Feeds:
Posts
Comments

The best time to plant a tree was 20 years ago. The second best time is now.

– Chinese Proverb

ক॰

সমস্যাটার শুরু প্রায় এক দশক আগে। ছুটাছুটির চাকরি। আজ এখানে তো কাল ওখানে। শেষমেষ ‘পীস কীপার’ হিসেবে পোস্টিং হলো কঙ্গোতে। ঘুরাঘুরিই বেশি। ঘুমের সময় ছাড়া বাকিটা হিসেব করলে – পুরোটাই রাস্তায়। নিজ দ্বায়িত্বের এলাকা, যাকে বলে ‘এরিয়া অফ রেস্পন্সিবিলিটি’ – ইঞ্চি ইঞ্চি করে না জানলে বিপদ। মানুষের জীবন বলে কথা। পুরো এলাকা থাকতে হবে নিজের নখদর্পণে। কন্সট্যান্ট ভিজিল্যান্স। পায়ে হাটা অথবা গাড়ি – পায়ের মাইলোমিটারে লাখ মাইল পার হয়েছে নিশ্চিত।

খ॰

রাস্তায় নামলেই হাজার চিন্তা কিলবিল করে মাথায়। একটা এদিকে হলে আরেকটা ওদিকে। মাথা মুন্ডু ছাড়া চিন্তাভাবনা। দিন কয়েক পর বেস ক্যাম্পে ফিরলে বসতাম ইউএন এর কচ্ছপ গতির ইন্টারনেট নিয়ে। সভ্যতার সাথে একমাত্র ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ – ওই স্যাটেলাইট লিংক। একসময়, প্লট করতে শুরু করলাম চিন্তাগুলোকে। ‘চ্যানেলাইজ’ করতে তো হবে কোথাও। একেকটা চিন্তা একেকটা ডট। কানেক্টিং দ্য ডট’স ব্যাপারটা বুঝলাম অনেক পরে। চল্লিশের আগে নাকি ব্যাপারটা আসে না মাথায়?

জ্ঞান তো হলো অনেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে আসবে প্রজ্ঞা। সেটাকে প্রয়োগ করলেই উন্নতি। দেশের।

জ্ঞান তো হলো অনেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে আসবে প্রজ্ঞা। সেটাকে প্রয়োগ করলেই উন্নতি। দেশের।

গ॰

আগের ঘটনা আরো চমত্‍প্রদ। কঙ্গোতে যাবার ঠিক আগ মূহুর্তে ফিরেছিলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিগন্যাল স্কুল থেকে। থাকতে হয়েছিল লম্বা সময়ের জন্য। প্রায় নব্বই বর্গ মাইলের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিকম্যুনিকেশন ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি। যায়গাটাও জর্জিয়ার একটা অজ পাঁড়া গাঁয়ে। সন্ধার পর কুপি জ্বলার মতো অবস্থা। স্কূল থেকে ফিরে কাজ না পেয়ে হাত দিলাম রান্নায়। কাঁহাতক আর খাওয়া যায় ফাস্ট ফুড! পিএক্স থেকে এটা কিনি, ওটা কিনি। বাসায় এসে ভয়াবহ ধরনের ‘টেস্ট এণ্ড ট্রায়াল’। অসুবিধা কি? গিনীপিগ তো নিজে। ক্ষান্ত দিলাম স্মোক ডিটেক্টরের পানির ঝাপটা খেয়ে। বার কয়েক। তবে, একেবারে ক্ষান্ত নয়, কমিয়ে দিলাম গতি। মনোযোগ সরালাম নতুন দিকে।

ঘ॰

বিশাল লাইব্রেরী। এটা ওটা ইস্যু করি, টাইম লিমিটও অসহনীয় লম্বা। পুরনো পত্রিকা, দুস্প্রাপ্য বই সব মাইক্রোফিশেএকদম নতুন বই লাইব্রেরীতে না থাকলেও সেটা কিনে এনে চেকআউট করিয়ে রাখতেন লাইব্রেরিয়ান। আমাজনের বেস্টসেলার লিস্ট দেখা অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেলো ওই সময়ে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ‘বেস্টসেলার’গুলো লিখছেন আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষ। মানে, পেশাদার লেখক নন তারা। সাহস পেলাম। যাই লিখি, পাঠক পেতেই হবে বলেছে কে? মনের খোরাক মেটানোর জন্য লেখা। ওই বিরানব্বই থেকে। সেথ গোডিংয়ের গলা শুনি প্রায়ই। শিপ, বাডি! শিপ!

ঙ॰

দেখা গেলো ওই ‘বেস্টসেলার’দের কেউ ছিলেন স্টক এক্সচেঞ্জের হর্তাকর্তা, কেউ সিআইয়ের চীফ। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার। সরকারী কর্মকর্তা। নেভী সীল। ফুটবল কোচ। জিমন্যাষ্ট। তারা লিখছেন পেছনের অনেকগুলো বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে। ব্যর্থতা থেকে সফলতার গল্প। যা আসলে সাহায্য করছে ওই পড়ুয়া মানুষদের। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। বিতর্কিত জিনিস নিয়ে যে লেখা হয়নি তা নয়। লিখেছেন রেচেল মোরানের মতো পেশাজীবীরা। মানে – লেখা হয়েছে প্রায় সব বিষয় নিয়ে। বের হয়ে এসেছে অনেক সমস্যার কথা। সেই ভুল থেকেও শিখছে দেশ। সমালোচনা নিতে পারার মানসিকতার দেশগুলো ওপরে উঠছে দ্রুত। আবার লিখছেন জাতির পিতারা। আজকের ‘আধুনিক’ সিঙ্গাপুরের পেছনে যিনি ছিলেন তারো বই আছে কয়েকটা। নেলসন ম্যানডেলা’র বইটা পড়েছেন নিশ্চয়। সাতাশ বছরের অবিচারের ঘৃণাটা মূহুর্তে গিলে ফেলার ঘটনাটা অজানাই থাকতো বইটা না পড়লে। পড়ছি সবই, বুঝতে পারছি ভালো মন্দ। মন্দটা ফেলে ভালো নিয়ে এগুচ্ছি সবাই আমরা, সময়ের বিবর্তনে। অন্যের কাছ থেকে শিখে। পেছনে লেগে নয়।

চ॰

জ্ঞান কিন্তু রি-ইউজেবল। ব্রিটেনের লেগেছে দুশো বছর প্রায়। শুধু শিখতেই। শিল্পবিপ্লব থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিখেছে ব্রিটেন থেকে। তাদের লোক পাঠিয়ে। নোটবই ভরে নিয়ে আসতো তাদের অভিজ্ঞতার কথা। জাহাজে করে। সেটা কাজে লাগিয়ে ওই ব্রিটেনের সাথে টক্কর দিয়েছে অনেক কম সময়ে। ‘লীড টাইম’ কমিয়ে নিয়ে এসেছে প্রায় একশো বছর। এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই শেখার চর্চাটা ধরে রেখেছে বলে তারা এখনো শীর্ষে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শত বিপত্তির মধ্যে উদ্ভাবনা দিয়ে আছে টিকে। নিজেদের দেশে মানুষ কম বলে বাইরের বাজার দখলে ব্যস্ত তারা। এখন বোকারাই বলে যুদ্ধের কথা, বাজার দখলে কে কাকে বাজার বানাতে পারে সেটাই হচ্ছে বড় যুদ্ধ। রক্তপাত ছাড়াই ‘আউটবাউন্ড’ ক্যাশফ্লো!

ছ॰

এশিয়ান দেশগুলো আরো বুদ্ধিমান। ইউরোপ আর অ্যামেরিকা থেকে শিখে সেটা কাজে লাগিয়েছে গত তিরিশ বছরে। এখন টক্কর দিচ্ছে সবার সাথে। হংকং, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর অন্যের ‘ঠেকে শেখা’র অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এগিয়েছে বেশি। পাশ্চাত্যে কোনটা কাজ করছে আর কোনটা করেনি সেটা জানলেই তো হলো! তার সাথে মেশাও ‘লোকাল কন্ডিশন’। আমি এটাকে বলি, ‘ঘুটা’, মানে জ্ঞানের ডিফিউশন। মেলাও হাজারো জ্ঞানের অভিজ্ঞতা। গরীব দেশ হলেও কোন সরকারী কর্মকর্তাকে তো মানা করা হয়না বৈদেশিক ভ্রমনে না যেতে। অথচ কর্পোরেট হাউসে কৃচ্ছতা সাধনে প্রায় সবই চলছে ভিডিও কনফেরেন্সে। দেশের একটাই চাওয়া, শিখে আসা জ্ঞানটা কাজে লাগবে দেশের উন্নতিতে। প্রাথমিক জ্ঞানটা পাবার পর বাকিটা শেখার বাহন হচ্ছে ইন্টারনেট। আর সেকারণে ইন্টারনেট নিয়ে লাগা। জ্ঞান ছড়িয়ে আছে সব যায়গায়, দরকার তার প্রয়োগ।

ঝ॰

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেলেন জ্ঞান ‘ক’। এদিকে সিংগাপুর দিলো ‘খ’ জ্ঞান, ভিয়েতনাম থেকে নিয়ে এলেন ‘গ’। এখন – আমাদের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্ডিকেটরের সাথে মিলিয়ে যেটা যখন কাজে লাগে সেটাই ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। অনেকে এটাকে বলে ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’। মানে, যেটা কাজ করেছে অনেক যায়গায়। ‘ওয়েল টেস্টেড’। টেস্ট পেপার সলিউশনের মতো কিছুটা। দেখা গেছে – ওভাবে কাজটা করলে জিনিসটা মার যাবার সম্ভাবনা কম। টেস্ট এণ্ড ট্রায়ালের পর ফুলপ্রুফ হয়েই নাম হয়েছে ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’। দেশের ‘লোকাল কন্ডিশন’কে বেস্ট প্র্যাকটিসে ঘুঁটানোতেই রয়েছে মুন্সিয়ানা। ইন্টারনেটকে ছড়িয়ে দেবার ওই ধরনের ‘টেম্পলেট’ নিয়ে কাজ করেছি গত সাত সাতটা বছর।

ঞ॰

মনে আছে বৈজ্ঞানিক নিউটনের কথা? ‘আমি যদি আজ বেশি দেখে থাকি অন্যদের চেয়ে, সেটা পেরেছি পূর্বপুরুষদের জ্ঞানের ভিত্তিতে’। উন্নতবিশ্বের আজকের যা উন্নতি তার সবটাই এসেছে ওই ‘স্ট্যান্ডিং অন দ্য সোল্ডার অফ জায়ান্টস’ কথাটার ওপর ভিত্তি করে। আজ জানি আমরা ট্রানজিস্টর কি – আর কিভাবে কোটি ট্রানজিস্টর থাকে একটা চিপসেটে। নতুন করে ওই ট্রাংজিস্টর উদ্ভাবন না করে বরং কোটি ট্রাংজিস্টরের চিপসেট দিয়ে আর কি কি করা যায় সেটাই ভাববার বিষয়। আর তাই আগের জ্ঞানের ‘ডিফিউশন’ দিয়ে নতুন উদ্ভাবনা কাজে লাগিয়ে ওপরে উঠছে নতুন ইমার্জিং দেশগুলো। এটাকে বলা হয় লিপ-ফ্রগিং।

য॰

সামরিক বাহিনীর স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার বিটিআরসিতে আসা। টেকনোলজি নিয়ে একসময় লিখতাম কিছু পত্রপত্রিকায়। শুরুতেই ঝামেলা। ব্রডব্যান্ড, ইন্টারনেট – নতুন যাই লিখি সেটা নিয়ে মাথা নাড়াচ্ছিলেন অনেকেই।

“ভালো, তবে সমস্যা অন্যখানে। এটা সম্ভব নয় এদেশে।”

সময় কিন্তু যাচ্ছে চলে। জ্ঞানকে অভিজ্ঞতায পরিণত করতে লাগবে সময়োচিত দর্শন, যুক্ত হবার অদম্য স্পৃহা। লাগবে রেগুলেটরী রেফর্ম। দরকার নেই প্রযুক্তি জানার, নীতিনির্ধারণীদের।

সময় কিন্তু যাচ্ছে চলে। জ্ঞানকে অভিজ্ঞতায পরিণত করতে লাগবে সময়োচিত দর্শন, যুক্ত হবার অদম্য স্পৃহা। লাগবে রেগুলেটরী রেফর্ম। দরকার নেই প্রযুক্তি জানার, নীতিনির্ধারণীদের।

বলেন কি? অবাক হয়ে তাকাই উনাদের দিকে। নীতিমালায় আটকানো আছে জিনিসগুলো। মানে আমরা আটকে আছি আমাদের জালে। জিনিসপত্র না জানার ফলে পিছিয়ে পড়ছি আমরা। যুক্ত থাকার হাজার সুবিধার মূলে হচ্ছে মানুষের মুক্তি। সেটা প্রথমে আসবে অর্থনৈতিক মুক্তি থেকে, জ্ঞান দেবে আমাদের প্রাপ্যতার নিশ্চয়তা। সোশ্যাল মিডিয়ার বিগ ডাটা নিয়ে কাজ করেছিলাম একটা এজেন্সিতে বসে। যুক্ত থাকার ফলে আজ যা দেখছেন, এটা আইসবার্গের ছোট্ট একটা টিপ। আরব বসন্ত, একটা উপসর্গ মাত্র। পালটাচ্ছে পৃথিবী, পাল্টাবো আমরাও। ভালোর দিকে। দরকার ইন্টারনেটের মতো কিছু টুলস।


The two most important days in your life are the day you are born and the day you find out why.

― Mark Twain

র॰

বইগুলো লিখছি কিছুটা দায়বদ্ধতা থেকে। বিটিআরসির সাত বছরের অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে ঘোরার অন্তর্জালা থেকে মুক্তি পেতে এ ব্যবস্থা। নোটবই সেনাবাহিনীতে পোশাকের অঙ্গ হবার ফলে মিস করিনি খুব একটা। জিম রনের অমোঘ ‘নেভার ট্রাস্ট ইয়োর মেমরী’ বাণীটা খুব একটা বিচ্যুতি আনতে পারেনি ‘নোট টেকিং’য়ে। এখন যুগ হচ্ছে ‘গুগল কীপ’ আর ‘এভারনোটে’র। হাতির স্মৃতি বলে কথা – মাটিতে পড়ে না কিছুই। দেশ বিদেশের ফোরাম, যেখানে গিয়েছি বা যাইনি – হাজির করেছি তথ্য। টুকেছি সময় পেলেই। ভরে যাচ্ছিলো নোটবই। ‘এভারনোট’ আর ‘কীপের’ ভয়েস মেমোতে। পয়েন্ট আকারে। প্রোগ্রামিংয়ের মতো পয়েন্টারগুলো লিংক করা ছিলো মাথায়। ভুলে যাবার আগেই বইগুলোর ব্যবস্থা।

ল॰

আরেকটা সমস্যা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে – ওই ছোটবেলা থেকে। কোন জিনিস ধরলে সেটার শেষ না দেখলে ঘুম আসে না আমার। বিশাল বিপদ। আগে ভাবতাম সমস্যাটা আমার একার। ভুল ভাঙ্গলো দুনিয়া দেখতে দেখতে। ইনডাস্ট্রিতে একই অবস্থা। একেকটা রিসার্চ, সফল না হওয়া পর্যন্ত পড়ে আছে মাটি কামড়ে। মনে আছে, হেনরী ফোর্ডের ভি-৮ সিলিন্ডার তৈরির কথা? এই কৌশল ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি, এরোস্পেস, নাসা, ঔষধ গবেষণা সহ প্রচুর স্পেসালাইজড প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে। আজকের এয়ারবাস এ-৩৮০, দোতলা উড়োজাহাজ এতো সহজে আসেনি। উনিশশো অষ্টাশির গবেষনার ফল পাওয়া গেছে এপ্রিল দুহাজার পাঁচে, উড়োজাহাজটাকে উড়িয়ে। এরপরও আরো দুবছরের বেশি হাজার হাজার ‘সেফটি টেস্ট’ আর অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার পর প্রথম বানিজ্যিক ফ্লাইট চালায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স। অন্য কিছু নয়, ওড়াতেই হবে – তাই উড়েছে উর্রুক্কুটা। কেউ জেদ ধরেছিলো, আট দশ ফ্লাইটের তেল দিতে পারবো না। এক ফ্লাইট এর তেল নাও, নইলে অন্য ব্যবসা দেখো। বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনারটাও তৈরি হয়েছে কয়েকটা জেদি মানুষের জন্য। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে উজাড় করে দিয়েছেন তার জ্ঞানকে। বাকিটা আমাদের পালা।

শ॰

আজকের ‘ইন্টারনেট’ (যা পৃথিবীকে পাল্টে দিচ্ছে) এর আবিস্কারের পেছনে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। দেশ চেয়েছে ব্যয়বহুল সার্কিট সুইচিং থেকে বের হতে, ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সী, সংক্ষেপে ‘ডারপা’ বিভিন্ন উনিভার্সিটিতে ঢেলেছে অঢেল পয়সা, দিয়েছে অনেক সময়। প্রজেক্ট ‘ফেইল’ করেছে হাজারো বার, হাল ছাড়েনি তারা। ফলে তৈরী হয়েছিল আরপানেট, বর্তমান ইন্টারনেট এর পূর্বসুরী। আজকের বিদ্যুত্‍ বাল্ব তৈরি করতে থমাস এডিসনকে চেষ্টা করতে হয়েছিল হাজার বারের বেশি। রিপোর্টার জানতে চেয়েছিলেন তার ‘হাজারবারের ব্যর্থতার অনুভুতির কথা’। এডিসনের জবাব, ফেইল করিনি তো হাজার বার। বরং, লাইট বাল্বটা তৈরি করতে লেগেছিলো হাজারটা স্টেপ।

ষ॰

টেলিযোগাযোগ ব্যবসায় ভাসা ভাসা কাজের উপযোগিতা কম। রেগুলেশনেও একই অবস্থা। দরকার স্পেশালাইজেশন – বাজার বুঝতে। ঢুকতে হবে ভেতরে, অনেক ভেতরে। পুরোটাই অর্থনীতিবিদদের কাজ। ভবিষ্যত না দেখতে পারলে এ ব্যবস্যায় টিকে থাকা কঠিন। টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোর জাহাবাজ লোকেরাও মাঝে মধ্যে অত ভেতরে ঢুকতে পারেন না। স্পেশালাইজেশন বলে কথা। সেখানেই আসে টেলিযোগাযোগ কনসাল্টিং কোম্পানিগুলো। ওদের কাজ একটাই, আর এন্ড ডি, সারাবছর ধরে। আবার সেই কনসাল্টিং ফার্ম একই ধরনের কাজ করে বেড়াচ্ছে সব টেলিযোগাযোগ কোম্পানির জন্য। স্পেশালাইজড না হয়ে যাবেই বা কোথায় তারা? আর সেই সল্যুশনের জন্য মিলিয়ন ডলারের নিচে কথা বলেন না কেউই। আর বলবেন নাই বা কেন? এধরনের আর এন্ড ডির জন্য কম কষ্ট করতে হয়না তাদেরকে। প্রচুর রিপোর্ট পড়েছি এই কনসাল্টিং ফার্মগুলোর। রিপোর্টতো নয় যেনো হাতের রেখা পড়ছেন। ভবিষ্যত দেখা যায় রীতিমত। মিলিয়ন ডলারের কনসাল্টিং বলে কথা। টার্গেট দিন এক কোটি কর্মসংস্থানের। তৈরি করে দেবো প্রায়োগিক ফর্মুলা। হতে বাধ্য। জানতে হয় ভবিষ্যত দেখতে। বিগ ডাটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি খানিকটা।

ট॰

তাই বলে সব কনসাল্টিং ফার্ম এক নয়। আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, কনসাল্টিং ফার্মের দোষ না দেখে যিনি কাজ দিয়ে বুঝে নেবার কথা – তার কম্পিটেন্সিতে ঘাটতি থাকলে রিপোর্ট খারাপ হতেই পারে। আমি কিনছি রিপোর্ট, না বুঝে কিনলে কনসাল্টিং ফার্মের দোষ দিয়ে লাভ কি? গরীবদেশগুলোতে প্রচুর কনসালটেন্সি হয় বটে, তবে সে দেশগুলো সেগুলো ঠিক মতো বুঝে নেবার সামর্থ বা জ্ঞান থাকে না বলেই ঝামেলা হয়। ডোনারদের টাকায় কনসাল্টেন্সি হলে সেটার অবস্থা হয় অন্য রকম। রিপোর্ট নিজের মনে করে বুঝে নিতে পারলে সেটার দাম মিলিয়ন ডলারের বেশি। সে ধরনের রিপোর্ট বুঝে নিয়েছিলাম বেশ কয়েকটা। পোস্ট-ডক করা যাবে কয়েকটা।

ঠ॰

কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হলো বিশ্বখ্যাত অনেকগুলো টেলিযোগাযোগ কনসাল্টিং ফার্মের সাথে। এর সাথে যোগ হলো ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) আর কমনওয়েলথ টেলিকম্যুনিকেশন অর্গানাইজেশনের (সিটিও) আরো অনেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট। ধারণা পেলাম তাদের কাজের। পড়তে থাকলাম আরো হাজারো রিপোর্ট। দামী সব রিপোর্ট, তবে তার দাম কোনো কোনো দেশ বা এজেন্সি দিয়ে দিয়েছে আগেই। পরিচয় হলো ওভাম, অ্যাকসেন্চার, কেপিএমজি, পিডাব্লিউসি, নেরা আর এনালাইসিস ম্যাসনের মতো তুখোড় তুখোড় ফার্মের সাথে। আবার নিজের প্রতিষ্ঠানেরই কাজ করতে পরিচয় হলো মার্কিন ফার্ম টেলিকমিউনিকেশনস ম্যানেজমেন্ট গ্রূপ, ইনকর্পোরেশন (টিএমজি)র সাথে। তাদের ধরনটাই বুঝতে সময় লেগেছিলো বেশ। তলই পাচ্ছিলাম না প্রথমে। বিলিয়ন ডলারের কনসাল্টিং কোম্পানি বলে কথা। পরিচয় হলো অনেকের সাথে। বন্ধুত্ব হলো অনেকের সাথে। হাতে ধরে দেখিয়ে দিলেন বাংলাদেশের ‘ফল্ট-লাইন’গুলো।

ড॰

একসময় তল পেলাম এই ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং ফার্মগুলোর কাজের ধারার। পৃথিবী জুড়ে কাজ করার ফলে কোথায় কি সমস্যা সেটা তারা জানে ভালো। আর সেটা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেয়া ওদের একমাত্র কাজ বলে ওটাও সে জানে ‘অসম্ভব’ ভালো। গরীব দেশগুলোতে হাজার কোটি টাকার ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্টেনসি করে টাকা বানালেও সেটার ব্যর্থতার দায় দেয়া যাবে না তাদের ওপর। ওই দেশের – যাদের ‘কন্সাল্টেনসি’টা বুঝে নেবার কথা তারা ‘ছাড়’ দিলে কাজ হবে কিভাবে? উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠতে হলে লাগবে কন্সাল্টেনসি, তবে সেটা ‘পাই’ ‘পাই’ করে বুঝে নেবার মতো থাকতে হবে মানুষ। দু চারটা বৈদেশিক ভ্রমণে ব্যাপারটা উপেক্ষিত হলে জ্ঞান আর প্রজ্ঞাটা হারায় দেশ।

ঢ॰

ব্যাপারটা অনেকটা বিজনেস প্ল্যান কেনার মতো। ও আমাকে বানিয়ে দিলো একটা। না বুঝে দিয়ে দেবো পয়সা? সমস্যা হয় যখন সেটা হয় ‘সরকারী’ মানে জনগণের পয়সা। একারণে উন্নতদেশগুলো ছোট করে নিয়ে আসছে সরকারগুলোকে। যাই হয় সব পার্টনারশীপে। যারাই থাইল্যান্ড গিয়েছেন মুগ্ধ হয়েছেন তারা – বিশাল বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার দেখে। বেশিরভাগ ইনফ্রাস্ট্রাকচারই কিন্তু পিপিপি’র মডেলে করা। সরকারের অতো পয়সা থাকে না কোথাও। পিপিপি হচ্ছে গিয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ। পয়সা যোগান দেবে বেসরকারী কোম্পানি – কাগজ দেবে সরকার, আইনগত ভিত্তি সহ। ‘উইন’ ‘উইন’ ব্যাপার। পয়সা লাগলো না সরকারের। কর্মসংস্থানও হলো। আমাদের পিপিপি নীতিমালা তৈরী হয়নি এখনো।


There is no ‘poor’ country, they are ‘poorly’ managed.

― Slightly modified

ণ॰

উন্নত দেশগুলোতে অনেক বড় বড় কাজে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে না জনগণ। কারণ এই পিপিপি। যেকোনো দেশের উন্নতির ইনডিকেটর বোঝা যায় ওদেশের পাবলিক ট্রানজিট সিস্টেম দেখে। মানে জনগন কতো সহজে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারছেন – নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। ঢাকা শহরে সেটার অবস্থা আফ্রিকার অনেক দেশ থেকেও খারাপ। অথচ ব্যবস্যা বান্ধব পিপিপি নীতিমালা থাকলে প্রাইভেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো প্রস্তাব দিতে পারতো সরকারের কাছে। তৈরী করতো ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড’। ভাগ করে ফেলতো পুরো শহর – চার পাঁচ ভাগে। একেকটা ভাগের রুট নিয়ে দেন-দরবার করতো কনসেশন পিরিয়ডটা নিয়ে। এই রুটটা দাও আমাকে পঞ্চাশ বছরের জন্য। তৈরী করবো স্কাই ট্রেন। ইনফ্লেশন হিসেব ধরে ভাড়ার একটা চার্ট জমা দিতো সরকারকে।

স॰

সফটওয়্যারের মানুষ হিসেবে শূন্য ভার্সন থেকে শুরুতে বিশ্বাসী আমি। শুরু করতে হবে কোথাও। নিউটনের কথায় ফিরে আসবো আবার। ষ্টান্ডিং অন দ্য সোল্ডার অফ জায়ান্টস। আমাদেরও এগুতে হবে পূর্বসূরীর অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে। গাছ রোপণ করার কথা ছিল বিশ বছর আগে। সেটা না হলে কি থাকবো বসে? বরং – লাগাবো আজই। বাংলাদেশের ‘যুক্ত’ হবার এজেন্সিতে চাকরি করার সুবাদে গরীব দেশ আমার ওপর যা ইনভেস্ট করেছে সেটা ফিরিয়ে দেবার জন্য নিয়েছি নগণ্য একটা প্রয়াস। নাম দিয়েছি প্রজেক্ট ‘গিভিং ব্যাক’। ব্রডব্যান্ড ছড়িয়ে দেবার ‘চিটকোড’ হিসেবে ধরুন ব্যাপারটাকে। ব্রডব্যান্ডে সফল দেশগুলোর ধারণা নিয়ে ‘আমাদের আঙ্গিকে’ কোডটাকে ‘ক্র্যাক’ করতে চেষ্টা করেছি মাত্র। আর, পয়সার জন্য ওর সাথে থাকবে ইনফ্রাস্ট্রাক্চার ফান্ড। আর এসপিভিলাগবে এটাও

দরকার আপনার সুচিন্তিত মতামত। ওই মতামতের ওপর ভিত্তি করে কাঠামোগত পরিবর্তন আনবো বইগুলোতে।

প্রি-প্রোডাকশন স্টেজ: কাজ চলছে এখনো

প্রথম বই: ইন্টারনেটের মুল্যঃ যে কারনে এখনো ধরাছোয়ার বাইরে

দ্বিতীয় বই: বাতাস ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: দক্ষ স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা পাল্টে দিতে পারে বাংলাদেশকে

তৃতীয় বই: রেগুলেট অর নট টু রেগুলেট? চতুর্থ প্রজন্মের রেগুলেটর ও বাংলাদেশ

* লিংকগুলো যুক্ত করা হয়েছে কয়েকটা ব্লগপোস্টের সাথে। পুরো বইগুলো আসবে আস্তে আস্তে – প্রিন্টে।


০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
সাশান্দ্রা, আইভরি কোস্ট

আমি (অবশ্যই) উপদেশ গ্রহণ করার জন্য এ কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি, কে আছে (তোমাদের মাঝে এর থেকে) শিক্ষা গ্রহণ করার?

— আল কোরআন ৫৪:১৭

৭১.

কোরআন থেকে সরে গেছি আমরা। আর সেকারণে আমাদের এই দূরবস্থা। উসমান (রা:) সময়ে আমরা ছিলাম ওপরে। তখন কোরআন ছিলো আমাদের কাছে। আমাদের মধ্যে। ইতিহাস পড়লে বোঝা যায় কোথায় ছিলাম আমরা। আগেও আলাপ করেছি ব্যাপারটা নিয়ে। মনে আছে তো, আপনাদের? যখন পুরো ইউরোপ ছিলো অন্ধকারে, তখন মুসলমানরা ছিলো সব কিছুর শীর্ষে। জ্যোতির্বিদ্যা, অ্যালজেবরা, মেডিসিন – বাকি থাকে কি? আজকের সংখ্যা এসেছে মুসলমানদের হাত হয়ে। যখন কেউ ছুঁতে পারতো না মুসলমানদের, জ্ঞানে – বিজ্ঞানে – সেই মুসলমানদের আজ বেহাল অবস্থা কেন? আজ বড় বড় মুসলিম স্কলাররা আসছেন উন্নত বিশ্ব থেকে। কেন? কোরআন নিয়ে রিসার্চ করছেন তারা। সেটার জন্য ধরতে হবে কোরআনকে। পড়তে হবে নিজের ভাষায়। বুঝতে হবে কি বলতে চেয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। আলমারীর ওপর তুলে রাখলে হবে কি?

কোরআনের একজন অনুবাদকের ব্যাখা

কোরআনের একজন অনুবাদকের ব্যাখা

৭২.

কোরআন অজু ছাড়া পড়া যাবে কিনা সে নিয়ে মুসলিম স্কলারদের মধ্যে দুধরনের চিন্তা ভাবনা রয়েছে। তবে, বেশীরভাগ স্কলাররা ওজুকে উত্সাহিত করেছেন। আর আমি বলছি না কোরআনের ব্যপারে। বরং, আলাপ হচ্ছে তার অনুবাদ নিয়ে। কোরআনের আরবী এতোটাই সমৃদ্ধ যে সত্যিকার অনুবাদ সম্ভব নয়। ফলে, অনুবাদ কিন্তু ‘কোরআন’ নয়। কোরআনের ‘অনুবাদ’কে ধরার ব্যপারে ওই সমস্যাটা থাকছে না। পড়ুন এখানে, এখানে আর এখানে। মূল কোরআনকে নিয়েই। আল্লাহ অবশ্যই ভালো জানেন। আর এখন, প্রচুর অ্যাপ এসেছে যেখানে পুরো কোরআন এবং তার অনুবাদ রয়েছে। মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপে পড়ার ব্যপারে কোন সমস্যা নেই। আমার কথা হচ্ছে, হাজারটা বই পড়ছি, কোরআনটা পড়ছি না কেন নিজের ভাষায়? সৃষ্টিকর্তার সাথে আলাপ শুরু হবে তখন থেকে। সময় দিন – অল্প অল্প করে। মরিস বুকাইলি’র মতো ৫০ বত্সর বয়সে আরবী শিখতে বলছি না এ মুহুর্তে। মুসলিম না হয়েও কোরআনকে শুধুমাত্র বোঝার জন্য উনি শিখেছিলেন আরবী।

৭৩.

কি করা যায় এখন? যে ভাষা আপনাকে টানে, সেটাতেই পাবেন কোরআনের অনুবাদ। কয়েকটা অনুবাদ পড়লে আরো ভালো। এখন পকেটবূক হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে এই অনুবাদগুলো। ফলে, পকেটে নিয়ে কোথাও যেতে যেতেও পড়তে পারেন এই বিশ্বসেরা বইটা। মোবাইল ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে পুরো অনুবাদ। ই-বূক রিডার? নেই কোথায়? ওজুর সমস্যা নেই। টাইমলাইন ঠিক করে নিন মনে মনে। তিন মাস থেকে ছয় মাস। তবে, শুরু করতে পারেন সূরা ‘আল-বাক্বারা’ দিয়ে। এক সপ্তাহ, পারবেন না? পকেট বই অথবা মোবাইল ফোনে? পড়লেই বুঝবেন কি ‘মিস’ করেছেন এতোগুলো বছর। সত্যি!

[শেষ]

আল্লাহর জমিনে (কখনোই) দম্ভভরে চলো না, কেননা (যতোই অহংকার করো না কেন), তুমি কখনো এ জমিন বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর উচ্চতায় কখনো পর্বত সমান হতে পারবে না।

— আল কোরআন ১৭:৩৭

৬৮.

মনে আছে, প্রথমদিকে মদ্যপান হারাম ছিলো না। তবে আল্লাহ বলেছিলেন, যাদের ইমান আছে, তারা মদ্যপ অবস্থায় নামাজ না পড়ে। ততক্ষণ না – যতক্ষণ সে না বোঝে সে কি বলছে নামাজে। মদের সমস্যা একটাই। মদ্যপ অবস্থায় মানুষ জানে না কি বলছে সে। সুখবর, যে মদের ওই সমস্যাটা নেই এখন। মদ্যপানকে বর্জন করার কথা এসেছে পরের দিকে। তবে, রয়ে গেছে বাকি সমস্যাটা। আমরা নামাজে কি বলছি জানি না সেটাই। তাহলে না বুঝেই পড়ছি এতোকাল? আর – অর্থ জেনে পড়লে নামাজে যে ‘কনসেন্ট্রেশন’ আসতো, সৃষ্টিকর্তার সাথে মানসিক যোগসূত্রটা পেতাম আরো ভালো করে। নামাজের বিভিন্ন অংশে আমরা কি বলছি সেটা ঠিকমতো জানলে মনটা উড়ে বেড়াতো না এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে।

৬৯.

মুসলিম কনভার্টদের নিয়ে হাজার গল্প আছে ইন্টারনেটে। ইউটিউবে গিয়ে ‘জার্নি টু ইসলাম’ লিখে সার্চ করলেই বুঝবেন আমি কি বলেছি। ধারনা করুন, একজনকে কতো বড় যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয় যখন সে তার বাবা দাদার ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্মে আসে। বিশাল যুদ্ধ, যতটা মানসিক তার থেকে বেশি যুদ্ধ করতে হয় সমাজ নিয়ে। তার ওপর চলছে ‘ইসলামোফোবিয়া’, পৃথিবী জুড়ে। সবার একটাই কথা, কখনো মনে করেনি সে মুসলমান হবে একদিন। তবে, কোরআন টেনে নিয়েছে তাদেরকে। এই বইটা এতোটাই শক্তিশালী যে অন্য ধর্মের মানুষদের ‘মুগ্ধ’ করে নিয়ে আসছে ইসলামে। উন্নত বিশ্বে যারা আসছেন ইসলামে, তাদের শতভাগ এসেছেন এই কোরআনকে নিজের ভাষায় পড়ে। পুরোপুরি বুঝে। আমরা বুঝেছি কতজন? এতো শক্তিশালী বই টানছে না আমাদের। সমস্যাটা কোথায়?

৭০.

আমরা, মুসলমানের ঘরে জন্মানোর পরও বুঝে পড়িনি কি বলেছেন সৃষ্টিকর্তা। কতো বড় একটা সুবিধার মধ্যে থেকেও আমরা বুঝতে চাইনি কিছুই। যারা মুসলিম কনভার্ট, তাদের জ্ঞানের গভীরতা দেখলে লজ্জা পাই মনে মনে। যেই মানুষটা মাসখানেক আগে মুসলিম হয়েছে তার আল্লাহ’র সম্পর্কে জ্ঞান অনেক অনেক – ‘অনেক’ বেশি। কারণ, ইসলাম ধর্মে আসার আগে নিজের সাথে ‘বিশাল’ যুদ্ধ করে আসে সে। নিজেকে পুরো ‘কনভিন্স’ করে আসতে হয় তাকে। এই কোরআনকে সে ব্যবহার করে আল্লাহকে চেনার জন্য। আমরা এই চল্লিশ বছরে যা শিখেছি সে হয়তোবা ওই পুরো জিনিসটা শিখেছে কয়েক মাসে। অনেককে কোরআনকে মানার ওই ‘টেনাসিটি’ দেখে অবাক হয়েছি আমি। সৃষ্টিকর্তা যাকে পথ দেখান – তার পরিবর্তিত রূপ ‘ইন্সপায়ার’ করে আমাদের। ও পারলে পারবো না কেন আমরা?

[ক্রমশ:]

(একটুখানি) সুন্দর কথা বলা আর (উদারতা দেখিয়ে) ক্ষমা করে দেয়া সেই দানের চাইতে অনেক ভালো, যে দানের পরিণামে কষ্টই আসে।

— আল কোরআন ২:২৬২

৬৫.

প্রচুর ‘সেলফ হেল্প’ ক্যাটেগরীর বই পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কয়েকটা জিনিস। মূল কতগুলো ‘গাইডেন্স’কে নিয়ে তৈরি হয়েছে হাজারো ‘ভ্যারিয়েন্ট’। আর ওই ‘ভ্যারিয়েশন’গুলো নিয়েই লেখা হচ্ছে হাজারো ‘বেস্টসেলার’। আমি অবাক হয়ে দেখলাম মানুষকে চালানোর জন্য সুন্দর সুন্দর নীতি যা পড়েছি এতোদিন – বিভিন্ন বইয়ে, তার সবকিছুই রয়েছে কোরআনে। ছয়মাস ধরে পড়েছি অনুবাদ বইগুলো। আফ্রিকাতে পড়ে থাকার ফলে ‘পন্ডারিং’ করতে পেরেছি অনেক অনেক বেশি। ধন্যবাদ সৃষ্টিকর্তাকে। এধরণের সুযোগ করে দেবার জন্য। প্রচুর বই পড়েছি এর মধ্যে। জন্ম থেকে। হাজার দুইয়ের বেশি হবে হয়তোবা। তবে, আমার মতে পৃথিবীর সেরা বইটা বুঝে পড়া হয়নি কখনো। এই আট মাস আগ পর্যন্ত।

৬৬.

বই পড়লে ভালো লাগে, তবে কোরআন এতোটা ‘কমফোর্টিং’ সেটা জানা ছিলো না আগে। কোরআন শুধুমাত্র পজিটিভ একটা বই নয়, এটাতে ‘চুড়ান্ত ক্ষমাশীলতা’, ‘ভালো কাজের পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি’ আর বিপদের সময় সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হিসেবে কাজ করে মানুষের ওপর। নিরাশাবাদীদের কাছে শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করছে বইটা। কোরআনের আরেক নাম ফুরকান। মানে, পৃথিবীর ভালো আর খারাপের পার্থক্য বুঝতে জানতে হবে কোরআনকে। আর কোরআনটাই যদি না পড়া থাকে? তাহলে, কোরআনকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা যাবে কি? কোরআন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ‘পঠিত’ বই হলেও এর আশি শতাংশের বেশি মানুষ না বুঝেই পড়ে। ফলে, সৃষ্টিকর্তার আসল ‘মেসেজ’ না পাবার ফলে আজ মুসলমানদের বেহাল অবস্থা। কোরআন না পড়েই দাবি করছি আমরা মুসলমান।

৬৭.

আমরা যখন কোরআনের অর্থ পড়তে যাই, প্রতিবারই নতুন নতুন জিনিস এসে দাড়ায় মনের সামনে। আপনি আর আমি যখন পড়বো, আমাদের দুজনের বোঝার ব্যাপারটা আলাদা হবে। এটা এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। যতবারই পড়ি – নতুন ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’, নতুন অর্থ মুগ্ধ করে আমাদের। কোরআন এমন ভাবে লেখা, মনে হবে সৃষ্টিকর্তা নিজেই কথা বলছেন আপনার আমার সাথে। একদম ‘পার্সোনাল’ মোডে। কোরআন পড়লেই বুঝতে পারবেন। পুরোটাই ‘কনভার্সেশনাল’ মোডে তৈরি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। অনেক ‘গাইডেন্স’ রয়েছে মানুষের জন্য। অনেক ঘটনা বলা হয়েছে – চিন্তা মানে ‘পন্ডার আপন’ করে বোঝার জন্য। সীমারেখা টেনে দেয়া আছে অনেক অংশে। সতর্কীকরণ এসেছে বারে বারে, মানুষের স্বভাবের কথা চিন্তা করেই। কোরআন পড়ছেন কিন্তু সেটা নিজের জীবনে ‘রিফলেক্টেড’ হয়েছে কিনা সেটা জানবেন কিভাবে? কোরআনকে বুঝতে হবে নিজের মতো করে। বাকিটা করে দেবেন সৃষ্টিকর্তা। প্রতিটা ঘটনা গল্প কিন্তু আমাদের জন্য ‘থেরাপি’।

[ক্রমশ:]

Those who spend in prosperity and adversity, and those who suppress anger and pardon men; and Allah loves those who do good.

— Al Quran 3:135

৬১.

ঘুরেছি পৃথিবীর অনেক দেশেই। যারা ধর্ম পালন করছেন তারা সেটাকে এমন সহজ করে নিয়েছেন যাতে মনে না হয় এটা আলাদা একটা জিনিস। সকাল আর রাতে দাঁত ব্রাশ করার মতো ‘ম্যাণ্ডেটরি’ করে নিয়েছেন ব্যাপারগুলোকে। আজান পড়েছে, ওখানেই অজু করে দাড়িয়ে যাচ্ছেন নামাজে। অজু করার ব্যবস্থা না থাকলে সেটার জন্য সৃষ্টিকর্তা যা ছাড় দিয়েছেন সেটা করেই দাড়িয়ে যাচ্ছেন সবার সাথে। প্রথম প্রথম মনে হতো আমি ঠিকমতো পরিষ্কার আছি কিনা, সেটার জন্য মন বলতো – বাসায় বা পরের ক্যাম্পে যেয়ে ‘কাযা’ পড়ে নেব। অথচ, সৃষ্টিকর্তা সবকিছুর জন্য অসাধারণ ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ তৈরি করে রেখেছেন। সৃষ্টিকর্তা তো জানেন আমরা কি অবস্থায় আছি। মনকে তো আর ফাঁকি দিতে পারি না।

৬২.

আফ্রিকার এই ‘পিস কীপিং মিশনে’ বিভিন্ন ন্যাশন্যালিটি’র সাথে কাজ করতে হয় অহরহ। এদের মধ্যে মুসলিম রয়েছেন অনেকে। অনেক দেশের। আজানের শব্দ শোনা গেলেই হলো, কোথায় টুপি, কোথায় জায়নামাজ, কোথায় ওজুর ব্যবস্থা – ওগুলো না খুঁজে ‘মিনিম্যালিস্ট রিকোয়ারমেন্ট’এ নামাজ পড়ে নেবে ওরা। জুতো খোলার সময় নেই, বরং জুতোর ওপর দিয়ে পানি ঢেলে অজু করে ফেললেন এক কলিগ। বরং, আমারই মনে হতো, পানি ভালো আছে কি না, কাপড়ের কি অবস্থা, পরিষ্কার আছি কিনা – এগুলোই মাথায় ঘুরতো বেশি। মন খুজতো হাজারো অজুহাত। আপনি কোন অবস্থায় আছেন সেটা তো সবচেয়ে ভালো জানেন সৃষ্টিকর্তা। আমি সৃষ্টিকর্তাকে অখুশি না করলেই তো হলো। তিনি জানেন আপনার মনের ভেতর কি চলছে। উনি তো আমাকে দেখছেন চব্বিশ ঘণ্টা। আর সেকারণে ‘সীমা’ ছাড়িয়ে যাবো না আমরা।

৬৩.

একটা জিনিস বুঝে গেলাম। আমরা নামাজ পড়ি কাজের ফাঁকে ফাঁকে, আর তারা নামাজের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করেন। মানে, নামাজ হচ্ছে ‘কনস্ট্যান্ট’, সময় হলেই পড়তে হবে। আর পৃথিবীর কাজ হচ্ছে ওর ফাঁকে ফাঁকে। কাজকে প্রায়োরিটি দিতে গিয়ে নামাজকে ফেলেছি পেছনে। সেকারণে, আমরা জমিয়ে রাখি নামাজ – বাসায় ফেরার জন্য। অজুহাত খুঁজে বের করি, অজু নেই বলে। কাপড় ময়লা। কিছু হলেই বলি ‘কাযা’ পড়া যাবে, কিন্তু আসলে কি তাই? আসছি পরে।

৬৪.

একটা প্রশ্ন করি? আপনি জানেন যে এই রাস্তায় ক্যামেরা আছে। কি করেন ওখানে? নিয়ম মেনে চলি আমরা। ওই রাস্তায়। যেখানে নেই, সেখানে নিয়ম মানেন না অনেকে। আমার ফোন আর ল্যাপটপে চালু আছে একটা অ্যাপ্লিকেশন। ওটার কাজ হচ্ছে আমার পুরো ‘অনলাইন লাইফ’ মনিটর করা। আমি কি কি কাজে সময় নষ্ট করছি সেটার একটা ‘ভয়ংকর’ রিপোর্ট তৈরি করে জানায় সময়ে সময়ে। এর আউটকাম? এখন, আমি কম সময় কাটাই সোস্যাল মিডিয়াতে। ফেসবুক, লিঙ্কডইনে। গানের অ্যাপ্লিকেশনে। এর মানে হচ্ছে, মনিটরিংয়ে থাকলে সবাই সোজা। আমি জানি, এই রিপোর্ট শুধু আমার জন্য। তবুও। যখন আমি জানবো, সৃষ্টিকর্তা দেখছেন আমাদের চব্বিশ ঘণ্টা – আমাদের ভুল করার প্রবণতা আসবে কমে। আর, মানুষ তো ভুল করবেই। সেটা জানেন সৃষ্টিকর্তা, নিজেই। আর সেকারণে সৃষ্টিকর্তা সতর্ক করেছেন হাজারবার। মানুষ অকৃতজ্ঞ। সেটাও জানেন তিনি। সেজন্য বার বার ক্ষমার কথাও বলেছেন উনি।

[ক্রমশ:]

Kind words and forgiveness are better than charity followed by injury.

— The Quran 02:263

৫৬.

আমাদের সামরিক বাহিনীতে একটা বই লাগে প্রায় অনেক কোর্সে। বিভিন্ন অর্গানাইজেশনের সাথে কিভাবে যোগাযোগ করবো সেটা নিয়ে লেখা বইটা। যেকোন লেখালিখিতে জিনিসটা ‘কনসাল্ট’ করলে উন্নত হয় আউটপুট। সত্যি! সহজ সরল ভাবে লেখালিখির জন্য বইটা আসলেই চমত্কার। কিছুটা বিজনেস কম্যুনিকেশনের মতো। তবে সেটার ব্যাপ্তি আরো বড়। আমার লেখালিখির অনেক স্কিলসেট এসেছে ওই বই থেকে। একেক কোর্সে গেলে একেক দিককে গুরুত্ব দেয়া হয় বলে বাদ পড়লো না কোন চ্যাপ্টার। শেষ মেষ দেখা গেলো – দাগিয়ে ফেলেছি পুরো বইটাই। লাল, নীল, ফ্লুরোসেন্ট, সবুজ, হলুদ – বাকি থাকে আর কোন রঙয়ের হাই-লাইটার?

৫৭.

আরবী পড়াও প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম এর মধ্যে। আর, আগে আরবী পড়তে জানলেও অর্থ জানতাম না – অন্য অনেকের মতো। ফলে বইটা ছিলো মূল কোরআনের অনুবাদ। ছয়মাস লাগিয়েছি শুধু ওই অনুবাদটা পড়ার জন্য। প্রতিদিন একটু একটু করে। আবারো টেক্সট মার্কার শেষ করে ফেললাম কয়েকটা। বিভিন্ন রঙয়ের। শেষমেষ বাদ পড়লো খুব কম অংশ। প্রায় অনেক লাইনই হাই-লাইটেড। এরকম হবার কথা ছিলো না প্রথমে। যতই ভেতরে ঢুকছিলাম ততোই বাড়ছিলো মনের সম্পৃক্ততা। দ্য কম্যুনিকেশন সীমড ভেরি পার্সোনাল। প্রভাব পড়ছিল মনের ওপর। ওই হাজারটা ‘সেল্ফ হেল্প’ বইগুলো থেকে অনেকগুন ‘ইল্যুমিনেশন’ টের পাচ্ছিলাম মনের ভেতর। ‘ট্রানকুইল’, ‘পিসফুল’, মনে শান্তি, যাই বলেন সেটা আসতে শুরু করলো তিন মাসের মধ্যে। সৃষ্টিকর্তার সাথে একটা ইন্টার-পার্সোনাল কম্যুনিকেশনের ধারনা পাওয়া যায় কোরআন পড়লে। সরাসরি কথা বলছেন আমাদের সাথে।

৫৮.

সোর্সিং করলাম আরো কয়েকটা অনুবাদ। টের পেলাম কয়েকটা জিনিস। কোরআনের বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে বহু কাদা ছোড়াছুড়ি দেখেছি, তার প্রায় সব কয়টাই ‘আউট অফ কনটেক্সট’। আগে পেছনের জিনিস বাদ দিয়ে হটাত্‍ করে একটা ‘উদ্ধৃতি’ নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে অনেকে। কোরআন সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার ফলে এ ব্যাপারগুলো হয় বেশি। আগে, আমার বন্ধুরা যেটার রেফারেন্স দিতেন, বিশেষ করে কোরআন থেকে, বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিতাম। কারণ, আমি তো নিজেই তো পড়িনি। পড়িনি বললে ভুল হবে, বুঝে তো পড়িনি। আর যারা রেফারেন্স দিচ্ছেন তাদের অনেকেই শুনেছেন অন্য কারো কাছ থেকে। সবাই ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে কথা বলছেন। আর সেটাই আমাদের ডোবার বড় কারণ। ইসলামের নামে হাজার অনৈতিক কাজ ম্লান করে দিচ্ছে আমাদের ইমেজ।

৫৯.

কোরআন ঠিকমতো মানলে আজ পুরো পৃথিবী তাকিয়ে থাকতো আমাদের দিকে। মনে মনে ঈর্ষা করতো – ‘আহা হতে পারতাম ওদের মতো!’ ধৈর্য্য, সহনশীলতা হচ্ছে ইসলামের বড় একটা অংশ। ঢাকার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামলে দেখা যায় উল্টো চিত্র। ‘সবর’ মানছি না আমরা নিজেই। কোরআনের ভেতর কি আছে সেটা না জানার ফলে আমরাও সরে গেছি অনেক দূরে। তবে, এখন আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে ব্যাপারগুলো। যতো বেশি ঢুকছি, ততোই অবাক হচ্ছি। ‘ওপেননেস’, মুক্তমনা, সহনশীলতা – যাই বলেন তার সবকিছুই এসেছে এই কোরআন থেকে। স্পেনের কর্ডোবাতে গেলে অবাক হবেন আপনি। ৭১১ সাল থেকে ১৫০০ পর্যন্ত পৃথিবীর সেরা ইউনিভার্সিটি আর মেডিক্যাল স্কূলগুলো চলছিলো মুসলিম শাসনের আওতায়। ধর্মীয় সহনশীলতা বলতে যা বোঝায় সেটা এসেছে ওই ওখান থেকে। ইউরোপের মডার্ন সিভিলাইজেশনের অনেককিছুর গোড়াপত্তন ওখানেই। পরে মুসলমানদের ভেতরে সমস্যা হবার কারণেই হারিয়ে যায় ওই স্বর্ণযুগ।

৬০.

ম্যানুয়াল পড়েছি হাজারো। প্রতিটা যন্ত্রের জন্য ইন্সট্রাক্শন ম্যানুয়াল থাকলেও যতো জটিল যন্ত্র, ততো ম্যানুয়ালের প্রয়োজন বেশি। মানুষকে যদি যন্ত্রের সাথে তুলনা করি, মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে ‘কমপ্লেক্স’ যন্ত্র, তাহলে তাকে চালাতে ম্যানুয়াল লাগবে না? আর – মানুষকে তৈরি করেছেন যিনি, তার সৃষ্টিকে উনি ছাড়া আর ভালো চিনবে কে বলুনতো? ভাবতেই অবাক লাগছে, সেরা ম্যানুয়ালটাই পড়া হয়নি আগে। মানুষ কিভাবে চললে তার ভালো হবে তার সবকিছুই লেখা আছে এই ‘অবিকৃত’ ম্যানুয়ালটাতে। আমরা কোরআনকে সন্মান দিতে গিয়ে সেটাকে উঠিয়ে রেখেছি সবচেয়ে ওপরের তাকে। অথবা, আলমারীর ওপরে। আমাদের স্পর্শের বাইরে। বেঁধে রেখেছি সবচেয়ে দামী কাপড়ে। কাপড়ের কাভারটা খুলে আবার ঢুকিয়ে রাখতে যে সময় নষ্ট হয়, সেখানে পড়ার জন্য মানসিকতা তৈরি হলেও পিছিয়ে যায় অনেকে। পড়তে থাকে ধুলা। অথচ, সেটা হওয়া উচিত ছিলো সবচেয়ে কাছের জিনিস। প্রতিদিন পড়ার মতো একটা বই। মুসলিমদের কাছে এটা একটা ন্যাভিগেশন টূল বটে।

[ক্রমশ:]

We are lost, but we’re making good time.

― Star Trek V

৩৭৭.

বিজনেসের দিক থেকে সবসময়ই কম স্পেকট্রাম পাচ্ছে অপারেটররা। আমাদের দেশের কথা একটু আলাদা। এতো বেশি মানুষ আমাদের দেশে, বিজনেস কেসও চমত্কার, দিয়ে কুল পাচ্ছে না অপারেটররা। কম স্পেকট্রাম, এতো মানুষ! কি করবে তারা? আপনি কি করতেন? ধরুন, আপনি অপারেটর, আছে ‘ক’ পরিমান স্পেকট্রাম। নেটওয়ার্ক তৈরি আছে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জন্য। ওমা, নেটওয়ার্ক তৈরি করতে বুঝি পয়সা লাগে না? কি করবেন? এমন ভাবে দাম বাড়াবেন যাতে অর্ধেক মানুষ ‘অ্যাফোর্ড’ করতে পারে। এতে নেটওয়ার্কে কমবে ‘কনজেশন’। লাগছে না নতুন ইনভেস্টমেন্ট ওই মূহুর্তে। পয়সাঅলা ব্যবহারকারীরা খুশি। কম মানুষ হওয়াতে স্পীড পাচ্ছে ভালো। পৃথিবীব্যাপী অপারেটররা দাম বাড়িয়েই চাপ কমায় নেটওয়ার্কের ওপর। প্রথম দিকে। ব্যালান্স করতে হবে না নেটওয়ার্ক? বুদ্ধি ভালো, না?

৩৭৮.

তবে একটা পরিমানের স্পেকট্রাম পেলে কষ্টটা কমে অপারেটরদের। কাভারেজ থেকে ক্যাপসিটি বাড়াতে সুবিধা তাদের। বাংলাদেশে সমস্যা যতটা কাভারেজে তার থেকে তাদের মাথার ঘাম ছুটে যায় ক্যাপসিটি বাড়াতে গিয়ে। আজ গ্রাহক ৫ গিগাবাইটের প্যাকেজ নিয়ে খুশি হলেও কালকে কি হবে সেটা বলা মুশকিল। তবে এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার – ভলিউম বাড়ছে দিনে দিনে। মনে আছে এটিএণ্ডটি’র কথা? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এটিএণ্ডটি’র কথা বলছি আমি। ২২৫টা মতো দেশে আছে – ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস কাভারেজ। তার মধ্যে ২১০টাতে আছে ওয়ারলেস ডাটা। বিশাল কোম্পানী, তাই না? দশ লক্ষ মাইলের বেশি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক। ওই দেশে। তার নিজের। আগের গল্প বাদ, ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত শুধুমাত্র ওয়ারলেস আর ওয়ারলাইন নেটওয়ার্কে ইনভেস্ট করেছে মাত্র ১২০ বিলিয়ন ডলার। শুধু গত বছরেই ইনভেস্ট করেছে ২১.৪ বিলিয়ন।

৩৭৯.

হটাত্‍ ‘এটিএণ্ডটি’কে নিয়ে লাগলাম কেন? আইফোন নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছিলো এই অপারেটর। আনলিমিটেড ট্রাফিকের কনট্রাক্ট দিয়ে ছেড়েছিলো আইফোন, এই ‘এটিএণ্ডটি’। বিনি পয়সার ফোন, একটা সময়ের জন্য থাকতে হবে নেটওয়ার্কে। পাগলের মতো নিয়ে নিলো মানুষজন। জুন ২০০৭ থেকে শুরু হয়েছিল এই দুই কোম্পানীর এক্সক্লুসিভ ডীল। ‘এটিএণ্ডটি’ আর অ্যাপল বুঝতেই পারেনি শত শত কোর্ট কেসে পড়বে এই নেটওয়ার্ক সার্ভিস দিতে এসে। ভয়েস নেটওয়ার্ক ঠিক থাকলেও ডাটা নেটওয়ার্কের ‘আউটেজে’ পাগল হয়ে গিয়েছিলো এই দুই কোম্পানী। নেটওয়ার্ক বসে যাচ্ছিলো কিছুদিন পর পর। বসতে হলো নতুন ‘আর এণ্ড ডি’তে।

৩৮০.

নতুন বিটিএস এল আরো ‘স্পেকট্রাল এফিসিয়েণ্ট’ হয়ে। পাল্টে ফেললো ফোনের ফার্মওয়ার। ওই একই পরিমাণ স্পেকট্রাম নিয়ে নতুন গ্রাহকদের কিভাবে নেটওয়ার্কে যুক্ত করবে – সেটাই গবেষণা। সরে এলো আনলিমিটেড ডাটা প্ল্যান থেকে। চাপ কমে এলো নেটওয়ার্কের ওপর। নতুন নতুন স্পেকট্রাম ব্লকের জন্য পাগল হয়ে গেলো সব অপারেটর। ‘আর এণ্ড ডি’ থেকে নতুন নতুন ‘অ্যাডভান্সড রেডিও ইন্টারফেস’ নিয়ে এসেও কুলিয়ে পারছে না তারা। সত্যি তাই! তাদের ফোরকাস্ট বলছে ডাটার চাহিদা বেড়েছে এতোটাই যে নতুন নতুন প্রযুক্তিও পাল্লা দিতে পারছে না গ্রাহকের চাহিদার সাথে। তাহলে কি দরকার এখন? ঠিক বলেছেন। স্পেকট্রাম। ব্রডব্যান্ডের অন্যতম কাঁচামাল।

[ক্রমশ:]

It is said that no one truly knows a Nation until one has been inside its jails. A Nation should not be judged by how it treats its highest citizens, but its lowest ones.

― Nelson Mandela

৫১.

‘স্টিলনেস’ দিলো অনেক কিছু। রিফ্লেকশন। নিজের ‘রিফ্লেক্ট’ করার সময়। নিজেকে চিনতে চেয়েছিলাম। ইঁদুর দৌড়ে দেখেছি পৃথিবীটাকে। এসে পড়লাম আফ্রিকাতে। আইভরি কোস্টে এসে একটা বিপদে পড়েছিলাম আমি। ইট ওয়াজ কাইন্ড অফ নাইটমেয়ার! সত্যি! যেই মানুষটা কথা বলে আনতো ‘কমফোর্ট জোন’য়ে – অন্যদেরকে; সেই খুঁজছিল শান্তি সবকিছুর মধ্যে। হাজার বই পড়েছি ‘সেল্ফ হেল্প’ আর ‘স্পিরিচুয়ালিটি’র ওপর। ‘পার্সোনাল ট্রান্সফর্মেশন’ আর ‘মোটিভেশনাল’ বইগুলো বাদ পড়ে কিভাবে? না, বাদ পড়েনি। যোগাযোগের মানুষ হয়ে ‘ইন্টার-পার্সোনাল কম্যুনিকেশন আর সোস্যাল স্কিল’ শিখতে হয়েছে কাজের দরকারে। সব জ্ঞান কিভাবে যেন ‘ফেইল’ করছিলো আমার সেই বিপদে। ঘটনাটা ঘটেছিলো প্রায় আট মাস আগে। মাস খানেক পর, ফিরে এলাম একটা বইয়ে। বুঝে পড়িনি কখনো।

৫২.

আত্মসমালোচলা করি। আমার বয়স চুয়াল্লিশ। বাবা মা ছোটবেলায় শিখিয়েছিলেন ওই বইটা পড়তে। ক্যাডেট কলেজে ঢোকার পর থেকে ধর্মীয় কাজের ফ্রিকোয়েন্সিটাও আসে কমে। মাঝে মাঝে ধরেও ছেড়ে দিতাম ওই বয়সটার কারণে। আফ্রিকাতে আইভরি কোস্ট একটা ‘ফ্র্যান্কোফোন’ দেশ। মানে, সবাই কথা বলে ফ্রেঞ্চে। আমার পিস কীপিং অপারেশনের আগের দেশটাও ছিলো ফ্রেঞ্চ কলোনী। তাই শিখেছিলাম এক আধটু, কাজ চালানোর জন্য। এবার শেখার পালা। আবার। ঝালাই করতে হবে না? ভর্তি হলাম নতুন ক্লাসে। ফ্রেঞ্চ। মন টিকলো না মাসখানিক পর। সহকর্মী বলেছিলেন একটা কথা। শুনিনি আগে। এখন মনে হচ্ছে ঠিক বলেছিলো সে। কি বলেছিলো সে? আপনি যতো গতিতে ওই ক্লাসে যাচ্ছেন, তার থেকে দ্বিগুণ গতিতে ফিরবেন মাসখানেক পরে। পুরোনো ফ্রেঞ্চ নিয়ে বিরক্ত হয়ে গেলাম একসময়। সময় হচ্ছে নতুন ভাষা শেখার। ‘আরবী’ হলে কেমন হয়? প্রশ্ন করলাম নিজেকে। কেন আরবী?

৫৩.

মানুষকে যদি কোন কারণে জেলে যেতে হয়, বিশেষ করে যাদেরকে একেবারে আলাদা করে রাখা হয়, তারা এক ধরনের ‘ট্রান্সফর্মেশন’এর ভেতর দিয়ে যায়। নিজের মুখোমুখি দাড়াতে বাধ্য হয় সে। তখন তাদেরকে অনেক ধরনের ভেতরের ‘কনফ্লিক্টিং’ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়। মৃত্যুর কাছাকাছি অথবা লম্বা সময়ের জন্য শুধুমাত্র নিজেকে কাছে পেলে ‘অর্থপূর্ণ জীবন’ হাতড়ে বেড়ায় মানুষ। সাধারণত: কখনোই ওই প্রশ্নগুলো আসে না মনে। মনে আসবেই বা কিভাবে? পৃথিবীর বিশাল ‘ইনফ্লুয়েন্স’ আমাদের আটকে রাখে নিজেকে জানতে। অনেক সময় দেখা যায়, উন্নত বিশ্বে যারা জেলে গিয়েছেন – তাদের অনেকেই প্রশ্নের খোঁজে ইসলাম ধর্মে চলে আসেন। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে। নিজের বিবেকের সামনাসামনি দাড়িয়ে যান তারা। বিবেকের কাছে মিথ্যা ব্যাপারগুলো দাড়াতে পারেনা বেশি দিন। পৃথিবীর বিলিয়ন মানুষের ‘মনের শান্তি’ দিচ্ছে বইটা।

৫৪.

বাইরের জীবনে হাজারো কাজের চাপে নিজেকে যেই প্রশ্নগুলো কখনোই করেননি, সেই প্রশ্নগুলো এসে দাড়ায় সামনে। তারা মুক্তি, ঠিক ধরেছেন – ওই জেলেই ‘মুক্তি’ খুঁজে পান সৃষ্টিকর্তার কাছে সমর্পণ করে। জেল হচ্ছে গিয়ে একটা ‘এক্সটেন্ডেড রিট্রিট’ মানে পেছনে ফিরে তাকানোর মতো একটা ব্যাপার। নিজেকে আয়নায় দেখা মানে ‘সেলফ রিফ্লেক্ট’ আর নিজের সাথে কথা বলার একটা চমত্কার পরিবেশ তৈরি হয় জেলের মতো পরিবেশগুলোতে। আউট অফ ডার্কনেস, কামস লাইট। ওই আলোর কাছে পরিষ্কার হয় অনেক কিছুই – নিজের কাছে। আর জেলখানা হচ্ছে ‘দুনিয়া’ মানে পৃথিবীর একটা ছোট্ট সংস্করণ।

৫৫.

আর এই জেলখানা একটা রূপক হিসেবে কাজ করে আমাদের আসল মুক্তির পথে। ইসলামের একটা বড় ব্যাপার হচ্ছে দুনিয়ার হাজারো ‘আকর্ষণ’ থেকে মুক্তি নিতে পারা। টেস্টিং গ্রাউন্ড, আমাদের জন্য। জেল মানুষকে অনেকটাই তৈরি করে দিচ্ছে সেটার জন্য। আর সেটাই নিয়ে যাবে আসল বেহেশতের আগে মনকে – আলোকিত পথে। হটাত্‍ জেলের কথা আসলো কেন? পিস কীপিং মিশনে ওধরনের একটা অনুভুতি তৈরি হয়েছিল আমার মধ্যে। ‘এভরিথিং হ্যাপেন ফর আ রিজন।’ বদ্ধ যায়গা, পরিবার থেকে দূরে। যাবার যায়গা নেই আশেপাশে। অফুরন্ত সময় – সন্ধার পরে। নিজের সাথে একা থাকার সময়টা বেশি বলে নিজেকে প্রশ্ন করা যায় অনেক কিছু নিয়ে। নিজেকে পাওয়া যায় অনেক সময় ধরে। এটা পাইনি গত চব্বিশ বছর ধরে।

[ক্রমশ:]

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 441 other followers

%d bloggers like this: