Feeds:
Posts
Comments

The best time to plant a tree was 20 years ago. The second best time is now.

– Chinese Proverb

ক॰

সমস্যাটার শুরু প্রায় এক দশক আগে। ছুটাছুটির চাকরি। আজ এখানে তো কাল ওখানে। শেষমেষ ‘পীস কীপার’ হিসেবে পোস্টিং হলো কঙ্গোতে। ঘুরাঘুরিই বেশি। ঘুমের সময় ছাড়া বাকিটা হিসেব করলে – পুরোটাই রাস্তায়। নিজ দ্বায়িত্বের এলাকা, যাকে বলে ‘এরিয়া অফ রেস্পন্সিবিলিটি’ – ইঞ্চি ইঞ্চি করে না জানলে বিপদ। মানুষের জীবন বলে কথা। পুরো এলাকা থাকতে হবে নিজের নখদর্পণে। কন্সট্যান্ট ভিজিল্যান্স। পায়ে হাটা অথবা গাড়ি – পায়ের মাইলোমিটারে লাখ মাইল পার হয়েছে নিশ্চিত।

খ॰

রাস্তায় নামলেই হাজার চিন্তা কিলবিল করে মাথায়। একটা এদিকে হলে আরেকটা ওদিকে। মাথা মুন্ডু ছাড়া চিন্তাভাবনা। দিন কয়েক পর বেস ক্যাম্পে ফিরলে বসতাম ইউএন এর কচ্ছপ গতির ইন্টারনেট নিয়ে। সভ্যতার সাথে একমাত্র ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ – ওই স্যাটেলাইট লিংক। একসময়, প্লট করতে শুরু করলাম চিন্তাগুলোকে। ‘চ্যানেলাইজ’ করতে তো হবে কোথাও। একেকটা চিন্তা একেকটা ডট। কানেক্টিং দ্য ডট’স ব্যাপারটা বুঝলাম অনেক পরে। চল্লিশের আগে নাকি ব্যাপারটা আসে না মাথায়?

জ্ঞান তো হলো অনেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে আসবে প্রজ্ঞা। সেটাকে প্রয়োগ করলেই উন্নতি। দেশের।

জ্ঞান তো হলো অনেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে আসবে প্রজ্ঞা। সেটাকে প্রয়োগ করলেই উন্নতি। দেশের।

গ॰

আগের ঘটনা আরো চমত্‍প্রদ। কঙ্গোতে যাবার ঠিক আগ মূহুর্তে ফিরেছিলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিগন্যাল স্কুল থেকে। থাকতে হয়েছিল লম্বা সময়ের জন্য। প্রায় নব্বই বর্গ মাইলের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিকম্যুনিকেশন ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি। যায়গাটাও জর্জিয়ার একটা অজ পাঁড়া গাঁয়ে। সন্ধার পর কুপি জ্বলার মতো অবস্থা। স্কূল থেকে ফিরে কাজ না পেয়ে হাত দিলাম রান্নায়। কাঁহাতক আর খাওয়া যায় ফাস্ট ফুড! পিএক্স থেকে এটা কিনি, ওটা কিনি। বাসায় এসে ভয়াবহ ধরনের ‘টেস্ট এণ্ড ট্রায়াল’। অসুবিধা কি? গিনীপিগ তো নিজে। ক্ষান্ত দিলাম স্মোক ডিটেক্টরের পানির ঝাপটা খেয়ে। বার কয়েক। তবে, একেবারে ক্ষান্ত নয়, কমিয়ে দিলাম গতি। মনোযোগ সরালাম নতুন দিকে।

ঘ॰

বিশাল লাইব্রেরী। এটা ওটা ইস্যু করি, টাইম লিমিটও অসহনীয় লম্বা। পুরনো পত্রিকা, দুস্প্রাপ্য বই সব মাইক্রোফিশেএকদম নতুন বই লাইব্রেরীতে না থাকলেও সেটা কিনে এনে চেকআউট করিয়ে রাখতেন লাইব্রেরিয়ান। আমাজনের বেস্টসেলার লিস্ট দেখা অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেলো ওই সময়ে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ‘বেস্টসেলার’গুলো লিখছেন আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষ। মানে, পেশাদার লেখক নন তারা। সাহস পেলাম। যাই লিখি, পাঠক পেতেই হবে বলেছে কে? মনের খোরাক মেটানোর জন্য লেখা। ওই বিরানব্বই থেকে। সেথ গোডিংয়ের গলা শুনি প্রায়ই। শিপ, বাডি! শিপ!

ঙ॰

দেখা গেলো ওই ‘বেস্টসেলার’দের কেউ ছিলেন স্টক এক্সচেঞ্জের হর্তাকর্তা, কেউ সিআইয়ের চীফ। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার। সরকারী কর্মকর্তা। নেভী সীল। ফুটবল কোচ। জিমন্যাষ্ট। তারা লিখছেন পেছনের অনেকগুলো বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে। ব্যর্থতা থেকে সফলতার গল্প। যা আসলে সাহায্য করছে ওই পড়ুয়া মানুষদের। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। বিতর্কিত জিনিস নিয়ে যে লেখা হয়নি তা নয়। লিখেছেন রেচেল মোরানের মতো পেশাজীবীরা। মানে – লেখা হয়েছে প্রায় সব বিষয় নিয়ে। বের হয়ে এসেছে অনেক সমস্যার কথা। সেই ভুল থেকেও শিখছে দেশ। সমালোচনা নিতে পারার মানসিকতার দেশগুলো ওপরে উঠছে দ্রুত। আবার লিখছেন জাতির পিতারা। আজকের ‘আধুনিক’ সিঙ্গাপুরের পেছনে যিনি ছিলেন তারো বই আছে কয়েকটা। নেলসন ম্যানডেলা’র বইটা পড়েছেন নিশ্চয়। সাতাশ বছরের অবিচারের ঘৃণাটা মূহুর্তে গিলে ফেলার ঘটনাটা অজানাই থাকতো বইটা না পড়লে। পড়ছি সবই, বুঝতে পারছি ভালো মন্দ। মন্দটা ফেলে ভালো নিয়ে এগুচ্ছি সবাই আমরা, সময়ের বিবর্তনে। অন্যের কাছ থেকে শিখে। পেছনে লেগে নয়।

চ॰

জ্ঞান কিন্তু রি-ইউজেবল। ব্রিটেনের লেগেছে দুশো বছর প্রায়। শুধু শিখতেই। শিল্পবিপ্লব থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিখেছে ব্রিটেন থেকে। তাদের লোক পাঠিয়ে। নোটবই ভরে নিয়ে আসতো তাদের অভিজ্ঞতার কথা। জাহাজে করে। সেটা কাজে লাগিয়ে ওই ব্রিটেনের সাথে টক্কর দিয়েছে অনেক কম সময়ে। ‘লীড টাইম’ কমিয়ে নিয়ে এসেছে প্রায় একশো বছর। এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই শেখার চর্চাটা ধরে রেখেছে বলে তারা এখনো শীর্ষে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শত বিপত্তির মধ্যে উদ্ভাবনা দিয়ে আছে টিকে। নিজেদের দেশে মানুষ কম বলে বাইরের বাজার দখলে ব্যস্ত তারা। এখন বোকারাই বলে যুদ্ধের কথা, বাজার দখলে কে কাকে বাজার বানাতে পারে সেটাই হচ্ছে বড় যুদ্ধ। রক্তপাত ছাড়াই ‘আউটবাউন্ড’ ক্যাশফ্লো!

ছ॰

এশিয়ান দেশগুলো আরো বুদ্ধিমান। ইউরোপ আর অ্যামেরিকা থেকে শিখে সেটা কাজে লাগিয়েছে গত তিরিশ বছরে। এখন টক্কর দিচ্ছে সবার সাথে। হংকং, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর অন্যের ‘ঠেকে শেখা’র অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এগিয়েছে বেশি। পাশ্চাত্যে কোনটা কাজ করছে আর কোনটা করেনি সেটা জানলেই তো হলো! তার সাথে মেশাও ‘লোকাল কন্ডিশন’। আমি এটাকে বলি, ‘ঘুটা’, মানে জ্ঞানের ডিফিউশন। মেলাও হাজারো জ্ঞানের অভিজ্ঞতা। গরীব দেশ হলেও কোন সরকারী কর্মকর্তাকে তো মানা করা হয়না বৈদেশিক ভ্রমনে না যেতে। অথচ কর্পোরেট হাউসে কৃচ্ছতা সাধনে প্রায় সবই চলছে ভিডিও কনফেরেন্সে। দেশের একটাই চাওয়া, শিখে আসা জ্ঞানটা কাজে লাগবে দেশের উন্নতিতে। প্রাথমিক জ্ঞানটা পাবার পর বাকিটা শেখার বাহন হচ্ছে ইন্টারনেট। আর সেকারণে ইন্টারনেট নিয়ে লাগা। জ্ঞান ছড়িয়ে আছে সব যায়গায়, দরকার তার প্রয়োগ।

ঝ॰

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেলেন জ্ঞান ‘ক’। এদিকে সিংগাপুর দিলো ‘খ’ জ্ঞান, ভিয়েতনাম থেকে নিয়ে এলেন ‘গ’। এখন – আমাদের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্ডিকেটরের সাথে মিলিয়ে যেটা যখন কাজে লাগে সেটাই ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। অনেকে এটাকে বলে ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’। মানে, যেটা কাজ করেছে অনেক যায়গায়। ‘ওয়েল টেস্টেড’। টেস্ট পেপার সলিউশনের মতো কিছুটা। দেখা গেছে – ওভাবে কাজটা করলে জিনিসটা মার যাবার সম্ভাবনা কম। টেস্ট এণ্ড ট্রায়ালের পর ফুলপ্রুফ হয়েই নাম হয়েছে ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’। দেশের ‘লোকাল কন্ডিশন’কে বেস্ট প্র্যাকটিসে ঘুঁটানোতেই রয়েছে মুন্সিয়ানা। ইন্টারনেটকে ছড়িয়ে দেবার ওই ধরনের ‘টেম্পলেট’ নিয়ে কাজ করেছি গত সাত সাতটা বছর।

ঞ॰

মনে আছে বৈজ্ঞানিক নিউটনের কথা? ‘আমি যদি আজ বেশি দেখে থাকি অন্যদের চেয়ে, সেটা পেরেছি পূর্বপুরুষদের জ্ঞানের ভিত্তিতে’। উন্নতবিশ্বের আজকের যা উন্নতি তার সবটাই এসেছে ওই ‘স্ট্যান্ডিং অন দ্য সোল্ডার অফ জায়ান্টস’ কথাটার ওপর ভিত্তি করে। আজ জানি আমরা ট্রানজিস্টর কি – আর কিভাবে কোটি ট্রানজিস্টর থাকে একটা চিপসেটে। নতুন করে ওই ট্রাংজিস্টর উদ্ভাবন না করে বরং কোটি ট্রাংজিস্টরের চিপসেট দিয়ে আর কি কি করা যায় সেটাই ভাববার বিষয়। আর তাই আগের জ্ঞানের ‘ডিফিউশন’ দিয়ে নতুন উদ্ভাবনা কাজে লাগিয়ে ওপরে উঠছে নতুন ইমার্জিং দেশগুলো। এটাকে বলা হয় লিপ-ফ্রগিং।

য॰

সামরিক বাহিনীর স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার বিটিআরসিতে আসা। টেকনোলজি নিয়ে একসময় লিখতাম কিছু পত্রপত্রিকায়। শুরুতেই ঝামেলা। ব্রডব্যান্ড, ইন্টারনেট – নতুন যাই লিখি সেটা নিয়ে মাথা নাড়াচ্ছিলেন অনেকেই।

“ভালো, তবে সমস্যা অন্যখানে। এটা সম্ভব নয় এদেশে।”

সময় কিন্তু যাচ্ছে চলে। জ্ঞানকে অভিজ্ঞতায পরিণত করতে লাগবে সময়োচিত দর্শন, যুক্ত হবার অদম্য স্পৃহা। লাগবে রেগুলেটরী রেফর্ম। দরকার নেই প্রযুক্তি জানার, নীতিনির্ধারণীদের।

সময় কিন্তু যাচ্ছে চলে। জ্ঞানকে অভিজ্ঞতায পরিণত করতে লাগবে সময়োচিত দর্শন, যুক্ত হবার অদম্য স্পৃহা। লাগবে রেগুলেটরী রেফর্ম। দরকার নেই প্রযুক্তি জানার, নীতিনির্ধারণীদের।

বলেন কি? অবাক হয়ে তাকাই উনাদের দিকে। নীতিমালায় আটকানো আছে জিনিসগুলো। মানে আমরা আটকে আছি আমাদের জালে। জিনিসপত্র না জানার ফলে পিছিয়ে পড়ছি আমরা। যুক্ত থাকার হাজার সুবিধার মূলে হচ্ছে মানুষের মুক্তি। সেটা প্রথমে আসবে অর্থনৈতিক মুক্তি থেকে, জ্ঞান দেবে আমাদের প্রাপ্যতার নিশ্চয়তা। সোশ্যাল মিডিয়ার বিগ ডাটা নিয়ে কাজ করেছিলাম একটা এজেন্সিতে বসে। যুক্ত থাকার ফলে আজ যা দেখছেন, এটা আইসবার্গের ছোট্ট একটা টিপ। আরব বসন্ত, একটা উপসর্গ মাত্র। পালটাচ্ছে পৃথিবী, পাল্টাবো আমরাও। ভালোর দিকে। দরকার ইন্টারনেটের মতো কিছু টুলস।


The two most important days in your life are the day you are born and the day you find out why.

― Mark Twain

র॰

বইগুলো লিখছি কিছুটা দায়বদ্ধতা থেকে। বিটিআরসির সাত বছরের অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে ঘোরার অন্তর্জালা থেকে মুক্তি পেতে এ ব্যবস্থা। নোটবই সেনাবাহিনীতে পোশাকের অঙ্গ হবার ফলে মিস করিনি খুব একটা। জিম রনের অমোঘ ‘নেভার ট্রাস্ট ইয়োর মেমরী’ বাণীটা খুব একটা বিচ্যুতি আনতে পারেনি ‘নোট টেকিং’য়ে। এখন যুগ হচ্ছে ‘গুগল কীপ’ আর ‘এভারনোটে’র। হাতির স্মৃতি বলে কথা – মাটিতে পড়ে না কিছুই। দেশ বিদেশের ফোরাম, যেখানে গিয়েছি বা যাইনি – হাজির করেছি তথ্য। টুকেছি সময় পেলেই। ভরে যাচ্ছিলো নোটবই। ‘এভারনোট’ আর ‘কীপের’ ভয়েস মেমোতে। পয়েন্ট আকারে। প্রোগ্রামিংয়ের মতো পয়েন্টারগুলো লিংক করা ছিলো মাথায়। ভুলে যাবার আগেই বইগুলোর ব্যবস্থা।

ল॰

আরেকটা সমস্যা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে – ওই ছোটবেলা থেকে। কোন জিনিস ধরলে সেটার শেষ না দেখলে ঘুম আসে না আমার। বিশাল বিপদ। আগে ভাবতাম সমস্যাটা আমার একার। ভুল ভাঙ্গলো দুনিয়া দেখতে দেখতে। ইনডাস্ট্রিতে একই অবস্থা। একেকটা রিসার্চ, সফল না হওয়া পর্যন্ত পড়ে আছে মাটি কামড়ে। মনে আছে, হেনরী ফোর্ডের ভি-৮ সিলিন্ডার তৈরির কথা? এই কৌশল ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি, এরোস্পেস, নাসা, ঔষধ গবেষণা সহ প্রচুর স্পেসালাইজড প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে। আজকের এয়ারবাস এ-৩৮০, দোতলা উড়োজাহাজ এতো সহজে আসেনি। উনিশশো অষ্টাশির গবেষনার ফল পাওয়া গেছে এপ্রিল দুহাজার পাঁচে, উড়োজাহাজটাকে উড়িয়ে। এরপরও আরো দুবছরের বেশি হাজার হাজার ‘সেফটি টেস্ট’ আর অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার পর প্রথম বানিজ্যিক ফ্লাইট চালায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স। অন্য কিছু নয়, ওড়াতেই হবে – তাই উড়েছে উর্রুক্কুটা। কেউ জেদ ধরেছিলো, আট দশ ফ্লাইটের তেল দিতে পারবো না। এক ফ্লাইট এর তেল নাও, নইলে অন্য ব্যবসা দেখো। বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনারটাও তৈরি হয়েছে কয়েকটা জেদি মানুষের জন্য। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে উজাড় করে দিয়েছেন তার জ্ঞানকে। বাকিটা আমাদের পালা।

শ॰

আজকের ‘ইন্টারনেট’ (যা পৃথিবীকে পাল্টে দিচ্ছে) এর আবিস্কারের পেছনে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। দেশ চেয়েছে ব্যয়বহুল সার্কিট সুইচিং থেকে বের হতে, ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সী, সংক্ষেপে ‘ডারপা’ বিভিন্ন উনিভার্সিটিতে ঢেলেছে অঢেল পয়সা, দিয়েছে অনেক সময়। প্রজেক্ট ‘ফেইল’ করেছে হাজারো বার, হাল ছাড়েনি তারা। ফলে তৈরী হয়েছিল আরপানেট, বর্তমান ইন্টারনেট এর পূর্বসুরী। আজকের বিদ্যুত্‍ বাল্ব তৈরি করতে থমাস এডিসনকে চেষ্টা করতে হয়েছিল হাজার বারের বেশি। রিপোর্টার জানতে চেয়েছিলেন তার ‘হাজারবারের ব্যর্থতার অনুভুতির কথা’। এডিসনের জবাব, ফেইল করিনি তো হাজার বার। বরং, লাইট বাল্বটা তৈরি করতে লেগেছিলো হাজারটা স্টেপ।

ষ॰

টেলিযোগাযোগ ব্যবসায় ভাসা ভাসা কাজের উপযোগিতা কম। রেগুলেশনেও একই অবস্থা। দরকার স্পেশালাইজেশন – বাজার বুঝতে। ঢুকতে হবে ভেতরে, অনেক ভেতরে। পুরোটাই অর্থনীতিবিদদের কাজ। ভবিষ্যত না দেখতে পারলে এ ব্যবস্যায় টিকে থাকা কঠিন। টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোর জাহাবাজ লোকেরাও মাঝে মধ্যে অত ভেতরে ঢুকতে পারেন না। স্পেশালাইজেশন বলে কথা। সেখানেই আসে টেলিযোগাযোগ কনসাল্টিং কোম্পানিগুলো। ওদের কাজ একটাই, আর এন্ড ডি, সারাবছর ধরে। আবার সেই কনসাল্টিং ফার্ম একই ধরনের কাজ করে বেড়াচ্ছে সব টেলিযোগাযোগ কোম্পানির জন্য। স্পেশালাইজড না হয়ে যাবেই বা কোথায় তারা? আর সেই সল্যুশনের জন্য মিলিয়ন ডলারের নিচে কথা বলেন না কেউই। আর বলবেন নাই বা কেন? এধরনের আর এন্ড ডির জন্য কম কষ্ট করতে হয়না তাদেরকে। প্রচুর রিপোর্ট পড়েছি এই কনসাল্টিং ফার্মগুলোর। রিপোর্টতো নয় যেনো হাতের রেখা পড়ছেন। ভবিষ্যত দেখা যায় রীতিমত। মিলিয়ন ডলারের কনসাল্টিং বলে কথা। টার্গেট দিন এক কোটি কর্মসংস্থানের। তৈরি করে দেবো প্রায়োগিক ফর্মুলা। হতে বাধ্য। জানতে হয় ভবিষ্যত দেখতে। বিগ ডাটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি খানিকটা।

ট॰

তাই বলে সব কনসাল্টিং ফার্ম এক নয়। আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, কনসাল্টিং ফার্মের দোষ না দেখে যিনি কাজ দিয়ে বুঝে নেবার কথা – তার কম্পিটেন্সিতে ঘাটতি থাকলে রিপোর্ট খারাপ হতেই পারে। আমি কিনছি রিপোর্ট, না বুঝে কিনলে কনসাল্টিং ফার্মের দোষ দিয়ে লাভ কি? গরীবদেশগুলোতে প্রচুর কনসালটেন্সি হয় বটে, তবে সে দেশগুলো সেগুলো ঠিক মতো বুঝে নেবার সামর্থ বা জ্ঞান থাকে না বলেই ঝামেলা হয়। ডোনারদের টাকায় কনসাল্টেন্সি হলে সেটার অবস্থা হয় অন্য রকম। রিপোর্ট নিজের মনে করে বুঝে নিতে পারলে সেটার দাম মিলিয়ন ডলারের বেশি। সে ধরনের রিপোর্ট বুঝে নিয়েছিলাম বেশ কয়েকটা। পোস্ট-ডক করা যাবে কয়েকটা।

ঠ॰

কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হলো বিশ্বখ্যাত অনেকগুলো টেলিযোগাযোগ কনসাল্টিং ফার্মের সাথে। এর সাথে যোগ হলো ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) আর কমনওয়েলথ টেলিকম্যুনিকেশন অর্গানাইজেশনের (সিটিও) আরো অনেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট। ধারণা পেলাম তাদের কাজের। পড়তে থাকলাম আরো হাজারো রিপোর্ট। দামী সব রিপোর্ট, তবে তার দাম কোনো কোনো দেশ বা এজেন্সি দিয়ে দিয়েছে আগেই। পরিচয় হলো ওভাম, অ্যাকসেন্চার, কেপিএমজি, পিডাব্লিউসি, নেরা আর এনালাইসিস ম্যাসনের মতো তুখোড় তুখোড় ফার্মের সাথে। আবার নিজের প্রতিষ্ঠানেরই কাজ করতে পরিচয় হলো মার্কিন ফার্ম টেলিকমিউনিকেশনস ম্যানেজমেন্ট গ্রূপ, ইনকর্পোরেশন (টিএমজি)র সাথে। তাদের ধরনটাই বুঝতে সময় লেগেছিলো বেশ। তলই পাচ্ছিলাম না প্রথমে। বিলিয়ন ডলারের কনসাল্টিং কোম্পানি বলে কথা। পরিচয় হলো অনেকের সাথে। বন্ধুত্ব হলো অনেকের সাথে। হাতে ধরে দেখিয়ে দিলেন বাংলাদেশের ‘ফল্ট-লাইন’গুলো।

ড॰

একসময় তল পেলাম এই ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং ফার্মগুলোর কাজের ধারার। পৃথিবী জুড়ে কাজ করার ফলে কোথায় কি সমস্যা সেটা তারা জানে ভালো। আর সেটা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেয়া ওদের একমাত্র কাজ বলে ওটাও সে জানে ‘অসম্ভব’ ভালো। গরীব দেশগুলোতে হাজার কোটি টাকার ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্টেনসি করে টাকা বানালেও সেটার ব্যর্থতার দায় দেয়া যাবে না তাদের ওপর। ওই দেশের – যাদের ‘কন্সাল্টেনসি’টা বুঝে নেবার কথা তারা ‘ছাড়’ দিলে কাজ হবে কিভাবে? উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠতে হলে লাগবে কন্সাল্টেনসি, তবে সেটা ‘পাই’ ‘পাই’ করে বুঝে নেবার মতো থাকতে হবে মানুষ। দু চারটা বৈদেশিক ভ্রমণে ব্যাপারটা উপেক্ষিত হলে জ্ঞান আর প্রজ্ঞাটা হারায় দেশ।

ঢ॰

ব্যাপারটা অনেকটা বিজনেস প্ল্যান কেনার মতো। ও আমাকে বানিয়ে দিলো একটা। না বুঝে দিয়ে দেবো পয়সা? সমস্যা হয় যখন সেটা হয় ‘সরকারী’ মানে জনগণের পয়সা। একারণে উন্নতদেশগুলো ছোট করে নিয়ে আসছে সরকারগুলোকে। যাই হয় সব পার্টনারশীপে। যারাই থাইল্যান্ড গিয়েছেন মুগ্ধ হয়েছেন তারা – বিশাল বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার দেখে। বেশিরভাগ ইনফ্রাস্ট্রাকচারই কিন্তু পিপিপি’র মডেলে করা। সরকারের অতো পয়সা থাকে না কোথাও। পিপিপি হচ্ছে গিয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ। পয়সা যোগান দেবে বেসরকারী কোম্পানি – কাগজ দেবে সরকার, আইনগত ভিত্তি সহ। ‘উইন’ ‘উইন’ ব্যাপার। পয়সা লাগলো না সরকারের। কর্মসংস্থানও হলো। আমাদের পিপিপি নীতিমালা তৈরী হয়নি এখনো।


There is no ‘poor’ country, they are ‘poorly’ managed.

― Slightly modified

ণ॰

উন্নত দেশগুলোতে অনেক বড় বড় কাজে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে না জনগণ। কারণ এই পিপিপি। যেকোনো দেশের উন্নতির ইনডিকেটর বোঝা যায় ওদেশের পাবলিক ট্রানজিট সিস্টেম দেখে। মানে জনগন কতো সহজে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারছেন – নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। ঢাকা শহরে সেটার অবস্থা আফ্রিকার অনেক দেশ থেকেও খারাপ। অথচ ব্যবস্যা বান্ধব পিপিপি নীতিমালা থাকলে প্রাইভেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো প্রস্তাব দিতে পারতো সরকারের কাছে। তৈরী করতো ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড’। ভাগ করে ফেলতো পুরো শহর – চার পাঁচ ভাগে। একেকটা ভাগের রুট নিয়ে দেন-দরবার করতো কনসেশন পিরিয়ডটা নিয়ে। এই রুটটা দাও আমাকে পঞ্চাশ বছরের জন্য। তৈরী করবো স্কাই ট্রেন। ইনফ্লেশন হিসেব ধরে ভাড়ার একটা চার্ট জমা দিতো সরকারকে।

স॰

সফটওয়্যারের মানুষ হিসেবে শূন্য ভার্সন থেকে শুরুতে বিশ্বাসী আমি। শুরু করতে হবে কোথাও। নিউটনের কথায় ফিরে আসবো আবার। ষ্টান্ডিং অন দ্য সোল্ডার অফ জায়ান্টস। আমাদেরও এগুতে হবে পূর্বসূরীর অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে। গাছ রোপণ করার কথা ছিল বিশ বছর আগে। সেটা না হলে কি থাকবো বসে? বরং – লাগাবো আজই। বাংলাদেশের ‘যুক্ত’ হবার এজেন্সিতে চাকরি করার সুবাদে গরীব দেশ আমার ওপর যা ইনভেস্ট করেছে সেটা ফিরিয়ে দেবার জন্য নিয়েছি নগণ্য একটা প্রয়াস। নাম দিয়েছি প্রজেক্ট ‘গিভিং ব্যাক’। ব্রডব্যান্ড ছড়িয়ে দেবার ‘চিটকোড’ হিসেবে ধরুন ব্যাপারটাকে। ব্রডব্যান্ডে সফল দেশগুলোর ধারণা নিয়ে ‘আমাদের আঙ্গিকে’ কোডটাকে ‘ক্র্যাক’ করতে চেষ্টা করেছি মাত্র। আর, পয়সার জন্য ওর সাথে থাকবে ইনফ্রাস্ট্রাক্চার ফান্ড। আর এসপিভিলাগবে এটাও

দরকার আপনার সুচিন্তিত মতামত। ওই মতামতের ওপর ভিত্তি করে কাঠামোগত পরিবর্তন আনবো বইগুলোতে।

প্রি-প্রোডাকশন স্টেজ: কাজ চলছে এখনো

প্রথম বই: ইন্টারনেটের মুল্যঃ যে কারনে এখনো ধরাছোয়ার বাইরে

দ্বিতীয় বই: বাতাস ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: দক্ষ স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা পাল্টে দিতে পারে বাংলাদেশকে

তৃতীয় বই: রেগুলেট অর নট টু রেগুলেট? চতুর্থ প্রজন্মের রেগুলেটর ও বাংলাদেশ

* লিংকগুলো যুক্ত করা হয়েছে কয়েকটা ব্লগপোস্টের সাথে। পুরো বইগুলো আসবে আস্তে আস্তে – প্রিন্টে।


০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
সাশান্দ্রা, আইভরি কোস্ট

And you may hear the same old story
In ev’ry town, on ev’ry street
The story of ‘Sunset’, and the
Heartbreak Kid

- Icehouse, Man of Colours

৩৫.

গানের নায়িকার প্রেমে পড়ে যাব – সেটা ভাবিনি কখনো। বইয়ের নায়িকা? ঠিক আছে, বই তো ‘গ্রো’ করতে থাকে আমাদের মনের ওপর – পড়ার শুরু থেকে। প্রথমেই না পছন্দ – নায়িকাকে। হবে না কেন? সেই তো ঝামেলা তৈরি করতে থাকে নায়কের। শুরু থেকে। বাস্তবেও তাই। আগেই ‘ক্লিয়ার’ করে রাখি, স্বাতী ব্যতিক্রম। নো মোর ডিসট্র্যাকশন। ফিরে আসি বইয়ে। একেকটা অধ্যায় পার হয়, মায়া বাড়তে থাকে নিজের অজান্তে। মানে নায়িকার ওপর। নায়ক হয়তো পাত্তা দিচ্ছে না মেয়েটাকে। তখন নিজেই উতযোগ নেই – মেলানোর ব্যপারে। আমরা তো আর মিলাই না, ওত্‍ পেতে থাকি গল্পের ‘টুইস্টে’র জন্য। কখন নায়িকা এমন কিছু করে ফেলবে যাতে নায়ক জিভ কেটে নায়িকার কাছে ক্ষমা চাইবে। মুভিতে মিল হলেও বইতে আবার মিলনান্তক ঘটনা কম।

‘ঠিক বলেন নি আপনি।’ আপনার জবাব। তবে তর্কে কখনোই পারিনি মানুষের সাথে।

৩৬.

বন্ধুর বাসায় গিয়ে চোখে পড়লো ক্যাসেটের খাপ একটা। বোঝাই যাচ্ছিলো বাইরে থেকে এনেছে কেউ। ইএমআই, অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ডিং। উনিশশো অষ্টাশির কথা। খুব গান শুনতাম তখন। হয়তোবা, এখনো। কাভারটা পুরোটাই সাদা, একটা মানুষের আউটলাইন আঁকা। একেছে তাও কয়েক টানে। মানুষটার হাতে ফুল তিনটা। তিনটাই তিন রঙের। অ্যালবামের কাভার হিসেবে একেবারে ব্যতিক্রমধর্মী। আকর্ষণ করলো আমাকে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, বন্ধুর খালাতো বোন এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। বরাবরের মতো ধার নিলাম ক্যাসেটটা। দিন কয়েকের জন্য। অস্ট্রেলীয় গায়কদের গান তো কম শোনা হয়নি ওই সময়ে। থ্যাংকস টু এবিসি, অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কার্পোরেশন। আর শর্টওয়েভ রেডিও।

৩৭.

আটকে গেলাম পাঁচ নম্বর গানটাতে। কোনো রিওয়াইন্ড বাটন ছিলো না আমার ওয়াকম্যানে – ওই সময়ের জিনিস। প্লে, ফরওয়ার্ড আর স্টপ। রিওয়াইন্ড করতে হলে ক্যাসেটটাকে উল্টিয়ে ফরওয়ার্ড – আবার উল্টিয়ে প্লে। সেম ড্রিল, ওভার এণ্ড ওভার এগেন। বুঝতেই পারছেন অবস্থাটা। আমার অভ্যাস হচ্ছে গান ভালো লাগলে শুনি – হাজারবার। রিপিট – আনলিমিটেড মোড। বাসার সবাই জানে ব্যাপারটা। অভ্যস্ত হয়ে গেছে সবাই। বিয়ের পর স্বাতীও। এখন আমার বাচ্চারা। আমার ধারনা, ইউটিউব আমাকে চেনে বলে ‘রিপিট’ ফিচারটা দেয়নি ইচ্ছে করে। আর সে কারণে চলে এসেছে রিপিট করার আলাদা সাইট। টেকনোলজি, ব্রাদার।

৩৮.

তখন তো ওয়েস্টার্ন বইয়ের যুগ। ঘটনাটা আঁচ করে নিলাম লিরিকস দেখে। বাকিটা তৈরি হলো মাথায় আমার। প্রেমে পড়ে গেলাম ‘সানসেট’ নামের মেয়েটার। বারমেইড। সমস্যাটা শুরু হলো অন্যখানে। আগন্তুক বন্ধুকধারীকে গুলি না করলে কি হতো না? আর বোকাটাই বা কেন চলে যেতে চাইলো? হৃদয় ভাঙার খেসারত যে এভাবে দিতে হবে এটা কে জানতো? গল্পটা অবশ্য জানে সবাই, পুরো জনপদ। রোমিও জূলিয়েটের ধাঁচে। ওয়েস্টার্ন বইয়ের ভেতরের সাব-প্লটের মতো। সবই ঘোরাঘুরি করছে মাথার ভেতরে। বের হয় না আর।

৩৯.

এটা ঠিক, ইভা ডেভিস গানটাও লিখেছিল দরদ দিয়ে। চমত্কার ‘স্টোরিটেলিং’ রয়েছে গানটাতে। সেটিং, প্রেমিস – সবই অসাধারণ। অ্যালবাম কাভারটার স্কেচেও হাত রয়েছে তার। আর শুরুটা না শুনলে মিস করবে সবাই। অ্যালবামটার নামটাও অসাধারণ।

[ক্রমশ:]

What you do has far greater impact than what you say.

— Stephen Covey

৬৩১.

ইকনোমিস্টের একটা রিপোর্ট পড়ছিলাম দিন কয়েক আগে। ওদের ‘ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট’ থেকে প্রতিনিয়ত ‘স্পেশাল রিপোর্ট’ বের করে – বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যাকে নিয়ে। এটা ছিলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্রডব্যান্ডের ভবিষ্যতের ওপর। মোবাইল ব্রডব্যান্ড নিয়ে অনেক আশা থাকলেও সেটার কিছু সমস্যা পিছিয়ে দিচ্ছে দেশগুলোকে। অপারেটররা চাচ্ছে নেক্সট জেনারেশন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে – তবে সেটার কাঁচামাল হচ্ছে এই স্পেকট্রাম। আর সেটার ‘অ্যালোকেশন’ নিয়ে যতো সমস্যা। আগে ঠিকমতো ‘অ্যালোকেশন’ না দেয়াতে নতুন করে পাওয়া যাচ্ছে না স্পেকট্রাম। অথবা নতুন স্পেকট্রাম কিভাবে দেবে সেটার ‘মোডালিটি’ কি হবে সেটা জ্ঞান না থাকার কারণে সময় ক্ষেপণ হচ্ছে অনেক অনেক বেশি। স্পেকট্রামের দামটা কি হবে সেটা নিয়ে কালক্ষেপণ করছে অনেক দেশ। অথচ, এটার ব্যপারে ‘অপুরচুনিটি কস্ট’ বলে একটা হিসেব চলছে উন্নত দেশগুলোতে – অনেকদিন ধরে।

৬৩২.

অর্থনীতির সংজ্ঞাতে গেলে কিন্তু বিপদ। উদাহরণ টানি বরং – এই স্পেকট্রাম দিয়েই। স্পেকট্রামের ‘অপুরচুনিটি কস্ট’ বের করতে পারি দুভাবে। প্রথম প্রশ্ন, মোবাইল অপারেটর ‘ক’কে ওই স্পেকট্রামটা ছাড়া পুরোনো স্পেকট্রাম দিয়ে একই ভূখণ্ড আর গ্রাহকদের সার্ভিস দিতে গেলে তার বাড়তি খরচ করতে হবে কতো? মানে, তাকে বার বার ব্যবহার করতে হবে ওই পুরনো স্পেকট্রাম, কমিয়ে দিতে হবে ট্রান্সমিশন পাওয়ার, কিনতে হবে অনেক বেশি বেজস্টেশন। আরেকটা প্রশ্ন হতে পারে এধরনের – আমরা স্পেকট্রামটা যদি অন্য কোন সার্ভিসে দিতাম, তাহলে ওই নতুন মোবাইল কোম্পানীটা কতো টাকার সুবিধা পেত ওই সার্ভিসটা তৈরি করতে গিয়ে? এটাই ‘অপুরচুনিটি কস্ট’, যেখানে অপারেটরও খুশি আর গ্রাহককেও দিতে হচ্ছে না অকশনের উচ্চমূল্যের খেসারত। ‘থ্রীজি’ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেয়া হলো এশিয়ার প্রথম দিকের দেশগুলোর প্রায় বারো বছর পর। সিংগাপুরের রেগুলেটর অপারেটরদের পুরোনো ‘টুজি’ স্পেকট্রামের ওপর সব টেকনোলজি চালাতে দিয়ে এগিয়ে গেলো সবার – অনেক অনেক আগে। বলছিলেন সেখানকার ডেপুটি চীফ এগজিকিউটিভ, লেয়ং কেঙ্গ থাই। এক ধাক্কায় তাদের অপারেটরগুলো চলে গেলো ‘টুজি’ থেকে ‘ফোরজি’তে। দিতে শুরু করলো সত্যিকারের মোবাইল ব্রডব্যান্ড।

৬৩৩.

রেগুলেটরের ভাষায় এটাকে বলে ‘টেকনোলজি নিউট্রালিটি’ – মানে স্পেকট্রাম কিনে নাও কোন ধরনের ‘ইফ’ আর ‘বাট’ ছাড়াই। ‘নো স্ট্রিংস অ্যাটাচড’। যে সময়ের জন্য কিনছো, ব্যবহার করো নিজের পছন্দমতো টেকনোলজি, বাজার যা চায়। বাজার ‘টুজি’, না ‘থ্রীজি’, না ‘ফাইভজি’, যা চাইবে সেটা দিতে পারবে ওই স্পেকট্রাম দিয়ে। এক কথায় অপারেটরকে স্বাধীনতা দেয়া স্পেকট্রামের ‘এফিশিয়েণ্ট’ ব্যবহারের ওপর। দুশো হার্টজ নাকি দশ মেগাহার্টজের চ্যানেল প্ল্যান, স্বাধীনতা অপারেটরদের। গ্রাহক বুঝে। আরেকটা উদাহরণ নিয়ে আসি আপনার সুবিধার জন্য। বাজার থেকে কিনলেন ফুলপ্যান্ট একটা। প্যান্টের পকেট চারটা, তার তিনটাই সেলাই করা। বলা হলো, ব্যবহার করতে পারবেন একটা, বাকিগুলো খুলতে লাগবে – পঞ্চাশ টাকা করে – প্রতিটা। পুরো প্যান্টের ‘এফিশিয়েণ্ট’ ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হলো আপনাকে।

৬৩৪.

রেগুলেটরের কাছে এটা একটা কলমের খোঁচা হলেও, অপারেটরের কাছে এটা একটা বিশাল জিনিস। এটা একটা নতুন ধরনের ‘সিগন্যাল’ দেয় বাজারে। সেটা চলে যায় পুরো বিনিয়োগ দুনিয়ায়। আনকোরা নতুন মেসেজ। ‘নিশ্চয়তা’, রেগুলেটরী সার্টেনিটি। আর সেকারণে ‘ব্রডব্যান্ড ওয়ারলেস অ্যাক্সেস’ লাইসেন্সে ব্যাপারটা ঢোকাতে না পারলেও থ্রীজি লাইসেন্সের প্রথম ড্রাফটেই দেয়া হয়েছিল এই ‘নিউট্রালিটি’র ব্যাপারটা। অনেক রেগুলেটর এটাকে ‘টেকনোলজি অ্যাগনস্টিক’ বলে থাকেন। নীতিমালার নিশ্চয়তা চায় সবাই। অপারেটর, গ্রাহক, সবাই। জিএসএম অপারেটরদের অ্যাসোশিয়েশন, জিএসএমএ’র একটা স্টাডি বলে শুধুমাত্র এশিয়া-প্যাসিফিক রিজিয়নের জিডিপি বাড়বে এক ট্রিলিয়ন ডলারে। ২০১৪ থেকে ২০২০য়ের মধ্যে। একটাই শর্ত, ‘এফিশিয়েণ্ট ইউজ অফ স্পেকট্রাম’। বেশি মনে হতে পারে, তবে, আমার ধারণায় এটা ছাড়িয়ে যাবে তাদের হিসেবকে। সেটা দেখাবো কাগজে কলমে। সামনে।

৬৩৫.

তবে মোবাইল ব্রডব্যান্ড সব সমস্যার ‘জীয়ন কাঠি’ – এটা ভাবা ভুল হবে। এমনটাই বলেছেন আরেকজন আইটিইউ কন্সাল্ট্যান্ট। মোবাইল ব্রডব্যান্ড ততোক্ষণ পর্যন্ত ভালো সার্ভিস দেবে যখন তার পাশাপাশি ভালো ‘ফিক্সড’ নেটওয়ার্ক থাকবে। ‘ফিক্সড লাইন অ্যাক্সেস’ আর ‘ওয়াই-ফাই’ না হলে এতো ডাটা ‘অফলোড’ একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার – তাও আবার শহরগুলোতে। স্মার্টফোন কিন্তু বাড়ছে হু হু করে। ফেমটোসেল আর ওয়াই-ফাই কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে অপারেটরদের। সিংগাপুরের রেগুলেটর সবার সাথে বসে তৈরি করছে ‘হেটনেট’। এই ‘হেটারোজেনাস নেটওয়ার্কে’ থাকছে ফিক্সড লাইন, মোবাইল অপারেটরের ডাটা, ওয়াইফাই আর ছোট ছোট সেলুলার নেটওয়ার্ক। গ্রাহকরা বুঝবেনই না কিভাবে ‘সিমলেস ট্রানজিশন’ হচ্ছে নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে। ওটা তো জানার দরকার নেই জনসাধারণের। এটা ছাড়া, এই বিশাল ডাটা ডিমান্ড মেটানো সম্ভব নয়, কারো একার পক্ষে। আর ঢাকা শহরের জন্য আমার প্রস্তাবনা কিছুটা ভিন্ন। সেটা প্রাসঙ্গিক নয় বলে এখানে আলাপ করছি না। কীওয়ার্ড, নেটকো মডেল।

[ক্রমশ:]

When I give a minister an order, I leave it to him to find the means to carry it out.

— Napoleon Bonaparte

৬২৫.

দরকার কি এইসব ইন্টারনেট ‘ইকোসিষ্টেমে’র? একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখতে পারবেন এগুলো একটা আরেকটার ওপর – পুরোপুরি ‘ইন্টার-ডিপেণডেণ্ট’। একটা ছাড়া আরেকটা অচল। অথচ, এই ইকোসিষ্টেমের প্রতিটা জিনিষ নিয়ে কাজ করে সরকারের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট। সত্যিই তাই। কার সাথে কোনটার কি সম্পর্ক সেটা না জানলেই বিপদ। ইন্টারনেটের ট্রান্সমিশন মানে হাই-স্পীড নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের। সার্ভিসগুলো কার? সেটা তো আসলে সবার। অনলাইন ক্লাস নিয়ে মাথাব্যথা হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। ‘জেনারেল পারপাজ টেকনোলজি’ হিসেবে সবকিছুই দরকার সব মন্ত্রণালয়ের। ‘হেল্থকেয়ার’ নিয়ে ইন্টারনেটের সুবিধা নিচ্ছে পাশের দেশ ভারত। হাজার মানুষ প্লেন ভরে আসছে ওই দেশে ‘হেল্থকেয়ার’ ট্রিপে। প্রাথমিক ‘ডায়াগনস্টিকস’ হচ্ছে ইন্টারনেটের ওপর দিয়ে। থাইল্যান্ড আর সিংগাপুর তো শুরু করেছে অনেক আগেই।

৬২৬.

স্বাস্থ্য আর চিকিত্‍সা নিয়ে কাজ করবে সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়। ‘অ্যাপ্লিকেশন’ নিয়ে কাজ করছে আইসিটি মন্ত্রণালয় অনেক আগে থেকে। তবে কেউ জানে না কার করতে হবে – কতোটুকু অংশ। নাকি আবার ‘ডুপ্লিকেশন অফ ইফোর্ট’ হচ্ছে বার বার? বিটিআরসিতে থাকার সময় দেখেছি এধরনের কাজ – করছে সবাই। সবার দরকার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক, পয়সা ঢালছে কিন্তু সবাই। গরীব দেশে এটা খুবই কষ্টকর ব্যাপার। এমনিতেই ফান্ডিংয়ের সমস্যা, সেখানে পয়সা যাচ্ছে নতুন নতুন জায়গায় – না জানার কারণে। ডোনার এজেন্সিরা সরকারের এই ‘সমন্বয়হীনতা’ ব্যাপারটা জেনেও দেনার ধার বাড়াচ্ছেন দিনে দিনে।

৬২৭.

ইন্টারনেট বা ব্রডব্যান্ড যাই বলেন সেটা যে শুধু হাই-স্পীড নেটওয়ার্ক নয় – সেটা থেকে বের হতে এই ‘ইকোসিষ্টেম’ ব্যবস্থা। সার্ভিস আর অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করার আগে কথা বলে নিতে হবে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে – জিনিসগুলো তাদের নেটওয়ার্ক নিতে পারবে কি না? টিএণ্ডটি’র যুগে ‘টেলিফোন মডেল’ থেকে বের হয়ে আসতে হবে আগে। একটা ফোনের জন্য একটা লাইন। আরেকটা ফোন লাগাতে চাইলে আরেকটা লাইন – আর ফ্যাক্স চাইলে আরেকটা। ওইটা ছিলো পুরনো টেলিযোগাযোগের ‘ওয়ালড গার্ডেন’ সমস্যা, সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা রিসোর্স। এখনকার যুগে লাইন আসবে একটা, ওইটার ওপর যা চাইবেন তাই করবেন। আবার সার্ভিস আর অ্যাপ্লিকেশন কিন্তু শুধুমাত্র আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি নয়, এটা সবার। শিক্ষা আর হেল্থকেয়ার অ্যাপ্লিকেশন কেন তৈরি করবেন তারা? ব্যবহারকারী মন্ত্রণালয় জানেন না – কিন্তু তার অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করছেন আরেকজন। ‘ইন-কম্পাটিবিলিটি’র শুরু ওখানেই। সনাতন ‘পুশ’ মানে ‘খাইয়ে দেয়া’র মডেল থেকে বের হয়ে আসতে হবে আমাদের। পয়সা ঢালো ‘সাপ্লাই সাইডে’, মানে দাম কমাও ইন্টারনেটের – ওতেই হবে সব – সেটা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে আমাদের।

৬২৮.

মানি, পুরনো শেখাটাকে ‘আন-লার্ন’ করা কষ্টের। সেটাকে মেনেই চিন্তা করতে হবে নতুন ‘কনসেপ্চুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক’, বড় আকারে – সবাইকে নিয়ে। ব্যবহারকারীদের নিয়ে। টাকা দেয় তো তারাই। তাদের জন্যই তো সবকিছু। চারটা কম্পোনেণ্টকে আলাদা করে মাইলস্টোনে ভাগ করলেই ‘ফোকাস’ এরিয়াগুলো বোঝা যাবে সরকারের দিক থেকে। ইকোসিষ্টেমের প্রতিটা কম্পোনেণ্টকে আলাদা করে সেটার জন্য সরকারের কোন কোন এজেন্সি কাজ করবে সেটা বের করতে হবে আগে। সেটার ‘ফীডব্যাক’ লুপ যাবে সরকারী বিভিন্ন প্রোগ্রামগুলোতে। সেটাকে ঘিরে ঘোরাতে হবে সরকারের সম্পর্কিত পলিসিগুলোকে। শুধুমাত্র ব্রডব্যান্ড নীতিমালা নিয়ে কাজ করতে গেলে পয়সা, সময় আর ‘ফোকাস’ নষ্ট হবে আরো বেশি। আমাদের মতো গরীব দেশের জন্য সেটা হয়ে যাবে বড় ধরনের বিলাসিতা। এখনকার ‘ব্রডব্যান্ড প্লান’ আগের মতো নেই আর। এটা শুরু হয় দেশের ‘দর্শন’ নিয়ে। দেশ কি চায়, সেটা বের করতে হয় আগে। টেকনোলজি বাদ, দেশের ‘প্রায়োরিটি’ বের করতে হয় খুটে খুটে। উদাহরণ দেখবেন নাকি একটা? ‘কানেক্টিং আমেরিকা’ বলে ওদের ন্যাশন্যাল ব্রডব্যান্ড প্ল্যানটা দেখলে পরিষ্কার হবে সবার। দেখুন তাদের দর্শনগুলো – প্রথম কয়েক লাইনে। সবকিছু আছে ওতে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, চিকিত্‍সা ব্যবস্থা, সরকারের কাজের জবাবদিহিতা, এনার্জি খাত, মানুষের নিরাপত্তা, আরো অনেক কিছু – কোন কিছু বাদ রাখে নি তারা। এক্সিকিউটিভ সামারিটা না পড়লে ব্যাপারটা না ধরতে পারার সম্ভাবনা বেশি। একটা দেশ কি চায়, সেটাই এনেছে এই প্ল্যানে। বিশাল ক্যানভাস।

৬২৯.

‘বিল্ডিং ব্রডব্যান্ড’ বইটাতে আমাদের মতো দেশগুলো কি ধরনের ভুল করতে পারে সেগুলোর বেশ কিছু ধারনা দিয়েছেন আগেভাগেই। ব্রডব্যান্ড মানে ইন্টারনেটের মতো প্রোডাক্টের ডিমান্ড তৈরি করার মতো ‘ব্যাপারটা’র ধারনা না থাকাতে পুরো ইনভেস্টমেন্ট চলে যায় ‘সাপ্লাই’ সাইডে। মানে ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক তৈরি হলেই খুশি। কিভাবে বাড়াতে হবে ব্যবহারকারীদের সংখ্যা, তৈরি করতে হবে নতুন নতুন সার্ভিস, নতুন গ্রাহকবান্ধব অ্যাপ্লিকেশন – সেটা পলিসিতে না থাকাতে পুরো কাজটাই যায় ভেস্তে। ‘ইকোনোমি অফ স্কেল’ – ব্যবহারকারী বাড়লে কমবে দাম, আর দাম কমলে আসবে নতুন নতুন সার্ভিস, নতুন ইনভেস্টমেন্ট। ইকোসিষ্টেমের তুখোড় সাইকেল হচ্ছে জিনিসটা। কম্পোনেণ্টগুলোর মধ্যে ‘ইন্টার-ডিপেনডেন্সি’ থাকাতে পুরো জিনিসটাকে ফেলতে হবে বড় ক্যানভাসে। ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি ‘হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’, তাহলেই কাজ করবে পুরো ইকোসিষ্টেম। কম্পোনেণ্টগুলোর একটার ওপর আরেকটার নির্ভরশীলতা কাজ করে অনেকদিক থেকে। হাই-স্পীড ট্রান্সমিশনে ইনভেস্টমেন্ট আসা মানে ‘কোয়ালিটি অফ সার্ভিস’ বাড়বে আমাদের দরকারী সব সার্ভিসগুলোতে। আর সেটা বাড়িয়ে দেবে ‘ব্যান্ডউইডধ ইন্টেসিভ’ অ্যাপ্লিকেশন তৈরির মাত্রা। যতো বেশি অ্যাপ্লিকেশন, ততো বেশি টানবে নতুন নতুন গ্রাহকদের। নতুন গ্রাহকেরা চাপ তৈরি করবে নেটওয়ার্ক এক্সপ্যানশনের কাজে। ফলে বাড়বে ইন্টারনেট আর ব্রডব্যান্ডের ওপর নতুন ইনভেস্টমেন্ট। পুরো পৃথিবী বসে আছে পয়সা নিয়ে। ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার জন্য বসে আছে কোম্পানীগুলো।

৬৩০.

নতুন সার্ভিস আসা মানে নতুন কনটেন্ট তৈরির হিড়িক। কনটেন্ট তৈরি করছেন ব্যবহারকারীরা নিজেই। ইন্টারনেটের শুরুতে ডাউনলোডই ছিলো বেশি। আজ – পাল্টে গেছে দাবার গুটি। অ্যাপ্লিকেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে গুগল আর ফেসবুকের মতো কোম্পানীগুলো। হাজার হাজার গিগাবাইটের ‘ইউজার জেনারেটেড কনটেন্ট’ আসছে আপনার আমার দিক থেকে। আমার আপনার ভিডিও, ছবি, ব্লগ পোস্ট দিয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেট। ষাট হাজার ছবি আছে আমারই, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। আগে কনটেন্ট তৈরি করতো মিডিয়া কোম্পানীগুলো। এখন সেটা চলে এসেছে গ্রাহকদের হাতে। ফলে, দরকার হচ্ছে হাই-স্পীড নেটওয়ার্ক – ব্যবহারকারীর দোরগোড়ায়।

[ক্রমশ:]

The nation will find it very hard to look up to the leaders who are keeping their ears to the ground.

—Sir Winston Churchill

৬১৬.

ব্রডব্যান্ড কি না দিচ্ছে? ইন্টারনেটের কথা বলছি আর কি। পড়ছিলাম দুহাজার সাতের ‘ইয়ানসেনের’ রিপোর্টটা। আস্তে আস্তে যোগ হতে থাকলো জেনী, বেজলী, ফিলিপা আর টিম কেলীর অনেকগুলো রিপোর্ট। বিশ্বব্যাঙ্কের ‘বিল্ডিং ব্রডব্যান্ড’ বইটা বেশ কিছু মিলিয়ে নিয়ে এসেছে কয়েকটা যায়গায়। সামাজিকভাবে ইন্টারনেটের সুবিধা কোথায় কোথায়? ফার্স্ট থিং ফার্স্ট, এটা যুক্ত করছে আমাদের সবাইকে। এই যে পড়ে আছি আমি সুদূর ‘কোতে দে ভোয়া’তে (সরকারীভাবে তারা মানে না ‘আইভরি কোস্ট’ নামটা), যুক্ত আছি কিন্তু এই ইন্টারনেটের ওপর দিয়ে। আমার সব ‘অ্যাপ’ জীবিত আছে ওই পাইপটার জন্য।

যোগাযোগে কোন সুযোগ নিতে নেই। আরেকটা ভি-স্যাট আছে অন্য যায়গায়।

যোগাযোগে কোন সুযোগ নিতে নেই। আরেকটা ভি-স্যাট আছে অন্য যায়গায়। ডিজাস্টার রিকভারি সাইটে। ওপরের দিকের মাইক্রোওয়েভ লিংকটার কথা বাদ দিয়েছি নাকি?

৬১৭.

ছবি দেবো নাকি একটা? এছাড়া, যুক্ত করছে ব্যবসাগুলোকে যারা পয়সা আনছে দেশে – তৈরি করছে কর্মক্ষেত্র। সবচেয়ে বড় জিনিসটা বলিনি এখনো। এটা যুক্ত করছে মানুষকে তাদের সরকারের সাথে। সরকারের সব সার্ভিসের সাথে। প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ‘সুশাসন’। ‘গুড গভার্নেন্স’ যাকে বলি আমরা। সরকারের কর্মক্ষমতা চেখে দেখতে পারছি আমরা। জবাবদিহিতা বাড়ছে সরকার আর রাজনীতিবিদদের। আমার ‘জবাবদিহিতা’র ওয়ার্ক-ফ্লো তৈরি করেছিলাম বিটিআরসিতে থাকতে। এর ওপরে তৈরি হয় দেশের প্রবৃদ্ধি। ইংরেজিতে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ও বলতে শুনেছি অনেক যায়গায়। মানে মানবসম্পদের মেধাভিত্তিক – অর্থনৈতিক যাই বলেন সবকিছুর প্রবৃদ্ধি।

৬১৮.

আজ ফেসবুকেই বিক্রি হচ্ছে অনেককিছু। বই, টি-শার্ট, জামা কাপড় – আরো কতো কি? গ্রাহক নিজে কথা বলছেন ক্রেতার সাথে। ভালো মন্দ যাই বলছেন না কেন সেটা কিন্তু ছড়াচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। ‘ইবে’ থেকে পুরোনো কিছু সিডি কিনেছিলাম অনেকদিন আগে। এর মধ্যে কিভাবে একটার সিডি’র কভার গিয়েছিলো ফেটে। শিপিংয়ের সময় হতেই পারে সেটা। কমেন্ট না করে ইমেইলে এমনিতে জানিয়েছিলাম বিক্রেতাকে। তবে সেটা পাল্টে দিতে বলিনি ইমেইলে। পরের সপ্তাহে নতুন কভার এসে হাজির। বিক্রেতাকে ভালো ‘রেটিং’ না দিয়ে উপায় আছে আমার?

৬১৯.

‘ইনফর্মেশন ইজ পাওয়ার’। আজ আমরা জানি কোথায় কি আছে – এই ইন্টারনেটের বদৌলতে। তথ্য যতো ছড়াবে, ইকোনোমিক অ্যাক্টিভিটি বাড়বে জ্যামিতিক হারে। ফালতু জিনিস গছিয়ে দিয়ে টাকা মেরে দেবার দিন গেছে চলে। ফলে, কোম্পানীগুলোর মধ্যে বাড়ছে সুশাসন। বাড়ছে ব্যবসা। কোম্পানীগুলো ‘সৌর্সিং’ করছে দুনিয়াব্যাপী। এক ল্যাপটপ আয়ারল্যান্ডে সংযোজন করলে তার পার্টস আসছে ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশের ফ্যাক্টরি থেকে। ইনভেন্টরি আপডেট হচ্ছে সেকেন্ডে। ইন্টারনেটের ওপর দিয়ে। মানুষ বাজার করছে বাসায় বসে। দেবে খারাপ জিনিস? ক্রেতা ওমুখো হবে না আর। বিক্রেতাও জানে সেটা। কোম্পানীর ফীডব্যাক পাতা না থাকলেও অসুবিধা নেই তাতে। রয়েছে গ্রাহকদের তৈরি পাতা। কোম্পানীর ঠিকমতো কাজ না করলে আছে খবর।

৬২০.

তথ্যের ‘প্রাচুর্যতা’ মুক্ত করে দিয়েছে মানুষকে। মাসলো’র থিওরিতে গেলাম না আর। মুক্তবাজার অর্থনীতি সুযোগ নিচ্ছে এই ইন্টারনেটের ওপর থেকে। এখন অফিস আর তাদের ফ্যাক্টরিগুলো থাকে দুনিয়া জুড়ে। বিলিয়ন বিটস যাচ্ছে শুধুমাত্র ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের ওপর। প্রোডাক্টিভিটি বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ‘আইফোনে’র ডিজাইন যাচ্ছে স্যান-ফ্রান্সিস্কো থেকে। কোরিয়া থেকে আসছে চিপসেট, গরিলা গ্লাস আসছে সিংগাপুর আর থাইল্যান্ড থেকে। মেমরি আসছে হয়তো তাইওয়ান থেকে। উদাহরণ হিসেবে বলছি আরকি। চীনের ফক্সকণ কোম্পানীতে হচ্ছে আরো অনেককিছু। প্রোটোটাইপ তৈরি হচ্ছে আরেক যায়গায়। পুরো দুনিয়া সুবিধা নিচ্ছে ইন্টারনেটের।

৬২১.

বোয়িংয়ের ‘ড্রিমলাইনার’ প্লেনটা তৈরি হয়েছে কয়টা দেশ মিলে? দেশগুলো টাকার কথা চিন্তা করছে না আর। সবার একটাই কথা। ছড়িয়ে দাও ইন্টারনেট, যুক্ত করো সবাইকে – ব্রডব্যান্ডে। পয়সা যা লাগে ঢাল তো আগে। সরকারী সার্ভিস পৌঁছে দাও মানুষের দোরগোড়ায়। সহজ করে দাও সরকারী ইন্টারফেসকে। সময় বাঁচিয়ে দাও মানুষের। তাহলেই বাড়বে মানুষের প্রোডাক্টিভিটি। মানুষের প্রোডাক্টিভিটি বাড়া মানে হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। পুরো ফিনান্সিয়াল সার্ভিসটাকে নিয়ে আসতে হবে অনলাইনে অথবা মোবাইলে। টাকাকে ‘রোল’ করানোর জন্য যতো ধরনের ‘অটোমেশন’ দরকার, সেটা কিন্তু তৈরি আছে ইন্টারনেট ইনফ্রাস্ট্রাক্চারে। একমাত্র ইন্টারনেটই পারে বিলিয়ন ডলার ‘রোল’ করতে – সেকেন্ডে। যতো বেশি ‘রোল’ – ততো বেশি ভ্যালু অ্যাডিশন। সব যায়গায়। পয়সা যাবে সবার পকেটে। আর, সব ইনফ্রাস্ট্রাক্চার তৈরি করতে হবে সরকারকে – এটা লেখা আছে কোথায়?

৬২২.

ইন্টারনেট আসার পর হেল্থকেয়ার ইনডাস্ট্রি কোথায় গেছে সেটা আর বলতে! টেলিমেডিসিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরের ডাক্তার দেখছে অজ পাড়াগাঁয়ের মানুষটাকে। ডায়াগনষ্টিক টেস্ট হয়ে যাচ্ছে অনলাইনে। এ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিতে পারে দেশের সরকারগুলো। প্রতিটা যায়গায় দামী মেডিক্যাল ‘রিসোর্স’ না কিনে সেটার সুবিধা বিস্তৃত করতে পারে ওই দূরদুরান্তের হাসপাতালগুলোতে – অনলাইনে। মানুষকে ভিড় করতে হতো না ঢাকায়। ইলেকট্রনিক ভোটিং আর জমির রেজিস্ট্রেশন অনলাইনে আনতে পারলে তো কেল্লা ফতে। দেশের মানুষ বেঁচে যেতো লক্ষ লক্ষ ফৌজদারী মামলা থেকে। প্রচুর খুনোখুনি হয় এই জমি নিয়ে। বিচার ব্যবস্থা অনলাইনে নিয়ে এলে মানুষের ভোগান্তি কমে আসতো হাজারগুণে। প্রতিবার ঢাকায় আসাটা বন্ধ হতো শুরুতেই। জমির অনলাইন রেজিস্ট্রেশনে আশেপাশের দেশগুলোর অগ্রগতি ইর্ষণীয়।

৬২৩.

দুহাজার ছয়ে চমত্কার একটা কাজ করেছিলো পিউ রিসার্চ সেন্টার। ওরা দেখিয়েছিলো ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা অন্যদের থেকে সাহায্য পায় অনেক বেশি। আপনি বলবেন এটার জন্য রিসার্চ লাগে নাকি? আসলেই তো! ইউনিক্স ‘সকেট প্রোগ্রামিং’ শিখতেই পারতাম না এই ইন্টারনেট না হলে। ভুল স্ক্রিপ্ট লিখে নিউজগ্রুপে পোস্ট দিলেই ঠিক করে দিতো সারা দুনিয়ার লোক। বকা যে খাইনি তাও নয় – ওই জ্ঞানের কাছে ও ধরনের ‘ফ্লেমিং’ তুচ্ছ। তাও আবার বোধকরি ‘ক্রস-পোস্টিং’য়ের জন্য। সোলারিস, ফ্রীবিএসডি আর লিনাক্স নিয়ে আমার হাজারো পোস্ট ঘুরছে ইন্টারনেটে – এখনো। এখন মানুষ সবচেয়ে বেশি সাহায্য পায় ‘স্বাস্থ্য’ বিষয়ক ব্যাপারে। এরপর আসে চাকরির ব্যাপারটা। ‘লিংকডইন’ প্রোফাইল দেখে চাকুরীর অফার পাচ্ছি না বলাটা ভুল হবে। বিডিজবস থেকে প্লেসমেন্ট হচ্ছে হাজারো লোকের। ‘মন্সটার ইঙ্ক’ও করছে ভালো। এখনকার ছোট বড় সবধরনের ইনভেস্টমেন্ট সিদ্ধান্ত হচ্ছে ইন্টারনেটের ওপর। স্টক এক্সচেঞ্জ চলছে কিসের ওপর?

৬২৪.

ইন্টারনেট হয়ে গেছে অক্সিজেনের মতো – না থাকলে সব যায় আটকে। আমার কথা নয়, জিজ্ঞাসা করুন নিজেকে। আর থাকবে না কেন? জিজ্ঞাসা করুন আমাকে। সামরিক বাহিনীর কম্যুনিকেশনের প্রথম শিক্ষা হচ্ছে – ডুপ্লিকেশন। নো কম্যুনিকেশন উইথআউট অল্টারনেটিভ চ্যানেল। পিরিয়ড।

[ক্রমশ:]

It [is] that courage that Africa most desperately needs.

― Barack Obama, Dreams from My Father: A Story of Race and Inheritance

০৭.

‘মাছের ঝোল লাগবে, কর্নেল?’

ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম ওই মুহূর্তটাতে। ‘পীস কীপার’ রোলের পাশাপাশি ‘এবোলা’ ভাইরাস ঘাড়ের ওপর চড়ে থাকলেও ভুল শোনার মতো মানসিক অবস্থা ছিলো না ওই দিনে দুপুরে। বেশি হয়ে গেলো নাকি? ক্লান্ত? তাও না। আঠারো উনিশ ঘন্টার ইউএন ফ্লাইট তো পানিভাত। আইভোরিয়ান মেয়েটা দাড়ানো আমার সামনে। কথা বলছে – স্পষ্ট বাংলায়। একদম কুষ্টিয়া’র শুদ্ধ অ্যাকসেন্টে। হাতে গ্লাভস, সাদা টুপি, ক্যাটেরিংয়ের ড্রেস পরা। গিলে ফেললাম নিজের কথা। আগের কঙ্গো মিশনে শেখা ভাঙ্গা ফ্রেঞ্চ খানিকটা বের হলো মুখ থেকে।

‘সিল ভ্যু প্লে’। মানে, অনুগ্রহ করে দিলে ভালো আরকি। পুরোটাই অস্ফুট থাকলো মুখের ভেতর। বুঝলো কিনা জানি না।

‘আমি বাংলা জানি, ভালো বাংলা। ধন্যবাদ আপনাকে।’ সপ্রতিভ উত্তর মেয়েটার।

সুপ্রীমের সবাই এদেশীয় স্টাফ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে এধরনের ‘প্রফেশনাল’ আচরণ আশা করিনি আমি।

০৮.

বিটিআরসিতে থাকার সময়েই পেলাম পোস্টিং অর্ডারটা। নিউ অ্যাসাইনমেণ্ট। কোতে দে’ভোয়া। আইভোরিয়ানদের ভাষায় না বললে দেশটার নাম ‘আইভোরি কোস্ট’। নতুন দেশ – নতুন অভিজ্ঞতা। উড়াল দিলো মনটা আগেই। দেশটার নাম নিয়ে অনেক ভাষায় অনেক ধরনের অনুবাদ হবার ফলে তাদের সরকার ‘কোতে দে’ভোয়া’ ছাড়া মানেনি কোনটাই। আমাদের অপারেশনের ইংরেজি নামটাও ওটাই। ইউনাইটেড নেশনস অপারেশন ইন কোতে দে’ভোয়া। এসেছি স্টাফ হয়ে। মাল্টি-ন্যাশন্যাল সেক্টর হেডকোয়ার্টার। থাকা খাওয়ার দ্বায়িত্ব ‘ইউএন’এর ওপর। যোগাযোগের মানুষ আমি। নতুন এলাকা। মাথাটাকে ‘ডিফ্র্যাগমেন্ট’ করে নিলাম প্রথম কয়েকদিনে। খালি হলো কিছু যায়গা। মুখ বন্ধ, চলে গেলাম ‘অবজার্ভার’ রোলে। নতুন পরিবেশে এই টেকনিক কাজ করে ভালো। থাকতে হবে নয় দশটা দেশের লোকের সাথে। এজন্য এই সেক্টরের নাম শুরু হয়েছে ‘মাল্টি-ন্যাশন্যাল’ দিয়ে। আমার তো পোয়াবারো। জানবো নতুন কালচার। বন্ধুত্বটা শুরু হলো বেনিনের আরেক কর্নেলকে দিয়ে।

০৯.

পোস্টিং অর্ডার পাবার পরের ঘটনা। সবার কথা একটাই। সব ভালো। খালি – খেতে পারবে না ‘সুপ্রীমে’। কি যে রাঁধে – ওরাই জানে ভালো। দেশ থেকে মশলা, আচার, রাইস কূকার না নিলে বিপদ। দেশ থেকে কথা হতো আগের অফিসারদের সাথে। এই ‘কোতে দে’ভোয়া’তে। মিশন এরিয়াতে ওই একটা ‘অ্যাপ’ই আমাদের লাইফলাইন। মাঝে মধ্যে স্বাতীর কানে যেতো কিছু কিছু জিনিস। চাল ডাল নেবার জন্য জোড়াজুড়ি শুরু করলো সে। আমার ধারনা হলো ‘সুপ্রীম’ হলো ডাইনিং হলের মতো কিছু একটা। চালাচ্ছে এদেশীয় কোন কনট্রাক্টর।

১০.

শেষমেষ ‘কোতে দে’ভোয়া’তে চলে এলাম আবিদজান হয়ে। আফ্রিকার ‘প্যারিস’ খ্যাত এই আবিদজান অনেকখানি মলিন – গৃহযুদ্ধের ফলে। দেখলাম তো আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ। দেশ ‘ডিভাইডেড’ থাকলে যে কি হয় সেটা দেখছি নিজের চোখে। আমার কাজের জায়গাটা হচ্ছে পশ্চিম সেক্টরে। এটার ‘এরিয়া অফ রেস্পন্সিবিলিটি’ আমাদের দেশ থেকেও বড়। পাশেই লাইবেরিয়া আর গিনি। মাল্টি-ন্যাশন্যাল সেক্টর বলে অনেকগুলো দেশ কাজ করছে এখানে। আর আমাদের খাওয়া দাওয়ার দ্বায়িত্ব হচ্ছে এই সুপ্রীমের ওপর। ছোট পরিপাটি ডাইনিং হল – নিরীহ মনে হলো প্রথম দেখায়। অলিভ অয়েলে আসক্তি চলে এলো কিছুদিনেই। খাওয়া দাওয়া, সেটা না হয় আরেকদিন? ওয়ান লাইনার? আই অ্যাম লাভিং ইট!

১১.

নতুন দেশ দেখা নেশা হলেও তাদের কাজের ধারা নিয়ে লেখার অভ্যাসটা ঢুকে গেছে রক্তে। পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা জ্ঞানগুলোর ডটগুলোকে কানেক্ট করার মতো। পাঠকদের মধ্যে যে যেভাবে সেটা ব্যবহার করে! কাজে লাগলেই খুশি আমি। জানতে চাইলাম এই সুপ্রীমকে নিয়ে। যতোটা নিরীহ মনে করেছিলাম সেটা মনে হলো না আর। লোকাল স্টাফ দেখে বিভ্রান্ত হয়েছিলাম কিছু সময়ের জন্য। এটা রীতিমত একটা মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ক্যাটারিং কোম্পানী। দুর্গম জায়গায় খাবার, ফুয়েল আর যা দরকার সবকিছু পাঠাতে সিদ্ধহস্ত তারা। এক লাখ খাবারের প্লেট ‘ডেলিভারী’ দেয় প্রতিদিন! পাঁচ মহাদেশ মিলে ত্রিশটা দেশে কাজ করছে গত পঞ্চাশ বছর ধরে। কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার, গাড়ি বোমা, এক্সপ্লোসিভ আর বুলেট ফাঁকি দিয়ে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে আফগানিস্তান, সুদান, ইরাক, লাইবেরিয়া, মালী সহ আরো অনেক দেশে। রুয়াণ্ডা, সোমালিয়া আর কোতে দে’ভোয়া বাদ দেই কেন? তুখোড় কাজের ডাউনসাইডটা অনেক কষ্টের। শুধু আফগানিস্তানে গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত হারিয়েছে তারা ৩১২ জন বেসামরিক কনট্রাক্টর। মন খারাপ করার মতো খবর বটে।

১২.

আজ আর নয়। এই তুখোড় কোম্পানীর গল্প নিয়ে আসবো আরেকদিন! সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের জাদুর চাবিকাঠি মনে হয় আছে তাদের কাছে! সমস্যাকে নিজের অনুকূলে নিয়ে এনে ব্যবসা – এটা নিয়েই কথা হবে সামনে।

[ক্রমশ:]

Do you know what my favorite renewable fuel is? An ecosystem for innovation.

- Thomas Friedman

৬১৩.

ছোটবেলায় ইকোসিষ্টেম নিয়ে ভাবলেই মনে আসতো মানুষ, গরু, ছাগল, ঘাসপাতা, গাছের ছবি। ওগুলো ছিলো ডাঙার অংশে। বাতাস সূর্য আর পানি ছিলো ‘জীবনহীন’ কম্পোনেণ্ট। পানির অংশে তাকাতেই ভয় লাগতো আমার। কুমির, তিমি – ছবির আকারে বেশ বড়ই ছিলো আঁকাগুলো। আসল কথা হচ্ছে সবাই মিলে একটা ইকোসিষ্টেম। লাগবে সবাইকে। মানে ওই ব্যাকটেরিয়াটাকেও। কোন একটা কম্পোনেট বাদ পড়লেই বিপদ। ‘ফীডব্যাক লূপে’ হবে সমস্যা। খাদ্য চেইনেও একই সমস্যা। কেউ উত্পাদক – কেউ ভোক্তা। ঘাস ছাড়া চলে না গরুর। আবার গরু ছাড়া চলে না মানুষের। এই ‘ইন্টার-ডিপেনডেন্সি’ চিরকালের। ব্রডব্যান্ডের ইকোসিষ্টেম তো আরো ভয়াবহ। প্রতিটা কম্পোনেণ্ট শুধু একটা আরেকটার ওপর শুধু ‘ডিপেনডেন্ট’ না, একটা আরেকটার প্রবৃদ্ধির সহায়ক। বইয়ের ভাষায় বলে ফেললাম মনে হচ্ছে।

৬১৪.

ব্রডব্যান্ড ইকোসিষ্টেমে আছে কি? শুরুতেই নিয়ে আসি হাই-স্পীড নেটওয়ার্ককে। আমাদের নীতিনির্ধারকরা এটা বোঝেন ভালো। ইন্টারনেট ছড়াতে এটার পেছনেই খরচ করছেন কোটি কোটি টাকা। তাও আবার দিচ্ছেন বিটিসিএলকে। এই ইকোসিষ্টেমের ‘ইনভেস্টমেন্ট’ আসবে কিভাবে? ওই ‘পাজল’টা মেলাতে লেখা হয়েছে আরেকটা চ্যাপ্টার। পাইপ তো হলো, ভেতর দিয়ে আসা যাওয়ার জিনিস কোথায়? সেটা হচ্ছে সার্ভিস, যা তৈরি করতে আমরা আসলেই দুর্বল। কোটি টাকা দিয়ে বানালাম স্কুল, বই ছাড়া। অথচ এই ‘সেবা’র জন্যই সবকিছু। এই সার্ভিস হচ্ছে আমাদের ব্রডব্যান্ড ইকোসিষ্টেমের দ্বিতীয় কম্পোনেণ্ট। আবার সার্ভিসগুলো কিন্তু অ্যাপ্লিকেশন ভিত্তিক। অ্যাপ্লিকেশন প্রোভাইডাররা বসবেন কোথায়? ভুল বুঝবেন না, এই কম্পোনেণ্টটাই বাঁচিয়ে রেখেছে নেটওয়ার্ক প্রোভাইডারকে। অ্যাপ্লিকেশন ছাড়া ইন্টারনেট কেন, আপনার স্মার্টফোনই তো অচল। এই বিলিয়ন ডলারের অ্যাপ্লিকেশন (নাকি অ্যাপ) হচ্ছে তিন নম্বর কম্পোনেণ্ট। টেলকো’রা প্রায় অভিযোগ করেন – কমছে তাদের আয়। টেলকো’র ব্যবসা আগে ছিলো ‘ওয়ালড গার্ডেন’ ধাঁচের। নিজ নিজ অ্যাপ্লিকেশন শুধুমাত্র নিজ গ্রাহকের জন্য। ইন্টারনেট ভেঙে ফেলেছে ওই ‘ওয়ালড গার্ডেন’য়ের ব্যবসা, থমাস ফ্রীডম্যানের ভাষায়, ওয়ার্ল্ড হ্যাজ বিকাম ফ্ল্যাট! একেবারে ফ্ল্যাট! ভিসা লাগে না আয় করতে। পাশাপাশি আয় বাড়ছে টেলকো’র হু হু করে। আর যতো বাড়ছে অ্যাপ্লিকেশন, ততো মোটা হচ্ছে পাইপ। মানে ব্যবসা হচ্ছে পাইপেরও। আর যাই করেন – মিটার লাগানো আছে তো পাইপে। তবে ‘নেট নিউট্রালিটি’র একটা ধকল যাবে সামনে। ওটা আরেকদিন!

কোনটা ফেলনা নয়। একটা ছাড়া চলবে না আরেকটা। নেটওয়ার্কে পয়সা ফেললেই হবে না - বাকিগুলোকে দেখভাল করতে হবে।

কোনটা ফেলনা নয়। একটা ছাড়া চলবে না আরেকটা। নেটওয়ার্কে পয়সা ফেললেই হবে না – বাকিগুলোকে দেখভাল করতে হবে।

৬১৫.

চার নম্বর কম্পোনেণ্টের কথা ভুলে যায় সবাই। আমরা মানে ‘ব্যবহারকারীরা’। গ্রাহক। ফেসবুকের ভাষায় ‘আম জনতা’। যে যাই বলুক – ভোক্তা ছাড়া ব্রডব্যান্ড ইকোসিষ্টেমের পুরোটাই অচল। দিচ্ছে কে পয়সাটা – দিনের শেষে? ভোক্তা। আমার ভাষায় ‘প্রাইস সেনসেটিভ’ ভোক্তা। ব্রডব্যান্ড ইকোসিস্টেমের সবচেয়ে নামী দামী কম্পোনেণ্টকে নিয়ে ভাবেন কম – নীতিনির্ধারণীতে বসা মানুষেরা। আমি নিজেই ওখানে ছিলাম বলেই বলছি ব্যাপারটা। বিশ্বাস করুন, সার্ভিসের দাম আর তার সহজলভ্যতাকে ঠিকমতো ‘টুইকিং’ করতে পারলে এটাই মোড় ঘুড়িয়ে দেবে পুরো ইকোসিস্টেমের। গ্রাহকের সাথে অ্যাপ্লিকেশনের সম্পর্ককে বাদ দিলে চলবে না কিন্তু। ইন্দোনেশিয়ায় যে ধরনের অ্যাপ্লিকেশন চলে বেশি সেটা আমাদের দেশে যে চলবে সেটার গ্যারান্টি দেবে কে? বাড়বে গ্রাহক একসময়। বাড়বে গ্রাহকের চাহিদা, বাড়বে ‘সফিস্টিকেশন’, আর সেটাই বাড়াবে ডিমান্ড। ডিমান্ড বাড়লে আসবে ‘ইনভেস্টমেন্ট’ নেটওয়ার্কে। তখন, পয়সা আসবে উড়ে উড়ে। মানে ঘুরতে থাকবে ইকোসিস্টেমের বৃত্তটা। একেকটা ‘কম্পোনেণ্ট’ ঠেলে ওপরে ওঠাবে তার পরের কম্পোনেণ্টটাকে। প্রতিটা কম্পোনেণ্টকে ঠিকমতো দেখভাল করলে আর তাকাতে হবে না পেছনে।

[ক্রমশ:]

In a minimum subsidy auction, the government identifies a project and a maximum subsidy. Companies compete for the project by bidding down the value of the subsidy. The bidder requiring the lowest subsidy wins.

- FCC Staff Working Paper 2 (Oct 2010)

৬০৮.

এখন আসুন আসল প্রশ্নে – কোথা থেকে আসবে টাকা? ‘ক্লু’ হিসেবে আরেকটা টুল নিয়ে আসি এখানে। নাম হচ্ছে ‘রিভার্স সাবসিডি অকশন’। শিখেছিলাম পেরুর একটা ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি থেকে। ফিরে আসি ডোমারের গল্পে। ওই পাঁচশো এমবিপিএস/সেকেন্ড ব্যান্ডউইডথ দিতে হবে পঞ্চাশটা সরকারী স্থাপনায়। একেক স্থাপনায় চার পাঁচটা করে সংযোগ দিলে মোট সংযোগের সংখ্যা দাড়াচ্ছে দেড়শোতে। শুধু ডোমার অথবা পুরো বিভাগ ধরে ‘উল্টো’ সাবসিডির অকশন করবো একটা। যার যতো কম খরচ তাকে দেবো এলাকাটা। না পারলে শক্ত পেনাল্টি!

৬০৯.

ধরা যাক আমার হিসেবে ওই দেড়শো সংযোগের জন্য সরকারকে খরচ করতে হবে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। কিন্তু একটা অপারেটর ওই ডোমারের জন্য শুধুমাত্র ওই পাঁচশো এমবিপিএস/সেকেন্ড ব্যান্ডউইডথ নিয়ে থাকবে না বসে। তার ব্যবসার জন্য নেবে আরো এক জিবিপিএস সংযোগ। ফলে দাম কমবে আরো বেশি। আমার অকশনে থাকবে সবাই। বিটিসিএল সহ। ওই দেড়শো সংযোগের জন্য একটা অপারেটরকে কতো ভর্তুকি দিতে হবে সেটাই নির্ধারণ হবে এই অকশনে। সবচেয়ে কম টাকা চাইবে যে অপারেটর তাকে দিয়ে দেয়া হবে এলাকাটা।

৬১০.

ধরা যাক অপারেটর ‘ক’ চাইলো ষাট লক্ষ টাকা। ‘খ’ চাইলো চল্লিশ। ‘গ’ চাইলো আরো কম। অপারেটর ‘ক’ বিড শেষ করে দিলো দশ লক্ষ টাকা চেয়ে। যেহেতু অনেক ব্যান্ডউইডথ একসাথে কিনছে সরকার, কমবে দামও। এছাড়া হাজারো ভ্যালু এডেড সার্ভিস যাবে ওই নেটওয়ার্কের ওপর দিয়ে। দেখা যাবে নিজের অন্যান্য সার্ভিসের সাথে দশ পনেরো বছরের ‘অ্যামোর্টাইজেশন কস্ট’ ধরে সরকারকে দিতে হবে না বেশি ভর্তুকি। বেশি ভলিউম হওয়াতে খুশি অপারেটর। টাকা পাবে এক জায়গা থেকে। খুশি সরকার, তিন চার ভাগের এক ভাগ দিয়ে কিনছে রাষ্ট্রের সার্ভিস।

৬১১.

এই ভর্তুকিটা যাতে সরকারকে না দিতে হয় সেটার ব্যবস্থাও করা হয়েছে দুহাজার নয়ে। মানে সরকারী সংযোগ হবে বিনামূল্যে! পলিসি ড্রাফটিংয়ের সাথে ছিলাম আমিও। তবে মন মতো হয়নি পুরোটা। বিশ্বব্যাপী এটাকে বলা হয় ইউনিভার্সাল সার্ভিসেস অবলিগেশন ফান্ড। গুগল করুন ‘ইউএসওএফ’ দিয়ে। নিজের আগ্রহে তিন তিনটা অনলাইন ট্রেনিং করেছিলাম এই ইউনিভার্সাল সার্ভিসেস আর তার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। ভয়ংকর জিনিসটা হচ্ছে ফান্ড ম্যানেজমেন্ট। হতে হবে স্বচ্ছ!

৬১২.

প্রতিটা জনগনের জন্য নিদেনপক্ষে একটা সংযোগ নিশ্চিত করার দ্বায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেকারণেই তৈরী করা হয়েছে একটা ফান্ড। এমুহুর্তে এখানে পয়সা দিচ্ছে মোবাইল অপারেটরগুলো। তাদের রেভিনিউয়ের এক শতাংশ যাচ্ছে এই ফান্ডে। মোবাইল অপারেটররা আশা করছেন এই ভর্তুকির পয়সাটা তাদের দিলে কাজ হবে ভালো। তবে, ধীরে ধীরে যোগ হবে বড় বড় সব অপারেটর। তখন অনেক বড় হবে ফান্ড। তবে যে যাই বলুক, ফান্ড খরচ করতে হলে ‘নূন্যতম সাবসিডি অকশন’ ছাড়া টাকাটা কাউকে দিয়ে দিলে ব্যাহত হবে এর মহত্‍ উদ্দেশ্যটা। দক্ষতার মূল্যায়ন না হবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। তাই দেখেছি আশেপাশের দেশে। ভুল থেকেই তো শেখে বুদ্ধিমানরা, তাই নয় কি?

ডিমান্ড এগ্রিগেশনের সবচেয়ে বড় উদাহরন আছে কোরিয়াতে। মারাত্মক টুল! গল্পটাও বিশাল।

আসছি সামনে।

[ক্রমশঃ]

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 345 other followers

%d bloggers like this: