Feeds:
Posts
Comments

Archive for April, 2013

“Some failure in life is inevitable. It is impossible to live without failing at something unless you lived so cautiously that you might as well not have lived at all, in which case you fail by default.”

J K Rowling

৪২.

গোল চশমার ভেতরে ভাসা ভাসা চোখ। কোকড়া চুলের মাথা বড় ছেলেটার কথা মনে পড়েছিল ট্রেনে বসে তার। কালো চুলের সাথে গোল গোল চশমা না গেলেও হ্যারির সাথে তা মানিয়ে গিয়েছিল গল্পের খাতিরে। কলম না থাকার কারণে কষ্ট পাচ্ছিলেন মনে মনে, চার চার ঘন্টা – কম নয়। ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডন। তাও আবার ট্রেন লেট এই সময়ের জন্য। হ্যারি কিভাবে ঢুকে গেল মাথায়, আর বের হলোনা। মায়াভরা ছেলেটা যে নিজেই একটা যাদুকর, তা জানার মধ্যে দিয়ে গল্পের উত্পত্তি। কলম না থাকার কারণে ভালো না খারাপ হয়েছিল তা বলতে পারবোনা, তবে তার মতে কলম থাকলে বরং চিন্তা যেত আটকে, হয়তোবা। আমি যখন চিন্তা করি, তখন লিখতে গেলে সমস্যা হয় বৈকি। ম্যানচেস্টার থেকে যাবার পথে ট্রেনে দেখা জঙ্গলগুলোই হগওয়ার্টসের আদি সংস্করণ বলে ধরা যায়।

৪৩.

জে কে রওলিং কিভাবে শুরু করেছিলেন তা অনেকের জানা। গরিবী হাল থেকে বিশ্বের হাতেগোনা কিছু লেখক যারা কোটিপতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছেন তাদের শুরুটা আমাদের মতো এতোটা সুখের ছিলো না। ব্যর্থতা রওলিংকে ঘিরে রেখেছিলো। না ছিলো কোনো চাকরি, বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিল আগেই। এক সন্তানের মা, রাষ্ট্রের ওয়েলফেয়ার বেনিফিটের উপরে চলছিলেন কোনো রকমে। ইউনিভার্সিটি থেকে বের হয়ে সাত বছর ধরে কিছু না করতে পেরে বিষন্নতায় ভুগছিলেন তিনি। আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন বার কয়েক। প্রথম সন্তানের মিসক্যারিজ হবার পর আরো ভেঙ্গে পড়েন। ট্রেনে লন্ডনে নেমে হাতে কলম ধরেন সেই সন্ধায়। “ফিলোসফার’স স্টোন” লেখা শুরু হয় সেই রাতে। বই লেখা শেষ হলে সেই রাতের ওই কয়েক পৃষ্ঠার মিল না থাকলেও সেটা ছিলো ভাগ্য পরিবর্তনের মাইল ফলক। এক ভোরে স্বামীর হাতে মার খেয়ে মেয়েকে নিয়ে ওঠেন তার বোনের বাসায়। বের হয়ে আসার সময় তার সুটকেসে ছিলো হ্যারি পটারের প্রথম তিন অধ্যায়।

৪৪.

লিখতেন ক্যাফেতে বসে, মেয়েকে ঘুম পাড়াতে সুবিধা হতো হাঁটলে। বারোটা পাবলিশিং হাউজ থেকে প্রত্যাখাত হতে সময় লাগেনি বেশি। ব্যর্থতা নিয়ে বছরের পর বছর পার করতে কম কষ্ট করতে হয়নি তাকে। সরকারের ওয়েলফেয়ারের টাকা আর বাড়ি তাকে ‘সর্বস্বান্ত’ শব্দটা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো।  বছরখানিক পরে ব্লুম্সবারি পাবলিশিং হাউজ তাকে পনেরোশো পাউন্ড দিলেও পাশাপাশি একটা চাকরি খুজতে বলেছিলো ঠিকই। বাচ্চাদের বইয়ের ভবিষ্যত ভালো না, মনে করিয়ে দিতে ভুল করেনি। রওলিংএর পান্ডুলিপিটা বইয়ের মুখ দেখার পেছনে যার অবদান সে হচ্ছে এলিস নিউটন, ব্লুমসবারির চেয়ারম্যানের আট বছরের মেয়ে সে। কি মনে করে মেয়েকে বইয়ের প্রথম অধ্যায় পড়তে দিয়েছিলেন তিনি। সেটা গোগ্রাসে শেষ করে বাকি বইটা চায় এলিস। পরে স্কটিশ আর্টস কাউন্সিল তাকে আট হাজার পাউন্ড দিয়ে সাহায্য করে লেখা চালিয়ে নেবার জন্য। এ ধরনের ক্রাউডসৌর্সিংএর কারণে অনেক লেখক বেচে গিয়েছেন তা নিয়ে আসবো সামনে।

৪৫.

এই রওলিং ছাড়া অন্যের কাছ থেকে ব্যর্থতার সঙ্গা নেয়াটাই হবে বৃথা। আমি নিজে ‘টেড’ বক্তৃতাগুলোর একনিষ্ঠ ভক্ত হলেও হার্ভার্ডে দেয়া রওলিংএর এই বক্তৃতাটা কিভাবে যেন এড়িয়ে গিয়েছিল। ব্যর্থতার শক্তিকে কিভাবে লেখাতে পাঠাতে হয় তার জন্য দেখতে হবে হার্ভার্ডের তার সেই বক্তৃতাটা। সেখান থেকে থেকে তুলে দিলাম নিচের একটা অংশ। বিশ্বাস হচ্ছে না? ব্যর্থতা সাহায্য করে লিখতে। কিছু ব্যর্থতা নিয়ে আসুন জীবনে। আর, না লেখতে পারার কষ্টটা।

ব্যর্থতা মানুষের অপ্রয়োজনীয় সব জিনিস চেছে দেয় ফেলে। নিজের সম্পর্কে সব ভান ছুড়ে ফেলে নিজেকে খুঁজে বেড়িয়েছি। সমস্ত শক্তি জড়ো করে সেই কাজটাই করেছি যা করতে চেয়েছি সারাজীবন। অন্য কিছুতে সাফল্য পেলে আমার যেখানে থাকার কথা ছিলো সেখানে যাবার সংকল্পটা থাকতোনা আর। ব্যর্থতা দিয়েছিল আমাকে মুক্ত করে, একেবারে। সবচেয়ে বড় ভয়টা কেটে গিয়েছিলো। আমার বাচ্চা মেয়েটা ছিলো আমার সাথে, বেচে ছিলাম তখনও – আর, টাইপরাইটারটা ছিলো সঙ্গে। সঙ্গে ছিলো নতুন কিছু করার চিন্তা। আর সেই লেখার চিন্তাটা এতটাই শক্তিশালী ছিলো যে এর উপর তৈরী করেছি আমার নতুন জীবন।

Read Full Post »

“We’re here to put a dent in the universe. Otherwise why else even be here?” — Steve Jobs

৩৯.

এপস্টেইনের কথা ধরে বলা যেতে পারে পৃথিবীর সব বই লেখা হয়নি এখনো। সব বই কি ভালো হবে, খারাপ বই না লিখলে ভালো বোঝা যাবে কিভাবে? আমরা যারা প্রথম দিকে অপেক্ষাকৃত খারাপ বই(গুলো) লিখবো তাদেরকে ধন্যবাদ দিতে হবে ভালো লেখকদের। তবে খারাপ বলবেন কাকে? অনেক বাজে থিম নিয়ে লেখা বই বেস্টসেলার হয়ে গেছে। উদাহরণ দিতে গেলে আপনারাই আটকে দেবেন। সেই বইগুলো হয়তোবা আপনার ভালো লেগেছে, আমার লাগেনি। আর খারাপ কয়েকটা বই না লিখলে ভালো লেখা বোঝা দুস্কর। আর মনে রাখবেন আমরা লেখা শেখার জন্যই এই বইটা হাতে নিয়েছি। ভালো বই লেখার জন্য নয়। সেটা আসবে পরে।

৪০.

বড় বড় লেখকরা কতগুলো বাজে বই লিখে একটা ভালো বই লিখেছেন তার হিসাব তো আপনারা জানেন। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা প্রথমেই হতে চাই বেস্টসেলার। জেনে অবাক হবেন এই বেস্টসেলার হবার লোভে মানুষ লেখাই শুরু করতে পারে না। ফলে, এক সময় এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে যেতে হয় বই না লিখে। স্টিভ জবসের কথা ধরে বলা যেতে পারে যে বিশ্বব্রম্মান্ডে ট্যাপ না খাওয়ালে আমরা আছি কি জন্য? একটা সাধারণ প্রশ্ন করা যায়, লেখকরা কি করেন? লেখে! নাবিল – আমার পাঁচ বছরের ছেলের উত্তর, কিছুটা বিরক্ত। ভ্রু কুচকাতে ওস্তাদ সে। হবু-লেখকরা লেখা ছাড়া সব কিছু করেন, তবে লেখার সময় পান না। ইংরেজিতে ‘প্রক্রাসটিনেট’ বা ‘প্রক্রাসটিনেশন’ কথাটার যৌক্তিকতা শুধুমাত্র লেখকদের মধ্যে পাওয়া যায়। দাঁতভাঙ্গা শব্দ হলে কি হবে, এটা ছাড়া লেখকরা অচল। আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে এই শব্দ। চিন্তায় আছি।

৪১.

আমেরিকার বেশ কয়েকটা রাইটিং ওয়ার্কশপ থেকে যে কয়েকটা মোদ্দা কথা মাথায় নিয়েছি তার প্রথমেই এসছে দশ লক্ষ শব্দের কথা। দশ লক্ষ শব্দ ‘ক্র্যাপ’ (বাজে লেখা) লিখবেন তারপর আসবে ভালো লেখা। মানে করলে দাড়ায়, দিনে হাজার শব্দ, ওখানে পৌছাতে লাগবে তিন বছর। দিনে পাচশো শব্দ, ছয় বছর। একে আক্ষরিক ভাবে না নিলেও বিশ্বাস করি আমি। একে তুলনা করা যায় মায়ের দশ মাসের মতো। ভালো বই তো প্রি-ম্যাচিউরড হলে হবে না। আপনাকে লিখতে হবে, সময় দিতে হবে। প্রথমেই ভালো লেখা আশা করলে লেখক হওয়া যাবে না। ফ্রি-রাইটিং এর উপর জোর দেয় ওয়ার্কশপগুলো একারণে। লেখুন মন খুলে, এডিটিংকে পাঠিয়ে দিন জাদুঘরে। এডিটিং নিয়ে এখন নয়।

কি লিখবেন?

Read Full Post »

“There is no greater agony than bearing an untold story inside you.” – Maya Angelou

৩২.

দুহাজার দুই সালের কথা। ছিলাম কোথায়? মনে করতে পারছিনা। কঙ্গো না উগান্ডা? কোথায় ছিলাম সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, তবে যেটা পড়ছিলাম তা মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছিলো। বলে কি বেটা? দুঃখিত, বেটা বলা ঠিক হয়নি। বেটার নাম জোসেফ এপস্টেইন, নামকরা ছোটগল্প লেখক, দীর্ঘদিনের সম্পাদক, নামকরা পত্রিকাগুলোতে। এপস্টেইনের লেখাগুলো সাধারণতঃ প্রতিদিনের বিষয় নিয়েই থাকত বেশী। সাধারণ বিষয়গুলো অসাধারণভাবে তোলার ব্যাপারে তার জুড়ি ছিলো না। পাগল কিছিম না কিন্তু, আগেই সাবধান করে দিলাম।

৩৩.

তাতে কি? মেজাজ খিচড়ে রইলো। একটা সার্ভে নিয়ে যতো সমস্যা। সার্ভের ফলাফল ঠিক আছে, ঠিক নেই এপস্টেইনের বক্তব্য। একাশি শতাংশ লোকজন তাদের মধ্যে বই লেখার গল্প আছে বলে মনে করে। মানে, তারা লিখতে পারবে, শুধুমাত্র লেখাটাই থাকে বাকি। সার্ভে কোথায় হয়েছিলো তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাও আবার এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে। তখনকার সময়ের আমাদের এই চৌদ্দ বইয়ের লেখক যার পনেরতম বই বেরুচ্ছে মাত্র, নিরুত্সাহিত করলেন এই একাশি শতাংশকে। বই লেখা সহজ নয় আর সে কারণে বেশিরভাগ বইগুলো শুধুমাত্র অপ্রয়োজনীয় নয়, সেগুলোর প্রতি মানুষের কোনো আকর্ষণ নেই। কেন বই লিখে সেই বোঝা বাড়াবেন? আমাদের হাজার হাজার বই, এর শেষ নেই, বলছিলেন তিনি, দরকার কি আর নতুন বইয়ের। বরং, নতুন বই আমাদের বোঝা বাড়াচ্ছে দিন দিন।

৩৪.

তারপরও মানুষ হয়তো একটা বই লিখে যেতে চান জীবনের তাত্পর্য খুঁজে পেতে। পৃথিবীতে লেখকদের সময়ের শেষে কিছু মানুষ মনে রাখে সেই লেখাগুলোকে। এই নশ্বর পৃথিবীতে মৃত্যুর পর বেচে থাকার আকুতি থেকে বই লেখার কথা আসতে পারে, তা কি খুব বেশী চাওয়া? তবে এপস্টেইনের ধারণা, প্রচুর বই মরে যাচ্ছে মানে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্মৃতিকে পাশ কাটিয়ে। আর নতুন করে বই লেখা সেই হারানোর পদ্ধতিকে তরান্বিত করছে – হবু লেখকদের জন্য। আমরা হয়তোবা বই লেখার জন্য অনেক আকর্ষণীয় বা সৃজনশীল পরিকল্পনা আনতে পারি কিন্তু বইতো যাচ্ছে হারিয়ে। লেখার দরকার কি?

৩৫.

প্রবন্ধ শেষে নতুন গল্প নিয়ে আসলেন এপস্টেইন। টাইপ করার কষ্ট বাদ দিলে ভালো, বললেন তিনি, অনেক গাছ বাচবে। টাকা পয়সা রোজগার করার জন্য বাতলে দিলেন আরো রাস্তা । বই লিখে কি হবে? ওটাকে নিয়ে চিন্তা করে হবে কি কিছু? বই রাখেন মাথার মধ্যে, ভালোই তো আছে ওখানে।

৩৬.

আজ রাতে সেই পুরোনো পত্রিকার ইন্টারনেট এডিশনে প্রবন্ধটা পড়লাম আবার। ধুর, খালি খালি এপস্টেইনের উপর রাগ করেছিলাম। ছোট বয়সে বুঝতে পারিনি হয়তোবা। বয়সের দোষ আর কি? আমার তো মনে হচ্ছে স্যাটায়ার। মুল প্রবন্ধটা নিউ ইয়র্ক টাইমসে এখনো ভেংচি কাটছে। হ্যা, আঠাশে সেপ্টেম্বরের পত্রিকা ছিলো ওটা।

৩৭.

লেখা শেষ করে দিয়েছিলাম আগের অংশে। আবার ফিরে এলাম এপস্টেইনের কথার জবাব দিতে। ‘প্রতিটা মানুষের মধ্যে আছে গল্প’ এটা যেমন সত্য, তেমনিভাবে হাজার বছর ধরে চলতেই থাকবে মানুষের এই গল্প। মানুষের গল্প মানুষই লিখবে, হাজার নতুন বই আসবে। যেমন আসছে স্তেফনি মেয়ার্সএর বইগুলো। নামকরা লেখক স্টিফেন কিং ‘টোয়াইলাইটের’ বইগুলোর গুণগতমানের ব্যাপারে ভিন্ন মত দিলেও বই বিক্রি তো আর কমে যায়নি, বরং রুপালীপর্দায় গিয়েছে সেটা। নতুন বই আসা বন্ধ হবে না, কখনোই।

৩৮.

আমরা এপস্টেইনের যুক্তি, ‘বেশির ভাগ মানুষ বই লিখতে পারে না’ যদি মেনে নেই, তা অলসদের মনের কথা বলা হবে। নতুন লেখকরা সেটা থোড়াই কেয়ার করে। নাহলে প্রতিবছর বইমেলায় এতো বই আসত না। কেউ কি বলেছেন যে আপনাকে হুমায়ুন আহমেদের মতো করে লিখতে হবে বা তার মতো বিক্রি করতেই হবে? কার কতটা বই বিক্রি হয় সেটা আপাতত: মানুষের প্রি-অকুপেশন বা পার্সেপশন থেকে আসলেও ভবিষ্যতে তা পাল্টে যাবে। ইন্টারনেটের যুগে সেগুলো ছেড়ে দিন সোশ্যাল মিডিয়ার উপর। আমরা সবসময় কি সবচেয়ে ভালো জিনিস ব্যবহার করি? সবসময় কি খাই পোলাও কোর্মা? সবচেয়ে সুন্দর জামাটা কি পরি সবসময়? মনে হচ্ছে অস্কার পাওয়া ছাড়া অন্য সিনেমা দেখি না কখনো। কে কোনটা পছন্দ করে তা যেভাবে বলা যায়না, কোন বই চলবে তা আগে থেকে বলতে পারার কথা না।

মানে, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বই চলবে। কত বেশী চলবে তা নির্ভর করবে অনুশীলন আর অদম্য আকাঙ্খার উপর। গল্প ভেতরে রাখার জিনিস নয়, আপনার গল্পের উপর অধিকার আছে সবার। গল্পকে বের করে নিয়ে আসুন মাথা থেকে, কারণ ওর জায়গা ‘বাইরে’।

Read Full Post »

“I got this story from someone who had no business in the telling of it.” ― Edgar Rice Burroughs, Tarzan of the Apes

২৭.

সমস্যা বটে, বড় সমস্যা। আগে যখন লিখতে বসতাম, শুরুতেই আসত কলমের সমস্যা। কলমের সমস্যা হয়তোবা সবসময়ের সমস্যা, কিন্ত তা আরো প্রকট হয় যখন লিখতে বসি। মোটা লেখা হচ্ছে না। অন্য সময়ে মোটা বা চিকন নিয়ে সমস্যা হয়না, কিন্ত ক্রিয়েটিভ কিছু করতে গেলে তা শুরু হয়ে যায়। এখন যেমন, ‘সমস্যা’ শব্দটা হাজার বার আসতেই থাকবে। লিখতে বসলে ল্যাপটপের হাজার সোশ্যাল নেটওয়ার্কএর নোটিফিকেশন লেখার পাট চুকিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলো সারাদিন মোবাইলে আটকে রাখলেও ল্যাপটপ পর্যন্ত এর দৌরাত্ব্য অনেকদিনের। অন্য সময়ে এই নেটওয়ার্কগুলোতে কাজ না করলেও তার জন্য যতো মায়া আসে লেখার সময়। নোটিফিকেশনগুলো আপাততঃ ঘুম পাড়িয়ে দিলাম।

২৮.

লেখতে বসতে গিয়ে স্বাতীর ডাক, গাড়ি জ্যামে রাস্তায় – কিছু জিনিস তা থেকে নামিয়ে আনতে হবে। জামা কাপড় পরতে হলো। আবার লিখতে বসতে যেয়ে চানাচুরের বাক্সে নজর পড়লো। চোখ নামিয়ে নিলাম। একলাইন লিখতে না লিখতেই দুটো কল, কলদুটো না ধরলে অনেক রাত হয়ে যাবে তা ব্যাক করতে করতে। কথা বললাম। বসলাম আবার। কিন্ত আর কতক্ষণ। ওই বাক্সে চোখ পড়ল আবার। এরপর কি করলাম সে ব্যাপারে না যেয়ে যেটা বলা যেতে পারে যে আমি সবসময় কিছু না কিছু করছি বা দেখছি। তাও আবার সবচেয়ে বেশী কাজ বের করার সময় বা প্রডাক্টিভ আওয়ারে।

২৯.

লেখক ব্রুস হল্যান্ড রজার্স, আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, এডিডি বা এটেনশন ডেফিসিট ডিজর্ডারের সাথে। মনোযোগ কার না ছোটে? তবে, তা বেশী মাত্রায় হলে ঝামেলা হতে পারে। এখনকার বাচ্চারা যারা টিভি বা ভিডিও গেমসে বেশী মনোসংযোগ করছে তারা এই সমস্যায় আছে এরইমধ্যে। আবার, সবকিছুতে মনোযোগ ছুটলে কিছুই করা যাবে না। আচ্ছা, বিয়ের সময় মনোযোগ ছুটলে কি হবে?

৩০.

আরেকজন, হার্টম্যান তার লেখায় এই ডিজর্ডারকে অন্য উপলব্ধিতে নিয়ে গেছেন। লোকজন যারা এটেনশন ডেফিসিট ডিজর্ডার নিয়ে আছেন, তাদেরকে ‘শিকারী’ গোত্রে ফেলা হয়েছে। আর বাকিরা ‘কৃষক’| তার ধারনায়, এই এডিডি গোত্রের মানুষের অন্যদের থেকে কিছু কম্পেটিটিভ সুবিধা বেশী পেয়ে থাকে। তিনশ-ষাট ডিগ্রী দৃষ্টি আর সবকিছুর উপর নজর থাকাতে ওর শিকার পেতে আর অন্যের শিকার না হতে সাহায্য করে। একদিকেই নজর দেয়া মানুষ শিকার না পেয়ে অন্যের শিকার হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

৩১.

বর্তমান জীবন ব্যবস্থায় আবার ‘কৃষক’শ্রেণী ভালো অবস্থায় আছে। একচোখা বা একটা জিনিস নিয়ে থাকার ফলে একই ফিল্ডে অনেক বিশেষজ্ঞ তৈরী হচ্ছে। সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে তাদের কাঁধে ভর করে। সামাজিক উচ্চতর নিরাপত্তার বলয়ে শিকারী হবার প্রয়োজন না হলেও আমাদের মতো সমাজে শিকারীর উত্থান দেখা যায়। আমার মতে এদুটোর শঙ্কর যেকোনো সমাজের জন্য ভালো। মনোযোগ ছোটা ভালো না খারাপ তা পরিস্থিতি বলে দেবে। শিকারীরা বলবেন, মনোযোগ সংযোগের কিছুক্ষেত্রে ব্যতয় হলে আমরা সবকিছু দেখার চেষ্টা করি, আর তা আমাদেরকে ‘কৃষক’শ্রেণী থেকে উপরে নিয়ে যায়।

অনেক কথা হলো। লেখকরা কোন গোত্রে পড়বেন?

এই লেখাটা শেষ করতে চাচ্ছি বেশ কিছুক্ষণ ধরে। বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। রাত বারোটা। ঘুরে আসব নাকি একবার এই বৃষ্টিতে? স্বাতী ঢুকতে দেবে তো আবার?

Read Full Post »

“Any resemblance to people living or dead is purely coincidental… Especially you, Jenny Beckman… Bitch.” – The film begins with a disclaimer, (500) Days of Summer

প্রতিশোধ না নিলেই কি নয়?

২৩.

সোনার চামচ নিয়ে জন্মালে অন্য কথা। যা লিখবেন তাই বই বের হবে, সেটার জন্য কপালেরও প্রয়োজন পড়ে। নতুন লেখা নিয়ে গেলে তার গঞ্জনা অনেক। বর্তমানের হটসেলিং লেখকের মতো করে না লিখতে পারলে আরো সমস্যা। নতুন লেখার গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হতে সময় নেয় অনেক বেশী। আর গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হবার আগ পর্যন্ত দিনগুলো খুব কষ্টের। “ছাপানো যাবে না” আর অখ্যাত লেখকের জন্য একথাগুলোই প্রতিদিনের ঔষুধ। “লেখা না পারলে শিখে আসেন” ধরনের কথাও শুনতে হয়েছে অনেককে।

২৪.

আর এব্যাপারে ফ্র্যাংক সিনাত্রার মন্তব্য আরো ভয়ংকর। যে কারোর অপ্রতিরোধ্য “সাফল্যই হতে পারে তার সেরা প্রতিশোধ”| লেখকদের মধ্যে যারা অনেকবার মানে অনেকবার প্রত্যাখ্যাত পরবর্তিতে অভাবনীয় বই বিক্রি দিয়ে শোধ নিয়েছেন প্রকাশকদের সাথে। প্রতিশোধের আরেকটা গল্প হতে পারে স্কট ন্যুস্তাডারকে ঘিরে যিনি ‘ফাইভ হান্ড্রেড ডেজ অফ সামার’ মুভির একাধারে লেখক আর স্ক্রীনরাইটার। মুভিটা দেখে এক সপ্তাহ ঘোরের মধ্যে থেকে জেনীর খবর পেলাম। লেখকদের প্রতিশোধ কত ভয়ংকর হতে পারে তা মুভিটা দেখলেই বুঝতে পারবেন ভালো।

২৫.

জেনী বেকম্যানের সাথে দেখা লন্ডনে। আমাদের লেখক স্কট ন্যুস্তাডার নিউ ইয়র্ক ছেড়ে গিয়েছিলেন লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে পড়তে। আগের সম্পর্কটা বাজে ভাবে শেষ হওয়াতে পালাতে চাচ্ছিলেন নিউ ইয়র্ক থেকে। সম্পর্কের ‘রিবাউন্ড’ যে কি কষ্টের তা যারা পড়েছেন তারাই বলতে পারবেন ভালো। ‘রিবাউন্ড’ এর সময় বুক ফাকা হয়ে গেলে তার উপর দিয়ে তেলাপোকার হাটা, ঘুম ছাড়া রাতের পর রাত, সুইডিশ সিনেমার লম্বা দিনগুলোর কথা মনে হবে তখন। আচ্ছা, সুইডিশ সিনেমাগুলো এতো মন খারাপ করে দেয় কেন? ব্রায়ান আডামসের “হোয়েন ইউ লাভ সামওয়ান” গানটা লুপের মধ্যে পড়ে গেলে সব নিয়ামক এর মধ্যে উপস্থিত বলে ধরে নেয়া যায়। রিবাউন্ড ১০১।

২৬.

ধরে নেয়া যায় যে স্কট জেনীকে নিয়ে আরেকটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। এলএসইতে এলিভেটরে লুকানো ছোটখাটো রোমান্টিক লিড দিয়ে শুরু হয় তাদের ভালবাসা। তবে, জেনী সেটাকে কিভাবে নিয়েছিলো তা নিয়েই মুভিটা। যেকোনো সিনেমার শুরুতে বাস্তব চরিত্রের সাথে এই মুভির মিল একান্ত কাকতালীয় বলে লেখা দেবার পরও নতুন করে আরেকটা লাইন চলে আসে। জেনী এই হৃদয়বিদারক গল্পের শেষে স্কটকে ছেড়ে দিলেও স্কট তার প্রতিশোধের ফনা তোলে তার লেখনীতে।

মুভিটা মানুষ পাগলের মতো দেখেছে। কাকতালীয়ভাবে অনেকে তাদের জীবনের সাথে মিল পেয়েছেন।

আমার? আমার আবার কি?

Read Full Post »

“Life begins at the end of your comfort zone.” – Neale Donald Walsch
“Everything you want is just outside your comfort zone.” — Robert Allen, The One Minute Millionaire.

১৭.

বেতন পাচ্ছি, দুটো পাচটা খেতে পাচ্ছি, চলে তো যাচ্ছে। এই অবস্থার উন্নতির প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে বেশিরভাগ মানুষ না বলবেন। মানুষ মাত্রই কমফোর্ট জোনের বাইরে যেতে ভয় পান। আবার, পৃথিবীর সব ভালো জিনিস আমাদের কমফোর্ট জোনের ঠিক বাইরে। ভালই তো আছি, আর কি দরকার? জীবন নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় নেই বাপু, পরে আম ছালা দুটোই যাবে।

১৮.

আমাদের নিজেদের জীবন নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার মানসিকতা না থাকার পেছনে মাসলোর তত্ত্ব আবার খাটানো যায়। মৌলিক চাহিদা, ভাত, কাপড় বা মাথা গোজার জায়গা না থাকলে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার আবেদন না থাকারই কথা। তবে, সবকিছুতে মরিয়া বা বেপরোয়া হবার মানসিকতা অনেকসময় ভাগ্য বদলে দেয়। মানুষ কোনঠাসা হয়ে গেলে অনেক চমত্কার চমত্কার ফলাফল নিয়ে আসে। একারণে অভিবাসীরা, যারা ভাগ্যের অন্নেষণে বিদেশ বিভুইয়ে পাড়ি দেন, তারা সবার সাথে প্রতিযোগিতায় তাদের সেরা কাজ দিয়ে নিজের সাথে দেশটাকেও উপরে নিয়ে চলে। এখানে, আমেরিকা, দ্য ল্যান্ড অফ অপুর্চুনিটি এসেছে ল্যান্ড অফ মাইগ্রান্ট থেকে। মরিয়া না হলে এটা সম্ভব নয়। তবে, ল্যান্ড অফ মাইগ্রান্ট ব্যাপারটি আসলে আমেরিকার মিত্র দেশটির জন্য বেশী প্রযোজ্য। পৃথিবীর সত্তুর ভাগ উদ্ভাবনী জিনিস আসে সেই দেশ থেকে। ‘ডেসপারেশন’ সেই দেশকে নিয়ে গেছে অন্য পর্যায়।

১৯.

মনে আছে সেই অকুতোভয় সেনাপতির কথা? অন্য দেশের পানিসীমায় প্রবেশ করে আবিষ্কার করলেন যে তার সৈন্য সামন্তের সংখ্যা তার শত্রুদেশের তুলনায় ভয়ংকরভাবে কম। ঘন্টা খানেকও টেকা যাবে কিনা তা নিয়ে আছে সন্দেহ। তীরে নেমেই পুড়িয়ে দিলেন সব জাহাজগুলো। সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমরা না জিতলে এই তীর ছাড়তে পারবো না। হয় জিতবো আমরা, না হয় আমরা শেষ সবাই!

তারা জিতেছিলো।

২০.
আমেরিকার “গ্রেট শিকাগো ফায়ার” এর কথা সবার মনে থাকবে অনেকদিন। বাংলাদেশের জন্মের ঠিক একশো বছর আগে এক বিশাল অগ্নিকান্ডে প্রায় নয় বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পুড়ে গিয়েছিলো। সর্বশান্ত হয়ে গিয়েছিলো মানুষ। ব্যবসায়ীদের সব দোকান ছারখার হয়ে গিয়েছিল। পরদিন ভোরে ব্যবসায়ীরা এসে অগ্নিকান্ডের ভয়াভয়তায় নতুন জায়গায় চলে যাবে নাকি নতুন করে দোকান চালু করবে সেটা নিয়ে অনেক শলাপরামর্শ করলেন। সবাই শিকাগো ছেড়ে চলে গেলেন পরে। থেকে গেলেন একজন। ঠিক ধরেছেন। ধারণা করা যায়, কমফোর্ট জোনের বাইরের লোক, পাগল কিসিমের।

২১.

শূন্য থেকে আবার দোকানটা তৈরী করা হলো। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আজ সেটা। মরিয়া হয়ে গেলে মানুষ কি করতে পারে তার সর্বতক্রিসঠ উদাহরণ হিসাবে দাড়িয়ে আছে মার্শাল ফিল্ড ডিপার্টমেন্ট স্টোর। দুহাজার ছয় সালে একে কিনে নেয় বিশ্বখ্যাত আরেক ব্র্যান্ড ‘মেসি’।

পৃথিবীর ভালো সব যা হয়েছে, তার সবকিছুই সেই অকুতোভয় মানুষগুলোর কমফোর্ট জোনের বাইরে ছিলো।

আপনার?

Read Full Post »

The girl doesn’t, it seems to me, have a special perception or feeling which would lift that book above the ‘curiosity’ level. – According to one publisher, “The Diary of Anne Frank”

১০.

লেখক জন্মায়, লেখক তৈরী করা যায় না।

এই মিথ্যা কিন্তু আজকের নয়। আর মিথ্যা চলছে হাজার বছর ধরে। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে যে গোয়েবলসের তত্ত্ব সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যবহার হয়েছে এখানে। জার্মান রাজনীতিবিদ পল জোসেফ গোয়েবলস, হিটলারের দলের লোক যে তার কূটবিদ্যার জন্য খুব বিখ্যাত হয়েছিল। “তুমি যদি খুব বড় কোন মিথ্যা ক্রমাগত বলে যেতে থাক, মানুষ এক সময়ে তা বিশ্বাস করতে শুরু করবে”, তার কিছু উক্তির অন্যতম। লেখক শৈশব থেকে ওয়েস্টার্ন বইগুলোর নায়কের মতো পিস্তলের নল না কামড়ে কলম কামড়ে বড় হয়। ক্লাসে গরুর রচনা না লিখে তালগাছের কবিতা লেখে। বড় হয়ে এমনিতেই লেখক হয়ে যায়। এইসব অন্যমনস্ক লেখকদের কিছু বদোভ্যাস থাকে, সেটাতে অন্যেরা মেনে নেয়। তারা প্রায়শই উশৃঙ্খল জীবন যাপন করে থাকে। নিষিদ্ধ জিনিস না হলে মাথাই খোলে না।

১১.

এগুলোর কোনটাই ঠিক নয়। আর, লেখক জন্মায় না। মন থেকে চাইলে লেখক কেন – অনেক কিছু হওয়া যায়। লেখকসহ যারা অনেক দুরে গিয়েছেন তারা খুবই নিয়মানুবর্তিতায় বিশ্বাসী। তবে, লেখক তৈরী করার বই হিসেবে এটুকু বলা যায়, লেখক হওয়ার জন্য আপনাকে সময় দিতে হবে, লিখতে হবে। লেখক লিখবে, তাইতো স্বাভাবিক। কিভাবে লিখবেন তা আসবে সামনে। একজন বিশ্বখ্যাত লেখকের ঘটনা যিনি আইনজীবী হিসেবে তার জীবন শুরু করেছিলেন। হঠাত্ ঘটল এক মারাত্মক দুর্ঘটনা, যা প্রায় মেরে ফেলেছিলো তাকে। হাসপাতালের বিছানাতে শুয়ে তার দ্বিতীয় জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে মনে হলো তিনি একসময় লেখক হতে চেয়েছিলেন। লেখলেন, একবছর, দুবছর, তিন বছর! কেউ তার লেখা ছাপতে চাইল না। লিখেই চললেন তিনি।

১২.

যেকোনো কিছুর প্রথম দরকারী জিনিস হচ্ছে, নিয়মানুবর্তিতা। এর পুরো শিল্পকৌশল মানে লেখার ‘ক্রাফট’ শেখানোর দায়িত্ব আমার, তবে আপনার অধ্যবসায়, নিয়মিত অনুশীলন আর ধৈর্য বাড়ানোর জন্য আমার সাথে থাকতে হবে শেষ পর্যন্ত। বই লিখিয়ে ছাড়বো আপনাকে। আছেন তো?

১৩.

যারা বই লেখেন তাদের ‘ব্রেক’ এর জন্য প্রয়োজন বই প্রকাশকদের। প্রকাশকরাই বইটাকে আলোর মুখ দেখান। তারাই আমাদের মতো লেখকদের জন্য ঝুঁকি নেন। আমাদের বই বের করার জন্য লগ্নি করেন। তাদের এই মানসিক চাপ এবং পার্থিব তোপের উপর থেকে নতুন লেখকের বই বের করা দুস্কর হয়ে পরে। প্রচুর জমা পড়া পান্ডুলিপির ভেতর থেকে মুক্তা খুঁজে বের করে আনতে হয়। সেখানে লেখকদের জমা দেয়া পুরাতন লেখা নতুন করে লেখা, অধ্যবসায় (সবসময়ের জন্য প্রযোজ্য) আর অনুশীলন করার পাশাপাশি ধৈর্য সেটাকে বাঁচিয়ে দেয়।

১৪.

বড় বড় প্রকাশক চিঠি লিখে জানিয়ে দেন তাদের অপারগতার কথা। অনেকে কিছু বলেন না। লেখকরা যা বোঝার বুঝেও যোগাযোগ করতে থাকেন। এগুলোকে সাধারণতঃ ‘রিজেকশন’ বা প্রত্যাখ্যান পত্র বলা হয়।

উদাহরণ দরকার? হাজারটা? আর, মাফ করবেন – বুঝতে পারিনি। বড় বড় লেখকদের?

আসছি কালকেই।

Read Full Post »

“I left the fairy tales lying on the floor of the nursery, and I have not found any books so sensible since.” ― G.K. Chesterton

৬.

ছোটবেলার শিশু পত্রিকা, নবারুণ থেকে কিশোরবাংলা সাপ্তাহিক কোনটাই বাদ পড়েনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনের বইয়ের অসম্ভব আসক্তি স্কুলের বইকে পাশ কাটাচ্ছিল। স্কুলের লাইব্রেরির কার্ডে বেশী বই তুলতে না পারার কারণে বন্ধুদের কার্ড দিয়ে বই তোলার মজা কম ছিলো না। ক্যাডেট কলেজএ যেয়ে বইয়ের সাগরে পড়লাম। বাংলার পাশাপাশি অক্সফোর্ডের ওয়ার্ল্ড ক্লাসিকসের চার আলমীরা বই শেষ করতে ছয় বছর কিন্তু অনেক সময়। টেকনোলজি নিয়ে কাজ করার সুবাদে যেকোনো ম্যানুয়াল পড়তে আমার না নেই। ইন্টারনেটের প্রথম দিকে কোনো সমস্যায় পড়লে বুলেটিনবোর্ড বা থ্রেডেড নিউজগ্রুপে, (যা বর্তমানের ওয়েব ফোরামের আদ্দিকালের ভার্সন) পোস্ট করলে মাঝে মধ্যে উত্তর হিসেবে “আরটিএফএম” চলে আসত, যার অর্থ হচ্ছে সময় নষ্ট করো না তো বাবু, “রিড দোজ ফ্রিকিং ম্যানুয়াল”! একসময় দেখা গেল এই ম্যানুয়ালই হয়ে গেল আমার সবসময়ের সঙ্গী। যেকোনো যন্ত্র আমাকে চালাতে দিন, ম্যানুয়ালের ধরন দেখে বলে দেয়া যাবে কতদিন দরকার। ম্যানুয়াল লেখা যে কিধরনের শিল্প তা না দেখলে বোঝানো যাবে না। বলা যায়, যে সভ্যতা যতো সুন্দর ম্যানুয়াল বের করে, সে তত উন্নত। এয়ারবাসের এ-থ্রীএইটির ম্যানুয়াল (কাগজের ম্যানুয়াল সব কম্পিউটারে পরিবর্তিত করা হয়েছে) এর খুটিনাটি বিশ্লেষণ দেখলে আপনার মাথা খারাপ হয়ে যেতে পারে। একটা কথা বলে রাখি, ঢাকায় এ-থ্রীএইটি আসছে খুব শিগগির!

৭.

মানুষ মাত্রই প্যাটার্ন এনালিস্ট। ছোটবেলায় ক্রিপ্টোগ্রাফির কয়েকটা বই হাতে পড়েছিলো বলে অফিসিয়ালি ব্যাপারটা মাথায় গেথে যায়। পরবর্তিতে যা পড়তাম বা দেখতাম তার একটা নকশা তৈরী করে ফেলতাম মনে মনে। দেখা যেত সমপ্যাটার্নের বিভিন্ন জিনিস গোত্রগুলোতে ভাগ করতে সময় লাগতো না। মানুষকেও প্যাটার্নের মধ্যে ফেলে দেবার পর বই পড়া আরো সহজ হয়ে গেলো। চোখ বন্ধ করে আপনার প্রিয় বইয়ের প্রধান চরিত্রের কথা মনে করুন। লেখক তার পাতার ভাজে ভাজে সেই  চরিত্রের নকশা ফেলে গেছেন।  মাফ করবেন, আমি ডেক্সটারের মতো ফিনকি দিয়ে ছড়িয়ে পড়া রক্তের ‘টর্ক’ এনালিস্ট নই। তবে, এর গল্প আগানোর প্যাটার্ন থেকে অনেক কিছু শেখার আছে – যা নিয়ে আসব সামনে। তবে জেফ লিন্ডসের “ডার্কলি ড্রিমিং ডেক্সটার” নামের এই অসাধারণ বইটা থেকে যা স্ক্রিপ্ট লেখা হয়েছে তা মানুষকে টিভির সামনে আটকে রেখেছে অনেকদিন। স্ক্রিপ্ট টীম থেকে গল্প আছে সামনেই।

৮.

বইয়ের ব্যাপারে প্যাটার্ন জিনিসটা আরো সহজ হয়ে এলো। চার পাঁচ হাজার বই পড়ার পর অনেকগুলো ধারণা মাথায় এলো। ফর্মুলার দিক থেকে অনেক বইকে কিছু কিছু গোত্রে ফেলানো যাচ্ছিল সহজেই। প্যাটার্নের প্যাচে পড়ে গেলাম আবার। রাত দিন স্বপ্নে প্যাটার্ন দেখি। এরপরের ঘটনা আরো চমত্কার। আগাস্টার মতো অজপাড়াগাঁ থেকে ক্রিসমাসের বিশ বাইশ দিনের লম্বা ছুটিতে বিগ এপলে চলে আসলাম। দুহাজার সালের দিকের কথা। যা দেখি তাতেই মুগ্ধ হই। এমটিএর (সাবওয়ে) মাসিক পাশ ধরে পুরো নিউ ইয়র্ক চষতে চষতে যেয়ে হাজির হলাম আট মাইল লম্বা (তখনকার সময়ের আট এখন আঠারো মাইল) বইতে দোকান, স্ট্র্যান্ডএ। বুক সাইনিং ইভেন্ট আর বিভিন্ন বুক রিডিং শুনতে শুনতে গোথাম রাইটার্স ওয়ার্কশপের পরিচিতি পেলাম। যে কেউ চাইলেই গল্প লিখতে পারে তার চাক্ষুস প্রমান পেলাম কয়েকজন বন্ধুদের প্ররোচনায়। সেটা আটকে ছিলো অনেকগুলো বছরের ধুসর স্মৃতিতে। কয়েকরাত ধরে সেই প্ররোচনাটা ফিরে আসছে, বার বার। আমাকে লিখতেই হবে, গল্প লেখার গল্প! কারণ, গল্প লিখবেন এবার আপনারা!

৯.

‘শিশু’র “সুমন ও মিঠুর গল্প” জীবনের প্রথম উপন্যাস হলেও  ‘কুশল আর মৃত্যুবুড়ো’ আমাকে প্রায় বছরখানেক আচ্ছন্ন রেখেছিলো। গল্পের সেই শক্তির ধারে কুপোকাত ছেলেটা বইয়ের লেখা সবকিছু বিশ্বাস করা শুরু করেছিলো। দিনের পর দিন শিশু পত্রিকার সেই উপন্যাসে সমুদ্রের নিচের বেশ কয়েকটা আঁকা ছবির মুগ্ধতা কাটছিলো না তার। বাবা মা কি ভাবছিলো তা না জানলেও উদ্বিগ্ন মনে হয়েছিলো তখন। এখন নিজের মেয়েকে যখন কোনো বইয়ে ডুবে থাকতে দেখি, মনে পড়ে সেই সব দিনের কথা। মেয়ে বা ছেলেটা গল্পের বই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লে তাদের রুমে আলো বন্ধ করতে গেলে নিজের দিনগুলোর কথা মনে পড়তে থাকে। মাঝে মধ্যে বালিশের পাশ থেকে বই সরিয়ে রাখতে গেলে ওদের সেই বইয়ের স্বপ্নে ভেসে যাওয়া বুঝতে পারি। বই আর সরাতে পারি না। যদি বই থেকে স্বপ্ন যাওয়া বন্ধ করে দেয়?

কুশলের একা ফিরে যাওয়া ভুলতে পারিনি এখনও।

Read Full Post »

“I’ll tell you a secret.

Old storytellers never die.

They disappear into their own story.” ― Vera Nazarian, The Perpetual Calendar of Inspiration

এই বই লেখার দরকার পড়লো কেন?

২.

প্রশ্নটা আমারও। বসলেই গল্প লেখা যায়। তা অবশ্যই যায়। এখানে দ্বিমত করার সুযোগ কম। আমার প্রস্তাবনা অন্য জায়গায়। বাংলা লেখালিখি বাড়ছে। আমাদের দেশে মানুষ আরো অনেকদিন কাগজের বই পড়বে। একুশের বইমেলা আরো অনেকদিন চলবে, আমরাও বইমেলায় আড্ডা আর বই কিনতে যাব। তবে, পাড়ার গল্পের বইয়ের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগে। টেক্সটবইয়ের দোকান কিছু আছে, তারা হয়তোবা বাছাই করা নামকরা লেখকের কিছু বই রাখে। নিউমার্কেটের গল্পের দোকানের পরিবর্তে অন্য দোকান হয়েছে, বই না চললে আর কতদিন ভর্তুকি দিয়ে চালাবেন। খোদ আমেরিকাতে বর্ডারের (নামকরা বইয়ের দোকান) অনেক দোকানের ‘ক্লিয়ারেন্স সেল’এ প্রচুর বই কিনেছি, অনেক দোকান সামনে হয়তোবা বন্ধ হয়ে যাবে। ব্রিটেনে ‘ওয়াটারস্টোন’ এখনো চুটিয়ে ব্যবসা করলেও তা কমে আসবে, সামনে। ভবিষ্যত অন্ধকার মনে হচ্ছে, তাইনা?

৩.

আব্রাহাম মাসলোর তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা হয়তোবা মৌলিক চাহিদার ধাপগুলোতে পড়ে আছি এখনো, তবে পৃথিবীর সমস্ত রিসার্চ বলছে, ভবিষ্যতে যা হবার তা বিশ্বের এঅংশেই হবে। ‘ব্রিক’এর পাশাপাশি সেভেন পার্সেন্ট ক্লাবে আমাদের ঢোকা শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার। সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিত্সাসেবা, ভালো পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন সুবিধা ইত্যাদি বাড়লেই মানুষের নতুন কিছু করার বা জানার আগ্রহ বাড়বে। মানুষের ফুল্ফিলমেন্টএর প্রথম শর্ত এটা। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে পানির সরবরাহ বা কিভাবে অফিসে যাবেন তা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন কিছু করা বা জানার চেষ্টা স্বভাবতই কমতে থাকবে। ধারণা করা হচ্ছে আমরা প্রচুর পড়ব সামনে। পড়তেই হবে।

৪.

গল্পের আবেদন চিরন্তন। লক্ষ বছর আগের কথা। মানুষের পূর্বপুরুষের গলার কাছে হাইয়য়েড হাড় ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকলে স্বরযন্ত্রের উদ্ভব হয়। নতুন পৃথিবী তৈরী সময় লাগেনি এরপর। নিয়ান্ডার্থাল আর তার আগের পূর্বপুরুষ শিম্পাঞ্জির মতো সামান্য কিছু শব্দ তৈরী করলেও স্বরযন্ত্রের এই সামান্য পরিবর্তন মানুষকে আরো অনেক জটিল শব্দ ব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়। তৈরী হয় ভাষা, মানুষকে আর পিছনে ফিরতে হয়নি তারপর। যোগাযোগের পূর্বসূত্র হিসাবে এই ভাষা গুহার চিত্রকর্ম পাশে জায়গা করে নেয়। মানুষ যতো উন্নত হতে থাকে, একসাথে থাকার জন্য গল্পের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। দলগতভাবে উন্নত হবার তরে ‘শেখার’ আবেদনে গল্পের পর গল্প তৈরী হতে থাকে, তা মানুষকে আরো পরিশীলিত করতে থাকে। বর্তমানের জটিল জীবনধারাতে এর প্রযোজ্যতা আরো বেশী। ছোটবেলা থেকে যে যতো বেশী গল্পে প্রবেশাধিকার পায়, সে তত উন্নত জীবনযাত্রায় যেতে পারে, পরীক্ষিত।

৫.

মানুষ কি পড়া কমিয়ে দিয়েছে? বাংলাদেশে বইয়ের দোকান অদৃশ্য হবার পাশাপাশি নতুন প্রজন্ম ইন্টারনেটের দিকে বেশী ঝুকে পড়াতে এই সমীক্ষা কিছুটা পড়তির দিকে। তবে, তা সাময়িক। এটা বাড়তে বাধ্য। বর্তমান প্রজন্মকে বই পড়ার দিকে নিতে হলে লেখার কিছু ধ্যানধারণা পাল্টাতে হবে। আর সে কারণে এই বই। পরে আসব সেটা নিয়ে। এই গতবছরের প্রথমে বৃটেনের আমাজনের (অনলাইন বই বিক্রেতা) প্রিন্ট বই থেকে ইলেকট্রনিক বইয়ের সেল বেড়েছে বেশী। আমাজন, (ইউকে) একশো প্রিন্ট বইয়ের বিপরীতে একশোচৌদ্দটা ইলেকট্রনিক বই বিক্রি করেছে। দুটো মিলিয়ে আমার মতো বইখাদকের সংখ্যা বেড়েছে বৈকি। কিন্ডল আসার আগে ‘আমাজন শর্ট’ বলে ছোট গল্পের পিডিএফ ভার্সন বিক্রি করতো। আমি নিজেই কিনেছি অনেক। দাম পঞ্চাশ সেন্টের কম হওয়াতে বিক্রি হতো প্রচুর। সাবান বা শ্যাম্পুর মিনি প্যাকের মার্কেটিং স্ট্রাটেজি এখানে ভালই চলছিলো। অনলাইনে কেনাকাটার পেছনে গ্রাহকদের মানসিকতা পরীক্ষা করতে বেশী দুরে যাবার দরকার নেই। ধরা যাক, আমি পত্রিকাতে একটা বইয়ের নাম দেখে কেনার সিদ্ধান্ত নিলাম। সে বইটা কিনতে আমাকে কতো সময় দিতে হবে? সব বই আবার সব দোকানে পাওয়া যায় না। পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন আর ট্যাক্সিতে যেয়ে বইটা নিতে গেলে কস্ট-বেনিফিটের বেড়াজালে বইটা হয়ত আর কেনা হবে না। ইদানিং অনলাইনে বই কেনাকাটা করা যায়, চার/পাঁচ দিন পরে শিপিং খরচ যোগ করে সেই বই পড়ার মানসিকতা নাও থাকতে পারে। প্রচুর বই কিনেছি কিন্ডলে, সেই মুহুর্তের টেম্পটেশন ধরে রাখতে পারিনি। বই কেনার পরবর্তী মুহুর্তে বই পড়ার এই অসাধারণ অভিজ্ঞতা কোথায় পাবেন? প্রিভিউ থেকে প্রথম তিন অধ্যায় পড়ার পর বাকি অধ্যায় পড়ার জন্য আপনি প্রলুব্ধ হলে কেনা কোনো সমস্যা নয়। আমাদের দেশে এই প্লাটফর্ম না থাকলেও তা আসতেও সময় নেবে না। যে দেশে স্মার্টফোন সহজলভ্য হয়ে আসছে, ট্যাবলেট কিনছেন সবাই, ইবুক রিডার আসছে সামনে, সেখানে বই বিক্রি শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার।

Read Full Post »

“Your tale, sir, would cure deafness.” ― William Shakespeare, The Tempest

গল্প কেন?

১.

লিখতেই যদি হবে গল্প কেন? আমারও প্রশ্ন ছিলো তাই।

মানুষের সমস্যার অন্ত নেই। আমরা ছোটবেলা থেকে অনেক কিছু হতে চাই, কেউ তা হতে পারি, বেশিরভাগই পারি না। আমি ফ্ল্যাশ গর্ডন হতে চেয়েছিলাম। হাসলেন?

ডেল আর্ডেনের সাথে কথা বলতে চেয়েছি। আরো ভয়ঙ্কর ব্যাপার!

গল্প মানুষকে বাস্তবতা থেকে পালাতে সাহায্যই করে না, সে তার মনের মাধুরী মিশিয়ে যেখানে যেতে চায়, সেখানে উড়িয়ে পাঠিয়ে দেয়।

টাইম মেশিন বাস্তবে সম্ভব নয়, বলে অনেকে – তবে গল্পই টাইম মেশিন!

মানুষকে এই অসম্ভব আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না একদমই।

লিখুন আপনার গল্প, মানুষের গল্প, নিয়ে যান অচেনার দেশে – পালাতে সাহায্য করুন কঠিন বাস্তবতা থেকে।

Read Full Post »

Older Posts »

%d bloggers like this: