেন্ট। মারা যায় অনেকে। মার্জার অ্যাকুইজেশন হয় তখন। এতে অনেকে বলবেন, ‘সারভাইভাল ফর দ্যা ফিটেস্ট’। ব্যাপারটা তা না। এটাতো আর ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’ নয়। নীতিমালা আছে এখানে। তবে প্রতিযোগিতা সুস্থ না হলে বাজারে বার বার টাকা হারিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে ইনভেস্টররা। চলে যাবে বাইরে। যেমনটি দেখেছি ওই চেয়ারে বসে। টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। যে যাই বলুক, উদ্যোক্তারাই কিন্তু চালায় দেশের অর্থনীতি। হোক সেটা দেশীয় অথবা বৈদেশিক বিনিয়োগ। দশটা পরিবারের চল্লিশটা মুখের খাবারের যোগান দেয় এই উদ্যোক্তা।

১২.

উদাহরন দেই বরং। আমাদের উপমহাদেশের একটা দেশ ‘ক’। কাকতালীয়ভাবে মিল হলে সেটা হবে দৈবচয়নের ভিত্তিতে। পুরো মোবাইল বাজার নিয়ে আছে ওখানের ছয়টা অপারেটর। পুরো রেভিনিউ মার্কেটের ৫০% এর কিছুটা বেশি মার্কেট শেয়ার দখল করে আছে প্রথম অপারেটর। মানে হচ্ছে – পুরো মোবাইল মার্কেট থেকে ১০০ টাকা আসলে সেটার ৫২ টাকা পায় ওই অপারেটর। বাকি ৪৮ টাকা মিলে মিশে পায় পাঁচ অপারেটর। বুঝতেই পারছেন প্রতিযোগিতার অবস্থা। ওই সময় একটা হিসেব করলো রেগুলেটর। বিদেশী কনসালটেন্ট নিয়ে। দেখা গেলো এই মোবাইল বাজারে ৩৫-৪০% হতে পারে নিচের ‘থ্রেসহোল্ড’ – মার্কেট শেয়ারে। মানে, ৩৫ থেকে ৪০% মার্কেট শেয়ার (যেটা রেগুলেটর মনে করে ভালো) হলেই সে হবে ‘এসএমপি’। এরকম ভাবে হোলসেল বাজারে ট্রান্সমিশন লাইসেন্সেও আসতে পারে এধরনের শতাংশের বেস লাইন।

১৩.

আমাদের প্রতিযোগিতা কমিশন নেই – সেটা নয় কিন্তু। আছে। আবার দেশীয় উদ্যোক্তা আর বৈদেশিক ইনভেস্টমেন্ট দুটোকে পরস্পর সাংঘর্ষিক করে দেখার সুযোগ কম। সেটার জন্য আমাদের দেখতে হবে বিশ্বখ্যাত “ডুইং বিজনেস” ইনডেক্সে কোথায় আমরা? কতোটা ব্যবসাবান্ধব আমরা? একটা ট্রেড লাইসেন্স অথবা একটা টেলিকম ব্যবসা খুলতে সময় লাগে কতো দিন? সরকার থেকে একটা ‘পারমিট’ বের করতে কতোটা অসহায় হতে হয় একেকজন উদ্যোক্তাকে? ‘গোল পোস্ট’ পাল্টায় কতো তাড়াতাড়ি? মানে, একটা নিয়ম মেনে ইনভেস্টমেন্ট করার পর কখন পাল্টায় আগের নিয়ম?

১৪.

খালি চোখে দেখা যায় না প্রতিযোগিতা’র অসুস্থতা। সেটা দেখতে লাগবে অনেকগুলো স্ট্যাটিসটিকাল ইন্ডিকেটর। আর প্রতিযোগিতাকে ব্যবসাবান্ধব করতে লাগবে ‘প্রজ্ঞা’। একটু ওলটপালট হলেই ক্ষতি হবে ব্যবসায়িক পরিবেশের। তিন বছর লেগেছে আমারই বুঝতে। আমার এই ব্যাপারটা কিছুটা ধীর, পুরনো প্রসেসর বলে হয়তোবা। যেমন, ‘প্রাইস’ অথবা ‘মার্জিন স্কুইজ’ দেখা যাবে না খালি চোখে। আপনি আরেকজনের কাঁচামাল নিয়ে যদি রিটেল মার্কেটে ব্যবসা করেন যেখানে ওই কাঁচামাল তৈরীর কোম্পানিও ব্যবসা করে পাশাপাশি। পারবেন তার সাথে? ধরা যাক, মোবাইল অপারেটর থেকে ‘ক’ টাকায় “ইন্টারনেট” কিনে ‘ভেহিকল ট্র্যাকিং সার্ভিস’ দেন আপনি। ওই বাজারে মোবাইল অপারেটর ওই একই ব্যবসা করলে টিকবে কি সেই উদ্যোক্তা? যতোই লাভ সে দিক সরকারকে। এরকম জিনিস আছে হাজারো।

১৫.

এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে দেশীয় উদ্যোক্তা আর বৈদেশিক ইনভেস্টমেন্টের মধ্যে ফারাক নেই বললেই চলে। বর্তমানে অনেক সফল দেশীয় উদ্যোক্তাদের ভেঞ্চারে বিনিয়োগ আসছে বিদেশ থেকে। আমার কথা একটাই। তৈরী হোক সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ। দেশে। বাড়ুক সবাই। একসাথে। হাজার হোক, আমাদের দেশ এটা। হোক এটা আরেকটা ‘ল্যান্ড অফ অপুর্চুনিটি’। বসে আছি ওই দিনের জন্য, যখন আমাদের ছেলেমেয়েরা বাইরে থেকে পড়ে ফিরে আসবে বাংলাদেশে।

কেন?

১. ল্যান্ড অফ অপুর্চুনিটি ২. দেয়ার’স সো মাচ টু ডু ইন বাংলাদেশ! আসলেই তাই! এখানে করার আছে এতো কিছু, যে মাঝে মধ্যে মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বসে থাকি ওই উত্তেজনায়!

ধন্যবাদ সবাইকে।

ট্যাগলাইন: দেয়ার’স সো মাচ টু ডু ইন বাংলাদেশ!


ডুইং বিজনেস http://www.doingbusiness.org
অস্ট্রেলিয়ান কম্পেটিশন অ্যান্ড কনসিউমার কমিশন http://accc.gov.au
ফেয়ার ট্রেড কমিশন https://www.ftc.gov
বাংলাদেশের রিপোর্ট: সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার https://goo.gl/IVbJSG

It’s like Tolstoy said. Happiness is an allegory, unhappiness a story.

― Haruki Murakami, Kafka on the Shore

ট্রেন স্টেশনে ঢুকেই চক্ষুচড়কগাছ! প্রায় সবার হাতেই অন্য ধরনের একটা কাগজ। এগোলাম একটু। খটকা লাগছিল প্রথম থেকেই। নিউজ পেপার নয়। পত্রিকা তো নয়ই। সামনে পড়লো একজন বয়স্ক মহিলা। সাহস করে ঘাড়ের ওপর দিয়েই দেখার চেষ্টা করলাম। অল্প বয়স্কদের ওপর দিয়ে তাকানো বিপদজনক। একবার হলো কী, এই চট্টগ্রামের ঘটনা।

বিরক্ত চোখে থাকলেন আপনি। ‘আরে শুরু করলেন ট্রেন স্টেশনে – থাকেন তো ওখানে। পরে শুনবো ওই কাহিনী।’

মাফ করবেন। ট্রেন স্টেশনে থাকি বরং। হ্যাঁ, যা বলছিলাম। ছোট কাগজ। ‘এ-ফোর’ সাইজ থেকে বেশ ছোট। আবার, পেপারব্যাক বইয়ের সমান না। বরং একটু বড়। হেডলাইন পড়েই বুঝলাম কাহিনী কী। ছোট গল্প। আশেপাশে তাকালাম সময় নিয়ে। ইংরেজির ‘হার্ড লুক’এর মতো করে। অনেকের হাতেই এই কাগজ। একেকটা দু তিন পাতার। সোর্স কী – মানে পেল কোথায়? বইয়ের দোকান থেকে পায়নি তো?

এটা ঠিক, স্মার্ট কখনোই ছিলো না এই বান্দা। তবে বেকুব হয়ে থাকার সুবিধা অনেক। মানুষ এগিয়ে আসে সাহায্যে। ভুল ভাঙ্গাতে। হলো এবারো। আমার ধারণা ওই বয়স্ক মহিলা বুঝতে পারছিলেন আমার অবস্থা।

‘মসিয়ে’, ভদ্রমহিলা তাকালেন আমার দিকে। মনে হলো – স্মিত হাসলেন আমার অবস্থা দেখে। ‘অবাক কান্ড হয়েছে এখানে। আজ। লাগবে আপনার?’ নিজের হাতের কাগজটা দেখিয়ে বললেন উনি।

মাথা নাড়ালাম আড়ষ্ট হাসি দিয়ে। ‘আসুন আমার সাথে।’ বললেন মহিলা।

পিছু নিলাম ওনার। অনেকে আসছেন ওই দিক থেকেই। ভিড় নয় তবে বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা আছে ওখানে।

ওখানেই পাবেন আপনার গল্পগুলো! অসাধারণ, তাই না? বললেন মহিলা।

মহিলার চোখের লীড নিয়ে তাকালাম ওই দিকটাতে। দুটো ভেণ্ডিং মেশিন দাড়িয়ে আছে ওদিকে। ধন্যবাদ জানিয়ে এগোলাম যন্ত্রগুলোর কাছে। যতোই এগোই যন্ত্রগুলোর কাছে – ততোই বাড়ছে আমার হাঁটার গতি।

কমলা রঙের গোলাকৃতি এই ভেণ্ডিং মেশিনটা অনেকটাই অন্য মেশিনগুলোর মতো, তবে একটা পার্থক্য বোঝা গেলো কাছে থেকে। মাত্র তিনটা বোতাম। এক মিনিট, দুই আর পাঁচ মিনিট। টাকা পয়সার কথা বলেনি কোথাও।

বলে কী? এই একটা ভেণ্ডিং মেশিন পাওয়া গেলো পয়সা ছাড়া। চাপ দিলাম দুই মিনিটের বোতামে। বেরিয়ে এলো দুই পাতার একটা ছোট গল্প।


গল্পের মানুষগুলো কাল্পনিক হলেও ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি। ফ্রান্সের ট্রেন স্টেশনগুলোতে বসানো হয়েছে এই গল্পের ভেণ্ডিং মেশিন। বিনে পয়সায় গল্প পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে ওদের ট্রেন অপারেটর ‘এসএনসিএফ’। ‘এসএনসিএফ’ ব্যবহার করার সুযোগ হয়েছে অনেকবার। প্রতিবারই নতুন কিছু না কিছু দেখেছি ওটাতে উঠে। এবারের গল্পটা বেশ ইউনিক। অনেক গভীর।

এই মোবাইলের যুগে এটা একটা স্বস্তির বাতাস। বোঝা যাচ্ছে – ট্রেন অপারেটর একটা নতুন কালচার চালু করতে চাচ্ছে এই গল্প পড়া নিয়ে। ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ যাতে কিছু কোয়ালিটি সময় পায় সেটার ব্যবস্থা করেছে এই অপারেটর। কোয়ালিটি সময়ের সাথে কোয়ালিটি লিটারেচার দিতে এপর্যন্ত লাখের বেশি গল্প ডিস্ট্রিবিউট করেছে এই প্রোগ্রামের সলিউশন প্রোভাইডার ‘শর্ট এডিশন’।

দশ বছর হবে হয়তোবা। আমাজন থেকে ছোট গল্প কিনতাম চল্লিশ সেন্ট করে। তিন – পাঁচ পাতার। দেশীয় ক্রেডিট কার্ড ঝামেলা করলে বন্ধুরাই কিনে দিতো জিনিসটা। পরে মেইল করে দিতো পিডিএফ ফাইলটা। তখনই মনে হয়েছিল এই মডেলটার কথা। পাঁচ টাকায় একেকটা গল্প। কয়েকজনের সাথে এটা নিয়ে কথা বলেছিলাম অনেকবার। সবার কথা, মানুষের পড়া কমে গেছে অনেকাংশে। সত্যি। পরে আর এগোয়নি জিনিসটা।

২০১৩তে ফ্রান্সকে নাম দেয়া হয়েছিল ‘লেখকদের দেশ’ হিসেবে। এটা এসেছিল বড় একটা ‘নেশনওয়াইড’ সার্ভের পর। জানা গেলো প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ বইয়ের পাণ্ডুলিপি লিখেও ফেলে রাখে বছরের পর বছর। বই হিসেবে আলোর মুখ দেখেনা আরো বড় একটা শতাংশ। শর্ট এডিশনের ডিরেক্টরের কথাটা ভালো লেগেছে আমার। ‘আমরা ছড়িয়ে দিতে চাই গল্পকে। মানুষের মাঝে। উত্সাহ দিতে চাই পড়া আর গল্প লেখার ওপর। প্রোমোট করতে চাই আমাদের লেখকদের। গল্পের বিশাল একটা আবেদন আছে আমাদের জীবনে।’ ঠিক তাই। একটা জার্নির আগে আরেকটা জার্নির পরশ দিতেই এ ব্যবস্থা।

পাঁচ হাজারের বেশি গল্প লেখক লিখেছেন এই প্রোগ্রামে। বুঝুন তাহলে – অনেক লেখক তৈরি হবে এভাবে। সামনের বছরগুলোতে। ট্রেনে মানুষের সময়ের ওপর ভিত্তি করে এক, দুই আর পাঁচ মিনিটের গল্প নিয়েই আজ আমার এই গল্প। আমিও চাইবো এধরনের একটা প্রোগ্রাম চালাতে। কী বলেন?

Most good programmers do programming not because they expect to get paid or get adulation by the public, but because it is fun to program.

– Linus Torvalds

ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায়।

বিশাল একটা দিন আজ। ১২ই সেপ্টেম্বর। প্রোগ্রামারস’ ডে।

আমাদের প্রতিটা মুহূর্তকে এগিয়ে নিতে এই প্রোগ্রামারদের অবদান আমরা জানি সবাই। সামান্য লিফটের বাটন থেকে শুরু করে প্রতিটা রিমোট কনট্রোল, হাতের মুঠোফোন থেকে টিভি, জীবনরক্ষাকারী সব মেডিকেল ইকুইপমেণ্টের পেছনে রয়েছে শত থেকে হাজার লাইনের কোড। আমাদের এই মুঠোফোনের অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিষ্টেমেই আছে দেড় কোটি লাইনের কোড। আর সেকারণে যন্ত্রটা যেকোন মানুষ থেকে ভালো চেনে আমাদের। আমাদের ভালোমন্দ – পছন্দ অপছন্দ জানে অনেকটাই। জানবে আরো বেশি। সামনে। কারণ একটাই। জিনিসটা আমাদের সাহায্যকারী একটা অংশ।

সৃষ্টিকর্তা তার গুণগুলোকে অল্প অল্প করে দিয়েছেন মানুষকে। এর মধ্যে ‘জিনিস তৈরি’ করার ক্ষমতাটা অতুলনীয়। উদ্ভাবন করার ক্ষমতা। সেইগুণ দিয়ে অনেকটাই অজেয় হয়ে উঠছে মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে প্রোগ্রামিংয়ে কিছুটা এক্সপোজড থাকার কারণে ভবিষ্যত দেখার ‘ছোটখাট একটা উইনডো’ তৈরি হয় আমাদের সামনে। তাও সবসময় নয়, মাঝে মধ্যে। খেয়াল করলে দেখবেন, মানুষ নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবার অনেক ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছে যন্ত্রের হাতে। আমিও চাই তাই। কয়েকটা লিফটের মধ্যে কোনটা ‘কতো তলায় থাকার সময়’ কোন কলে আপনার কাছে আসবে সেটাতো ছাড়িনি লিফটম্যানের হাতে। ‘লিফটম্যান’ বলে অপমান করা হয়েছে মানুষকে। আমাদের অনেক ‘অনেক’ কাজ রয়েছে সামনে।

চেয়ে দেখুন, সামান্য ড্রাইভিং থেকে শুরু করে বড় বড় উড়ুক্কযান চলে গেছে অটো-পাইলটে। সামনে আরো যাবে। সোজা হিসেব। মানুষ দেখেছে, একটা সীমার মধ্যে বেশ কয়েকটা সিদ্ধান্তের ভেতরে “কী প্রেক্ষিতে কে কী করবে” সেটা আগে থেকে ঠিক করে দিলে যন্ত্র কাজটা করে নির্ভুলভাবে। মানুষের মধ্যে অনেক ‘বায়াসিং’ বিভ্রান্ত করলেও যন্ত্র সেটা করে ঠিক করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বড় কিছু নয় কিন্তু। মানুষের ‘ডিসিশন সাপোর্ট সিষ্টেম’কে ওয়ার্কফ্লোতে ফেলে যন্ত্রকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছে বাড়তি কিছু জিনিস। তেমনি এই মানুষেরই তৈরি ‘সুপারভাইজড লার্নিং’ দিয়ে নিজের কাজের ফীডব্যাক নিয়ে শিখছে নতুন নতুন জিনিস। মানুষকে চিনতে। আরো ভালোভাবে।

মানুষ এখনো অসহায় – অনেক কিছুর কাছে। জলোচ্ছাস, ভূমিকম্প, আর হাজারো রোগ আসবে সামনে। এগুলো ঠেলেই এগুতে হবে – আরো অনেক। সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে জ্ঞান দিয়েছেন ‘এক্সপ্লোর’ করতে। জানতে। যেতে হবে লাইট ইয়ার্স দূরের নতুন নতুন গ্রহাণুপুঞ্জে। যদি জানতাম আমরা, সৃষ্টিকর্তা কী অভূতপূর্ব জিনিস ছড়িয়ে রেখেছেন নক্ষত্রপুঞ্জে। আর সেকারণেই অফলোড করতে হবে আরো অনেক সময়ক্ষেপণকারী ‘সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা’। আমাদের সহায়তাকারী যন্ত্রের কাছে। দরকার কোটি কোটি … কোটি লাইন লেখার ‘উদ্ভাবনাশক্তি’ সম্পন্ন প্রোগ্রামার। সামনের দিনগুলোতে। যন্ত্রকে শিখিয়ে দেবার জন্য। ওর পর, শিখিয়ে দেয়া হবে মানুষের ভেতরের ‘সুপারভাইজড লার্নিং’ সিকোয়েন্স। যন্ত্রকে। যাতে, ও নিজে থেকেই লিখতে পারে কোড।

মানুষের কাজ অন্যকিছু। সেটা বের করবে এই মানুষই।

মোদ্দা কথা, যন্ত্রকে ভয় নেই। মানুষই মাত্রই ‘চিন্তা’ করতে পারে। যন্ত্র নয়। সৃষ্টিকর্তাই মানুষকে তৈরি করেছেন ওই সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারা দিয়ে। তাকে খুঁজতে। জানতে তাকে। আরো ভালোভাবে।

যেতে হবে বহুদূর।

ঈদ মুবারক।

[ক্রমশ:]

%d bloggers like this: