Feeds:
Posts
Comments

The best time to plant a tree was 20 years ago. The second best time is now.

– Chinese Proverb

ক॰

সমস্যাটার শুরু প্রায় এক দশক আগে। ছুটাছুটির চাকরি। আজ এখানে তো কাল ওখানে। শেষমেষ ‘পীস কীপার’ হিসেবে পোস্টিং হলো কঙ্গোতে। ঘুরাঘুরিই বেশি। ঘুমের সময় ছাড়া বাকিটা হিসেব করলে – পুরোটাই রাস্তায়। নিজ দ্বায়িত্বের এলাকা, যাকে বলে ‘এরিয়া অফ রেস্পন্সিবিলিটি’ – ইঞ্চি ইঞ্চি করে না জানলে বিপদ। মানুষের জীবন বলে কথা। পুরো এলাকা থাকতে হবে নিজের নখদর্পণে। কন্সট্যান্ট ভিজিল্যান্স। পায়ে হাটা অথবা গাড়ি – পায়ের মাইলোমিটারে লাখ মাইল পার হয়েছে নিশ্চিত।

খ॰

রাস্তায় নামলেই হাজার চিন্তা কিলবিল করে মাথায়। একটা এদিকে হলে আরেকটা ওদিকে। মাথা মুন্ডু ছাড়া চিন্তাভাবনা। দিন কয়েক পর বেস ক্যাম্পে ফিরলে বসতাম ইউএন এর কচ্ছপ গতির ইন্টারনেট নিয়ে। সভ্যতার সাথে একমাত্র ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ – ওই স্যাটেলাইট লিংক। একসময়, প্লট করতে শুরু করলাম চিন্তাগুলোকে। ‘চ্যানেলাইজ’ করতে তো হবে কোথাও। একেকটা চিন্তা একেকটা ডট। কানেক্টিং দ্য ডট’স ব্যাপারটা বুঝলাম অনেক পরে। চল্লিশের আগে নাকি ব্যাপারটা আসে না মাথায়?

জ্ঞান তো হলো অনেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে আসবে প্রজ্ঞা। সেটাকে প্রয়োগ করলেই উন্নতি। দেশের।

জ্ঞান তো হলো অনেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে আসবে প্রজ্ঞা। সেটাকে প্রয়োগ করলেই উন্নতি। দেশের।

গ॰

আগের ঘটনা আরো চমত্‍প্রদ। কঙ্গোতে যাবার ঠিক আগ মূহুর্তে ফিরেছিলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিগন্যাল স্কুল থেকে। থাকতে হয়েছিল লম্বা সময়ের জন্য। প্রায় নব্বই বর্গ মাইলের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিকম্যুনিকেশন ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি। যায়গাটাও জর্জিয়ার একটা অজ পাঁড়া গাঁয়ে। সন্ধার পর কুপি জ্বলার মতো অবস্থা। স্কূল থেকে ফিরে কাজ না পেয়ে হাত দিলাম রান্নায়। কাঁহাতক আর খাওয়া যায় ফাস্ট ফুড! পিএক্স থেকে এটা কিনি, ওটা কিনি। বাসায় এসে ভয়াবহ ধরনের ‘টেস্ট এণ্ড ট্রায়াল’। অসুবিধা কি? গিনীপিগ তো নিজে। ক্ষান্ত দিলাম স্মোক ডিটেক্টরের পানির ঝাপটা খেয়ে। বার কয়েক। তবে, একেবারে ক্ষান্ত নয়, কমিয়ে দিলাম গতি। মনোযোগ সরালাম নতুন দিকে।

ঘ॰

বিশাল লাইব্রেরী। এটা ওটা ইস্যু করি, টাইম লিমিটও অসহনীয় লম্বা। পুরনো পত্রিকা, দুস্প্রাপ্য বই সব মাইক্রোফিশেএকদম নতুন বই লাইব্রেরীতে না থাকলেও সেটা কিনে এনে চেকআউট করিয়ে রাখতেন লাইব্রেরিয়ান। আমাজনের বেস্টসেলার লিস্ট দেখা অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেলো ওই সময়ে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ‘বেস্টসেলার’গুলো লিখছেন আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষ। মানে, পেশাদার লেখক নন তারা। সাহস পেলাম। যাই লিখি, পাঠক পেতেই হবে বলেছে কে? মনের খোরাক মেটানোর জন্য লেখা। ওই বিরানব্বই থেকে। সেথ গোডিংয়ের গলা শুনি প্রায়ই। শিপ, বাডি! শিপ!

ঙ॰

দেখা গেলো ওই ‘বেস্টসেলার’দের কেউ ছিলেন স্টক এক্সচেঞ্জের হর্তাকর্তা, কেউ সিআইয়ের চীফ। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার। সরকারী কর্মকর্তা। নেভী সীল। ফুটবল কোচ। জিমন্যাষ্ট। তারা লিখছেন পেছনের অনেকগুলো বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে। ব্যর্থতা থেকে সফলতার গল্প। যা আসলে সাহায্য করছে ওই পড়ুয়া মানুষদের। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। বিতর্কিত জিনিস নিয়ে যে লেখা হয়নি তা নয়। লিখেছেন রেচেল মোরানের মতো পেশাজীবীরা। মানে – লেখা হয়েছে প্রায় সব বিষয় নিয়ে। বের হয়ে এসেছে অনেক সমস্যার কথা। সেই ভুল থেকেও শিখছে দেশ। সমালোচনা নিতে পারার মানসিকতার দেশগুলো ওপরে উঠছে দ্রুত। আবার লিখছেন জাতির পিতারা। আজকের ‘আধুনিক’ সিঙ্গাপুরের পেছনে যিনি ছিলেন তারো বই আছে কয়েকটা। নেলসন ম্যানডেলা’র বইটা পড়েছেন নিশ্চয়। সাতাশ বছরের অবিচারের ঘৃণাটা মূহুর্তে গিলে ফেলার ঘটনাটা অজানাই থাকতো বইটা না পড়লে। পড়ছি সবই, বুঝতে পারছি ভালো মন্দ। মন্দটা ফেলে ভালো নিয়ে এগুচ্ছি সবাই আমরা, সময়ের বিবর্তনে। অন্যের কাছ থেকে শিখে। পেছনে লেগে নয়।

চ॰

জ্ঞান কিন্তু রি-ইউজেবল। ব্রিটেনের লেগেছে দুশো বছর প্রায়। শুধু শিখতেই। শিল্পবিপ্লব থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিখেছে ব্রিটেন থেকে। তাদের লোক পাঠিয়ে। নোটবই ভরে নিয়ে আসতো তাদের অভিজ্ঞতার কথা। জাহাজে করে। সেটা কাজে লাগিয়ে ওই ব্রিটেনের সাথে টক্কর দিয়েছে অনেক কম সময়ে। ‘লীড টাইম’ কমিয়ে নিয়ে এসেছে প্রায় একশো বছর। এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই শেখার চর্চাটা ধরে রেখেছে বলে তারা এখনো শীর্ষে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শত বিপত্তির মধ্যে উদ্ভাবনা দিয়ে আছে টিকে। নিজেদের দেশে মানুষ কম বলে বাইরের বাজার দখলে ব্যস্ত তারা। এখন বোকারাই বলে যুদ্ধের কথা, বাজার দখলে কে কাকে বাজার বানাতে পারে সেটাই হচ্ছে বড় যুদ্ধ। রক্তপাত ছাড়াই ‘আউটবাউন্ড’ ক্যাশফ্লো!

ছ॰

এশিয়ান দেশগুলো আরো বুদ্ধিমান। ইউরোপ আর অ্যামেরিকা থেকে শিখে সেটা কাজে লাগিয়েছে গত তিরিশ বছরে। এখন টক্কর দিচ্ছে সবার সাথে। হংকং, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর অন্যের ‘ঠেকে শেখা’র অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এগিয়েছে বেশি। পাশ্চাত্যে কোনটা কাজ করছে আর কোনটা করেনি সেটা জানলেই তো হলো! তার সাথে মেশাও ‘লোকাল কন্ডিশন’। আমি এটাকে বলি, ‘ঘুটা’, মানে জ্ঞানের ডিফিউশন। মেলাও হাজারো জ্ঞানের অভিজ্ঞতা। গরীব দেশ হলেও কোন সরকারী কর্মকর্তাকে তো মানা করা হয়না বৈদেশিক ভ্রমনে না যেতে। অথচ কর্পোরেট হাউসে কৃচ্ছতা সাধনে প্রায় সবই চলছে ভিডিও কনফেরেন্সে। দেশের একটাই চাওয়া, শিখে আসা জ্ঞানটা কাজে লাগবে দেশের উন্নতিতে। প্রাথমিক জ্ঞানটা পাবার পর বাকিটা শেখার বাহন হচ্ছে ইন্টারনেট। আর সেকারণে ইন্টারনেট নিয়ে লাগা। জ্ঞান ছড়িয়ে আছে সব যায়গায়, দরকার তার প্রয়োগ।

ঝ॰

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেলেন জ্ঞান ‘ক’। এদিকে সিংগাপুর দিলো ‘খ’ জ্ঞান, ভিয়েতনাম থেকে নিয়ে এলেন ‘গ’। এখন – আমাদের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্ডিকেটরের সাথে মিলিয়ে যেটা যখন কাজে লাগে সেটাই ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। অনেকে এটাকে বলে ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’। মানে, যেটা কাজ করেছে অনেক যায়গায়। ‘ওয়েল টেস্টেড’। টেস্ট পেপার সলিউশনের মতো কিছুটা। দেখা গেছে – ওভাবে কাজটা করলে জিনিসটা মার যাবার সম্ভাবনা কম। টেস্ট এণ্ড ট্রায়ালের পর ফুলপ্রুফ হয়েই নাম হয়েছে ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’। দেশের ‘লোকাল কন্ডিশন’কে বেস্ট প্র্যাকটিসে ঘুঁটানোতেই রয়েছে মুন্সিয়ানা। ইন্টারনেটকে ছড়িয়ে দেবার ওই ধরনের ‘টেম্পলেট’ নিয়ে কাজ করেছি গত সাত সাতটা বছর।

ঞ॰

মনে আছে বৈজ্ঞানিক নিউটনের কথা? ‘আমি যদি আজ বেশি দেখে থাকি অন্যদের চেয়ে, সেটা পেরেছি পূর্বপুরুষদের জ্ঞানের ভিত্তিতে’। উন্নতবিশ্বের আজকের যা উন্নতি তার সবটাই এসেছে ওই ‘স্ট্যান্ডিং অন দ্য সোল্ডার অফ জায়ান্টস’ কথাটার ওপর ভিত্তি করে। আজ জানি আমরা ট্রানজিস্টর কি – আর কিভাবে কোটি ট্রানজিস্টর থাকে একটা চিপসেটে। নতুন করে ওই ট্রাংজিস্টর উদ্ভাবন না করে বরং কোটি ট্রাংজিস্টরের চিপসেট দিয়ে আর কি কি করা যায় সেটাই ভাববার বিষয়। আর তাই আগের জ্ঞানের ‘ডিফিউশন’ দিয়ে নতুন উদ্ভাবনা কাজে লাগিয়ে ওপরে উঠছে নতুন ইমার্জিং দেশগুলো। এটাকে বলা হয় লিপ-ফ্রগিং।

য॰

সামরিক বাহিনীর স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার বিটিআরসিতে আসা। টেকনোলজি নিয়ে একসময় লিখতাম কিছু পত্রপত্রিকায়। শুরুতেই ঝামেলা। ব্রডব্যান্ড, ইন্টারনেট – নতুন যাই লিখি সেটা নিয়ে মাথা নাড়াচ্ছিলেন অনেকেই।

“ভালো, তবে সমস্যা অন্যখানে। এটা সম্ভব নয় এদেশে।”

সময় কিন্তু যাচ্ছে চলে। জ্ঞানকে অভিজ্ঞতায পরিণত করতে লাগবে সময়োচিত দর্শন, যুক্ত হবার অদম্য স্পৃহা। লাগবে রেগুলেটরী রেফর্ম। দরকার নেই প্রযুক্তি জানার, নীতিনির্ধারণীদের।

সময় কিন্তু যাচ্ছে চলে। জ্ঞানকে অভিজ্ঞতায পরিণত করতে লাগবে সময়োচিত দর্শন, যুক্ত হবার অদম্য স্পৃহা। লাগবে রেগুলেটরী রেফর্ম। দরকার নেই প্রযুক্তি জানার, নীতিনির্ধারণীদের।

বলেন কি? অবাক হয়ে তাকাই উনাদের দিকে। নীতিমালায় আটকানো আছে জিনিসগুলো। মানে আমরা আটকে আছি আমাদের জালে। জিনিসপত্র না জানার ফলে পিছিয়ে পড়ছি আমরা। যুক্ত থাকার হাজার সুবিধার মূলে হচ্ছে মানুষের মুক্তি। সেটা প্রথমে আসবে অর্থনৈতিক মুক্তি থেকে, জ্ঞান দেবে আমাদের প্রাপ্যতার নিশ্চয়তা। সোশ্যাল মিডিয়ার বিগ ডাটা নিয়ে কাজ করেছিলাম একটা এজেন্সিতে বসে। যুক্ত থাকার ফলে আজ যা দেখছেন, এটা আইসবার্গের ছোট্ট একটা টিপ। আরব বসন্ত, একটা উপসর্গ মাত্র। পালটাচ্ছে পৃথিবী, পাল্টাবো আমরাও। ভালোর দিকে। দরকার ইন্টারনেটের মতো কিছু টুলস।


The two most important days in your life are the day you are born and the day you find out why.

― Mark Twain

র॰

বইগুলো লিখছি কিছুটা দায়বদ্ধতা থেকে। বিটিআরসির সাত বছরের অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে ঘোরার অন্তর্জালা থেকে মুক্তি পেতে এ ব্যবস্থা। নোটবই সেনাবাহিনীতে পোশাকের অঙ্গ হবার ফলে মিস করিনি খুব একটা। জিম রনের অমোঘ ‘নেভার ট্রাস্ট ইয়োর মেমরী’ বাণীটা খুব একটা বিচ্যুতি আনতে পারেনি ‘নোট টেকিং’য়ে। এখন যুগ হচ্ছে ‘গুগল কীপ’ আর ‘এভারনোটে’র। হাতির স্মৃতি বলে কথা – মাটিতে পড়ে না কিছুই। দেশ বিদেশের ফোরাম, যেখানে গিয়েছি বা যাইনি – হাজির করেছি তথ্য। টুকেছি সময় পেলেই। ভরে যাচ্ছিলো নোটবই। ‘এভারনোট’ আর ‘কীপের’ ভয়েস মেমোতে। পয়েন্ট আকারে। প্রোগ্রামিংয়ের মতো পয়েন্টারগুলো লিংক করা ছিলো মাথায়। ভুলে যাবার আগেই বইগুলোর ব্যবস্থা।

ল॰

আরেকটা সমস্যা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে – ওই ছোটবেলা থেকে। কোন জিনিস ধরলে সেটার শেষ না দেখলে ঘুম আসে না আমার। বিশাল বিপদ। আগে ভাবতাম সমস্যাটা আমার একার। ভুল ভাঙ্গলো দুনিয়া দেখতে দেখতে। ইনডাস্ট্রিতে একই অবস্থা। একেকটা রিসার্চ, সফল না হওয়া পর্যন্ত পড়ে আছে মাটি কামড়ে। মনে আছে, হেনরী ফোর্ডের ভি-৮ সিলিন্ডার তৈরির কথা? এই কৌশল ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি, এরোস্পেস, নাসা, ঔষধ গবেষণা সহ প্রচুর স্পেসালাইজড প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে। আজকের এয়ারবাস এ-৩৮০, দোতলা উড়োজাহাজ এতো সহজে আসেনি। উনিশশো অষ্টাশির গবেষনার ফল পাওয়া গেছে এপ্রিল দুহাজার পাঁচে, উড়োজাহাজটাকে উড়িয়ে। এরপরও আরো দুবছরের বেশি হাজার হাজার ‘সেফটি টেস্ট’ আর অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার পর প্রথম বানিজ্যিক ফ্লাইট চালায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স। অন্য কিছু নয়, ওড়াতেই হবে – তাই উড়েছে উর্রুক্কুটা। কেউ জেদ ধরেছিলো, আট দশ ফ্লাইটের তেল দিতে পারবো না। এক ফ্লাইট এর তেল নাও, নইলে অন্য ব্যবসা দেখো। বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনারটাও তৈরি হয়েছে কয়েকটা জেদি মানুষের জন্য। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে উজাড় করে দিয়েছেন তার জ্ঞানকে। বাকিটা আমাদের পালা।

শ॰

আজকের ‘ইন্টারনেট’ (যা পৃথিবীকে পাল্টে দিচ্ছে) এর আবিস্কারের পেছনে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। দেশ চেয়েছে ব্যয়বহুল সার্কিট সুইচিং থেকে বের হতে, ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সী, সংক্ষেপে ‘ডারপা’ বিভিন্ন উনিভার্সিটিতে ঢেলেছে অঢেল পয়সা, দিয়েছে অনেক সময়। প্রজেক্ট ‘ফেইল’ করেছে হাজারো বার, হাল ছাড়েনি তারা। ফলে তৈরী হয়েছিল আরপানেট, বর্তমান ইন্টারনেট এর পূর্বসুরী। আজকের বিদ্যুত্‍ বাল্ব তৈরি করতে থমাস এডিসনকে চেষ্টা করতে হয়েছিল হাজার বারের বেশি। রিপোর্টার জানতে চেয়েছিলেন তার ‘হাজারবারের ব্যর্থতার অনুভুতির কথা’। এডিসনের জবাব, ফেইল করিনি তো হাজার বার। বরং, লাইট বাল্বটা তৈরি করতে লেগেছিলো হাজারটা স্টেপ।

ষ॰

টেলিযোগাযোগ ব্যবসায় ভাসা ভাসা কাজের উপযোগিতা কম। রেগুলেশনেও একই অবস্থা। দরকার স্পেশালাইজেশন – বাজার বুঝতে। ঢুকতে হবে ভেতরে, অনেক ভেতরে। পুরোটাই অর্থনীতিবিদদের কাজ। ভবিষ্যত না দেখতে পারলে এ ব্যবস্যায় টিকে থাকা কঠিন। টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোর জাহাবাজ লোকেরাও মাঝে মধ্যে অত ভেতরে ঢুকতে পারেন না। স্পেশালাইজেশন বলে কথা। সেখানেই আসে টেলিযোগাযোগ কনসাল্টিং কোম্পানিগুলো। ওদের কাজ একটাই, আর এন্ড ডি, সারাবছর ধরে। আবার সেই কনসাল্টিং ফার্ম একই ধরনের কাজ করে বেড়াচ্ছে সব টেলিযোগাযোগ কোম্পানির জন্য। স্পেশালাইজড না হয়ে যাবেই বা কোথায় তারা? আর সেই সল্যুশনের জন্য মিলিয়ন ডলারের নিচে কথা বলেন না কেউই। আর বলবেন নাই বা কেন? এধরনের আর এন্ড ডির জন্য কম কষ্ট করতে হয়না তাদেরকে। প্রচুর রিপোর্ট পড়েছি এই কনসাল্টিং ফার্মগুলোর। রিপোর্টতো নয় যেনো হাতের রেখা পড়ছেন। ভবিষ্যত দেখা যায় রীতিমত। মিলিয়ন ডলারের কনসাল্টিং বলে কথা। টার্গেট দিন এক কোটি কর্মসংস্থানের। তৈরি করে দেবো প্রায়োগিক ফর্মুলা। হতে বাধ্য। জানতে হয় ভবিষ্যত দেখতে। বিগ ডাটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি খানিকটা।

ট॰

তাই বলে সব কনসাল্টিং ফার্ম এক নয়। আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, কনসাল্টিং ফার্মের দোষ না দেখে যিনি কাজ দিয়ে বুঝে নেবার কথা – তার কম্পিটেন্সিতে ঘাটতি থাকলে রিপোর্ট খারাপ হতেই পারে। আমি কিনছি রিপোর্ট, না বুঝে কিনলে কনসাল্টিং ফার্মের দোষ দিয়ে লাভ কি? গরীবদেশগুলোতে প্রচুর কনসালটেন্সি হয় বটে, তবে সে দেশগুলো সেগুলো ঠিক মতো বুঝে নেবার সামর্থ বা জ্ঞান থাকে না বলেই ঝামেলা হয়। ডোনারদের টাকায় কনসাল্টেন্সি হলে সেটার অবস্থা হয় অন্য রকম। রিপোর্ট নিজের মনে করে বুঝে নিতে পারলে সেটার দাম মিলিয়ন ডলারের বেশি। সে ধরনের রিপোর্ট বুঝে নিয়েছিলাম বেশ কয়েকটা। পোস্ট-ডক করা যাবে কয়েকটা।

ঠ॰

কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হলো বিশ্বখ্যাত অনেকগুলো টেলিযোগাযোগ কনসাল্টিং ফার্মের সাথে। এর সাথে যোগ হলো ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) আর কমনওয়েলথ টেলিকম্যুনিকেশন অর্গানাইজেশনের (সিটিও) আরো অনেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট। ধারণা পেলাম তাদের কাজের। পড়তে থাকলাম আরো হাজারো রিপোর্ট। দামী সব রিপোর্ট, তবে তার দাম কোনো কোনো দেশ বা এজেন্সি দিয়ে দিয়েছে আগেই। পরিচয় হলো ওভাম, অ্যাকসেন্চার, কেপিএমজি, পিডাব্লিউসি, নেরা আর এনালাইসিস ম্যাসনের মতো তুখোড় তুখোড় ফার্মের সাথে। আবার নিজের প্রতিষ্ঠানেরই কাজ করতে পরিচয় হলো মার্কিন ফার্ম টেলিকমিউনিকেশনস ম্যানেজমেন্ট গ্রূপ, ইনকর্পোরেশন (টিএমজি)র সাথে। তাদের ধরনটাই বুঝতে সময় লেগেছিলো বেশ। তলই পাচ্ছিলাম না প্রথমে। বিলিয়ন ডলারের কনসাল্টিং কোম্পানি বলে কথা। পরিচয় হলো অনেকের সাথে। বন্ধুত্ব হলো অনেকের সাথে। হাতে ধরে দেখিয়ে দিলেন বাংলাদেশের ‘ফল্ট-লাইন’গুলো।

ড॰

একসময় তল পেলাম এই ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং ফার্মগুলোর কাজের ধারার। পৃথিবী জুড়ে কাজ করার ফলে কোথায় কি সমস্যা সেটা তারা জানে ভালো। আর সেটা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেয়া ওদের একমাত্র কাজ বলে ওটাও সে জানে ‘অসম্ভব’ ভালো। গরীব দেশগুলোতে হাজার কোটি টাকার ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্টেনসি করে টাকা বানালেও সেটার ব্যর্থতার দায় দেয়া যাবে না তাদের ওপর। ওই দেশের – যাদের ‘কন্সাল্টেনসি’টা বুঝে নেবার কথা তারা ‘ছাড়’ দিলে কাজ হবে কিভাবে? উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠতে হলে লাগবে কন্সাল্টেনসি, তবে সেটা ‘পাই’ ‘পাই’ করে বুঝে নেবার মতো থাকতে হবে মানুষ। দু চারটা বৈদেশিক ভ্রমণে ব্যাপারটা উপেক্ষিত হলে জ্ঞান আর প্রজ্ঞাটা হারায় দেশ।

ঢ॰

ব্যাপারটা অনেকটা বিজনেস প্ল্যান কেনার মতো। ও আমাকে বানিয়ে দিলো একটা। না বুঝে দিয়ে দেবো পয়সা? সমস্যা হয় যখন সেটা হয় ‘সরকারী’ মানে জনগণের পয়সা। একারণে উন্নতদেশগুলো ছোট করে নিয়ে আসছে সরকারগুলোকে। যাই হয় সব পার্টনারশীপে। যারাই থাইল্যান্ড গিয়েছেন মুগ্ধ হয়েছেন তারা – বিশাল বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার দেখে। বেশিরভাগ ইনফ্রাস্ট্রাকচারই কিন্তু পিপিপি’র মডেলে করা। সরকারের অতো পয়সা থাকে না কোথাও। পিপিপি হচ্ছে গিয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ। পয়সা যোগান দেবে বেসরকারী কোম্পানি – কাগজ দেবে সরকার, আইনগত ভিত্তি সহ। ‘উইন’ ‘উইন’ ব্যাপার। পয়সা লাগলো না সরকারের। কর্মসংস্থানও হলো। আমাদের পিপিপি নীতিমালা তৈরী হয়নি এখনো।


There is no ‘poor’ country, they are ‘poorly’ managed.

― Slightly modified

ণ॰

উন্নত দেশগুলোতে অনেক বড় বড় কাজে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে না জনগণ। কারণ এই পিপিপি। যেকোনো দেশের উন্নতির ইনডিকেটর বোঝা যায় ওদেশের পাবলিক ট্রানজিট সিস্টেম দেখে। মানে জনগন কতো সহজে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারছেন – নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। ঢাকা শহরে সেটার অবস্থা আফ্রিকার অনেক দেশ থেকেও খারাপ। অথচ ব্যবস্যা বান্ধব পিপিপি নীতিমালা থাকলে প্রাইভেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো প্রস্তাব দিতে পারতো সরকারের কাছে। তৈরী করতো ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড’। ভাগ করে ফেলতো পুরো শহর – চার পাঁচ ভাগে। একেকটা ভাগের রুট নিয়ে দেন-দরবার করতো কনসেশন পিরিয়ডটা নিয়ে। এই রুটটা দাও আমাকে পঞ্চাশ বছরের জন্য। তৈরী করবো স্কাই ট্রেন। ইনফ্লেশন হিসেব ধরে ভাড়ার একটা চার্ট জমা দিতো সরকারকে।

স॰

সফটওয়্যারের মানুষ হিসেবে শূন্য ভার্সন থেকে শুরুতে বিশ্বাসী আমি। শুরু করতে হবে কোথাও। নিউটনের কথায় ফিরে আসবো আবার। ষ্টান্ডিং অন দ্য সোল্ডার অফ জায়ান্টস। আমাদেরও এগুতে হবে পূর্বসূরীর অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে। গাছ রোপণ করার কথা ছিল বিশ বছর আগে। সেটা না হলে কি থাকবো বসে? বরং – লাগাবো আজই। বাংলাদেশের ‘যুক্ত’ হবার এজেন্সিতে চাকরি করার সুবাদে গরীব দেশ আমার ওপর যা ইনভেস্ট করেছে সেটা ফিরিয়ে দেবার জন্য নিয়েছি নগণ্য একটা প্রয়াস। নাম দিয়েছি প্রজেক্ট ‘গিভিং ব্যাক’। ব্রডব্যান্ড ছড়িয়ে দেবার ‘চিটকোড’ হিসেবে ধরুন ব্যাপারটাকে। ব্রডব্যান্ডে সফল দেশগুলোর ধারণা নিয়ে ‘আমাদের আঙ্গিকে’ কোডটাকে ‘ক্র্যাক’ করতে চেষ্টা করেছি মাত্র। আর, পয়সার জন্য ওর সাথে থাকবে ইনফ্রাস্ট্রাক্চার ফান্ড। আর এসপিভিলাগবে এটাও

দরকার আপনার সুচিন্তিত মতামত। ওই মতামতের ওপর ভিত্তি করে কাঠামোগত পরিবর্তন আনবো বইগুলোতে।

প্রি-প্রোডাকশন স্টেজ: কাজ চলছে এখনো

প্রথম বই: ইন্টারনেটের মুল্যঃ যে কারনে এখনো ধরাছোয়ার বাইরে

দ্বিতীয় বই: বাতাস ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: দক্ষ স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা পাল্টে দিতে পারে বাংলাদেশকে

তৃতীয় বই: রেগুলেট অর নট টু রেগুলেট? চতুর্থ প্রজন্মের রেগুলেটর ও বাংলাদেশ

* লিংকগুলো যুক্ত করা হয়েছে কয়েকটা ব্লগপোস্টের সাথে। পুরো বইগুলো আসবে আস্তে আস্তে – প্রিন্টে।


০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
সাশান্দ্রা, আইভরি কোস্ট

If you think cryptography is the answer to your problem, then you don’t know what your problem is.

- Peter G. Neumann, New York Times, February 20 2001.

১৫.

গল্প দিয়েই শুরু করি কি বলেন? শাফায়েত কিছু একটা জানাতে চাচ্ছে সালমাকে। দুজন আবার থাকে শহরের দুপ্রান্তে। যোগাযোগ করতে পাঠাতে হবে কিছু একটা – কাগজে লিখে। শাফায়েত ম্যাসেজটা লিখলো গোপন একটা কোড দিয়ে। গোপন কোডটা জানে মাত্র ওই দুজন। আগে থেকেই। পরে, ওর বন্ধুকে দিয়ে কাগজটা পাঠিয়ে দিলো সালমার বাসায়। সময়মতো সালমার জানালা দিয়ে জিনিসটা ফেলেও দিলো বন্ধুটা। কপাল ভালো হলে সেটা পাবে সালমা। কিন্তু গল্পে দরকার ‘টুইস্ট’। কপাল খারাপ, ওটা গিয়ে পড়লো সালমার ‘বদরাগী’ বড় ভাইয়ের হাতে। সব বড়ভাই বদরাগী হয় কিনা জানিনা, তবে সালমার ভাই ‘ওই সিনেমা’র মতোই বদরাগী। কাগজটা পেলেন ঠিকই তবে সেটার মাথামুন্ডু কিছু না বুঝে ফেলে দিলেন ওয়েস্ট পেপার বীনে। সালমা সবার চোখের আড়ালে তুলে নিয়ে এলো জিনিসটা – ওই বীন থেকে। আগে থেকে ‘শেয়ার’ করা কোড দিয়ে ম্যাসেজ উদ্ধার করলো মেয়েটা। আমার জীবনের গল্প দিলাম কিনা?

১৬.

এখানে যে পদ্ধতিতে শাফায়েত ম্যাসেজটা গোপন করলো সেটাকে বলে ‘এনক্রিপশন’। আর যেভাবে ম্যাসেজটা পাঠোদ্ধার করলো সালমা, সেটা ‘ডিক্রিপশন’। ধরুন, ওই কোড ছাড়া পাঠাতে গেলে কি করতে হতো শাফায়েতকে? একটা বাক্স কিনে লাগাতে হতো তালা। ওই চাবিটার দুই কপি থাকতো দুজনের কাছে। অথবা ‘কম্বিনেশন লক’ হলে সেটার তিন ডিজিটের সংখ্যাটা জানতো দুজনই। ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’তে ওই তালার চাবিকে প্রতিস্থাপন করছে একটা কোড। যাকে আমরা বলছি ‘সাইফার’। আবার যেই পদ্ধতিতে ‘এনক্রিপ্ট’ করা হচ্ছে সেটা হতে পারে কিছু গাণিতিক অ্যালগরিদম, তাই না? আর যে অ্যালগরিদম দিয়ে ওই তথ্যটা লুকানো হচ্ছে সেটাকেও বলা হচ্ছে ‘সাইফার’। ওই ‘সাইফার’ মানে যে অ্যালগরিদম দিয়ে ওই তথ্যকে লুকানো হয়েছে তার ‘ভার্চুয়াল তালা’টার চাবি কোথায়? ওই চাবিটাই হচ্ছে লুকানোর ‘কোড’। ওটা দিয়ে খোলা যাবে গুপ্ত তথ্যটা। তালার মতো ওই ‘চাবি’টাই (কোড) আসল।

১৭.

‘সাইফার’ ওই ম্যাসেজটাকে এমনভাবে ‘স্ক্র্যাম্বল’ আর ‘ডি-স্ক্র্যাম্বল’ মানে ‘ঘুটা’ দেয় যে সালমার ভাই আর শাফায়েতের বন্ধুর কাছে পুরো জিনিসটাই ঘোলাটে মনে হবে। এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ চলে আসছে হাজার বছর ধরে। এটা নিয়ে হয়েছে অনেক অনেক যুদ্ধ – বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। যুদ্ধের জয় পরাজয়ও নির্ভর করেছে এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’র ওপর। এক দেশ পাঠিয়েছে ম্যাসেজ, সেটা হাতে পেয়ে প্রযুক্তির সাহায্যে ‘ডিক্রিপ্ট’ করে আগে ভাগে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ‘অ্যালাইড ফোর্স’। ওই গল্প জানেন সবাই।

১৮.

আমি যেখানে কাজ করছি, ওই টেলিযোগাযোগ সেক্টরের পুরোটাই চলছে এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’র ওপর। ফোন, ইন্টারনেট, ইমেইল, স্কাইপ, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফাইনান্সিয়াল ট্রান্জাকশন, এটিএম নেটওয়ার্ক, অনলাইনে কেনাকাটা – যাই চিন্তা করেন সেটার কোর জিনিস হচ্ছে এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’। এটা না থাকলে আপনার আমার ইমেইল পড়ে ফেলার কথা সবার। স্কাইপ নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে অনেক। উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে ব্যাপারটা। এক ব্যাংক থেকে টাকা পাঠানো হবে আরেক ব্যাংকে। ভাড়া করলেন ‘স্টেট অফ দ্য আর্ট’ এসকর্ট সার্ভিস। পথে টাকা হাইজ্যাক হবার প্রশ্নই আসে না। এসকর্ট সার্ভিসের হাতে টাকা দেবার আগেই লূট হয়ে গেল টাকাগুলো ব্যাংক থেকে। দোষ দেবেন কাকে? এসকর্ট সার্ভিসকে? ভেবে দেখুন।

১৯.

পৃথিবীটাই চোর পুলিশের খেলা। ‘ক্লোজ’ ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ ব্যবহার করছেন যারা, মানে কোম্পানীগুলো – তাদের হাত পা বাধা। তবে, ধরুন – আপনি তৈরি করলেন একটা ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ সিষ্টেম। কমপ্লায়েন্সের কারণে ওই সরকারকে দিতে হলো এর ‘কী’ মানে চাবিটা। অর্থাত্‍ দেশ মনিটর করতে পারবে এটা দিয়ে ‘এনক্রিপ্ট’ করা পাঠানো ফাইল অথবা ভয়েস কল। কিন্তু ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ সিষ্টেমটা ওপেন সোর্স হবার কারণে যে কেউ নিজের মতো তৈরি করে নিতে পারবে আরেকটা ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ সিষ্টেম। কি হবে তখন? অথবা, কয়েকটা ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ সিষ্টেমের কম্বিনেশন? জার্মান পত্রিকা ‘দার স্পাইজেল’ কিছু ডকুমেন্ট পেয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএ’র। ডিফেন্স কনট্রাক্টর এডওয়ার্ড স্নোডেনের হাত দিয়ে। পরে মার্কিন পত্রিকাগুলোতেও কিছু ঘটনা আসে এ সুত্রে। অনেক ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ এখনো মাথা খারাপ করে দিচ্ছে তাদের এনএসএ’র। প্রযুক্তির উত্কর্ষতার সাথে সাথে সমস্যা আসবেই।

[ক্রমশ:]

It is not that we have so little time but that we lose so much. … The life we receive is not short but we make it so; we are not ill provided but use what we have wastefully.

― Seneca the Younger, On the Shortness of Life

১০.

ভবিষ্যতের ‘ডট’ দেখতে চাইলে বসতে হবে ঠান্ডা মাথায়। ভুল বললাম, শুধু ঠান্ডা মাথায় নয়, সবকিছু ফেলে বসতে হবে স্থির হয়ে। নো মোবাইল ফোন, নো ইন্টারনেট, নো বূক – একদম খালি হাতে। মনে আছে ফরাসী গণিতবিদ ব্লেইজ প্যাসকালের কথা? তার একটা কথা এখন ঘুরছে সবার মুখে মুখে। ইদানিং। এই মহাব্যস্ত ইঁদুর দৌড়ের সময়ে। “মানুষের অসুখী হবার পেছনে কারণ একটাই। ঠান্ডা মাথায় বসতে পারে না নিজের যায়গায়।” বলে কি ব্যাটা? চাকরির গত তেইশ বছর কি করলাম আমি?

১১.

চষে বেড়িয়েছি অনেক শহর। এই পৃথিবীতে। ‘ডট’এর খোঁজে। এখন বুঝতে পারি শান্তির ‘টাচবেজ’ হচ্ছে স্থির হয়ে বসা, বাসায়। একা। ফিরে আসি অ্যাডমিরাল রিচার্ড বার্ডের কথায়। উনাকে একটা মিশনে থাকতে হয়েছিল অ্যান্টার্কটিকায়। বলতে গেলে একাই। শূন্যর সত্তুর ডিগ্রী নিচের তাপমাত্রায়। পাঁচ মাসের মতো। শুনবেন উনার উপলব্ধি? পৃথিবীর অর্ধেক ‘কনফিউশন’ মানে এলোমেলো অবস্থার সৃষ্টি শুধুমাত্র না জানার কারণে, আসলে আমরা চলতে পারি কতো কমে! সাধারণ জীবনযাত্রায় আমাদের তেমন কিছু লাগে না বললেই চলে। তাহলে এতো ইঁদুর দৌড় কেন? সেটাতো প্রশ্ন আমারও।

১২.

মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগলে ‘টেড’এর বক্তৃতাগুলো শুনি মাঝে মধ্যে। সত্যিকারের ইন্সপায়ারিং! বিখ্যাত মানুষগুলোর সারাজীবনের জ্ঞান উগড়ে দেন মাত্র আঠারো মিনিটে। কে নেই ওখানে? পৃথিবীর “হু’জ হু”দের প্ল্যাটফর্ম ওটা। কে জানে আমিও দেবো কোন একদিন। হাসছেন? ‘গোল’ সেটিংয়ে ওটা রাখতে অসুবিধা কোথায়? দিলাম নাকি দিলাম না – সেটা হয়তোবা বলে দেবে সময়। আর কিছু না থাকলে আমাদের জন্য রয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিভি স্টেশন। ইউটিউব।

১৩.

শুনছিলাম পিকো আয়ারের কথা। এই ‘টেড’এ। ‘দ্য আর্ট অফ স্টিলনেস।’ অসাধারণ। পড়ছিলাম তার বইটাও। বক্তৃতার নামে নাম। সাবটাইটেল ‘অ্যাডভেঞ্চারস ইন গোয়িং নোহোয়ার’। নিজেকে খুঁজতে পাড়ি দিতে হবে না পাহাড় পর্বত, বসতে হবে স্থির হয়ে কোথাও, থাকতে হবে ‘অ্যাপ্রেসিয়েটিভ’ মানে ‘সপ্রশংস উপলব্ধিপূর্ণ’ চোখ। বাংলায় কঠিন করে ফেললাম নাকি আবার? সোজা কথা – দুনিয়ার ইঁদুর দৌড় থেকে নিতে হবে ‘ব্রেক’! এরপর চালু করতে হবে মনের গভীরের ‘অভিজ্ঞতাপূর্ণ’ স্লাইডশো। খুঁজে পেতে বের করতে হবে আপনার মন ভালো ছিলো কোন কোন মূহুর্তে। ডটগুলো যোগ হতে শুরু করবে ওই ‘স্থির’ হবার পর থেকে। একটু সময় নিয়ে।

১৪.

আচ্ছা, কেমন হয় প্রতিদিন থেকে বের করে নিলেন মিনিট দশেক সময়? অথবা প্রতি মাসে দিন কয়েক? আমার জানা মতে বেশ কিছু মানুষ চিনি যারা আসলেই ‘হাওয়া’ হয়ে যান কয়েক বছরের জন্য। তিন বছর পর ফোন। ছিলেন কোথায়? আফ্রিকার একটা গ্রামে। পুরোপুরি অফলাইন। নিজেকে খুঁজতে। জানতে, কি লাগে ভালো? মন আসলে চায় কি? শান্তি কোথায়? কি করলে ভালো হয়ে যায় মন? সুখী মনে হয় নিজেকে। পুরানো ‘ডট’গুলো দেখিয়েছে নতুন পথের সন্ধান। মনের গহীনে ‘ডাইভ’ দিয়েছিলেন ওই কটা বছর। এসেই ছেড়ে দিলেন ইউনিভার্সিটি’র চাকরি। আবার ডুব। দিন কয়েক আগে এলো একটা ইমেইল। থাইল্যান্ডের একটা গ্রামে স্কুলে পড়াচ্ছেন উনি। হয়তোবা ওটাই শান্তি দিয়েছে তাঁকে। কে জানে।

১৫.

তবে, আমাদের কষ্টটা অন্য যায়গায়। এতো বেশি ইনফর্মেশন আমাদেরকে প্রতিনিয়ত ‘ফীড’ করছে বর্তমান প্রযুক্তি, আমাদের মাথা আর পারছে না প্রসেস করতে। না পারছে ফেলে দিতে। এই বিলিয়ন বিলিয়ন ওয়েবসাইট, হাজার হাজার টিভি চ্যানেল, ইউটিউবের বিলিয়ন ভিডিও, ফোন, এসএমএস, হাজারো ফোনের কনট্যাক্টস (আমার ফোনের ‘কনট্যাক্টস’ই দেখলাম পনেরো হাজারের মতো – থ্যাংকস টু ক্যামকার্ড), ফেসবুক, লিঙ্কডইন সময় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। ভুল বললাম নাকি? সেকেন্ডে বিলিয়ন কনটেন্ট আপলোড হচ্ছে ইন্টারনেটে। মানুষ তো বাড়ছে না ওই হারে। একটা বই পড়তে যেই সময় লাগে, ওর মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরো লাইব্রেরী অফ কংগ্রেসের পাঁচগুণ কনটেন্ট এসে হাজির হয় আপনার আমার সামনে। এই পোস্টটা পড়ার সময় আপনি যতো তথ্য দিয়ে ‘বম্বার্ড’ হচ্ছেন, শেক্সপিয়েরের পুরো জীবনের ইনপুট অতখানি হবে নাকি সন্দেহ। কারণ, ওনার সময়ে ইমেইল আসতো না মিনিটে মিনিটে। ফোনে হতো না ‘কল ওয়েটিং’। ইন্সট্যান্ট ম্যাসেঞ্জার? হাসছেন আপনি।

১৬.

‘ইণ্টারাপশন সায়েন্স’ নিয়ে অনেক গল্প হচ্ছে ইদানিং। আপনারা বসেছেন কাজে, ওখানে ব্যাঘাত হচ্ছে কয়বার, সেটা নিয়ে শুরু হয়েছে গবেষণা। বড় বড় গবেষণা। আবার কাজে ফিরতে পারছেন কিনা – আর ফিরতে পারলেও কতো সময় নিচ্ছে আবার মনো:সংযোগ করতে, সেখানে কেমন ক্ষতি হচ্ছে কোম্পানীগুলোর অথবা আপনার নিজের – এটার হিসেব নিয়েই তাদের গল্প। ফোন, ইমেইল, স্মার্টফোন, স্ট্যাটাস আপডেট অথবা আপনার অফিস সহকর্মী অযথাই আপনার অফিসে আসলে শুরু হয় এই সমস্যার। যারা পাইলট, সার্জন অথবা নার্সদের মতো প্রফেশনাল, তাদের কাজে ব্যাঘাত মানে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। আপনি যদি একটা হাসপাতাল চালান, তবে আপনার অপারেশন থিয়েটারে কি ফোন নিয়ে যেতে দেবেন আপনি? আমি হলে দিতাম না। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের বাইরে কাজ করছেন একজন ‘ক্রু’, তার জন্য একটা ম্যাসেজ আছে জরুরী, ক্যান দ্যাট ওয়েট? তার কাজ শেষ হবার পর্যন্ত? মনো:সংযোগ বিচ্যুতি’র জন্য আধাঘণ্টার খরচ সামলাবে কে শুনি?

১৭.

ওই গবেষনার আউটপুট দেখে তো আমি থ! ‘নলেজ ওয়ার্কার’ মানে যারা আমরা মাথা বেঁচে খাই তারা প্রতি তিন মিনিটে পাল্টায় তাদের কাজ। টাস্ক সুইচিং। আর একবার ওই কাজ ব্যাহত হলে আগের যায়গায় ফিরতে গড় সময় লাগে আধা ঘন্টার মতো – এই আমাদের। অফিসে বসা লোকদের নিয়ে গবেষনার রেজাল্ট আরো মজার। গড়ে আমদের প্রতি এগারো মিনিট পর পর মনো:সংযোগের ব্যাঘাত ঘটায় এই ‘অলওয়েজ অন’ প্রযুক্তি। আর ওই এক বিচ্যুতির পর ‘পুরোনো’ মানে আসল কাজে ফিরতে গড় সময় নেয় মানুষ – মিনিট পঁচিশ। সাচ আ ওয়েস্ট অফ টাইম! আপনার ব্যবস্যায়িক প্রতিষ্ঠান চালাবেন কিভাবে? বেশিরভাগ কোম্পানীতে সোস্যাল মিডিয়া বন্ধ অফিস সময়ে, কিন্তু তার স্মার্টফোনের জন্য কি নীতিমালা? ফোন বা ইমেইলের নোটিফিকেশন অ্যালার্টের ‘ফ্রিকোয়েন্সি’ কেমন? আর সেটা কি শব্দ করে?

১৮.

আর যতো বেশি ইনপুট আসবে আমাদের দিকে, ততো কম সময় পাবো আসল কাজটা করতে। এই যে আমি লিখছি, তিন চার লাইন পর পর উঠতে হচ্ছে দরকারী কাজে। হয়তোবা বাজছে ফোন, কেউ বা ম্যাসেজ দিচ্ছে বিভিন্ন ইন্সট্যান্ট ম্যাসেঞ্জারে। ওয়াশিং মেশিনের ‘বীপ’ অথবা কিচেন টাইমারের রিং উপেক্ষা করতে পারছি না এই লেখার সময়ও। পিকো’র কথা একটাই – প্রযুক্তি আমাদেরকে দিয়েছে অনেককিছুই তবে ওগুলোর ‘অপটিমাইজড’ ব্যবহার মানে কতটুকু করলেই আমাদের কাজ চলে সেই বোধশক্তিটা দেয়নি খুব একটা। আগে তথ্য সংগ্রহটা ছিলো কষ্টের। আর এখন হাজারো তথ্যের মধ্যে আমাদের কোনটা ‘আসলেই’ দরকার সেটা বেছে নেবার প্রজ্ঞাটা অনেক জরুরী।

[ক্রমশ:]

The mystery of human existence lies not in just staying alive, but in finding something to live for.

― Fyodor Dostoyevsky, The Brothers Karamazov

০১.

কর্মজীবন পড়লো তেইশে। তেইশ বছর লম্বা সময় বটে। বয়সও পয়তাল্লিশ হলো বলে। অন্যদের ব্যপারে পুরোপুরি না জানলেও মাঝে মধ্যে ‘ভাসমান’ মনে হতো নিজেকেই। কাজ করছি ঠিকই, মন লাগিয়ে – পাগলের মতো। তবে উঁকি দিতো প্রশ্নটা। মাঝে মধ্যে।

‘আমি কেন এখানে?’

অথবা,

কি চেয়েছি জীবনে? আসলেই কি এটা চেয়েছি জীবনে? যা করছি এখন – সেটাই কি চেয়েছিলো আমার ভেতরের সত্তা?

অথবা,

পৃথিবীতে আসার পেছনে কারণ কি আমার? হোয়াট ইজ দ্য পারপাজ অফ বীইং হিয়ার?

০২.

শিক্ষাজীবন শেষ হবে বলে বলে শেষ হচ্ছে না এখনো। শেষ হবে কি কোনদিন? এদিকে, চালাতে হবে সংসার। আর সে জন্যই কি কর্মজীবন? কর্মজীবনে যাই করেছি বা করছি সেটাতে দিয়েছি মন প্রাণ ঢেলে। নিজেকে প্রশ্নগুলো করা হয়নি কখনো। করবো কিভাবে প্রশ্ন? ‘ইট’স লাইক ডে ইন – ডে আউট’। ক্লান্ত, কিন্তু ডানা মেলে রাখা। ফ্লোটিং মোডে। প্রতিদিন আছড়ে পড়ি একেক যায়গায়। ওখান থেকে ওড়ার আবার আপ্রান্ত চেষ্টা। ‘স্টেইং অ্যাফ্লোট’ হচ্ছে জীবনের লক্ষ্য। আপনারটা না জানলেও আমারটা জানছি ধীরে ধীরে। তবে, যাই করি না কেন, নিজের ভেতরের সাথে নিরন্তর ‘যুদ্ধ’ চলছে বেশ আগে থেকেই। ‘কি চেয়েছি আমি’, অথবা ‘এটাই কি চেয়েছিলাম জীবনে’ এধরনের প্রশ্ন বের করে দিতাম মাথা থেকে। আছি তো ভালোই। বউ বাচ্চা নিয়ে। কিন্তু, দুত্তরি ছাই – এটাই কি চেয়েছিলাম এই আমি?

০৩.

দুহাজার আটে একটা খোঁচা খেয়েছিলাম রান্ডি পাউশের ‘দ্য লাস্ট লেকচার’ থেকে। ভিডিওটা দেখে গিয়েছিলামও ভুলে। পরে একটা ট্রানজিটে এয়ারপোর্ট থেকে কিনে ফেললাম বইটা। আগেও লিখেছিলাম ব্যাপারটা নিয়ে। বাইরের ইউনিভার্সিটিগুলোতে ‘শেষ বক্তৃতা’ নামে একটা ‘চল’ প্রচলিত আছে। ছাত্ররা তাদের প্রিয় ফ্যাকাল্টির ‘শেষ একটা বক্তৃতা’ শোনার জন্য ভার্সিটিকে অনুরোধ করে। বক্তৃতা দেবার আগে প্রফেসরদের ধরে নিতে বলা হয় জীবনের শেষ বক্তৃতা হিসেবে। ধরুন, কাল যদি আর না আসে, তাহলে কি উপদেশ রেখে যেতে চাইবেন তার ছাত্রদের জন্য?

০৪.

কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রান্ডি পাউশের গল্পটা জানেন সবাই। তার হাতে সময় ছিল না বললেই চলে। টার্মিনাল ক্যান্সারে ভুগছিলেন তিনি। প্রথম ক্যান্সারের আক্রমন থেকে পালাতে পারলেও পরেরটা আর ক্ষমা করেনি তাঁকে। এই কয়েক মাসের সীমিত টাইমলাইনে আগের দেয়া ‘শেষ বক্তৃতা’র সিডিউলটা রাখবেন, না পরিবারের সাথে শেষ কয়েকদিন কাটাবেন – দ্বিধায় পড়লেন রান্ডি পাউশ। তার অবর্তমানে স্ত্রী ‘জে’ আর তিন অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যতের ব্যবস্থাও তো করতে হবে এর মধ্যে। ছোট মেয়ে ‘ক্লয়ী’র বয়স মাত্র তখন বারো মাস। মৃত্যুর আগের কিছুটা ‘পার্সপেক্টিভ’ পেলাম বইটা থেকে।

০৫.

ওপরাহ উইনফ্রে’র ‘সুপার সৌল সানডে’ ব্যাপারটা মন্দ লাগে না আমার কাছে। এটা একটা ‘ডে টাইম সিরিজ’ হলেও নামকরা মানুষজন আসেন আলাপ করতে। একবার ডাকা হলো ‘ক্যারোলাইন মেইস’কে। মেইস অনেকগুলো বই লিখেছেন ‘স্পিরিচুয়ালিটি’র ওপর। একেকটা বই লেখেন, সব চলে যায় নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার লিস্টে। তার উত্তর হচ্ছে – যখন মনে হবে আমি নিজের সত্তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছি, প্রতিনিয়ত:। মানে আমরা সরে গেছি আমাদের ‘ট্রু কলিং’ থেকে। যখনই নিজেকে আপস করতে হবে ‘ইন্টার্নাল কোর ভ্যালু’র সাথে, হেরে যাওয়া শুরু করলেন তখন থেকে। তবে তার আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে হবে একেবারে ভেতর থেকে। অ্যাম আই ডুইং জাস্টিস টু মাইসেল্ফ? টু মাই জব? আমার আশেপাশের মানুষের জন্য?

০৬.

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন জিনিসটা কি? প্রশ্ন করা হয়েছিল গ্রীক দার্শনিক ‘থেলস’কে। ‘টু নো দাইসেল্ফ।’ নিজেকে জানা। আর সবচেয়ে সহজ? অন্যকে উপদেশ দেয়া। দুহাজার পাঁচে স্টিভ জবসের ‘কানেক্টিং দ্য ডটস’ ব্যাপারটা শুনলেও মাথায় ঢোকাইনি গভীর ভাবে। পরে বুঝেছি ধীরে ধীরে। ওই ‘ডট’গুলো হচ্ছে আপনার আমার জীবনের অভিজ্ঞতা আর ‘দ্য চয়েসেস উই হ্যাভ মেড’। ইতিমধ্যে। আমরা যখন পেছনে তাকাবো জীবন নিয়ে, একটা প্যাটার্ন ফুটে উঠবে আমাদের কাজে। কি কি করেছি আমরা। এটা আমাদেরকে জীবনকে দেখতে শেখায় নতুন একটা ‘পার্সপেক্টিভ’ থেকে। জীবনের হাজারো ‘ইভেন্টে’র পেছনের একটা ট্রেন্ড, আমাদেরকে তৈরি করে দেয় – সামনে দেখতে।

০৭.

ধরে নিন, আমার বয়স চুয়াল্লিশ। আচ্ছা, ধরে নিতে হবে না, এটাই আসল। হলো তো! এই চুয়াল্লিশটা বছর ধরে আমার মাথাকে প্রসেস করতে হয়েছে কোটি কোটি ‘ইভেন্ট’। অনেক অনেক ঘটনা দেখেছি, জিনিস পড়েছি, শুনেছি অনেক কিছু, অনেক কিছু ধরেছি হাতে। পার করেছি অনেক আবেগঘন মুহূর্ত। গিয়েছি নতুন যায়গায়। মিশেছি হাজারো মানুষের সাথে। ‘ইন্টার্নাল ট্রান্সফর্মেশনে’র ভেতর দিয়েও যেতে হয়েছে কয়েকবার। ‘কোটি ইভেন্ট’ মাথায় ধারণ করলেও সেগুলোকে প্রসেস করার সময় কোথায়? ফুরিয়ে আসছেও সময়। ভুল জিনিস শিখে আবার সেটাকে ‘আনলার্ন’ করে নতুন করে শেখার সময় বের করতে হবে এরই মধ্যে।

০৮.

ওই ‘কোটি’ ইভেন্টে’র কতোগুলো নিয়ে চিন্তা করেছি গভীর ভাবে? বেশি নয়। বাদবাকি ‘ইভেন্ট’ পড়ে আছে মাথার স্মৃতিকোঠায়। এই চরম ব্যস্ততার যুগে প্রসেসের সময়ের অভাবে মুছে যাচ্ছে মাথা থেকে ওগুলো। একটা একটা করে। তবে যারা ব্যাপারগুলো নিয়ে চিন্তা করেন অথবা তাদের বিশ্রামের সময় প্রসেস হয় জিনিসগুলো। বিকালে একা বসে থাকলে, ‘ফোন আর বই ছাড়া’ হাজারো জিনিস যোগ হতে থাকে ওই ডটগুলোতে। ঘুমালে, হাটলে, জগিং করলে আমাদের অবচেতন মন এই কোটি তথ্যকে ছোট করতে থাকে ভেঙে ভেঙে।

০৯.

এভাবেই তৈরি হতে থাকে একেকটা ‘ফ্লো অফ আইডিয়া’। কয়েকটা ডট মিলে হয় একেকটা ওয়ার্কফ্লো। যুক্ত হতে থাকে ওই ‘ডটেড’ ইভেন্টগুলো। পাশাপাশি। তৈরি হয় ‘বিগ পিকচার’। ওই সময়ে মনে আসে ‘আহা’ মুহূর্তটা! সময় আর অভিজ্ঞতা থেকেই চলে আসে আরো অনেক ‘ডট’। দুটো ‘ডটে’র মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনে নতুন নতুন ‘ডট’ প্রতিদিন। মানে নতুন নতুন প্রসেস করা তথ্য। পেছনের ওই গায়ে গায়ে লাগানো ডটগুলো প্রজ্ঞা দেয় আমাদের তৈরি করতে – সামনের ডট। ভবিষ্যত দেখার প্রজ্ঞা। কিছুটা বুঝতে পারি এখন – কি করতে চাই জীবনে।

[ক্রমশ:]

Everybody has their own level of doing their music. … Mine just happened to resonate over the years, in one way and another, with a significant enough number of people so that I could do it professionally.

—Linda Ronstadt

দ্য ভেরি বেস্ট অফ লিণ্ডা রন্সট্যাড, অ্যালবাম কাভারটাও তুখোড়!

দ্য ভেরি বেস্ট অফ লিণ্ডা রন্সট্যাড, অ্যালবাম কাভারটাও তুখোড়! ভুল বলেছি?

৮৮॰

শুরু হয় গান শোনা – ‘অ্যাবা’ দিয়ে। আহ, কি আনন্দের দিন ছিলো সেগুলো! বড় প্লেয়ার ছিলো না বাসায়। গান বাজনার প্রচলন ছিলো না বলে যন্ত্রটা কেনেন নি বাবা মা। পরে আমাকে একটা ওয়াকম্যান কেনার টাকা দিলেন মা। অনেক দৌড়াদৌড়ি করে কেন হলো একটা ওয়াকম্যান। সস্তার মধ্যেই। ফরওয়ার্ড করা যেতো খালি। রিওয়াইন্ড মানে ওল্টাও ক্যাসেট, ‘প্রেস ফরওয়ার্ড’। ওল্টাও আবার। ‘প্রেস প্লে’! গান ঠিকমতো না পড়লে – ‘রিপিট ফুল সিকোয়েন্স’। কিনলাম সেটাই – পাওয়ার অ্যাডাপ্টার সহ। এতো ব্যাটারি কিনবে কে শুনি? আর ওয়াকম্যানের ‘হেড’ পরিষ্কার? সেটার জন্যও যোগাড় করলাম কিছু স্পিরিট। অল সেট। ক্যাসেট কিনলামও দুটো। ‘সুপার ট্রুপার’ আর ‘ডিপারচার’। বুঝতেই পারছেন প্রথমটা ‘অ্যাবা’র। পরেরটা জার্নি’র। আস্তে আস্তে চলে গেলাম হার্ড রকের দিকে। কিছুটা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে।

৮৯.

আজকের লেখা ‘ডুয়েট’ নিয়ে। ডুয়েটগুলোকে সবসময় মনে হতো ‘মেলো’ ‘মেলো’। মানে পছন্দ ছিলো না আমার। ছেলেদের তো এই ধারার গান পছন্দ হবার কথা না। কেমন যেন ঠান্ডা ঠান্ডা। বয়সের সাথে পাল্টাতে থাকলো থাকলো গানের পছন্দের লিস্ট। আজ আর উল্টাবো না লিস্টটা। কাউন্টডাউন নয়। কবে আবার এই ‘ডুয়েট’ নিয়ে লিখবো তার আছে নাকি ঠিক! মনে আছে ‘লিণ্ডা রন্সট্যাডে’র কথা? সব মিলিয়ে তার অ্যালবাম আছে খুব বেশি না, মাত্র ১২০টা। বিক্রি হয়েছে ১০ কোটির বেশি কপি। বিক্রির দিক দিয়ে পৃথিবীর উপরের দিকের একজন শিল্পী। অপেরা, মুভি সব কিছুতেই আছে সে। তার বায়োগ্রাফীও ছিলো নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার লিস্টে। গানটা নিয়েছি ওর ‘দ্য ভেরি বেস্ট অফ লিণ্ডা রন্সট্যাড’ থেকে। শেষের আগেরটাই এটা। আমার পছন্দের ‘কম্পাইলেশন’ হলেও ‘দ্য বেস্ট অফ’ সাধারণত: কিনি না আমি। গানের ‘সিনার্জি’ নষ্ট হয় ওতে। ভুল বলেছি?

৯০.

বলতে হবে অ্যারন নেভিলের কথা? মানে, যার গলা শুনে মুর্ছা যায় মানুষ। মাল্টি প্ল্যাটিনাম সার্টিফায়েড আরেক গায়ক। যার সাথেই ডুয়েট গায়, সেই হয়ে যায় হিট। আমি জানি – আপনার পছন্দ ‘ডোন্ট নো মাচ’ ডুয়েটটা। আচ্ছা, পৃথিবীর সবাই এক দিকে গেলে আমাকেও যেতে হবে নাকি? তবে, এই গানটা শুনলে মনে পড়ে স্বাতী’র কথা। আমাকে ছাড়াই দিব্যি চালিয়ে নিচ্ছে সংসার, চাকরি। বাচ্চাগুলোর একাধারে ‘বাবা মা’ সে। আর, আমি থাকি বাইরে বাইরে। মনে হচ্ছে – আর নয় বেশিদিন এই বাইরে বাইরে থাকা। করে ফেলতে হবে কিছু। তো, রেডি? এক নম্বরে – মানে ডুয়েটে, ‘অল মাই লাইফ’। ওই দুজনের। গান, তাল আর লয় ভালো না লাগলে ফেরত্‍ কথা আমার! সত্যি! হাই-ডেফিনেশন কোয়ালিটির জন্য বেছে নিয়েছি ভিডিওটা। শুনলেই হবে গানটা। ভিডিও নয়। শুভরাত্রি!

[ক্রমশ:]

If you reveal your secrets to the wind, you should not blame the wind for revealing them to the trees.

— Kahlil Gibran

১২.

গুপ্তচররাই তথ্য লুকিয়ে ঘুরে বেড়ায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে। মাঝে মধ্যে ওই ‘কাগজ’ অন্যের হাতে পড়লেও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় না বলে দেখি আমরা মুভিতে। অথবা স্পাই-থ্রিলার বইগুলো পড়তে গেলে। সচরাচর ধারনা করা হয়, স্নায়ু যুদ্ধের পর ব্যবহার শেষ হয়ে গেছে এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’র। ‘কেজিবি’র ‘শ্লীপার এজেন্ট’দের নিয়ে পড়তে পড়তে আমরাও হয়ে যেতাম একেকজন গুপ্তচর। ওই ছোটবেলায়। ছিলো না খালি নায়িকা। কেউ ‘নায়িকা’ হলেও সে আবার মিলাতে পারতো না গুপ্তচরদের ‘খল’ নায়িকার চরিত্রে। গুপ্তচর হবার খায়েশ ওখানেই শেষ! ‘অ্যানা’কে কেন মরতে হলো ‘গানস অফ নাভারোণ’য়ে – সেটা নিয়েই জল্পনা কল্পনা। বছরখানেক। ‘গ্রেগরি পেক’ আবার হতেও দিলো ব্যপারটা? আর যাই হই – গুপ্তচর নয়। সৃষ্টিকর্তা বোধহয় হেসেছিলেন আড়ালে।

১৩.

সত্যিকার অর্থে, স্নায়ু যুদ্ধের পর ব্যবহার বেড়েছে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’র। বরং হু হু করে। কোম্পানীগুলো একটার পর একটা সাইবার আক্রমনের শিকার হয়ে হারাচ্ছিলো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। গ্রাহকের ‘পরিচয়’ চুরি করে এমন সব কাজ হতে শুরু করলো সেটাতে শুধু টাকা হারানো নয়, হাজারো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে থাকলো সাধারণ মানুষেরা। কে কবে কাকে কি ইমেইল লিখেছিলো সেটাও চলে গেল ওয়েব সাইটে। মানুষের ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও চুরি করে বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে। ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ মানে মানুষের ‘প্রাইভেসী’ নিয়ে চরম টানাটানি। বিটিআরসিতে ‘সাইবার সিকিউরিটি টীম’ চালানোর সময় মানুষের হয়রানি দেখে শিউরে উঠতাম নিজেই। সাত বছর – লম্বা সময়। মানসিকভাবে কষ্ট পেতাম মানুষের ‘অসহায়ত্ব’ দেখে। মানুষের চোখের পানির সামনে নিজেকে অসহায় মনে হতো আরো। ওই কষ্ট থেকে বইটা ধরা। মিলিয়ন ডলারের ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ নিয়ে আলাপ করবো না আমি। ‘ওপেনসোর্স’ হাজারো ‘নিরাপত্তা প্রজেক্ট’ তৈরি হয়েছে মানুষকে সাহায্য করতে। এটা নয় আর রকেট সায়েন্স। অন্তত: আমাদের জন্য। তবে, সবার আগে – কেন দরকার এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’? আর, কিছুটা ব্যাবচ্ছেদ করবো – মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে।

১৪.

আমার অভিজ্ঞতা বলে – মানুষ সবচেয়ে বেশি ‘ওপেন’ মানে খোলামেলা হয় অনলাইনে গেলে। অনেকেই নিজের ভালো মানুষের খোলসটা ফেলে দিয়ে নেমে পড়েন দু:সাহসী কাজে। ‘কেউ দেখছে না’ মনে করে ইচ্ছেমতো সাইটে গিয়ে রেজিস্টার করছেন নিজের লুকানো নাম দিয়ে। ওই ইচ্ছেমতো সাইটগুলো শুরুতেই ঢুকিয়ে দেয় ‘ট্র্যাকিং কুকি’। আপনার কম্পিউটারে। আপনার দুর্দান্ত ‘প্রোফাইল’ তৈরি করে ফেলবে ‘ব্রাউজিং হিসট্রি’ ঘেঁটে। ইনিয়ে বিনিয়ে আপনাকে দিয়েই ডাউনলোড করিয়ে নেবে তাদের পছন্দের সফটওয়্যার। বাকি গল্প থাকছে সামনে। তবে, ওই ‘সাইবার সিকিউরিটি টীম’ চালানোর সময় কিছু শিক্ষিত(!), ভালো অবয়বের মানুষের ‘মানসিক বিকৃতি’ দেখে অবাক হয়েছি বেশি। সাধারণ মানুষের ‘কম্পিউটার নিরাপত্তার’ অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে হেয় করছে তাদের। সামাজিক ও মানসিক ভাবে। দেশছাড়া হয়েও মুক্তি পায়নি মানুষ।

[ক্রমশ:]

There are no secrets better kept than the secrets that everybody guesses.

— George Bernard Shaw

০৭.

পড়ে আছি আফ্রিকাতে। আগেও ছিলাম এখানে। আরেকটা দেশে। বউ বাচ্চা ছেড়ে। পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ছাপ পড়েছে এখানেও। অফিসের কাজ শেষে ‘স্কাইপিং’ করি বাসায়। বিনামূল্যে। বাচ্চারা মায়ের ফোন নিয়ে ওপরতলা নিচতলা করতে থাকে প্রতিনিয়ত। পুরো বাসার ‘ট্যুর’ হয়ে যায় ওদের অজান্তে। কোন রুমের আসবাবপত্র কোন রুমে যাচ্ছে কোন কিছুই এড়াচ্ছে না আমার চোখ। আর্শিয়ার ‘ফ্রোজেন’ আর নাবিলের ‘বিগ হিরো ৬’য়ের পোস্টার কোথায় লাগবে সেটার শালিসিতেও বসতে হলো এখানে বসে। দরকার লাগলে ঢুকে যাই নিজের বাসার নেটওয়ার্কে। চালু করি বাসার কম্পিউটার বা ওয়াইফাই রাউটারটা। টেনে আনি দরকারী ফাইল। বাসার গাড়িটাকে নিয়ে এসেছি হাতের নাগালে। ‘ভার্চুয়াল ফেন্সে’র বাইরে গেলেই মাথা গরম হয়ে যায় ফোনের। সঙ্গে আমারো। এই আফ্রিকায় বসে। ফ্রীজটা বাকি। হয়ে যাবে সেটাও।

০৮.

ফিরে তাকাই পেছনের দিনগুলোতে। অথচ, দশ পনেরো বছর আগে পকেট ফাঁকা করে ফেলতাম কথা বলতে। এই আফ্রিকা থেকে দেশে। তাও শুধু দরকারী কথা। তখন বউ অবশ্য বলতো মিষ্টি মিষ্টি কথা। পাল্টেছে সময়। এখনো বলে। কম। ভাগ্য ভালো, আমার শহরে আছে থ্রীজি সার্ভিস। হাজার টাকায় পাওয়া যায় দুর্দান্ত গতির ইন্টারনেট। হিসেব করে দেখলাম – ইন্টারনেট হচ্ছে আমাদের লাইফলাইনের মতো। ‘ইন্টারন্যাশনাল কল’ করার সাহস করি না আমি। মনের ভুলেও। আমার ধারনা, বাকিদের একই অবস্থা। ধন্যবাদ ‘সিম্ফনী’ আর ‘ওয়ালটন’কে। তাদের সুবাদে – সবার হাতে স্মার্টফোন। ভুল বললাম। একেকটা মিনি কম্পিউটার। আবারো ভুল বললাম। একেকটা শক্তিশালী কম্পিউটার। আমার নিজের ফোনটাই ল্যাপটপ থেকে তিনগুণ শক্তিশালী। স্ক্যান করছে আমার ভাউচার, পোস্ট-ইট পেপার, হাতে লেখা নোট, দরকারী কাগজ, দোকানের বিলের মতো আরো কতো কি! মেডিক্যাল রেকর্ড? ব্যাংক স্টেটমেন্ট? ব্যক্তিগত ছবি তোলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। হাজারো কথা বলছি স্কাইপে। বন্ধুদের সাথে। যারা ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন টাইমজোনে। ইমেইলের পাশাপাশি ‘ইন্সট্যান্ট ম্যাসেঞ্জারে’ রয়েছে হাজারো কথা। সবকিছুই যাচ্ছে পছন্দের ‘ক্লাউড’ সার্ভিসে। ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড থেকে শুরু করে অনেককিছুর পাসওয়ার্ড ইদানিং থাকে ‘ক্লাউডে’।

০৯.

আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন আপনার ইমেইল অন্য কেউ পড়ছে কি না? আপনার ফোন দিয়ে ‘থ্রেট’ কল গিয়েছে কখনো? ‘ভয়েস সিন্থেসিস’ করে দেখা গেলো গলা আপনার! আপনার কম্পিউটারের দরকারী ফাইলটা আরেকজন পড়ে চুপটি করে রেখে দিয়েছে কি না? আপনার উইনডোজের ‘ক্রিটিক্যাল’ সিষ্টেম ফাইল পাল্টে যায়নি যে তার গ্যারান্টি কি? বছর খানেক ধরে আপনার কম্পিউটারে যা কিছু টাইপ করেছেন সেটার ‘কী-লগার’ ফাইল যাচ্ছে কোথায় – জানেন আপনি? আপনার ল্যাপটপের ‘মাইক্রোফোন’ আর ‘ওয়েবক্যাম’ আপনার অজান্তে চালু থাকে কি না? আপনার ফোনের ক্যামেরা দুটো আর মাইক্রোফোন? ইন্টারনেট হচ্ছে ওধরনের একটা ‘গ্লোবাল দেশ’ যেখানে ‘কেউ’ চাইলে নজরদারী করতে পারে আপনার প্রতিটা মুহূর্ত। যাচ্ছেন কোথায়, কি বলছেন, কি করছেন। সব।

হতাশ?

১০.

‘এভরি ক্লাউড হ্যাজ আ সিলভার লাইনিং’! আছে সুখবর। এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ যেভাবে অন্যের পড়ার অযোগ্য করে দিতে পারে আপনার ফাইলকে, সেভাবে ‘নিশ্চিত’ করতে পারে আপনার ‘অনলাইন’ পরিচয়। মানে ‘থ্রেট’ ইমেইলটা করেননি আপনি। ভয়েস সিন্থেসিসে ‘সিগনেচার’ মিলেনি আপনার। কম্পিউটারের হাজারো ফাইলের (সিষ্টেম ফাইলসহ) যেকোন একটা পাল্টালে আগে জানবেন আপনি। আপনার প্রতিটা ডকুমেন্টকে রাখবে যথেষ্ট নিরাপত্তার সাথে। হাতের শক্তিশালী কম্পিউটার মানে স্মার্টফোনটা হাতছাড়া হওয়া মাত্র ‘মুছে’ যাবে সমস্ত ডাটা। অবশ্যই, আপনি চাইলে। ‘এনক্রিপ্ট’ করা থাকলে খুলতেও পারবে না – কি আছে ফোনে। খুশি তো? আপনি না জানলেও ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার খাতিরে অপারেটিং সিষ্টেম কোম্পানীগুলো নিজে থেকে উইনডোজ, অ্যান্ড্রয়েড, ‘আইওএস’এর সাথে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ ব্যবহার করছে আগে থেকেই। তবে সেটার অনেকাংশ নির্ভর করে ব্যবহারকারীদের ওপর। আপনি কম্বিনেশন লক কিনলেন ঠিকই, তবে সেটা রাখলেন ‘ফ্যাক্টরি ডিফল্ট’ ০০০০। হবে কি কাজ? তালা দিয়ে দিয়েছে কোম্পানী, আপনি না লাগালে ওদের দোষ দিয়ে লাভ হবে কি? আর তারা তো দেবে বেসিক টূল, সেটা তো করবে না সব কাজ।

১১.

আমরা মানে ‘মর্টাল’রা ‘এনক্রিপশন’ আর ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ শব্দগুলোকে যে যেভাবে পারি – ব্যবহার করি। হাজার হোক, ফ্রী কানট্রি! কার ঘাড়ে দুটো মাথা আছে আপনার সাথে তর্ক করার? দুটোর ব্যাপারটা আলাদা হলেও এটাকে সঙ্গায়িত করা যেতে পারে ব্যকরণ দিয়ে। আবার জুলিয়াস সিজার যেটা ব্যবহার করতেন সেটাকে আমরা বলতাম জুলিয়াস ‘সাইফার’। তাহলে শব্দ এসে দাড়ালো তিনটাতে। ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ হচ্ছে ওই বিজ্ঞান যেটা আলোচনা করে ‘গোপন’ যোগাযোগ নিয়ে। এটা বিশেষ্য পদ। মানে নাম পদ। আমরা যদি ‘রুট’ওয়ার্ডে যাই, এটা হবে দুটো শব্দ। ‘ক্রিপ্টো’ আর ‘গ্রাফী’। ‘ক্রিপ্টো’ হচ্ছে গুপ্তকথা অথবা লুকানো কথা। আর ‘গ্রাফী’টা হচ্ছে ওই যোগাযোগটাকে লুকানোর একটা পদ্ধতি। মানে যেভাবে ওই গুপ্তকথাকে লুকিয়ে আরেকজনের কাছে পাঠানো হয় সেই বিজ্ঞানটাই আমাদের গল্প। আর ‘ক্রিপ্ট’ করাকে বলা হচ্ছে ‘এনক্রিপশন’। ‘এন’ মানে হচ্ছে ‘টু মেক’। তৈরি করা। তথ্যকে অন্যের জন্য ‘হিব্রু’ বানিয়ে ফেলা। নতুন গল্প দিচ্ছি না তো আবার? এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড?

[ক্রমশ:]

Cryptography is the ultimate form of non-violent direct action.

― Julian Assange

০১.

আমরা এগুচ্ছি কিন্তু। দুনিয়ার সাথে তাল না মিলিয়ে যাবেন কোথায়? সমস্যা থাকবে সাথে। আর সমস্যা নেই কোথায়? তবে বাসায় বসে অনলাইনে কেনাকাটা করতে পারাটা যে কতো ‘লিবারেটিং’ সেটা আমার থেকে আপনি জানেন ভালো। শুক্রবার সকালের ঘুম বাদ দিয়ে বাজারে দৌড়ানো? অন্য কারণে না হলেও বউয়ের ঝামটা খেয়ে নিজের গজগজটাও গিলে খেয়ে ‘বাজারে যাওয়া’ বন্ধ করার ‘সিষ্টেম’ মনে হয় দাড়িয়ে গেছে, কি বলেন? অনেকেই বাজার পাচ্ছেন বাসায় বসে। ঢাকায়। বাসার ‘কমফোর্ট জোনে’ বসে মানে বউ বাচ্চার শান্তি’র ‘কিচির মিচির’এর মধ্যে অর্ডার দেয়া অনলাইনে। ভুল বলেছি? গলায় ঝুলছে দুজন, দুপাশ থেকে। ওই টানাটানিতে মনের ভুলে ‘ধুন্দল’ অর্ডার দিলেন দু কেজি। ‘পই পই করে বললাম এক কেজি। বাকিটা খাবে কে?’ ‘ঝাপটা’ একটাও মাটিতে পড়লো না কর্তীর কাছ থেকে! হেভেনলী!

০২.

বাসার কাজের সাহায্যকারী মেয়েটার বেতন পাঠাতে হবে তার পরিবারকে। কি হতো আগে? খুঁজে বের করো তার আত্মীয় স্বজনকে। কে থাকে ঢাকায়? কবে যাবে দেশে? বসে থাকো তার দেশে যাবার সময়ের জন্য। বাস ভাড়া দাও যাওয়া আসার। আর এখন, “খালু, ‘বিকাশ’ করে দিয়েন আজ।” সময় পাল্টেছে, সহজ হয়ে যাচ্ছে কাজ। ঘরে বসে অনেক কাজ সেরে ফেলতে পারছি আমরা। ই-কমার্সের যুগে সবাই কেনাবেচা করতে পারেন বলে অনেকেই হতে পারছেন ‘উদ্যোক্তা’। ধরা যাক ‘বিজনেস রাইটিং’য়ে দক্ষতা আছে কিছুটা। আমার। একটা সাইট খুলে বাসায় বসে শুরু করা যায় ব্যবসাটা। বাইরের ক্লায়েন্টের জন্য লিখে দেবো চমত্কার চমত্কার চিঠি, এক দিনে ডেলিভারী, একশো টাকা। আর্জেন্ট মানে দু ঘণ্টায় হলে – দুশো টাকা। দুর্দান্ত, তাই না? গেম চেঞ্জার হচ্ছে এই ইন্টারনেট। আর তার ইকোনমি।

০৩.

আগে চুরি হতো সিঁধ কেটে। ওখানেও পাল্টেছে যুগ। ইন্টারনেট ভরে যাচ্ছে বুদ্ধিমান ‘চোর’ দিয়ে। কেনাকাটা করছেন আপনার প্রিয় সাইটে। টাকা পয়সার বিত্তান্ত দিলেন জিনিসটা পাবার জন্য। সপ্তাহ খানেক পর ব্যাংক থেকে জানলেন আরো অনেক কিছু কেনাকাটা করেছেন আপনি। ভাষা হারিয়ে ফেললেন কয়েক মুহূর্তের জন্য। অর্ডারের জিনিসই পাননি এখনো। এদিকে বলে কি ব্যাংক? মানে, টাকা হওয়া। টাকা পাঠালেন মোবাইল করে, বন্ধুকে। টাকা গিয়েছে ঠিকই। তবে তুলে নিয়েছে আরেকজন। আগে ইমেইলে কি পাঠাতেন – সেটা জেনে যেতো অন্যরা। আবার, হটাত্‍ করে ইমেইল পেলেন প্রিয় বন্ধুর কাছ থেকে, আটকে পড়েছেন আফ্রিকার একটা দেশে। পকেটমার হয়ে গেছে সব কিছু, ফিরতে পারছেন না টাকার অভাবে। বন্ধুর সাথে কি কথা বললেন ফোনে, সেটাও চলে এলো ইউটিউবে। ল্যাপটপ বসে আছে কিন্তু আপনার বাসায় বা অফিসে। কোম্পানীর গুরুত্বপূর্ণ ফাইল কিভাবে যেন চলে গেছে আরেকজনের হাতে।

০৪.

আগে এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে টাকা পাঠাতে ‘হুলুস্তুল’ ঝামেলা করতো ব্যাংক কতৃপক্ষ। ভল্টের মতো গাড়ি, গুলিভরা বন্দুক সমেত গার্ড। সামনে পেছনে পুলিশ। ওটাতো ‘ফিজিক্যাল’ টাকা। এদিকে প্রতিমূহুর্তে বিলিয়ন ‘ভার্চুয়াল’ টাকা পাড়ি দিচ্ছে হাজারো নেটওয়ার্ক। যাচ্ছে এই ‘ইন্টারনেট’ নামের রাস্তা দিয়ে। সেটার কি হবে? কে দেবে সেটার নিরাপত্তা? তার ওপর ইন্টারনেটে নেই কোন ভৌগলিক সীমারেখা। অন্য দেশ থেকে আমাদের দেশ হয়ে যদি চুরি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারো টাকা? কি হবে তখন? কোম্পানীগুলো বিলিয়ন ডলার ঢালছে তাদের ই-কমার্স ইনফ্রাস্ট্রাক্চারে। তার থেকেও বেশি ঢালছে সেটার নিরাপত্তার খাতিরে। ‘ব্যক্তিগত ফাইল’ বলে হেলাফেলা করে মানুষ হচ্ছে বিব্রত – প্রতিনিয়ত।

০৫.

জেমস বন্ডের ছবিতে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’র গল্প দেখে ধারনা হতেই পারে অন্য কথা। গুপ্তচরদের টেকনোলজি নিয়ে কি করছি আমি? বিপদে ফেলার ফন্দি করছি নাকি আবার? ওগুলো তো ব্যবহার করে সামরিক বাহিনী। ঠিক ধরেছেন! জুলিয়াস সিজার এই কাজ শুরু করেন খ্রীষ্টজন্মের ৫৮ বছর আগে। দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য তো ব্যবহার করবেই এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’। ইন্টারনেট ইকোনমি’র জন্য অনেক হিসেবই পাল্টে গেছে এই দশকে। অ্যাপল, হ্যা, কোম্পানী অ্যাপলের কথা বলছি। তার ‘ভ্যালুয়েশন’ মানে দাম হচ্ছে মাত্র ৭০০ বিলিয়ন ডলার। আবার ‘ক্যাশ’ হিসেবে তার হাতেই আছে মাত্র ১৭৮ বিলিয়ন ডলার। এই ফেব্রুয়ারীর শুরুর কথা। এই টাকা কিন্তু নিউজিল্যান্ডের জিডিপি’র সমান। ঝেড়ে কাশি। ‘অ্যাপল’ যদি কোন দেশ হতো আজ, ৫৫তম ধনী দেশ হিসেবে নাম হতো তার। বাকি কোম্পানীগুলোর কথা বাদ দিলাম আজ। দেশ যেখানে তার নিরাপত্তায় যে ধরনের ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’ ব্যবহার করবে, তার থেকে কোন অংশ কম করবে এই কোম্পানীগুলো – শুনি?

০৬.

ভড়কে দিলাম নাকি? গল্প বাদ, পরিচিত হওয়া যাক আমাদের ‘ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’ এই ‘ক্রিপ্টোগ্রাফী’র সাথে। অনেকে বলবেন ব্যাপারটা সহজ নয় অতো। আমি আছি কি করতে? পানি বানিয়ে ফেলবো – এই আপনাদের জন্য। শুরু করেছি কিন্তু ওই নব্বইয়ের দশকে। আপনারা চাইলে বই হয়ে যাবে এটা! রেডি?

[ক্রমশ:]

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 417 other followers

%d bloggers like this: