Feeds:
Posts
Comments

Archive for July, 2013

Such knowledge, Wal-Mart has learned, is not only power. It is profit, too.

– The New York Times, 2004

৩৩.

গ্রিক পৌরাণিক কাহিনীর মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি বলে তার কিছু ছায়া দেখতে পাই সব জায়গায়। সব দোষ ওই পত্রিকাটার। কি যেন নাম পত্রিকাটার? কিশোর বাংলা? কিশোর বয়সে ওই পুরানো গল্পের জন্য অপেক্ষা করতাম সপ্তাহের পর সপ্তাহ। আহা, কি যে দিন ছিলো তখন! মানে হয় কোনো? মাথাটা আরো খারাপ হলো আর্শিয়ার জন্য কেনা ‘দ্য লাইটনিং থীফ’ পড়ার পর। পার্সি জ্যাকসনকে পরের দুনিয়াতে নেয়া হলে মানুষ সম্পর্কে সে যে উক্তি শোনে তা থেকে অনেক ধরনের ধারণা মাথায় ঘুরপাক খেলেও ওদিকে যাবো না আর। ‘মানুষ সেটাই দেখে যেটা সে দেখতে চায়’ কথাটা যুক্তিবিদ্যার বাইরের মর্টালদের জন্য প্রযোজ্য হলেও বর্তমানে ভবিষ্যতদ্বানির ব্যবস্যা গেছে অন্য মাত্রায়। পেশা আর নেশা এক হলে সমস্যার অন্ত নেই। ভাগ্যগণনায় বিশ্বাস করতাম না বলে আবার সেই ভাগ্যের ফেরে জ্যোতিষী বনে গেলাম নিজেই। অফিসের কাজের ফাঁকে অন্যের হাতের রেখা না দেখলেও গণকের কাজটা খারাপ নয়।

টিয়ে পাখি?

সরকারীভাবে বন্য পাখি রাখা বারণ। তবে, এক্সেলশিট টিয়ে পাখির মতো না পারলেও একবারে খারাপ নয়।

৩৪.

কারো পৌষমাস, কারো সর্বনাশ কথাটা আমাদের কোথায় প্রযোজ্য সেটা খুঁজতে যেয়ে বাসার পোষা টিয়ে পাখি উড়ে বসলো দেয়ালে ঝোলানো নাবিলের ওয়ার্ল্ডম্যাপে। একি, ওমা – ফ্লোরিডা? না, মাথা ঝাঁকিয়ে ঠোট ফেললো আরকানসাসের ওপর। বেন্টনভিল?

তো, হয়েছে কি তাতে? টিয়ে কে প্রশ্ন। ওয়ালমার্ট স্টোর। পরিস্কার জবাব। আমার বিরক্তি চরমে। মুখে না বললেও কপালের ভাঁজে প্রকাশ পেলো।

আরে বেটা, টিয়ের স্বরে বিরক্তি ‘করো গুগল’!

চালু হলো গুগল ভয়েস সার্চ।

৩৫.

উত্তর এলো হ্যারিকেন ফ্রান্সিস। টাইমলাইন – দুহাজার চার সাল। জট খুললো শেষে। আটলান্টিকের ধার ধরে হ্যারিকেনের পূর্বাভাসে সব মানুষের আত্মারাম খাঁচাছাড়া। দুর্যোগ মোকাবেলায় দরকারী কিছু কিনতে এসে খালি হাতে মানুষ না ফেরে সেটা জানতে ভাগ্য গণনার আশ্রয় নিলো বেন্টনভিলের সব ওয়ালমার্ট স্টোরগুলো। স্টোরে যা আছে তাই বিক্রি হবে সে ভাবনায় বসে না থেকে মানুষ কি কিনতে পারে আর তার পর্যাপ্ত স্টক আছে কিনা সেটা নিশ্চিত করার জন্য ডাকা হলো টিয়েকে। ওদের টিয়া পাখি কিন্তু সাদা রঙের, প্রতিটা জিনিস বেচার সময় ঠোকর না দিয়ে ‘বিপ’ শব্দ করে। চোখ দিয়ে লাল রশ্মি দিয়ে জিনিসের বারকোড খোঁজে। ‘বিপ’ শব্দের পর শুরু হয় আসল খেলা। মানুষের প্রতিটা কেনাকাটার উপর তার অন্তরঙ্গ ডিটেলস ম্যাপিং হয়ে তৈরী হচ্ছে তার ভবিষ্যত কেনাকাটার লিস্টি। সে কি কিনবে সামনের সপ্তাহে বা মাসে সেটা বলে দিতে পারে এই টিয়ে পাখিটা। কার শ্যাম্পু, সাবান, সফট ড্রিংকসের কেস আর দুধের সাপ্লাই শেষ হবে কবে আর তার ভবিষ্যত কেনাকাটার লিস্টি আগে ভাগে ইমেইলে বা এসএমএসে গ্রাহককে পাঠিয়ে ভয় না দেখিয়ে তার দরকারী জিনিসে ডিসকাউন্ট দিয়ে সারছে কাজ। কয়টা মুরগির ডিম পাড়াতে হবে, কতো টন সবজি উত্পাদন করতে হবে, নতুন কোন প্রোডাক্ট আপনাকে গছাতে হবে, দিনে কয়বার দাঁত মাজবেন আর কিভাবে মাজবেন তার সব হিসেব আসে ওই টিয়ের পেট থেকে। কার ঘর আলো করে সন্তান আসবে তাও ডাক্তারের আগে জানে টিয়ে। কি কি অসম্ভব সেটা জানালে তাকে সম্ভব করে দেখাবে সেই টিয়ে।

৩৬.

ফিরে আসি হ্যারিকেন ফ্রান্সিসে। মাস দুয়েক আগের হ্যারিকেন চার্লির ডাটা নিয়ে বসলো টিয়ে। তাজ্জব বনে গেলো ওয়ালমার্ট। ধারণা করেছিলো বিক্রি বেশি হবে টর্চলাইটের। টিয়ের হিসেব অন্য। ছবি গুগল করুন “স্ট্রবেরী পপ টার্ট”, কেল্লোগের প্রি-বেকড টোস্টার প্যাস্ট্রি! বিক্রি হয়েছিলো দশগুন হারে! প্যাকিংয়ে পরিবর্তন নিয়ে আসা হলো রাত পার হবার আগেই! ছয়টা নিয়ে এক একটার প্যাক। পরিবর্তন আসলো বিয়ারের প্যাকিংয়েও। জানা গেলো “হ্যারিকেন-পূর্ব” টপ সেলিং ব্র্যান্ডগুলোর নাম আর কতগুলো করে কেনে মানুষ সেগুলো। ইন্টারস্টেট নাইনটিফাইভ রাস্তা ভরে গেলো বিজে এন্ড দ্য বিয়ারের ট্রাকের মতো শত ট্রাকে। হ্যারিকেন ফ্রান্সিসের আগে পৌছাতে হবে ওয়ালমার্ট স্টোরগুলোতে।

এতো কিছু থাকতে স্ট্রবেরী পপ টার্ট? মানুষ বড়ই বিচিত্র!

Advertisements

Read Full Post »

No problem can be solved from the same level of consciousness that created it.

– Albert Einstein

২৯.

কিছুটা সময় পেলাম ঘর গোছানোর জন্য। গোছাতে গিয়ে হাতে পড়লো ব্রডব্যান্ড কমিশনের একটা রিপোর্ট। ছোট কিন্তু মন ভালো করা রিপোর্ট। হাজার মানুষের প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরী করা হয়েছে দুহাজার দশের লিডারশিপ মানে নীতি নির্ধারণীদের জন্য এই ডিক্লারেশন। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের সাথে এর সংযুক্তিটাই বোঝানো হয়েছে প্রতিটা পাতায় পাতায়। প্রযুক্তির ‘প’ নেই এ রিপোর্টে। দারিদ্র্যতা, স্বাস্থ্যসেবা, সবার জন্য শিক্ষা, জেন্ডার ইকুয়ালিটি আর জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে ব্রডব্যান্ড কিভাবে সাহায্য করতে পারে সেটাই বলা আছে এখানে। বাংলাদেশকে পাল্টাতে হলে যে প্রজ্ঞা দরকার তার প্রায় সবটাই দেয়া আছে এখানে। বাকিটা হোমগ্রোন। ব্রডব্যান্ড কমিশনে কমিশনার হিসেবে আছেন পৃথিবীর হু’জ হুর সবাই – যারা পৃথিবীকে পাল্টাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। সেই পঞ্চাশের লিস্টে আছেন বাংলাদেশ থেকে একজন।

৩০.

মন ভালো হয়েছে আরেকটা কারণে। এক্সিকিউটিভ সামারি শুরু হয়েছে যে বাণী দিয়ে সেটা ব্যবহার করা হয়েছে উপরে। এই চরম সত্য কথাটার প্রতিফলন দেখি আমার কাজের পদে পদে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো সমস্যার সমাধানে আগের নলেজবেস খাটিয়ে সাময়িকভাবে উতরে গেলেও লম্বা দৌড়ে সেটা বিফলে পর্যবসিত হয়। রিসার্চে কোনো পয়সা খরচ না করে আগের বিদ্যায় অল্প সময়ে সমস্যার উত্ড়ানোর ব্যবস্থা করে বরং তা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। ‘জিরো এরর সিন্ড্রোমে’ বিফলতার স্বাদ নিতে পারিনা বলে সফলতার কিভাবে আনতে হবে তাও জানি না আমরা। কোথায় যেনো পড়েছিলাম যে ব্যবস্যা আর নিজের জীবনে হোক – সমস্যা মানুষকে মারে না, বরং সেই সমস্যাকে অগ্রাহ্য বা অস্বীকার করেই মরে।

৩১.

ফিরে আসি আইনস্টাইনের কথায়। যেকোনো সমস্যার সমাধান কখনই যে লেভেলে সেটা তৈরী হয়েছে সেই একই লেভেলে সমাধান সম্ভব নয়। সমাধান চাইলে সমস্যাটা থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে নিজেকে – পুরোপুরি। আর অন্য লেভেলে গেলে সেটার সমাধানের চেষ্টাটা ব্যর্থ হলেই জানা যাবে তার আন্টিডোট। সমস্যাটার মধ্যে সমাধান লুকিয়ে থাকে বলে সমস্যায় থাকা অবস্থায় সেটা দেখা যায় না। তার জন্য বের হয়ে আসতে হবে সমস্যার অঞ্চল থেকে। অবজার্ভারের ভুমিকায় আসতে হবে নিজেকে। তাহলেই দেখতে পারবেন তার সমাধান – নিরপেক্ষভাবে। সেই জিনিসটার সাথে ভালবাসায় থাকি বলে সেটা থেকে বিযুক্ত হতে পারি না। ফলে, সমস্যাটার আসল সমাধান পাওয়া যায় না সে মুহুর্তে। যে জাতি সেলফ ক্রিটিসিজম নিতে পারে তারা থাকবে সব সময় উপরে। পয়সার অপর পিঠ দেখতে চাইলেই দেখতে পারবেন, তার আগে নয়। সেলফ ক্রিটিসিজম মানে হচ্ছে নিজেকে অন্য লেভেলে বা পার্সপেক্টিভে নিয়ে বিচার করা। এনালজি নিয়ে আসি কি বলেন? গাছের লতাপাতার জন্য আপনি পুরো বনটাকে দেখতে পাচ্ছেন না বলেই আপনাকে বের হতে হবে গাছের নীচ হতে। গাছের উপরে উঠুন – অন্য গাছের সাথে তুলনা করতে পারবেন তখনি!

৩২.

প্রযুক্তিবিদগণ নীতি নির্ধারণীতে থাকলে কিছু ভীতিকর কাজ হয় বলে আমি এ বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে বিব্রত বোধ করি কিছুটা। নীতি নির্ধারণীতে অর্থনীতির ধারণাসম্পন্ন মানুষ দেশের ভালো করে বেশি। প্রযুক্তিবিদরা সমস্যার সমাধানে তার তৈরী করা সেই প্রসেসের ভালবাসায় পড়েন বলে সেটার সমাধান এড়িয়ে যেতে পারে তাদের চোখ। নিরপেক্ষ মানুষের কাছে সমস্যাটা ধরা পড়বে সহসায়। শিক্ষা সবার থাকা জরুরী, তবে প্রজ্ঞা নয়। উৎকর্ষতার শীর্ষে থাকা দেশগুলো চালান কজন? বেশি কি? আমাদের দরকার কতজন? প্রজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারছেন যতোজন। আমার ধারনা, সমস্যা সমাধানে ভালবাসা কাজ করে না। ভালবাসার কাঙ্গাল হিসেবে আমরা খুবই আবেগপ্রবণ জাতি। সেটার প্রয়োগক্ষেত্র কিন্তু ভিন্ন।

আমি কোন জন?

প্রযুক্তিবিদ না অর্থনীতিবিদ? অথবা ভালবাসায় অবিশ্বাসী কেউ?

চমৎকার বৃষ্টি পড়ছে বাইরে।

যাবেন নাকি আমার সাথে?

Read Full Post »

‘Who controls the past,’ ran the Party slogan, ‘controls the future: who controls the present controls the past.

– George Orwell, Nineteen Eighty-Four, 1948

Because sometimes things happen to people, and they’re not equipped to deal with them.

– Suzanne Collins, The Hunger Games trilogy

২৭.

বই লিখছি দুটো একসাথে। এর মধ্যে কিভাবে যেনো ঢুকে গেলো বিগ ডাটার গল্প। হাত ঘুরছে বিলিয়ন ডাটা আমাদের – প্রতিনিয়ত, করছি কি কিছু আমরা? এই বিলিয়ন ডাটার তথ্যভান্ডারের ব্যবহারের উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যত। যতো তাড়াতাড়ি একে আত্মস্থ করতে পারবো ততো উপরে উঠবো আমরা। আমার হাতের এক্সেল সীট যদি দুতিন বছর পরের প্রজেকশন দিতে পারে তাহলে দেশ চাইলে পারবে না কেন তিরিশ থেকে পঞ্চাশ বছর পরের ভবিষ্যতদ্বানী করতে – এই বিগ ডাটার সাহায্যে। দক্ষতার বিকল্প নেই আজকে। মনটা ভালো যাচ্ছিলো না গত কয়েকদিন ধরে। এর মাঝে ঢুকে গেলো ‘স্কাইলার গ্রে’| মানে তার ডেমো টেপ। গানটার নাম ‘লাভ দ্য ওয়ে ইউ লাই’| রিপিট মোড: ফরএভার! ঘরে নিগৃহীত হবার কষ্টকর গান এটা। আমাদের দেশে এর হার বেশি বটে।

২৮.

ফিরছি বই লেখায়। সাহায্য নেবার কথা ভাবছিলাম বিগ ডাটার। অন্যভাবে নেবেন না অনুগ্রহ করে। বই পড়ছেন আপনি, মনের ভেতরে ঢুকতে পারলে বইটাকে আপনার পছন্দমতো লিখতে পারতাম আমি। আমি জর্জ অরঅয়েলের ‘নাইনটিন এইটিফোরে’র টেলিস্ক্রীনের কথা বলছি না এখানে। ‘বিগ ব্রাদার’এর নজরদারী না চাইলেও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আপনার মনের অবস্থা জানতে পারছি – প্রতিমুহুর্তে। কোন বইটা পড়ছেন সে ব্যাপারে স্টেটাসও পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। ধরে নিচ্ছি আমার বইয়ের প্রোটাগনিস্টএর নাম দীপ্তি। তার প্রথম সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করতে পারেন আপনারাই। দ্বিতীয় সম্পর্ক নিয়ে অতি সাবধানী হতে যেয়ে শান্তুনু ভুল বুঝলো দীপ্তিকে। সরে গেলো সে। আপনিও অসহিষ্ণু হয়ে পড়লেন দীপ্তির ভুলের মাত্রা নিয়ে। দীপ্তির কষ্ট নিতে পারছেন না আর। মনে মনে চাইলেন তৃতীয় সম্পর্কটা নিয়ে অন্ততঃ ঠিক সিদ্ধান্তে পৌছাবে দীপ্তি। সেটা কি পারবে দীপ্তি?

২৯.

কোটি লোকের মতো আমিও ঝাঁপ দিয়েছি ই-বুক রিডারে। বিলিয়ন বিলিয়ন বই ডাউনলোড হয়ে গেছে এর মধ্যেই। কি বই পড়ছি আমি, কার বই পড়ছি সেটা জানে আমাজন, কোবো আর বার্নস এন্ড নোবল। আমার উইশলিস্ট ঘেঁটে বের করেছে কি পছন্দ করছি এমুহুর্তে। কোন বইটা পড়তে গিয়ে আরেকটা বই ধরেছি আমি। জর্জ অরঅয়েলের বইটা পড়তে গিয়ে কতোবার ব্রেক নিয়েছি বা কোন বইটা এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলেছি সব জানে আমাজন। কোন বইয়ের ‘মুখবন্ধ’ না পড়েই পরের অধ্যায়ে গিয়েছি আর কোন বই কতো সিটিংয়ে পড়েছি সেটা আর বাদ থাকবে কেন? কোন পাতাটা মানুষকে সেই বইটা ছুড়ে ফেলে দিতে বাধ্য করেছে সেটা জানতে আপত্তি থাকার কথা নয়। বই পড়তে গিয়ে দাগাদাগি করি বলি বন্ধুরা ধার দেবার আগে সতর্ক করলেও কিন্ডলে সেটা করা যায় ইচ্ছামতো। হাঙ্গার গেমসের দ্বিতীয় বই ‘ক্যাচিং ফায়ারে’ আমার পছন্দের লাইন হাইলাইট করতে গিয়ে দেখি মারাত্মক অবস্থা। আমার আগে বিশ হাজার লোক দাগিয়েছে ওই লাইনটা। টের পেলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দাগাদাগি করা প্রথম দশটা লাইনের ভেতরে আটটাই হচ্ছে কষ্টের! কোন বইটা পড়ছি বার বার আর কোনটাতে দশ পাতাও এগোইনি সেটা জানে আমার ইলেকট্রনিক পাবলিশিং কোম্পানি।

৩০.

ধারণা করছি দীপ্তির গল্পের এন্ডিং হতে পারে চারটা। এটা নতুন কিছু নয়। ‘দ্য বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ মুভিটাতে দ্বিতীয় এন্ডিংটাই বরং কাঁদিয়েছে মানুষকে বেশি। ইভান, গল্পের নায়ক যাই করে তার ফলাফল তার কাছের মানুষকে ভোগ করতে হয়। আসল এন্ডিংয়ে ইভান ইচ্ছা করেই বান্ধবী কেইলীকে তার ওপর খেপিয়ে তোলে যাতে সে নিজে থেকে দুরে সরে যায় তার কাছ থেকে। ইভানের এই বিসর্জন বাঁচিয়ে দেয় কেইলীকে তার অসুস্থ মানসিকতার ভাই আর বাবার নিষ্ঠুরতা থেকে। অন্য এন্ডিং আরো ভয়ঙ্কর। ইভান তার জন্মের সময়ই মায়ের আম্বিলিক্যাল কর্ডে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। পরবর্তিতে তার মা আর বাবার চমত্কার মেয়ে হয় আরেকটা। সেখানে তারা একটা ভালো জীবন পায় ফিরে। নাম ‘কলোকুই’, নতুন ডিজিটাল পাবলিশিং হাউস – যার বইয়ের সিরিজগুলো পাল্টে যায় পাঠকদের মনস্তাত্ত্বিক আচরণের উপরে। লেখিকা টনা ফেন্সকের ‘গেটিং ডাম্পড’ সিরিজ উপন্যাসটার গল্প পাঠকদের মর্জির উপরে নির্ভর করে এগিয়ে চলে। গল্পের নায়িকা তার তিন ছেলে বন্ধুর কার সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটাবে তার ধারনাটা পাঠকদের কাছ থেকে পেয়ে সে এগোয়। পাঠকও খুশি, লেখিকাও। তিন নায়কের মধ্যে কে ‘জেজে’কে পাবে আর কাকে জেলে পাঠাতে হবে সেটা লেখিকা লিখে ফেলেছেন প্রায়। পরে দেখা গেলো জেজে’র বয়ফ্রেন্ড ডানিয়েলকে পছন্দ করছে তিরিশ শতাংশের বেশি পাঠক। ডানিয়েলকে বাদ দেয়া সম্ভব হলো না পরের বইয়ে। ‘গ্রেট এস্কেপস’ সিরিজের বইগুলোতে পাঠকদের পছন্দের [বিগ ডাটার কাজ] কারণে নায়ককে শুধুমাত্র লম্বাই করা হয়নি তার চুলের রঙ আমাদের মতো কালো, সবুজাভ চোখ আর আরো অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। ধন্যবাদ, বিগ ডাটা!

৩১.

হ্যারি পটার খ্যাত জেকে রোলিং হ্যারিকে বাদ দিয়ে ‘ক্যাজুয়াল ভ্যাকেন্সী’ বইটা লিখেছিলেন নিজেকে চেখে দেখার জন্য। পরের চেষ্টাটা আরো ভয়ঙ্কর! রবার্ট গ্যালব্রেইদ ছদ্দনামে একটা ক্রাইম নভেল লিখেছিলেন রোলিং – নাম “কুকু’স কলিং”| যা হবার তাই হলো। বেশ কয়েকটা রিজেকশন লেটার, পরে এক পাবলিশিং হাউস চেষ্টা করে দেখতে চাইলো। বিক্রিও হলো  কোন রকমে পনেরশো কপি। এক রিপোর্টারের সন্দেহ হলো। লেখার প্যাটার্ন আর লেখকের শব্দ বাছাই করার ধারণা থেকে যোগাযোগ করা হলো এধরনের একটা সফটওয়ারের লেখকের সাথে যিনি একাধারে ইউনিভার্সিটিরও প্রফেসর। সিগনেচার, নামেই যার পরিচয় – সফটওয়্যারটা একটা বাক্যের তার শব্দের ব্যবহার, বাক্যগুলো কতো বড় ছোট, প্যারাগ্রাফগুলো কি ধরনের, যতিচিহ্ন মানে দাড়ি, কমা, সেমিকোলন কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা বের করতে ওস্তাদ। আর তার সাথে একেকটা লেখকের প্যাটার্নের ধারণা পাওয়া যায় এ ধরনের শব্দব্যাঙ্কের সাহায্য নিয়ে শুরু হলো তার প্যাটার্ন এনালাইসিস। বিগ ডাটা দিয়ে পাওয়া গেলো আসল লেখিকার নাম। পত্রিকায় খবরটা বের হলো সেদিনই। জেকে রোলিংও সেটা মেনে নিলেন তার ওয়েবসাইটে। সেদিনই চলে গেলো বেস্টসেলার লিস্টে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের হিসেব মতে ‘মকিংজে’, হাঙ্গার গেমসের তৃতীয় বইটা মানুষ পড়েছে সাত ঘন্টায়। মানে, সাতান্ন পাতা প্রতি ঘন্টায়। আর এই বইটা পড়ার আগে প্রায় সবাই প্রথম বইটা ডাউনলোড করে পড়েছে। এর চেয়ে আরো অন্তরঙ্গ মানে ভেতরের ডাটা নিয়ে কাজ করছে পাবলিশিং হাউসগুলো। চমকে দেবার মতো লেখা নিয়ে আসব শিগগিরই!

অনুরোধ করবো কি একটা?

পড়বেন নাকি ‘নাইনটিন এইটিফোর’ বইটা?

Read Full Post »

“Change the way you look at things and the things you look at change.”

Wayne W. Dyer

২৪.

ডাক্তারের চেম্বারে আছি বসে। চোখের ডাক্তার। কাজের দিন হওয়াতে মানুষ বলতে আমি আর ব্রিজিত। সকাল বলে হয়তোবা। আটটার মতো বাজে। তাকে চিনতামও না মিনিট পাঁচেক আগে। ডাক্তার আমাকে দেখেছে মিনিট দশেক হলো। পরের টেস্ট এক ঘন্টা পরে। মেয়েটা সুডোকু খেলছে আপন মনে। জানতামও না সেটা – বুঝলাম পেন্সিলটা চেয়ে নেবার সময়।

তোমার দেশ কোথায়? চোখ তুলে তাকালো সে। মুখের কাঠিন্য কিছুটা শিথিল হয়েছে বলে মনে হলো। আসার পর থেকে আমরা দুজনই বসা। ঢোকার সময়ে চোখাচোখি হওয়াতে ‘হালো’ সাথে স্বাভাবিক স্মিত হাসি। সাধারণ ইউরোপিয়ানদের মতো নয়।

তবে শব্দটা এলো দশ মিনিট পরে।

বাংলাদেশ, আমার আড়স্ট জবাব। প্রথমে ধরতে পারিনি। মিউনিখে ইংরেজিতে প্রশ্ন। অস্বাভাবিক বটে। দুহাজার সাল হবে কি?

২৫.

পাজলের বইটা বন্ধ করলো সে। টিকারটা ভেতরে ঠিকমতো রাখতে রাখতে উঠে দাড়ালো, এতো লম্বা লাগে নি তথন। পাঁচ দশ এগারো হবে হয়তোবা। পায়ে আবার ফ্ল্যাট স্যান্ডেল, ম্যাজেন্টা লেসের সাথে সামনে একটা গোল ধরনের ফুল। নীল রঙের। পায়ের রঙের সাথে মিলেছে ভালো। হেঁটে আসলো আমার সোফা পর্যন্ত। র‌্যাম্পের মডেলের মতো মনে হয়নি তখন, এথলিটদের মতো কিছুটা বরং।

মে আই? আমার সোফার মাঝের অংশটা ছেড়ে দিয়ে লংএন্ডে বসার ইঙ্গিত দিতেই দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। একাডেমির প্রশিক্ষণ – যায় কি ভোলা? নার্ভাসনেস থেকে ‘প্লীজ’ শব্দটা বললাম কয়েকবার। চমত্কার দাঁত মেয়েটার। হাসার সময় দাঁত দেখায় না ইউরোপিয়ানরা। মানে সাধারণতঃ। টুকটাক কিছু কথা হলো তখন। ব্রিটিশ মেয়ে ব্রিজিত। সুডোকুতে আটকে গেছে বলে আমার শরণাপন্ন হয়েছে। ভারতীয়রা অংকে ভালো ধারণা থেকে আমার সাথে কথা বলা।

তোমার ধারণা পাল্টাতে মিনিটও লাগবে না। আমার উত্তর। অংকে ভীষণ দুর্বল। আর আমি বাংলাদেশী।

ও সবাই বলে। আমাকে আশ্বস্ত করতে চাইলো ব্রিজিত। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভালোই জানে সে। মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে পড়ছে বলে সাবধান হয়ে গেলাম কথা বার্তায়। কি বলতে কি ঠাউরায় – চুপ হয়ে গেলাম। বুঝতে পেরে কথা পাল্টালো মনে হলো।

কিছুটা অপ্রস্তুত অবশ্য আমিও। ব্যালান্স করতে তাকে মনের ভাবটা জানালাম আমার। মনোবিজ্ঞানীদের ভয় পাই আমি। মনে হয় সারাক্ষণ, পড়ে ফেলছে আমাকে। একেবারে বইয়ের মতো। সোনালী চুল নাড়িয়ে শব্দ করে হাসলো সে। হাজার হোক ল্যাবে আমরা। সামার হওয়ার কারণে চোখের দৃষ্টি সাবধানেই রাখছি। পায়ের গোড়ালিতে একটা নীল লেইস আকর্ষনীয় করছে আরো। সাহস করে তার পাঠ্যবিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করেই পড়লাম বিপদে।

কি পড়ায় তোমাদেরকে? ক্লাস লাগে কেমন?

আমাদের প্রফেসর আমাদেরকে বোকা বানিয়েছিলেন একটা ক্লাসে। সেটাই বলবো নাকি চিন্তা করছি! হাফ ছাড়লাম – বেশি কথা বলতে হবে না দেখে।

দাড়াও, দাড়াও, সমস্যাটা তোমাকেই দেই কি বল? বলে কি? প্রশ্ন করে মনে হচ্ছে ধরা খেলাম আমিই। গলা শুকিয়ে আসছে আমার। মাথা নাড়ালাম কিছুটা জোর করেই। ভালোই ফাঁসলাম দেখি।

২৬.

উঠে গেলো রিসেপশন ডেস্কের দিকে। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসতে লাগলো। হাফ ছাড়লাম। কিছু কাগজ নিয়ে ফেরৎ এসেছে সে। কি আঁকবে সে? নাকি আমাকে দিয়ে আঁকাবে আবার? বিপদ।

ধরো মোমবাতি দেয়া হলো একটা তোমাকে। একটা টেবিল আঁকলো যেখানে মোমবাতিটা শুইয়ে রেখেছে সে। পাশে একটা ম্যাচের বাক্স। পাশে কার্ডবোর্ডের একটা বাক্সে পুশপিন রাখা আছে অনেকগুলো। নোটিশবোর্ডে যেটা দিয়ে আমরা কাগজ আটকাই সেই পুশপিন। ব্রিজিতে ভাষায় থাম্বট্যাক। ছবি দেখে বুঝলাম। পাশে একটা দেয়াল আঁকলো সে। কাঠের দেয়াল।

আকার ইঙ্গিতে মোমবাতিটা জ্বালালো সে। আমার হাতে মোমবাতিটা দেবার অভিনয়ও করলো শেষ পর্যন্ত। মেয়েটা পাগল নাকি? আমিও যোগদান করলাম পাগলামিতে। জানার ইচ্ছা বাড়ছিলো আমারো। হাতে নিলাম মোমবাতিটা। আগুন গলে মোম হাতে লাগতেই লাফ দেবার অভিনয়টাও করলাম নিঁখুতভাবে। হাসলো সে। বন্ধুর মতো হাসি এবার।

লাগাওতো মোমবাতিটা দেয়ালে। মোম গলে টেবিলে পড়তে দেয়া যাবে না কিন্তু। বুঝেছো তো ঠিক ঠিক?

মাথা নাড়ালাম সুবোধ বালকের মতো। এছাড়া উপায়ও নেই বেশি একটা। সমস্যাটা গুরুতর বটে। আরেকটা ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে মোমবাতিটার পাশ গলিয়ে – কাঠের দেয়ালে লাগালে কি সেটা লেগে থাকবে ওখানে?

কয় মিনিট সময় পাচ্ছি আমি? সময় কিনতে চাইলাম ব্রিজিতের কাছে।

হেন্ডারসন, ব্রিজিত হেন্ডারসন! কোথাও লুকিয়ে থাকা স্পিকারে বাখের মিউজিক মিলিয়ে একটা নাম শোনা গেলো। বুঝতেই পারিনি এটাই ওর নাম। টেস্টের কল এসেছে ওর।

উঠে দাড়ালো সে। হাসলো। লাইফটাইম, বাডি।

(more…)

Read Full Post »

“I only sing in the shower. I would join a choir, but I don’t think my bathtub can hold that many people.
”

― Jarod Kintz, Who Moved My Choose?: An Amazing Way to Deal With Change by Deciding to Let Indecision Into Your Life

১৯.

ভারী বিপদে পড়লাম। বাঁছবিচার করি না বলে মুভির আজ এই অবস্থা। ফালতু মুভি দেখেই বড় হয়েছি আমি। আসল কথা হচ্ছে ফালতু মুভি দেখার জন্য হিম্মত লাগে যে, সেটা ছিলো আমার – সবসময়ই। প্রথম পোস্টিং ছিলো সৈয়দপুরে। আহা, কি দিন ছিলোরে তখন! সকালে দৌড়াদৌড়ি, গোছলের পর মস্তিস্ক নিঃসৃত এন্ডরফিনস সারা অফিস সময় মনকে ছাপিয়ে রাখতো অন্য রকম ভালোলাগায়। বকাবকির উত্তর হচ্ছে হাসি – তাও আবার আমার হাসি। বলেন কি? এন্ডরফিনের গল্প দেয়া হয়নি এর আগে? মাই ব্যাড! এক্সারসাইজ বা বেশি দৌড়াদৌড়ির পর অথবা টান টান উত্তেজনার সময় মাথা থেকে এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ পুরো মনকে ভালো করে দেয় কিন্তু। দুষ্টলোকের মতে ভালবাসার সময়ও নাকি মন ভালো করে দেয় এটা। ‘রানার্স হাই’টাও সে রকম কিছু? আপনার প্রশ্ন।

২০.

মনের কথা ধরেছেন আপনি। দৌড়ানো পেশা না হলেও কম দৌড়ানো হয়নি জীবনে। পায়ে মাইলের মিটার লাগানো থাকলে দেখাতে পারতাম হয়তোবা। দৌড়ের শুরুতে কিছুটা কষ্ট হলেও অপেক্ষা করতাম ‘রানার্স হাই’ সময়টার জন্য। দেড় মাইলের শেষের দিকে মন ভালো হয়ে যেতো আপনিতেই। আমার থ্রেশোল্ড হয়তোবা তাই। এরপর এন্ডরফিনসসের খেলা। বেসিক কমান্ডো, যেটা সবার জন্য প্রযোজ্য – সেটার তিরিশ মাইল অস্ত্র আর ওজনসহ দৌড়াতে গিয়ে ‘রানার্স হাই’ টের না পেলে শেষ করা যেতোই না ওই দৌড়গুলো। এন্ডরফিনসসের গল্প তো আর জানতাম না তখন, মনে হতো – দৌড়াচ্ছি এতো, শান্তি শান্তি লাগছে কেন? পা গেছে ছিলে, কষ্টটা পালালো আবার কোথায়? মানুষের আদি সময়ে সৃষ্টিকর্তা এটা দিয়ে দিয়েছিলেন বলে কষ্টের যুদ্ধ আর দুরদুরান্তের শিকারে হারেনি মানুষ। মানুষ বলে কথা।

২১.

শুরু করলাম গিয়ে ফালতু মুভির কথা – আসলাম এন্ডরফিনসসে। মোমবাতির সমস্যা তোমার, ব্রিজিতের জবাব। ওদিকে যাবো না আর। ফিরে আসি স্বপ্নের সৈয়দপুরে। বিকেলে গেমসের পর আবার বর্ষবরন মানে গায়ে পানি দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে শহর! চাপলি কাবাবের পর শহর চষে দু তিনটা ভিডিও কাসেট নিয়ে ফেরত আবার ডেরায়। চার মাসেই ফালতু ছবি সহ সব দেখা শেষ! দোকানদার দূর থেকেই মাথা নাড়ে দেখলেই। নতুন এসাইনমেন্টে চলে আসতে হলো রংপুরে। উঠলাম ভাতৃসম সিনিয়রের রুমে। ওমা, রুমে ওনার চৌদ্দ ইঞ্চির টিভি! ওই সময়ে বাংলাদেশে এলো ষ্টারটিভি নেটওয়ার্ক, আর ষ্টারমুভিজ হচ্ছে গিয়ে সারারাতের মিশন আমাদের! ব্যাক টু ব্যাক – নো ইন্টারমিশন। ভোরে দু ধরনের মোজা পরে হাজির পিটিতে – দুটোই সাদা কিন্তু। ভালো মুভি, খারাপ মুভি, ফালতু মুভি, জি রেটিং, পিজি, পিজি-তেরো, আর রেটিং বাদ থাকে কোনটা? বলুনতো।

২২.

আমেরিকায় যেয়ে সাইফাই চ্যানেলের প্রেমে পড়ি সবার প্রথমে। ছিলাম অজ পাড়াগাঁয়ে। আটলান্টা খেকে মাত্র মাইল দুশো দুরে। সন্ধায় কুপি না জ্বললেও সবকিছুর ঝাঁপি পড়তো তখনি। পায় কে আমাকে! আজগুবি চ্যানেল মানে সাইফাই। আমার আকর্ষণ অন্য জায়গায়। সনাতন চিন্তা থেকে মানুষ কতো দূর যেতে পারে তার বারোমিটার নিয়ে বসতাম চ্যানেলটা দেখার জন্য। পুরোপুরি ওপেন মাইন্ড যাকে বলেন আপনারা। মানে সব মুভিতো আর স্পিলবার্গের নয়। চ্যানেলটা আমাকে শিখিয়েছে হাজার জিনিস। আর সে কারণে বাক্সের বাইরের চিন্তার কথা উঠলেই মনে হয় চানেলটার কথা। ফালতু নয় কোনো কিছু, সবই সম্ভব, আর সবই সম্ভবের দেশ হচ্ছে ওই দেশ। যেটা আজ আপনার কাছে ফালতু সেটার মূল্যমান অন্যের কাছেও যে ফালতু হবে সেটার গ্যারান্টি দিতে পারছে না তো কেউ। সমস্যাটা গড়ায় পারসেপশনে। আর সে কারণে আমরা সেলফ ক্রিটিসিজম নই বিশ্বাসী। মুদ্রার অপর পিঠের একটা বক্তব্য হারায় গ্রহণযোগ্যতা – আমাদের কাছে। আমরা হয়ে পড়ি অসহিষ্ণু।

২৩.

বন্ধু আমার টুইট [অভিধানের শব্দ কিন্তু এটা] করেছে নতুন একটা হ্যাশট্যাগে। থাকে ফ্রান্সের আরেক অজপাড়াগাঁয়ে। ও মুভির জানে কি? ফালতু ট্যাগ। সার্কন্যাডো। করলাম গুগল! ভয়েস সার্চ। বলে কি ব্যাটা? মুভির নাম নাকি এটা। ফালতু সেটিং। টর্নেডোয় সাগরের সব সার্ক উড়িয়ে ফেলেছে লস এঞ্জেলেস শহরে। শুরুটাই ভুঁয়া। সার্ক+টর্নেডো=সার্কন্যাডো। বি ক্যাটাগরির মুভি। ফালতু প্লট। মজাটা হচ্ছে অন্য জায়গায়। এতোই ফালতু যে মানুষ মিনিটে ছবিটার নাম টুইট করছে পাঁচ হাজার বার! বক্স অফিসে নামকরা মুভিগুলো ফেল করতে বাকি। জনি ডেপের ‘লোন রেঞ্জার’এর কি হবে সেটা আপনারই বলতে পারবেন ভালো। সাফল্য আসছে অন্য জায়গা থেকে। সার্কন্যাডোর ফালতু প্লট ভেঙ্গে দিয়েছে মানুষের সনাতন চিন্তাধারা। ‘কি হলো এটা’ বা ‘কি দেখলাম এটা’ ধারনাটা মানুষকে এতটাই উদ্বেলিত করেছে যে সে নিজেই আরেকটা টর্নেডো তৈরী করছে টুইটে – ইন্টারনেটে। সমস্যাটা মোমবাতিতে, আগেই বলেছিলাম কিন্তু।

কালকেই আসছি! মোমবাতি নিয়ে।

Read Full Post »

“Those who have knowledge, don’t predict. Those who predict, don’t have knowledge. ”

Lao Tzu, 6th Century BC Chinese Poet

[আগের পর্ব থেকে …]

২৩.

টিকেট কেনার সময় ট্রেন্ড এনালাইসিস করে তার গড়পরতা দাম কমের দিকে থাকলে দিন কয়েক পরে টিকেটটা কাটলে কমে পাওয়া যাবার সম্ভাবনা বেশি। আবার সিস্টেম যদি দাম বাড়তির দিকের গন্ধ পায় –টিকেটটা কেনার পরামর্শ দেবে তখনি। ত্রিশ হাজার ফুট ওপরে এজীয়নির সেই ইনফরমাল সার্ভের ম্যাথমেটিক্যাল ভার্সন তৈরী হলো সেই ল্যাবে বসে। ভ্রমন সম্পর্কিত একটা সাইট বেছে নেয়া হলো। বারো হাজার প্রাইস পয়েন্ট মানে বিমান ভাড়ার বারো হাজার ভেরিয়েশন আর একচল্লিশ দিনের ডাটা নিয়ে তৈরী করা হলো একটা সিমুলেশন। মূল্য সংবেদনশীল মানুষের জন্য তৈরী এই প্রেডিকটিভ মডেল কাজ করতো আগের ডাটার ধারণা থেকে। সাধারণভাবে কেন দাম বাড়ছে বা কমছে সেটার দিকে না যেয়ে সামনে কি হতে পারে সেটা নিয়ে ধারণা দিতো এই মডেল। সিটের দাম বাড়া কমার পেছনে কতগুলো সিট খালি আছে বা ঈদ পূজা পার্বনের ছুটি বা সাপ্তাহিক ছুটির সাথে এক দুদিনের বাড়তি ছুটি মানুষের টিকেট কেনার ব্যাপারে কিভাবে প্রভাবিত করে সেদিকে না যেয়ে শুধুমাত্র টিকেট কিনতে সিদ্ধান্ত নেবার সাহায্য করতো এই মডেল। টিকেট কিনবেন নাকি কিনবেননা –সেটাই প্রশ্ন।

২৪.

টু বি অর নট টু বি’র মতো “টু বাই অর নট টু বাই” প্রশ্ন থেকে রিসার্চ প্রজেক্টের নামও হয়ে গেলো প্রজেক্ট হ্যামলেট। স্বভাবতই ছোট্ট প্রজেক্টটার পেছনে দাড়ালো ভেনচার ক্যাপিটাল ফার্ম। উদ্ভাবনীর গন্ধ ছুটলে টাকা ওড়ে বলে দেশটা উঠে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্টার্টআপটার নাম হয়ে গেলো ফেয়ারকাস্ট। বিমান ফেয়ারের ফোরকাস্ট করার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যাত্রীদের ক্ষমতায়ন করলো কোম্পানিটা। প্লেনে ওড়ার আগ পর্যন্ত কবেকার টিকেটের দাম কতো হবে – সবচেয়ে সস্তা দাম থেকে কতো কম বেশি হবে সেটা বলতে পারায় যাত্রীদের ভোগান্তি কমে এলো। কবে “বাই টিকেট” বাটনটা প্রেস করবেন সেটা আন্দাজ করতে পারায় লক্ষ মানুষের টাকার সাশ্রয় হওয়া শুরু করলো। ইন্টারনেট থেকে হাজার তথ্যের ভিত্তিতে কাজ শুরু করলেও এজীয়নি তার তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ফ্লাইট ইন্ডাস্ট্রির রিজার্ভেশন ডাটাবেসের দিকে হাত বাড়ালেন। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রতিটা এয়ারলাইন্সের রুট আর তার প্রতিটা সিট ধরে প্রেডিকশন করার ক্ষমতা চলে এলো ফেয়ারকাস্টের হাতে। ফেয়ারকাস্টের এলগরিদম তখন প্রায় বিশ হাজার কোটি প্রাইস পয়েন্ট ভ্যারিয়েবল নিয়ে বিমানের প্রতিটা সিটের দাম আগে থেকে বলে দিচ্ছিল। এয়ারলাইন্স ইন্ডাস্ট্রির কোটি টাকার রেভিনিউ কমিয়ে দিয়েছিলেন যাত্রীদের পক্ষে। কি ভয়ংকর ব্যাপার! এর সাফল্যে তার মাথায় হোটেল রুম বুকিং, কনসার্ট টিকেট, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি বিক্রির কাজ গিজগিজ করা শুরু করলো। শুরু করার আগেই মাইক্রোসফট কোটি টাকা নিয়ে তার দরজায় হাজির। সার্চ ইঞ্জিন বিংয়ে যুক্ত হলো ফেয়ারকাস্টের জাদু। দুহাজার বারো সালেই প্রতি টিকেটে যাত্রীরা বাঁচালেন প্রায় পঞ্চাশ ডলার করে।

২৫.

বিগ ডাটা কোম্পানি হিসেবে ফেয়ারকাস্টকে এখানে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসার অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর ভবিষ্যতকে আপনাদের সামনে নিয়ে আসা। আগে কম্পিউটারের ক্ষমতা, শক্তি বিজ্ঞানের পরিবর্তিত ধারায় অনেকগুণ বেড়েছে, ফলে আপনার হাতের মোবাইলফোন আগের সুপারকম্পিউটার থেকে বেশি ক্ষমতা ধারণ করে। ফলে, বিলিয়ন বিলিয়ন রেকর্ড ক্রাঞ্চ মানে প্রসেস করা এখন আর বাজেটের উপর নির্ভরশীল নয়। পিপিলিকার মতো সার্চ ইঞ্জিন এখন হোস্ট করা যায় অনায়াসে – হাজার মাইল দুরে – প্রসেসিং ক্ষমতা জেনেই। ডাটা আর আগের মতো স্ট্যাটিক নেই, এর ডাইনামিক আচার আচরণ একে মূল্যবান করে ফেলছে দিনের পর দিন। ডাটা, যেমন আপনার বিমান ভ্রমণের পর আর অপাংতেয় হচ্ছে না বরং তা ভবিষ্যত দেখার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। সার্চ করছেন বাংলাদেশে বসে আপনি, আপনার সার্চ কোয়েরি কর্পুরের মতো উড়ে যাচ্ছে না আপনার সার্চের পর। তাকে বরং ব্যবহার করা হচ্ছে আপনার ভবিষ্যত নির্ধারণের জন্য। আমাদের ভবিষ্যত ছেড়ে দেয়া আছে তাদের উদ্ভাবনীর উপর। আমরা কি পছন্দ করবো সেটা আসছে ওখান থেকে।

২৬.

বাংলাদেশ – কোটি মানুষের দেশ – পাশ কাটাচ্ছি প্রতিনিয়ত এই বিগ ডাটার সুফল। বিশাল সম্ভবনা রয়েছে আমাদের দারিদ্র বিমোচনে, শিক্ষার প্রসারে আর সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে। তথ্য আছে হাতের মুঠোয়, বের করে নিতে হবে প্রজ্ঞা অংশটুকু।

দরকার একটু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভাবভঙ্গি। মানুষে নয়, নীতিমালায়।

মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে না জমি – সিঙ্গাপুর আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকবে কি আর? যাদের খাওয়ার পানিটাও কিনে খেতে হয় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে, তারা আজকে গিয়েছে কোথায়? সাগরের সাথে যুদ্ধ করে জমি মানে রিক্লেমল্যান্ড বের করতে দক্ষতার বিকল্প নেই। ইনএফিসিয়েন্ট হবার সুযোগ দেখছি না, অন্ততঃ আমাদের।

কোটি ডাটা, যা নিয়ে কাজ আমার, ভবিষ্যতদ্বানি করার সময় হয়ে আসছে বলে।

আসছি সামনে।

Read Full Post »

“Global warming isn’t a prediction. It is happening.”
James Hansen

২০.

কোনো কিছু কিনে ঠকে মন খারাপ না হলে আপনি মহামানুষের ক্যাটাগরিতে পরবেন চোখ বুঁজে। এক দোকান দেখে কেনা বাদ দিয়েছি বহু আগে। অনেক সময় কয়েক দোকান দেখে কিনলেও পরে অন্য এলাকার দামের খোঁজ পেলে মন কিঞ্চিত বিষিয়ে যায় বটে। ইনফরমেশন গ্যাপের কারণে যারা এই তথ্য নিয়ে কাজ করেন তাদের মনে হয় মন খারাপ হয় আরো বেশি। যেমনটি হয়েছিলো অরেন এজীয়নির। সত্য ঘটনাটা নিয়ে আসছি ভিক্টর মেয়ারের ‘বিগ ডাটা’ থেকে। ‘বিগ ডাটা’ নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি কিছু গল্প না হলে বইটা নিরস হয়ে যাবার সম্ভাবনা থেকেই যায়। সিয়াটল থেকে লস এঞ্জেলেসে যাবার টিকেট কিনেছিলেন মাস খানিক আগেই – অনলাইনে। অনেকগুলো সাইট ঘুরে সস্তার মধ্যে পাওয়া গেলো টিকেটটা। হাজার হোক ভাইয়ের বিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী যতো আগে টিকেট কাটবেন ততো সাশ্রয়। আমার অভিজ্ঞতা এর ব্যতিক্রম কিছু নয়, তবে প্ল্যানিং এর অভাবে টিকেট কাটা পড়ে যাবার কয়েকদিন আগে। আর দাম? সে আর বলতে! মাস খানেক আগে এয়ারলাইন্সের টিকেট পাওয়া যায় পানির দামে। দুরপাল্লার ট্রেন টিকেট থেকেও দাম পড়ে অনেক কম।

২১.

ওড়ার পর কথায় কথায় পাশের সিটের সহযাত্রীর কাছ থেকে তার টিকেটের দাম শুনে চক্ষু চড়কগাছ! তাও আবার কেনা হয়েছে কয়েকদিন আগে। মেজাজ খারাপ হতে শুরু করলো এজীয়নির। কৌতুহলবশত: লজ্জার মাথা খেয়ে প্রশ্নটা করলেন আরো কয়েকজনকে। তারপর আরো চার পাঁচজনকে। বেশিরভাগই টিকেটগুলো কিনেছেন কমদামে। তাও আবার কিনেছেন এই সপ্তাহ দুএকের মধ্যে। প্রতারিত মনে হতে থাকলো নিজেকে। সাধারণ মানুষের মতো ঘটনাটা সবাই আমরা ভুলে যেতাম বিমানযাত্রাটার শেষে। কতো জায়গায় প্রতারিত হয়েছি তার নাই ঠিক। এতো সামান্য একটা টিকেটই তো! ভুললেন না জিনিষটা। সেসময়ের সেরা কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের একজন এজীয়নি। তার তেতো হবার বিষয়টি নিয়ে বসলেন ল্যাবে। হার্ভার্ড থেকে পাশ করে তথ্যপ্রযুক্তির পাশাপাশি ‘বিগ ডাটার’ মতো জিনিসটা বোঝার চেষ্টা করছিলেন তিনি। ‘বিগ ডাটা’ শব্দটা তখন অজানা থাকলেও তার পিএইচডির রিসার্চ তৈরী করতে সাহায্য করে পৃথিবীর প্রথম সার্চ ইঞ্জিন ‘মেটাক্রলার’। ‘মেটাক্রলার’কে কিন্তু কিনে নেয় পরে ইনফোস্পেস। ‘মেটাক্রলার’কে কম জ্বালাইনি আমি। তখন তো আর ইয়াহু আর গুগল ছিলো না। মেটাক্রলার, ওয়েবক্রলার আর লাইকস ছিলো মাঠের মধ্যমনি। এজীয়নির আরো বেশ কয়েকটা স্টার্টআপ কিনে নেয় সার্চ ইঞ্জিন এক্সসাইট আর নিউজ এজেন্সী রয়টার।

২২.

এয়ারলাইন্সের টিকেট নিয়ে হাজার সাইট নতুন নতুন অফার নিয়ে আসলেও একই ফ্লাইটে সিটগুলোর দামের ওঠানামা নির্ভর করে সেই এয়ারলাইন্সের ওপর। এই দাম ওঠা নামার মধ্যে অনেক ফ্যাক্টর কাজ করলেও এয়ারলাইন্সের ভেতরের খবর তো আর কারো জানা থাকার কথা নয়। এজীয়নি এমন একটা মেকানিজম বের করতে চাইলেন যার মাধ্যমে একটা যাত্রী অনলাইনে দাম দেখে বলতে পারবেন সেটা তার জন্য আসলে প্রযোজ্য কিনা। মানে মেকানিজমটা বলতে পারার কথা যে ওই টিকেটটার দাম ওই মুহূর্ত থেকে ভবিষ্যতে আরো বাড়বে নাকি কমবে কিনা? বা, আগে আরো কম ছিলো কিনা? নাকি এখন না কিনলে ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে কিনা? এ কাজটা করতে যেয়ে প্রথমদিকে ঝামেলা হলেও পরে প্রচুর ডাটা থেকে প্রেডিকশন আর ফোরকাস্টিং মতো জিনিসগুলো কিভাবে বের করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিলেন এজীয়নি। তার থেকে বরং নতুন কিছু উদ্ভাবন করে এই দামের হরফের বের করাটা আরো কষ্টকর হতো। তার থেকে ওই মুহুর্তে যে দাম ওয়েবসাইটে দেয়া আছে তার থেকে ভবিষ্যতে বাড়বে না কমবে সেটা আন্দাজ করতে পারলেই কিন্তু কেল্লাফতে। একটু কষ্টকর হলেও এটা সম্ভব কিন্তু। একটা রুট ধরে তার সব টিকেট বিক্রির ইতিহাস, মানে বাড়ছে না কমছে – আর সেটার সাথে ফ্লাইটের আগের দিনগুলোর হিসাব থাকলে তা সহজ হয়ে যাচ্ছে আরো। …

[পরের পোস্ট দেখুন]

Read Full Post »

Older Posts »

%d bloggers like this: