Feeds:
Posts
Comments

“Excellence is not a skill. It is an attitude.”

- Ralph Marston

১.

কাডেট কলেজে পড়ার সময় বছর প্রতি ক্রস কান্ট্রি দৌড়ের কথা মনে পড়ে প্রায়ই। মধ্যম গ্রুপের যারা আমরা; প্রথম হবার বাসনা ছিলনা কখনোই যাদের, ক্রস কান্ট্রি রুট ব্রিফিং শুনতামও না ঠিক মতো। দাড়িয়ে থাকতাম পেছনে – দৌড় শুরু হবার অপেক্ষায়। ধারণা এমনটাই যে – প্রথম গ্রুপের যারা, তাদেরকে ফলো করলেই তো হলো ঠিক মতো। এ আর কি? যারা ‘ঘোড়া’ হিসেবে পরিচিত তাদেরকে নিয়েই এডজুটেন্টের যতো চিন্তা ভাবনা। রুট পরিচিতি বার বার হতো তাদেরই জন্য। তখন সমস্যা ছিলো না জীবন মরণের। আসতে পারলেই হলো। পেছনে আসার পর তিরস্কার – এতো আর নতুন কিছু নয়।

২.

মিলিটারি একাডেমীতে এসে এর আইডিয়া গেলো পাল্টে। দৌড় আর বন্ধুত্ব এগোলো সমান তালে। মানে সমান দূরত্বের জন্য প্রতিনিয়ত সময় কমতে থাকলো দ্রুত – বন্ধুত্ব পাল্লা দিলো তার সাথে। বিভিন্ন দুরত্বের মাইল টেস্ট দেবার সময় নতুন ঘোড়া বন্ধুরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল বন্ধুদের সাহায্য করার পদ্ধতি বের করে ফেললো এর মধ্যে। প্রত্যক্ষ সাহায্য, যেমন পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নেয়া নিয়ম বহির্ভূত হবার কারণে ঘোড়া বন্ধুদের বিশেষ করে পরীক্ষাগুলোর [মাইল টেস্ট] সময় নিতে হতো অতিরিক্ত কষ্ট। কারণ পরীক্ষাগুলোতে উত্তীর্ণ না হতে পারলে বন্ধুগুলোকে হারিয়ে ফেলবো একাডেমী থেকে। দৌড় শুরু হবার পর থেকে ঘোড়া বন্ধুরা জীবনবাজি নিয়ে এমনভাবে টান দিতো, সেখানে আমরা মধ্যম গ্রুপ, ঘোড়া বন্ধুদের অনুশীলনের সময়ের কাছাকাছি গতি তুলে ফেলতাম। অবাক হয়ে যেতাম নিজেদেরই পারফরমেন্স দেখে। যারা থাকতো পেছনে, মধ্যম গ্রুপের সাথে তাদের দুরত্ব বাড়তে থাকলে পাগলের মতো দিশেহারা হয়ে গালিগালাজ করতে করতে সময় শেষের আগেই পার হয়ে যেত সাদা দাগ। বমি করতে করতে আমরা ঘোড়া বন্ধুদের মুন্ডুপাত করলেও তাদের প্রশ্রয়মাখা হাসিমুখ মনে পড়ে এখনো। ‘ঘোড়া’ বন্ধুদের কয়েকজন চলে গেছে না ফেরার দেশে।

২.

উন্নত বিশ্বের সাথে তুলনা করে আমাদের কাজ হয়না বলে আমরা আশেপাশের, আফ্রিকা মহাদেশ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে আমাদের বেঞ্চমার্ক করে মানসিক তৃপ্তি নিয়ে থাকি। তবে বিশ বা তিরিশ বছর আগের গল্প দিয়ে যে কাজ হবে না সেটা টিভি আর খবরের কাগজ পড়লে কিছুটা আঁচ করা যায়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ড আমাদের অনেক নিচে থাকলেও তারা করে নিয়েছে ভাগ্যের পরিবর্তন। সবাই পরিবর্তন চায়, চাই না আমরা। ভয় পাই অবস্থান পরিবর্তনের। কিছু হলেই শুরু হয় ব্লেমগেম, দোষ দেই নীতি নির্ধারনী কর্তাব্যক্তিদের। চেয়ে থাকি তাদের দিকে। মনে হয় তারা খাইয়ে দেবেন আমাদের সবকিছু। আমাদের করার নেই কিছুই। অথচ যে কোনো পরিবর্তনের শুরু হয় নিজেকে পাল্টিয়ে। নিজের অভ্যাস পাল্টাতেও কষ্ট, ব্লেম ইট অন দ্য ওয়েদার! আফগানিস্তানের স্ট্যাটিসটিকাল ইনডিকেটর দেখলেও খাবেন ভিমড়ি। হুড়হুড় করে উঠে যাচ্ছে দেশটা ওপরে। তবে সরকারী বা ব্যবসার কাজে অথবা ভ্রমনে দেশের বাহিরে গিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো অথবা আফ্রিকা গেলে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে বেশ ভালো আন্দাজ পাওয়া যায়। সৃষ্টিকর্তা সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরী করার জন্য দিয়েছেন জ্ঞান – যা হচ্ছে হালের ইন্টারনেট। উন্নতদেশগুলোর ঠেকে শেখার জ্ঞানগুলো [ওরা সময় নিয়েছে অনেক] রপ্ত করতে পারলে তার জন্য সময় বাঁচিয়ে বিভাজন কমিয়ে আনা সম্ভব। সেই ইন্টারনেটের গোড়া মানে সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে আফ্রিকার গল্প দেখলে উঠবে চোখ কপালে। আমরা আছি কোথায়? বেশি নয়, আমাদের সেই ঘোড়া বন্ধুদের মতো দশ বারোটা লোক পাল্টে দিচ্ছে আফ্রিকা। তাদের জীবন সঁপে দিয়েছেন উন্নত জীবনের সোপানে – বাকিদের জন্য। তারা ছিলেন না নীতিনির্ধারণীতে, কাজ করে দিচ্ছেন মানুষের তরে। নিচের ছবিটা তার প্রমান। আফ্রিকা এখন আলোকিত – অনেক অনেক বেশি!

কিছু ‘ঘোড়া বন্ধু’ প্রয়োজন - দেশের জন্য, হবেন নাকি একজন?

বন্ধু স্টিভ সংয়ের সাইট থেকে নেয়া। পুরোটা পাবেন http://manypossibilities.net/african-undersea-cables/ এখানে।

বন্ধু স্টিভ সংয়ের সাইট থেকে নেয়া। পুরোটা পাবেন http://manypossibilities.net/african-undersea-cables/ এখানে।

“A photograph is a secret about a secret. The more it tells you the less you know.”

— Diane Arbus

১৩.

ভবিষ্যত গ্রোথ দেখাতে এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনকে দেখিয়ে দেয় সবাই। অন্যদের বাড়ার সুযোগ নেই বললে ভুল হবে, বরং আমাদের বাড়ার সম্ভাবনা অন্যদের থেকে অনেক অনেক বেশি। অন্যরা গ্রো করেছে আগেই ফলে আমাদের সুযোগ বেড়েছে। আগে গ্রো করিনি বলে আর্লি মুভার্স অ্যাডভান্টেজ না পেলেও অন্যের জ্ঞান নিয়ে আগানো সহজ। উন্নত দেশগুলো যে জিনিসগুলো ঠেকে শিখেছে বা সময় নিয়ে শিখেছে – সেতুলনায় আমাদের ভাগ্য ভালই বলতে হবে। অন্যদের ভুল আর সময় ক্ষেপণ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠার সময় কমিয়ে নিয়ে আশা সম্ভব। উন্নতদেশের মতো কাঠামোগত সুবিধা আমাদের না থাকলেও আমাদের বিভাজন কমছে দ্রুত। বিভাজন কমাবে তথ্য আর সে থেকে আহরিত জ্ঞান, নতুন ধরনের যুদ্ধ, যে আগে আহরণ করতে পারবে জ্ঞান তার মুঠোয় সবকিছু। সেই জ্ঞান দিচ্ছে ইন্টারনেট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসে ইন্টারনেটে যে তথ্য পাবেন তা পাওয়া যাচ্ছে আমাদের গ্রামেও। জ্ঞানের সমানাধিকারের নিয়ে চলছে কাজ। মাঝখানে ‘নেট নিউত্রালিটি’ নিয়ে কিছু বড় বড় টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লবি করছিলো এর বিপক্ষে। তাদের যুক্তি হচ্ছে – যতো ফেলবেন কড়ি ততো কনটেন্ট বা ওয়েবসাইট। মানে স্যাটেলাইট চ্যানেলের মতো। টাকা তিনশো, যেমন আমি – পাই চল্লিশ চ্যানেল। ভাগ্যবানরা পান দুশো, বেশি টাকা দেন বলে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো মনে হচ্ছে। বর্তমান ইন্টারনেটে যতো কম টাকায় প্যাকেজ হোক না কেন সব সাইটে অধিকার রাখেন যাবার। ভবিষ্যত খুব একটা সুমধুর যে তাও বলা যাচ্ছে না এখুনি। কনটেন্ট কোম্পানি টাকা বানাচ্ছে মাথা খাটিয়ে, টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিগুলোর নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর সময় নেই আর। ক্যারিয়ারগুলোর পাইপ বেচার সময় শেষ, টাকা সব কনটেন্টের ভেতর।

১৪.

বড় উড়ুক্কু যন্ত্রটা ভিজলো তো ভিজলোই – তা আবার বার্সেলোনাতে। এ-থ্রিএইটির মেইডেন ফ্লাইট নামছে এই এয়ারপোর্টে। মাফ করবেন আমার এ-থ্রিএইটির প্রীতি দেখে। ম্যানুয়াল যতো ঘাঁটি এর ততই অবাক হই এর স্বয়ংক্রিয় ন্যাভিগেশনের বিস্তৃতি দেথে। পাইলট না হলে কি এর ব্যাপারে জানতে নেই নাকি? তেইশটা ফ্লাইট চালায় এমিরেটস একাই – ঢাকায়। তাদের অপারেটিং কস্ট কমিয়ে নিয়ে আসা যাবে এক তৃতীয়াংশে, মাত্র আটটা এ-থ্রিএইটি দিয়ে। কম দূরুত্বে আসবে কি দানব পাখিটা? বলেন কি? চায়না সাদার্ন এ-থ্রিএইটি চালায় সাংহাই থেকে গুয়াংঝো, দু ঘন্টার ফ্লাইট। হংকং থেকে ব্যাংকক, থাই এয়ারওয়েজ আর এমিরেটস। সমস্যা অন্যখানে। আরেকদিন কথা বলা যাবে এটা নিয়ে। ফিরে যাই বার্সেলোনাতে। এমিরেটস এরুটে প্রতিদিন একটা এ-থ্রীথার্টির ফ্লাইট চালালেও মোবাইল ওয়ার্ল্ড কনগ্রেসে যাবার শেষ কানেক্টিং ফ্লাইটে বড়টা না দিয়ে যাবে কোথায়? ওকে ব্যবস্যা করে খেতে হবে না নাকি? ষাট থেকে আশি হাজার মানুষের মিলনস্থল হচ্ছে গিয়ে মোবাইল ওয়ার্ল্ড কনগ্রেস, জিএসএমএর মেগা অনুষ্ঠান। অনুমানের ভিত্তিতে টিকেট কাটলেও শেষ ফ্লাইটটা যে এ-থ্রিএইটি দিয়ে দেবে তার জন্য আলাদা প্রেডিকশন ক্ষমতা লাগে না। বিজনেস ডিসিশন। এ-থ্রিএইটিটা ট্যাক্সিওয়ে ছেড়ে এয়ারপোর্ট লাউঞ্জের দিকে ঘুরতে ঘুরতেই দুটো বিশাল ওয়াটার ক্যানন শত গ্যালন পানি ছিটিয়ে বরণ করে নিলো পাখিটাকে। শাম্পেইনের বোতল খুলে আর বেলুন উড়িয়ে মেইডেন ফ্লাইটের পুরো অনুষ্ঠানটা দেখা গেলো এয়ারক্রাফটের ফ্রন্ট আর বেলি ক্যামেরা দিয়ে – এর ভেতরে বসেই। পাখিটার পেট থেকে বেরুতেই শেষ বিকেলের আলোয় সদ্যস্নাত জিনিসটা ঝিকমিক করে উঠলো। মানুষ বানায় কিভাবে এতবড় যন্ত্র? আমরা পারবো কবে? ল্যাপেল পিনটার ছবিটাও পোস্ট করতে হবে নাকি?

১৫.

মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে এবছরের সবসেরা মোবাইল এপ্লিকেশন ‘ওয়েজ’ নজর কেড়েছিল অনেকের মতো আমারো। হাজারো এপ্লিকেশনের মধ্যে ড্রপবক্স আর ফ্লিপবোর্ডকে পেছনে ফেলে প্রথম সারিতে আসার পেছনে কাজ করছে ক্রাউডসৌর্সিংএর মতো শক্তিশালী ‘বাজওয়ার্ড’| কোটি মানুষের প্রতি সেকেন্ড ইনপুটের উপর ভিত্তি করে ‘ওয়েজ’ এপ্লিকেশনটা একটা জীবন্ত সোশ্যাল জিপিএস নেটওয়ার্ক। রাস্তার মোড়ে মোড়ে নিখুত আর রিয়েলটাইম স্টেটাস আপডেট ইনপুটের উপরে ভিত্তি করে একজন চালক প্রায় চোখ বন্ধই করে চালাতে পারবেন গাড়ি। মানুষের আসল ফিডব্যাকের উপর নির্ভর করে এর বিগ ডাটা দামী হয়ে গেছে এতটাই যে গুগল একে কিনে নিয়েছে একশো তিরিশ কোটি ডলারে। ফেইসবুক ফেল! কোন রাস্তায় জ্যাম আর কোনটায় দুর্ঘটনা ঘটেছে সব আপডেট পাচ্ছেন সেকেন্ডের মধ্যে। সাধারণ জিপিএস এপ্লিকেশন থেকে এটা এতটাই চমত্কার যে চোদ্দটা দেশের পুরো বেজ ম্যাপ তাদের হাতের মুঠোয়। রোড ট্র্যাপ আর পুলিশ ওত পেতে রয়েছে কোথায় তাও পাবেন এখানে। সস্তায় পেট্রল পাম্প কোন মোড়ে তার আপডেট না পেলে মানুষ এটা ব্যবহার করবেই বা কেন? আপনার গাড়ির গতি আর তার অবস্থান তথ্য থেকে বের করে নেবে আপনার প্রয়োজন মাফিক আউটপুট। মানুষ সম্মিলিতভাবে এই ক্রাউডসৌর্সিং দিয়ে [আগের পোস্টগুলো পড়ুন] কতো দামী তথ্যভান্ডার তৈরী করতে পারে তা বোঝাতে আর কষ্ট করবো না আজ আর। আর ভবিষ্যত এখানেই। আমাদের বাংলাদেশেই রয়েছে তিন কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যা অনেক দেশের জনগনের মোট সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের গ্রোথ আসবে না তো আসবে কার? ক্রিটিক্যাল মাসের কাছাকাছি পৌছে গেছি আমরা, সত্যি! আমাদের ক্রাউডসৌর্সিং এপ্লিকেশন আসছে কবে? আর বিগ ডাটা, সেটা তো আছে আমাদেরই কাছে।

তৈরী করবেন নাকি কিছু? লাগবে সাহায্য?

“To change ones life: Start immediately. Do it flamboyantly.”

- William James

৮২.

কোথায় যেনো পড়েছিলাম ‘স্টার্টিং ইজ হাফ দ্য ব্যাটেল, কিন্তু শুরু করতেই পারছিলাম না কিছুতেই। অফিস থেকে এসেছি রাত নয়টায়। ট্রেডমিলটা কয়েকবার করুণভাবে এদিকে তাকালেও পাত্তা দিলাম না। রাস্তায় ফোনের মধ্যে নয়টা ইমেইল জুলু জুলু চোখ মটকালেও ব্যাটারির সমস্যার জন্য জিপিআরএস রেখেছিলাম বন্ধ করে। জ্যান্ত রাখতে হবে তো ফোনটাকে। জামা পাল্টাবো না ইমেইল পাঠিয়ে ক্ষান্ত দেবো সেটা ভাবার আগে শুনলাম মা ডেকেছে উপরে। অগত্যা রওয়ানা দিলাম বাবার বাসায়। বাবা, মা আর বোনের সাথে দেখা হলো। বিকালের নাস্তার মতো কিছু ফল নিলাম। মাথায় স্টপওয়াচ চেষ্টা করলাম বন্ধ করার, বন্ধও হলো – মিনিট পনেরোর জন্য। ফোন আসলো একটা – উত্তর সংক্ষিপ্ত করার মহড়া দিলাম, হলো কিছুটা। অপর প্রান্ত বুঝতে পারলেন। ছেড়ে দিলেন। নেমে আসলাম বাসায়, বাচ্চাদের কাছে।

৮৩.

দেখা হলো মেয়ের সাথে। ক্লাস ফাইভের পড়ার চাপ কাবু করে ফেলেছে তাকে। মা’কে পড়া দেবার জন্য অপেক্ষা করছে সে। মা আসলেন পৌনে দশটায়। ছেলে আসলো দৌড়ে, ওয়ানের সিলেবাস দেখলে মাথা ঘোরে আমারই। গোসল না করলে খেতে হবে বকা, ভয়ে কাক গোছল! ল্যাপটপ বের করলাম মুহূর্তের মধ্যে। পিস্তল ড্রয়ের মতো করে। উইন্ডোজ আট রিজিউম হতে সময় না নিলেও এক্সচেঞ্জ কানেক্ট করতে সময় চাইল কিছুটা। পনেরো মিনিটের মাথায় খেতে বসলাম সবাই। মেয়ের দুটো প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করলাম। ছেলে আরেক কাঠি সরেস। গুনে গুনে প্রশ্ন করলো তিনটা। পারলাম না দিতে – একটা। চোখাচোখি হলো মেয়ের সাথে। সাহায্য চাইলাম ওর কাছে। মেয়ের মা ফিরলেন গোছল থেকে। মার জন্য প্রশ্নটা রেখে নতুন বইটা নিয়ে বসলাম। চালু করে দিলাম লরা পসিনি, হালের ক্রেজ। না হালের নয়, আমাদের ক্রেজ। বয়স উনচল্লিশ। ইতালিয়ান সেনসেশন৷ গাইছে ‘সেলেস্তে’| বইয়ে মনোযোগ দিলাম। চালু করলাম পমোডোরো টাইমারটা, লং ব্রেক। পমোডোরো মানে হচ্ছে টমেটো – কি হয়েছে আজকে। সব ইতালিয়ান শব্দ। লরা মাথা খেয়েছে আমার। পমোডোরো টাইমারটা হচ্ছে কিচেন টাইমার, বাইরে থাকার সময় রান্না করার সময় লাগতো তখন। এখন এটা ব্যবহার করে পুরো পৃথিবী। বিশ্বাস হচ্ছে না? গুগল করুন।

৮৪.

মেইল নোটিফিকেশন পেলাম – উইন্ডোজ আটের ডিফল্ট টোন, ভালই। এক্সচেঞ্জ সার্ভার পাওয়া গেছে তাহলে। সেথ গোডিংকে পাশ কাটালাম। তিনটার উত্তর দিলাম। পাশ কাটালাম মেইলকেও। উডি এলেনকে ধরে নিয়ে এলাম আবারও। মানে, মনে মনে। উডি বলেছিলেন সফলতার আশি শতাংশই নির্ভর করে কোনো রকমে [উপস্থিত] থাকার উপর। ইংরেজিতে, এইটি পার্সেন্ট অফ সাকসেস ইজ জাস্ট শোয়িং আপ। উডির মুখে পড়ুক ফুল চন্দন। খাঁটি কথা বলেছে সে। শোয়িং আপ মানে থাকতে পারাটা – ফিজিক্যালি। কোনো কাজ করতে মন না চাইলেও কোনো রকমে টেনে আনুন নিজেকে। দেখবেন হয়ে যাবে কাজ। জীমে কে যেতে চায় বলুন। কোনো রকমে হাজির করুন নিজেকে। দেখবেন নিজেই কখন সব এক্সারসাইজ করে বাসায় ফিরেছেন বলতেই পারবেন না আপনি। যেকোনো কজের সবচেয়ে কষ্টের জিনিস হচ্ছে মানসিকভাবে তৈরী হওয়া। মানে বিছানা থেকে নেমে কোনরকমে জুতোটা পরা। ওয়ার্ডপ্রসেসরটা ফায়ারআপ করলাম। তিনশ পঞ্চাশ শব্দ, প্রতিদিন। কাম হোয়াট মে! স্বাতী ডাকছে। কালকে অফিস যাবার কথা মনে করিয়ে দিলো সে।

লিখছেন তো কিছু, আজ?

“If you were born without wings, do nothing to prevent them from growing.”

― Coco Chanel

২১.

‘পুশিং দ্য এনভেলপ’ কথাটা শুনি ‘টপ গান’ [মুভিটা] দেখার সময় প্রথম। আহা, সোনার দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে এ মুহুর্তে। পড়তাম হয়তোবা ক্লাস নাইন বা টেনে। ক্যাডেট কলেজের ছুটিতে বাড়িতে আসলেই দৌড়াতাম বন্ধুদের বাসায়। পাশেই ছিলো ওর বাসা। বাবা-মা কাজ থেকে ফিরলেই বাসা থেকে হাওয়া। ওদের বাসায় ছিলো ভিসিআর আর রোজভ্যালীর একটা সাবস্ক্রিপশন। পায় কে আমাদের, আর ‘টপ গান’ দেখা হয় তখুনি – শখানেকবার। প্রতিটা লাইন মুখস্ত না হয়ে যাবে কোথায়? আর সে কারণে পরীক্ষা দিয়েছিলাম জিডি পাইলটে। এরোডিনামিক্সএর ভাষায় ‘এনভেলপ’ যেকোনো উড়ুক্কু যন্ত্রের সক্ষমতার কথা বলে থাকে। ধরে নেই, কোনো যন্ত্রের গতি সর্বোচ্চ দুই ম্যাক [শব্দের দ্বিগুন বেগে চলার ক্ষমতা] হলে তার বাইরে সেটা চালানো বিপদজনক হলেও এডভেঞ্চারের হাতছানিতে জীবনবাজি ধরেন অনেকে। আর টেস্ট পাইলট, যিনি চালাচ্ছেন সেই যন্ত্রটা প্রথম – পরীক্ষার খাতিরে তার ডিজাইন ক্যাপাসিটির বাইরে নিয়ে যেতে হয় তাকে – যন্ত্রের সক্ষমটা দেখার জন্য। অল্টিচুডেরও সীমানা থাকে না তখন। এসব অকুতোভয় পাইলটদের অনেকেই ফেরেন না আর। তবে এই সক্ষমতার বাইরে নিয়ে উড়ুক্কু যন্ত্র চালানোটাকেই ‘পুশিং দ্য এনভেলপ’ বলে থাকেন বিজ্ঞজনেরা।

২২.

গল্প কিন্তু অন্য জায়গায়। দুহাজার সালের আগের ঘটনা। মিউনিখে এক্সচেঞ্জের খুঁটিনাটি নিয়ে পড়ার সময় জার্মান ভাষা অসহ্য লাগতে শুরু করলো একসময়। বইয়ের দোকানগুলোও রাখে না কোনো ইংরেজি বই। ‘হুগেনদুবেল’ নামের চেইন বুকস্টোর রাখতো কিছু – তার সাথে আবার মেলে না আমার। কে যেনো বুদ্ধি দিলো একটা মুভি থিয়েটারের কথা – নিম্ফেনবার্গার স্ট্রিটে। আসল ইংলিশ মুভি, সাবটাইটেল ছাড়া – শুনতেই দৌড়ালাম ওদিকে। কয়েকটা মুভি দেখতেই কিছু পাগলের পাল্লায় পরলাম আবার, বড় পাগলি ইউলিয়া – ইংরেজি শিখতে চায় সে। আমার দুলাইনের ইংরেজির জ্ঞান দেখে গুরু মানলো ওরা। ইউলিয়া, ভালই জানে সে – ভান করে বেশি বেশি। ইউ নো গার্লস! একরাতে মুভি দেখার পর কি করবো জানতে চাইলে বললাম – হাঁটবো। হেঁটেই যাব এপার্টমেন্টে। সারাদিনের ফিরিস্থি চাইলে প্রতিদিন ভোর ছয়টার থেকে রাত বারোটার গল্প দেয়ায় ভারিক্কি চালে ব্যবহার করেছিলো এই ফ্রেজটাই। উর্রুক্কু যন্ত্রের গল্প আমার উপর দিয়ে চালানোর জন্য ইংরেজি জ্ঞান দেবার চেষ্টা করলাম ওকে। মেনে গেলো সে। দুদিন পর ডিকশনারি দেখে ভুল ভাঙ্গলো নিজেরই। বুঝলাম, নিতান্তই জার্মান ভদ্রতা করেছিলো আমার সাথে।

২৩.

মানুষের ডিজাইন ক্যাপাসিটি আর তার এনভেলপের সীমা পরিসীমার একটা হিসেব বের করার চেষ্টা করছিলাম বেশ কিছুদিন ধরে। যন্ত্রের না হয় এমটিবিএফ (মিন টাইম বিফোর ফেইলিউর) থাকে, মানুষের এরকম কিছু তো দেখিনি কখনো। এই অফিসেই পরিচয় হয়েছে লক্ষাধিক মানুষের সাথে, আসেন সরকারের সাহায্য চাইতে। তারা চান নিজে গ্রো করতে। নিজে গ্রো করা মানে যে দেশ গ্রো করবে তা আমরা আবার ভুলে যাই প্রায়ই। ছোট কোম্পানিগুলো যখন প্রথম দিকে আসা শুরু করে, তাদের চোখের দ্যুতিতে ঝলসে যাই আমরা। সেই দ্যুতি কমতে থাকে সময়ের সাথে সাথে। সাহায্য করা, যা আমার কর্তব্য – পেরে উঠতে পারি না – অনেক কারণে। তবে, ঝড় ঝাপটা আর সরকারের সাহায্য ছাড়া বেশ কিছু কোম্পানি উঠে গিয়েছে নেহায়েত তার ‘এনভেলপে’র বাইরে কাজ করে। অভিমানও কাজ করেছে তাদের সাথে। মানুষ যে সব পারে তার উদাহরণ আমার কাছে তারাই। তাদের দেখেছি লেগে থাকতে বছরের পর বছর। এনভেলপের শেষ সীমায় যাবার পথ দেখিয়েছেন এই এরাই – আমাকে। চার বছর কাজ করেছি নাইন তো নাইন। কষ্ট হয়নি কখনো। মনে হয়েছে কাজ করছি তাদের সাথে – গ্রো করছি সবাই এক সাথে। যা করেছি, ভালোবেসে করেছি, টাকার জন্য নয়। এনভেলপের বাইরেই ছিলাম পুরো সময়। অনেকটা সময়!

২৪.

সেথ গোডিং, যার বই না পড়লে ঘুম হয় না ইদানিং – ভালই লিখেছেন শেষ বইটা। গ্রিক দ্বীপপুঞ্জের পাশে ইকারিয়ান সাগরের কথা মনে আছে তো আপনার? আর ইকারাসের ডানার গল্পটা? ইকারাসের বাবা ডিডেলাস বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাবার জন্য তৈরী করেন দুজোড়া পাখা – ছেলেরটা সহ। পালকগুলোকে আটকেছিলেন মোম দিয়ে। ছেলেকে ওড়ার আগেই বেশি ওপরে ওঠার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছিলেন বাবা। বেশি ওপরে ওঠা মানে সুর্যের কাছাকাছি চলে যাওয়া। তার প্রথম ওড়াতেই বেশি সাহস দেখিয়েছিলেন ইকারাস। তারপরের ঘটনা তো সবার জানা। গলে গিয়েছিলো মোম, ঝরে গিয়েছিলো পালকগুলো। পাখা হারিয়ে পড়লেন সাগরে। মারা গেলেন ইকারাস। পৌরাণিক গল্পের শিক্ষনীয় বিষয় কিছুটা গুরুজনের অবাধ্য না হবার দিকে ঠেললেও নিজের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস না রাখার কথাটাও চলে আসে কিন্তু। কি পারবো আর পারবোনা এটার উপর বিশ্বাস করলে কিছুই হতো না আজকের পৃথিবীতে। পারবো সব কিছু – চেষ্টা করতে হবে সব কিছু – তাহলেই মিলবে গতি। গল্পের বাকি অংশটা ভুলে গেছে সবাই, ইচ্ছা করেই হয়তোবা। বাবা ডিডেলাস খুব নিচ দিয়েও মানা করেছিলেন উড়তে। সাগরের পানি নষ্ট করে দেবে পালকগুলোকে। আর আমরা সেটাকে পাল্টে বানিয়ে নিয়েছি নিজেদের মতো করে। অতি উচ্চতা থেকে নিচে ওড়ার অভিজ্ঞতা নিরাপদ ভাবার ফলে হয়েছে আরেক বিপদ। নিরাপদ বৃত্ত থেকে বের হতে যতো ভয়। আছিই তো ভালো, দরকার কি আর? আর এটাই আমাদেরকে ফেলেছে মেরে – মনের ভেতরে। মন হয়ে গেছে ছোট, উচ্চতা ভয় পাই বড্ড, কি জানি হয়ে যায় আবার! নিরাপদ ব্যাপারটা আমাদেরকে শুধু নয়, আশেপাশের সবাইকে করেছে সংক্রামিত। নতুন কিছু করার ব্যাপারে ভয় ধরে থাকে আস্টেপিষ্টে। নিজে কিছু করার চেয়ে চাকুরী খুঁজি সবার আগে। সরকারী চাকুরীতে কেনো? জিজ্ঞাসা করেছিলাম ইন্টারভিউতে। নিরাপত্তা, সবার উত্তর। ভাঙ্গতে হবে নিজের নিরাপত্তা বলয়, তৈরী করুন অন্যদের জন্য!

উদ্ধার করতে পারে এই একমাত্র ‘পুশিং দ্য এনভেলপ’ ব্যাপারটা – সবাইকে আজকের দিনগুলোতে।

“The mind is the limit. As long as the mind can envision the fact that you can do something, you can do it, as long as you really believe 100 percent.”

- Arnold Schwarzenegger

“There is no passion to be found playing small – in settling for a life that is less than the one you are capable of living.”

- Nelson Mandela

১৭.

অফিসের নতুন লোক নিয়োগ প্রক্রিয়াতে সংযুক্ত থাকতে হয়েছিলো কিছুদিন আগে। টেলিকম আর কম্পিউটার প্রকৌশলীদের ইন্টারভিউ নেবার সময় মনটা ভার হয়ে উঠছিলো কিছুক্ষণ পর পরই। চটপটে ছেলেমেয়েগুলো পারছে না কথা বলতে। অসীম সম্ভাবনার সামনে এসে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। বিশ বছরের সরকারী চাকুরীর অভিজ্ঞতায় আমাদের এই জিনিসটা মিস করছি অনেকদিন ধরে। সদ্য উনিভার্সিটি পাস করা যে ছেলেমেয়েগুলো ইন্টারভিউ দেবার জন্য আসছে তাদের প্রায় সবারই আস্থা, প্রত্যয় বা সংকল্পের অভাব ধরা পড়ছে বার বার – প্রকটভাবে। প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও আটকে যাচ্ছে বার বার। তার জন্য দেয়া দশ মিনিটে তাকে ‘সেল’ করার কোনো ধারণা না থাকার কারণে চুপ করে থাকছে বসে – তার জীবনের ‘প্রিমিয়াম’ সেগমেন্টে। শারীরিক ভাষা থেকে উত্তরটা জানে বলে [আমি] বুঝতে পারলেও বলছে না – আস্থার ওভাবে। ওই বয়সে একই সমস্যা ছিলো আমারও। ক্যাডেট কলেজের হাজারো এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটি পার করলেও ‘বিগ পিকচার’ পাবার সেই প্রশিক্ষণ ছিলো না আমার। যেকোনো জিনিসকে তার ছোট গন্ডির মতো করে না মেপে বড় পরিসর থেকে চিন্তা করলে সবকিছুই মনে হবে অন্য রকম। এই বড় করে চিন্তা না করতে পারাটা আমাদেরকে পিছনে ফেলে দিচ্ছে অন্য দেশগুলো থেকে। এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে আমাদের অংশগ্রহণ সে কারণে অন্যদের থেকে অনেক কম। পৃথিবী জয় করার মানসিকতা আসতে হবে ছোট বেলা থেকে। সংকল্প তৈরী করার কারখানা হতে হবে স্কুলগুলোকে। মানসিকভাবে পৃথিবীকে অধিগ্রহণ করার প্রত্যয় তৈরী করে দিতে হবে এই সময় থেকে। প্রতিমাসে দেশের সফল মানুষগুলোকে মুখোমুখি করতে করতে হবে ক্লাসরুমে – সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। মাসে এক ঘন্টা। রাজি আছি আমি - বিনামূল্যে। আপনি?

১৮.

গ্রামীণফোন আর প্রথমআলোর উদ্যোগে ‘ইন্টারনেট উত্সবের’ প্রোগ্রামের প্রথম দিকে যুক্ত থাকার কারণে এধরনের একটা উপলব্ধি এসেছিলো। আসলে, সেটা মনে দাগ কেটে গিয়েছিলো – গভীরভাবে। প্রতিযোগিতাটা ছিলো খুবই সহজ। আপনার প্রশ্নের উত্তর ফোনের ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করতে হবে – সবচেয়ে কম সময়ে। মোবাইল অপেরা ব্রাউজার পার্টনার থাকাতে এটার লোকালাইজড ভার্সন দিচ্ছিল বিনামূল্যে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শতাধিক স্কুল থেকে হাজারো ছাত্রদের মধ্যে পঞ্চাশ রত্নকে ছেঁকে তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন ঢাকার গ্রামীণফোনের কর্পোরেট হেডকোয়ার্টার – জিপিহাউজে। আমি সেই পঞ্চাশ রত্নের মুখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছিলাম – নতুন পরিবেশে। আস্থা, সংকল্প আর প্রত্যয়ে টইটুম্বুর সবাই, বিশ্বজয়ে প্রস্তুত সবাই। পরিবেশটার প্রতিটা ইট ইন্ফিউজ করেছে সবাইকে। আবার, সেই হাজার হাজার ছাত্র যারা পারেনি আসতে – তারা শিখে নিয়েছে ইন্টারনেটের ক্ষমতায়নের কথা। জিপিহাউসের সেই কয়েকদিন ওয়ার্কশপ পাল্টে দিয়েছে তাদেরকে – সারা জীবনের জন্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই বালক বা বালিকা প্রতিযোগিতার পর তার নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গেলেও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থান তাকে দমাতে পারবে না আগের মতো। মনে মনে সেই হাউজের চাকুরিরত অন্যান্য চৌকস মানুষগুলোর সাথে তুলনা করে ফেলেছে সে – এই ভাবনাটা কি কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে তাদের কাছ থেকে – এভার! এখন বসে আছে সময়ের অপেক্ষায় – স্লীপার এজেন্টদের মতো। ভালো রেজাল্ট, ভালো কলেজে ভর্তি হবার জন্য। তারা দেখেছে বিজয়ীরা কিভাবে গিয়েছে টেলিনর আর অপেরার নরওয়েজিয়ান হেডকোয়ার্টারে। কঠোর মানসিক প্রশিক্ষণের মধ্যে তৈরী হচ্ছে ওরা – বিশ্বজয়ে। আর না হলে, সেই হাউজে, চাকুরী নিয়ে – প্রত্যয়ের হাতছানিতে। বিশ্বাস না হলে খোঁজ নিন এই পঞ্চাশ রত্নের – দশ বছর পর! এর মধ্যে পুরে যাবে ইন্টারনেটের ‘ক্রিটিকাল মাস’এর প্রয়োজনীয় প্যারামিটার।

১৯.

নতুন বইটা নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। আমাদের ক্যাডেট কলেজের এক বড় ভাই রেকমেন্ড করেছিলেন বলে সুদূর আমেরিকা থেকে আনানো। লেখা হয়েছে অবশ্যি – উনিশশো উনষাট সালে। বই পড়ার ব্যাপারে আমার একটা বদঅভ্যাস হচ্ছে ডেডিকেশন আর মুখবন্ধ পরে কয়েকদিনের জন্য ফেলে রাখা। আমার ধারণা (ভুল হবার সম্ভাবনা শতভাগ) জনপ্রিয় লেখকরা প্রায় সবাই গল্প দিয়ে শুরু করেন মুখবন্ধ। সেখানে তার বইটা লেখার মোটিভেশনের কথা আসে চলে। সেটা মাথায় জমতে দেই কয়েকদিন ধরে। টিউবলাইট ইফেক্ট বলতে পারেন অনেকটা। আর, স্টোরিটেলিং এর ক্ষমতা উপেক্ষা করা অসম্ভব। ‘দ্য ম্যাজিক অফ থিঙ্কিং বিগ’ বইটার শুরুর গল্প মনে ধরেছে আমার। লেখক বইটা লেখার কয়েক বছর আগে একটা সেলস মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। সেই সভার ব্যাপারে খুবই উদ্দীপিত মনে হচ্ছিলো কোম্পানিটির মার্কেটিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্টকে। কিছু একটা মেসেজ দিতে চাচ্ছিলেন তিনি – সবাইকে। একজন ‘সাধারণ চেহারার’ সেলস রেপ্রিজেন্টেটিভ দাড়িয়েছিলেন তার সাথে – স্টেজে। কারণ, সেবছর কোম্পানিতে ষাট হাজার ডলার এনে দিয়েছিলেন উনি। অন্য রেপ্রিজেন্টেটিভদের গড়পরতা বাত্সরিক আয় বারো হাজার ডলারের কাছাকাছি।

২০.

অন্য রেপ্রিজেন্টেটিভদের হ্যারির (স্টেজের সেই সাধারণ চেহারার রেপ্রিজেন্টেটিভের নাম) সাথে তুলনা করতে বলছিলেন সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট। সবার এমন কি নেই যেটা আছে হ্যারির কাছে? তার পাঁচগুন আয়ের রহস্যটা জানতে চাইলেন সবার কাছে। ও কি সবার থেকে পাঁচগুণ চালাক? বরং কোম্পানির পরীক্ষায় দেখা গেছে সে মধ্যমানের বুদ্ধিমান। ও কি তাহলে সবার থেকে কাজ করেছে বেশি? কোম্পানির হিসেবে ও বরং ছুটি নিয়েছে বেশি – অন্য সবার থেকে। হ্যারির সেলসের জায়গাটা কি অন্যদের থেকে ভালো। তাও নয়। ওর কি পড়াশোনার ডিগ্রী বেশি? না। স্বাস্থ্যও ভালো নয় অতটা। তবে অন্য সবার থেকে একটা জায়গায় আলাদা এই হ্যারি। হ্যারি অন্য সবার থেকে পাঁচগুন বড় করে চিন্তা করতে পারে। তারপর সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট দেখালেন কিভাবে সফলতা মগজের আয়তনের উপর নির্ভর না করে তা করে বড় করে চিন্তা করার আয়তনের উপর। মানুষের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে তার চিন্তা করার পরিধিটা। যার পরিধি যতো বড় সে উঠে গেছে ততো উপরে। বড় করে চিন্তা করলেই যদি সফলতা আসে তাহলে সবাই সেটা পারছেনা কেনো? মানুষ মাত্রই তার পারিপার্শ্বিক থেকে তার চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরী করে বলে সে সেটার মধ্যে হয়ে পড়ে সীমাবদ্ধ। আর সেই চিন্তাটা সহজাত কারণে বের হতে পারে না সেই ছোট গন্ডি থেকে। আবার আমাদের ছোট পারিপার্শ্বিক অবস্থাই আটকে রাখছে ছোট চিন্তায়। ভেবেই হচ্ছি নাকাল – এতো সফল মানুষের মধ্যে পাওয়া কি যাবে জায়গা? প্রথম ক্যাটাগরিতে হাজার মানুষের আনাগোনা, দিতে পারবো তো টেক্কা? বরং আসল গল্প হচ্ছে আমরাই পড়ে আছি দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে – কোটি মানুষের ভিড়ে। বড় চিন্তা করার ভয়ে মানুষ পড়ে থাকে নিচে। আচ্ছা, বলুনতো – পাঁচ লক্ষ টাকার উপর আয় করে কজন? সেই সাথে বিশ হাজার টাকার নিচে? অনেক এইচআর ম্যানেজারের সাথে পরিচয় থাকাতে এব্যাপারটা আমার কাছে পানির মতো পরিস্কার। অনেকে আমাকে তাদের উপরের ম্যানেজমেন্টের জন্য লোকদের নাম দিতে বলেন – হাতড়ে বেড়াই আমিও, তাদের সাথে। উপযুক্ত মানুষ কম। বেশিরভাগ মানুষ বড় করে চিন্তা করতে পান ভয়, আছি যেখানে – আছি ভালইতো। এর মাঝেই আছে ‘ব্লু ওশান’!

আরেকটা বইয়ের কথা বললাম না তো?

“640K ought to be enough for anybody.” — Bill Gates (1955-), in 1981

৮.

ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম বড় সমস্যা বটে। তবে প্রযুক্তির যুগে তার সমাধান আছে কি নেই সে বিতর্কে যাব না আজকেই। মানুষ বাড়ছেই কিন্তু এই মেগা শহরে। সুবিধার জন্যই রাজধানীতে আসা। মানুষ পাখি না হলেও বসে তো থাকেন না তারা – প্রয়োজনের জন্য পাড়ি দেন নতুন নতুন জায়গায়। মানুষের এই যাওয়া আসার একটা প্যাটার্ন পাওয়া গেলে কতো সমস্যার সমাধান সম্ভব তা নিয়ে আজকের লেখা। ফিরে আসি মোবাইল ইন্ডাস্ট্রির বিগ ডাটাতে। কথা বললেই তার বিল করতে হবে আপনার অপারেটরকে। আর সে কারণে তাদেরকে রাখতে হয় অনেক তথ্যই। প্রতিটি মোবাইল ফোন টাওয়ারে জিপিএস থাকার ফলে ব্যবহারকারীদের অবস্থান আছে অপারেটরের বিগ ডাটায়। টাওয়ারগুলোতে জিপিএস রাখা হয়েছিলো টাইমড সিগনালের জন্য, যাতে সব টাওয়ারের সময় ঠিক থাকে। আর তার বাই-প্রোডাক্ট নিয়ে হয়েছে মানুষের হাজারো গবেষণা। ইচ্ছা করেই মোবাইল এপ্লিকেশনের দিকে যাচ্ছি না আর। ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক দিয়ে ঢাকা শহর ছেয়ে গেলে নতুন গল্প ফাঁদব এই আমিই।

1

৯.

আপনার হাজার বা বারোশো টাকার ফোন কখন কোথায় আছে তা বের করার জন্য রকেট সাইন্স পড়তে হয়না। আর আমাদের এতোই সেল টাওয়ার, আপনার ফোনের সিগন্যাল একসাথে টাওয়ার পায় তিন চারটা – একা একাই। টাওয়ারগুলো নিজের অবস্থান জানে বলে আপনারটা ফোনের অবস্থান বের করা পানির মতো সহজ। সিগন্যাল পৌছাবার টাইম ল্যাগ আর ট্রায়ানগুলেশন, মানে টাওয়ার থেকে লাইন টানলেই পাবেন আপনার ফোনের অবস্থান। আর ফোন আছে আপনার পকেটে। বিগ ডাটাতে আপনার অবস্থান পিনপয়েন্ট হবার দরকার নেই। আর জিপিএস ইচ্ছা করে যতোটুকু ভুল করে – তার হিসেব বাদ দেয়া হয়নি এখানে। দরকারও নেই আপনার ফোন নম্বর। মোবাইলের সেই নামছাড়া তথ্য নিয়ে কাজ করলে পাল্টে দেয়া যাবে মানুষের জীবন। নামছাড়া মানে হচ্ছে এই তথ্যের সাগরে থাকবে না কোনো মানুষের নাম। মানুষের ব্যক্তিগত, একান্ত তথ্য যাবে না – এই বিগ ডাটাতে। এলাকা ভিত্তিক কোথায় কতো মানুষের বসবাস, চাকুরী করতে যাচ্ছেন কোন এলাকায়, সকালে, দুপুরে আর রাতে থাকছেন কোথায়, সব আছে এখানে। নগরকর্তারা মানুষের এধরনের হিসেব পেলে যাবেন বর্তে। আমাদের দরকার প্রতিদিন কতো লোক উত্তরা থেকে মহাখালী হয়ে মতিঝিল যাচ্ছেন। ধানমন্ডি থেকে বনানী বা মিরপুর থেকে গুলশান। কতো লোক ফিরছেন নিজের ডেরায় – কোন রাস্তা নিচ্ছেন – কোন সময়? সব আছে এই বিগ ডাটায়। কোন কোন রাস্তা ফাঁকা থাকছে, মানুষ হিসেব করা কোনো সমস্যাই নয় কারণ শতকরা নিরানব্বই জনের পকেটে আছে মোবাইল ফোন। আর সেই ফোন প্রতিনিয়ত: তৈরী করছে প্রচুর তথ্য – যা ব্যবহার করা যাবে মানুষের কল্যানে। কোথায় কথা বলছেন বেশি – তার মানে কাজের সুযোগ কোথায় বেশি – কতক্ষণ ধরে কথা বলছেন তা দেখলেই বোঝা যাবে পরবর্তী ফিনান্সিয়াল ডিস্ট্রিকটা হচ্ছে কোথায়। আমার এলাকায় কি? মোবাইল ব্যাঙ্কিং চালু হওয়াতে সুবিধা হলো আরো বেশি। ফাঁকা আবার একটু ঘুরে যাবার রাস্তা নেবেন যারা তাদের মোবাইল ওয়ালেটে যোগ হবে আগের দিনের কাটা পাঁচ টাকা। আগের দিন নিয়েছিলেন ভিআইপি রোড। একটা ফাস্টফুডের দোকানের কথা চিন্তা করছেন বনানীর তিন নম্বর রোডের চৌরাস্তার পাশে। কতো মানুষ যাচ্ছে সেই রাস্তা দিয়ে – সঙ্গে শুক্র শনিবারের হিসেব পাওয়া কি খুব কষ্টকর? বিভিন্ন সভা সমিতিতে কোন রাস্তা বন্ধ আর কোনটা খোলা সমীচীন হবে আর কোন এলাকা থেকে লোক আসছে বেশি – তার জন্য বাস মালিকদের আগে থেকে জানানো, সবই সম্ভব এই নতুন অর্জিত জ্ঞান থেকে। কোন এলাকার লোক বেশি গ্যাস পোড়াচ্ছেন মানে যাচ্ছেন বেশী দুরে, সাথে হাসপাতালগুলোতে কতো মানুষ যাচ্ছেন তার হিসেব সরকারকে নতুন কিছু চিন্তার খোরাক পারে দিতে। মেট্রোপলিটন শহরের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে পরবর্তী ফ্লাইওভার কোথায় করতে হবে তার জ্ঞান আসবে এই বিগ ডাটা থেকে।

2

3

১০.

কাপড় চোপড় কেনা কাটা তো দুরের কথা বাইরে বের হবার জামা নিয়ে আমার ‘বিগ ডাটা’ (স্বাতী)র সাথে ঝামেলা লাগে মাঝে মধ্যে। সেই আমি এলিফ্যান্ট রোড পার হবার পেয়ে গেলাম নতুন কিছু কাপড়ের অফার – চার পাঁচটা এসএমএসে। একটা শার্ট কিনলে আরেকটা প্যান্ট ফ্রি। দুঃখিত, উল্টোটা হবে হয়তোবা। কারণ, আমার ফোন এখন ওই রোডে। তথ্য চলে গেছে বিগ ডাটায়, আর সে সঙ্গে দোকানগুলোতে। আমি যতো ঘুরাঘুরি করি না কেনো ডায়মন্ডওয়ার্ল্ডের পাশে – ডিসকাউন্ট এর অফার আসবে আমার ‘বিগ ডাটা’র (মেয়ের মা) কাছে। সবার প্রোফাইলিং আছে বিগ ডাটার কাছে। টুইটার, ফেইসবুক, লিংকডইন থেকে হাজার তথ্য নিয়ে তৈরী হয়ে গেছে প্রতিটা মানুষের প্রোফাইল, কি পছন্দ আপনার। কি কিনবেন সামনের সপ্তাহে তাও জানে সে। ডিসকাউন্ট পৌছে যাবে যথাসময়। আপনার ট্রাভেল প্যাটার্ন তার জানা – আগের মাসেই বুকিং দিয়ে রাখবে আপনার মালদ্বীপের পরবর্তী ট্রিপ। কম দামে দেবার জন্য কোম্পানির পুরো বছরের জন্য কেনা (জানতে চাইলে মানতে হবে হোটেলস.কম এর বিজনেস কেইস) ওই অফার কি পারবেন ফেলতে? বিশ্বাস হচ্ছে না? ফিরে আসি আপনার মোবাইল অপারেটরের বিজনেস কেইসে। সারা বছর ধরে কি ধরনের সার্ভিস ব্যবহার করছেন তা আপনার মনে না থাকলেও আপনার প্রোভাইডারের কাছে আছে ঠিকই। আপনার কেনাকাটার প্যাটার্ন সে আপনার চেয়ে ভালো জানে বলেই ভুলেও আপনাকে তিন গিগাবাইট প্যাকেজ কেনার জন্য প্রস্তাবনা দেবে না। আপনার কেনাকাটা সপ্তাহে পঁচিশ মেগাবাইট বা তার আশেপাশে হলে আপনার ব্যবহার জেনেই কখন এবং কোন সময়ে নতুন প্যাকেজের এসএমএসটা করতে হবে তা অবশ্যি আরেকটা বিজ্ঞান। কেএফসির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আপনার পরিবারের সদস্য (ফ্রেন্ডস্ এন্ড ফ্যামিলি নম্বর ধরে) সঙ্গে থাকলেই ‘চিকেন’ বালতির সাথে বাড়তি ফ্রি অফার না নিয়ে যাবেন কোথায়? আর লয়ালটি প্রোগ্রামের জন্য আপনাকে কিভাবে খুশি রাখবে তা না হয় রেখে দিলাম আরেকদিনের জন্য।

১১.

বাংলাদেশকে মানুষ চেনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ হিসেবে। আমরা অনেকটাই বের হয়ে এসেছি, তবে ফেলে রেখেছি আমাদের স্বর্ণখনি ‘বিগ ডাটা’কে। ভবিষ্যত দেখার সব অস্ত্র হাতে থাকা সত্ত্বেও আমরা কিছুটা অন্ধ – এখনো। ছোটবেলায় শুনতাম, ‘ফিউচার ইজ ইন ইওর হ্যান্ড’, তখন না বুঝলেও এখন বুঝি কড়ায় গন্ডায়। আমাদের হাতে ভবিষ্যত বলেই ভবিষ্যত দেখাটা কষ্টের কিছু নয়। আমার বর্তমান কাজের একটা বড় অংশ হচ্ছে ভবিষ্যতদ্বানী করার ব্যর্থ চেষ্টা করা, যা মাঝে মধ্যে লেগে যায় বটে। বাংলাদেশের বাইরের একটা ঘটনা নিয়ে আলাপ করি বরং। দুর্যোগের সময় মানুষ দুর্যোগপূর্ণ অবস্থান থেকে যতো তাড়াতাড়ি অন্য জায়গায় যেতে পারে ততো জীবন বাঁচে। উপকূল অবস্থান থেকে লক্ষ লোক সরে গেলেও তার কতোভাগ ফিরে আসেন আবার তার হিসেব রাষ্ট্রের কাছে থাকলে তাদের পুনর্বাসন করা সহজ হয়ে যায় বটে। আর যারা ফিরে আসেন না তারা শহরের বস্তি এলাকায় গিয়ে শেষ আশ্রয় খোঁজেন। শ্রম বিক্রি করে চলে তাদের জীবন। সরকার তাদেরকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করতে চাইলেও কে কোথায় গিয়েছে তা বের করতে না পারার জন্য ব্যাহত হয় সেটা। রিলিফ অপারেশন চালানোর একটা বড় সমস্যা হচ্ছে আসল মানুষগুলোকে সাহায্য করতে না পারাটা। তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ব্যাহত হয় চিন্হিত না করতে পেরে। নদীর ভাঙ্গনে কতো মানুষই তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কয়জনকেই আমরা পারি পুনর্বাসন করতে? শুধুমাত্র দুহাজার দশ সালেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চার কোটি ২০ লক্ষ মানুষ মাথা গোঁজার ঠাই হারায়। ফলে একুশ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয় – প্রতক্ষ্যভাবে আর ক্ষতি হয় বারোশো কোটি ডলারের।

১২.

মনে করুনতো দুহাজার দশ সালের জানুয়ারীর বারো তারিখের কথা। তিন লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো সেই ভুমিকম্পে – হাইতিতে। শুরু হয়েছিলো হাইতির রাজধানী পোর্ট অ-প্রিন্স থেকে পঁচিশ কিলোমিটার দূর থেকে। হাইতির সবচেয়ে বড় মোবাইলফোন কোম্পানি, ডিজিসেল আর কয়েকটা ইউনিভার্সিটির সমন্বয়ে বিপদে পড়া সেই মানুষগুলোর ছুটাছুটি আর তার রিলিফ অপারেশন কিভাবে সুষ্ঠুভাবে করা যায় তার পরিকল্পনা এসেছিলো সেই বিগ ডাটা থেকে। ভূমিকম্পের বিয়াল্লিশ দিন আগে থেকে ঘটনার পরের তিনশো একচল্লিশ দিন পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) ঘেঁটে যা পাওয়া গেছে তা সেই সরকারকে দিয়েছিলো নতুন করে চিন্তার সুযোগ। উনিশ দিনের মাথায় পোর্ট অ-প্রিন্স ছেড়ে গিয়েছিলো তিরিশ শতাংশ মানুষ। কতো দূর গিয়েছিলো মানুষগুলো, কোথায় গিয়েছিলো, কেন গিয়েছিলো, কার কাছে গিয়েছিলো – তার খতিয়ান পেয়েছিল সরকার। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ প্রথমে ছোটে তাদের আত্নীয়দের কাছে, মানবিক বন্ধন ধরা পরে সেই বিগ ডাটা থেকে। মানুষ তো মানুষেরই জন্য। সেই বিগ ডাটা বিপদে পড়া মানুষের আচরণ আগে থেকেই পারছিলো বলতে, ভবিষ্যত দেখা যাচ্ছিলো ওই বিগ ডাটা থেকে। ভবিষ্যত দেখতে পারলে বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করা সহজতর হয় বলে আমি ভালবাসি এই বিগ ডাটাকে। আরো গল্প নিয়ে আসব সামনে। জানতে চান হাইতির গল্পটা? ঘুরে আসুন এখানে

শুভরাত্রি!

“The idea that the future is unpredictable is undermined every day by the ease with which the past is explained.”

― Daniel Kahneman, Thinking, Fast and Slow

“I may be surprised. But I don’t think I will be.”

― Andrew Strauss

১.

আগে অবাক হতাম, এখন ছেড়ে দিয়েছি অনেক কিছুই। অবাক হবার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে হয়তোবা। ধরুন, লিখছি একটা বিষয় নিয়ে – অনেকের মতো রিসার্চের জন্য সাহায্য নিতে হয় গুগলের। পিএইচপি দিয়ে তৈরী করা সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করছিলাম বহুবছর আগে – তাও আবার একটা অফিসেরই ভেতরে। আমার পালা দুটো স্পাইডার (ক্রলারও বলেন অনেকে) ইনডেক্সিং করতো অফিস ডকুমেন্টগুলো – সারাদিন ধরে। সেই আদি ধারণা থেকে গুগলের সার্চ আলগরিদম আন্দাজ করা কষ্টকর তো বটে। কাজের সুবিধার জন্য আমার সার্চ প্যাটার্ন (যা সার্চ করেছি এপর্যন্ত, দশ বছর হবে কি?) গুগলকে রাখতে বলেছি মনে, আর তার ফলাফল ভয়াবহ। এর মধ্যে ‘গুগল ইনস্ট্যান্ট’ আগুনে ঢেলেছে ঘি। ইনস্ট্যান্ট সার্ভিসটা কোটি মানুষের ‘সার্চ ফ্রেজ’ মানে যে বাক্য দিয়ে মানুষ সচরাচর কিছু একটা খোজে তা মুখস্ত করে বসে বসে। আবার আপনি সার্চ করার মুহুর্তে ভবিষ্যদ্বাণী করার মতো লিখে দেয় আগেই। আপনি সার্চ করার বাক্যের প্রথম শব্দটা কোনো রকমে লিখলেই হলো। আপনার আশেপাশের লোকজন এধরনের কিওয়ার্ড ব্যবহার করে থাকলে তার প্রস্তাবনার লিস্টি সহ আপনার কাছে উপস্থিত করবে গুগল। সেদিন ষ্টারমুভিজে ‘মিরর মিরর’ মুভিটা দেখার পরপরই গুগলে মিররের শুধুমাত্র ‘এমআইআর’ লিখতেই পুরো মুভিটার সাজেশনই নয় – তার ডান পাশের স্নিপেটে চলে এলো এর পুরো মুভির আদ্যপান্ত। কনটেক্সট ও ছাড়া ভালো কে বুঝবে? গুগলের কথা বলছি। দশ বছরের ব্যবহৃত সার্চ টার্ম ও জানে বলে আমার খোজার ফলাফলকে ন্যারো ডাউন করে নিয়ে এসেছে আমার চাহিদার উপর ভিত্তি করে।

২.

অবাক হবার কিছু নেই। ধারণা করছি, ওই সময়ে এশিয়া প্যাসিফিক রিজিয়নে ষ্টারমুভিজ সিনেমাটা ব্রডকাস্ট করছিলো বলে অনেকেই মুভিটা সমন্ধে জানতে চেয়েছে গুগলের কাছে। তার একদিন আগে মেয়ের জন্য জিমেইলে ‘স্নোহোয়াইট’ সম্পর্কিত কিছু ইমেইল চালাচলি করেছিলাম হয়তোবা। আমার দশ বছরের সার্চ প্যাটার্ন গুগল মনে রাখাতে তার সাজেশন এতটাই টার্গেটেড হয় তা দেখলে অবাক না হবার জো নেই। ও আমাকে চেনে আমার থেকে বেশি। বেশি অবাক হলে কাজে সমস্যা হয় বলে ছেড়ে দিয়েছি ইদানিং। আমার সব লেখালিখির জিনিসপত্র গুগলের বিভিন্ন সার্ভিসে থাকার কারণে এটা কতোটা নিখুঁত হয় তা আপনার অজানা নয় আপনার। ফ্লাইট ডিটেলস আর স্টক মার্কেট? বাংলা টাইপিং এর জন্য গুগল ইনপুট টুলস ব্যবহার করাতে ইংরেজিতে একটা বাংলা শব্দ লেখা শুরু করতেই যা সাজেশন দেয়া শুরু করে তা ইর্ষনীয় বটে। এই টুল যতই ব্যবহার করছি, আরো স্মার্ট হচ্ছে দিনকে দিন – আমার লেখার (মানে ইনপুটের) ভিত্তিতে। আমি যে শব্দটা যেই ইংরেজি শব্দে লিখেছি আগে, মনে রেখে দেয় টুলটা। অনেকটা টেক্সট তো স্পীচ সফটওয়্যারের ট্রেনিং পিরিয়ডের মতো। মানে, নিজের চোখে দেখছি মেশিন লার্নিং। আর ইংরেজি শব্দ এমন ভাবে বাংলায় ম্যাপিং করেছে তার জন্য নিজেকে দেখতে হবে চেখে। ইংরেজি বানানে কোনো কিছু লেখলে তার সরাসরি বাংলা উচ্চারণ ছাড়াও অভিধানের কাজ করছে সময় সময়। যেমন, ইংরেজিতে ‘আমেরিকান’ শব্দটা লেখতেই ‘মার্কিন’ শব্দটা বের করে দিচ্ছে বাংলায়।

৩.

বই পড়ার সময় পাতায় পাতায় দরকারী লাইনে দাগানো আমার ছোট বেলার অভ্যাস। আমাজনের কিন্ডল এ কেনা সব বইয়ে পৃথিবীর বাকি পাঠকদের হাইলাইটগুলোর অংশ দেখে বুঝতে পারি আমার ফারাকটা। পিসিতে কাজ করার পর মোবাইল ফোনে কাজ করতে গেলে অবাক হবার চেষ্টা করি – ও আমার সব বদ অভ্যাসগুলো রেখেছে মনে। ফোনটা [নয় সালের] পুরোনো হলেও এন্ড্রয়েডের সর্বশেষ অপারেটিং সিস্টেমে নতুনভাবে ইনস্টল করতেই পুরোনো সব সেটিংস, ফোনবুক এন্ট্রি, গুগলের কোন কোন সার্ভিস ব্যবহার করছিলাম তার সকল যোগসূত্র, কি কি এপ্লিকেশন ইনস্টল করেছিলাম তা নিমিষেই নিয়ে আসলো গুগল ক্লাউড থেকে। মানে, গুগল জানে সবকিছু! আমার প্রিয় রংটাও। ‘গুগল কীপ’ [ড্রাইভের অংশ] সাহায্য করছে পরের বইটা লেখার ম্যাটেরিয়ালস নিয়ে।

৪.

‘পার্সোনালাইজেশন’ কাকে বলে সেটা দেখতে যেতে হবে আমাজনের সাইটে। প্রতিদিন প্রায় বিভিন্ন জিনিসের জন্য ওখানে ঢু মারার ফলে আমাকে চিনে গেছে বন্ধুদের থেকে বেশি। আমার কেনাকাটার রেকর্ড আর তার ব্রাউজিং রেকর্ড ঘেঁটে যা রেকমেন্ডেশন তৈরী করে তা ইর্ষনীয়। না কিনে যাবেন কোথায়? ওই জিনিষটা যারা কিনেছেন উনারাই আর কি কি কিনেছেন তার প্রস্তাবনা দিচ্ছে পাশেপাশে। আবার আমার কেনাকাটার রেকর্ড দেখে অন্যেরা প্রভাবিত হলে তারা কি কিনেছেন তাও দেয়া আছে পাশে। বিশেষ দিনগুলোতে কি কি কিনেছেন সেটা মনে রাখবে বছর ধরে। পরের বছর নতুন কিছু মনে করিয়ে দিতে পিছুপা হবে না সে। কুকি দিয়ে ট্রাক করছে আমার ব্রাউজিং হিস্ট্রি, আমার একান্ত গোপনীয় জিনিসও জানে সে। তবে বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো আমাকে কখনো জানাবে না কি কি জানে সে আমার ব্যাপারে।

৫.

দোকানের জানালা পার হতেই পাঞ্জাবিটা পরলো চোখে। মনেও ধরলো আপনার। দামটাই মনকে সায় দিলো না বরং। হাঁটতে শুরু করলেন আগের মতো। আপনি হয়তোবা জানেন না যে জানালাতে লাগানো ওয়াইফাই সেন্সর আপনার স্মার্টফোনতাকে স্ক্যান করে নিয়েছে এর মধ্যে। কতোজন দাড়িয়েছিলেন সেই ডিসপ্লের সামনে, কতোজন এরপর দোকানে ঢুকেছেন আর কতোজন ঢোকেননি – তার হিসেব চলে যাচ্ছে স্টোর ম্যানেজারের কাছে। কতোক্ষণ দাড়িয়েছিলেন ক্রেতা তার উপর নির্ভর করছে দামটা যুতসই হয়েছে কিনা। দোকান যদি এটাই না বের করতে পারে তাহলে বিক্রি ব্যবসায় কেনো? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো রিটেল শপে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ইউক্লিড এনালাইটিক্স’ এর প্রযুক্তি – যারা সিলিকন ভ্যালির আরেকটা স্টার্টআপ। ক্রেতার কোন কোন তথ্য নেয়া যাবে আর নেয়া যাবেনা সেটার উপর সুবিধাজনক অবস্থান আসাতে ফ্লাডগেট খুলেছে ‘বিগ ডাটা’র ব্যাপারে। বিজনেস মডেল পাল্টে যাচ্ছে রাতের মধ্যে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের বই ‘ডিকোডিং বিগ ডাটা’ বইটা শুরু হয়েছে এভাবেই।

৬.

সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর ডাটার ভলিউম নিয়ে বিপাকে সবাই। যেভাবে বাড়ছে ডাটা সেটাকে প্রসেস করাটা সমস্যা হলেও ভবিষ্যত এখানেই। বিজনেস হাউস, হেলথকেয়ার ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে সরকারও এই ডাটার দিকে তাকিয়ে আছে। গুগলের আগের চিফ এক্ষিকিউটিভ এরিক স্মিদ দুহাজার দশ সালেই বলেছিলেন নতুন এই ডাটা তৈরীর ব্যাপারে। মাত্র দুদিনে তৈরী হচ্ছে পাঁচ এক্সাবাইটের মতো যা দিয়ে ধারণ করা যাবে দুলক্ষ পঞ্চাশ হাজার বছরের ডিভিডি কোয়ালিটি ভিডিও। আর দু হাজার তেরোতে সেটাই তৈরী হচ্ছে প্রতি দশ মিনিটে। ‘খেতে যাচ্ছেন গুলশানে’ থেকে ‘রক্ত দরকার বন্ধুর জন্য’ বা সহমর্মীদের কাছ থেকে টাকা তোলা থেকে শুরু করে আপনার ‘পিনপয়েন্ট লোকেশন’ সবই যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আপনার আপলোড করা কোন কোন ছবিতে আপনি বা আপনার বন্ধুরা আছেন তাদের মুখ স্ক্যান করে তথ্য যাচ্ছে এই বিগ ডাটাতে। ছবিটা কোথায় তোলা হয়েছে তা বলে দিতে হয়না আর। ও জানে সব। প্রচুর ডাটা, প্রচুর সম্ভাবনা।

৭.

রাতে ঘুমের সমস্যা হওয়াতে ফোনটাকেও শুইয়েছিলাম আমার সাথে। ভোরে বলে দিলো ঠিক কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম রাতে, কোন কোন লেভেলে। তাও চলে গেছে ‘বিগ ডাটা’তে। হেলথকেয়ার ইন্ডাস্ট্রি মুখিয়ে আছে সামনের বছরগুলোতে। যারা মোবাইল হেলথ ট্র্যাকার পরতে সন্মত হচ্ছেন তাদের জন্য প্রিমিয়াম কমিয়ে দিচ্ছেন ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো। সব যাচ্ছে বিগ ডাটাতে। আগে গাড়ির ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো যেভাবে জিপিএস লাগালেই কিস্তি কমিয়ে দিতো – তার উন্নততর ভার্সন এটা। চালু করা টিভির সামনে এক দম্পতি ঝগড়া করাতে পরবর্তী কমার্শিয়াল ব্রেকে চলে আসলো স্থানীয় ম্যারেজ কাউন্সিলরের বিজ্ঞাপন। ভেরাইজন তার পেটেণ্ট ডাটাবেসে এই প্রযুক্তি পাশ করিয়ে নিয়েছে বেশ আগে। মা তার সন্তানের একটা ইনফেকশনের খবর জানতে পেরেছেন চব্বিশ ঘন্টা আগে, দৃশ্যমান লক্ষণ হাতে পাবার আগেই। সবই যাচ্ছে ‘বিগ ডাটা’য়।

৮.

আসি মোবাইল ইন্ডাস্ট্রির বিগ ডাটাতে। লেডি গাগাকে ব্যক্তিগতভাবে [প্রথম দিকে] পছন্দ না করলেও তার ‘বিগ ডাটা’র উপরে ভরসা মুগ্ধ করেছে আমাকে। লেডি গাগার ভক্তদের  ব্র্যাকেটটা দেখতে অনুনয় করছি। ‘স্পটিফাই’ এপ্লিকেশনের ‘বিগ ডাটা’র ক্লাউড থেকে কোটি মানুষের প্লে-লিস্ট দেখে তার পরবর্তী কনসার্টে কোন কোন গান গাইবেন তা ঠিক করতে পারাটা কিন্তু উচ্চমার্গের। ভক্তরা তার ব্যক্তিগত সময়ে ফোনে বা পিসিতে গানের যে ‘একান্ত’ প্লেলিস্ট ব্যবহার করেন; সংগীতশিল্পী তার আন্দাজ পেলে ভক্তের মনের ভেতরে ঢোকা কষ্টকর নয়। নির্বাচন পূর্ব সার্ভে আর বিগ ডাটা সম্পর্কযুক্ত।

‘বাবা’, আমার মেয়ে দাড়িয়ে আছে হাসিমুখে ‘মা খেতে ডেকেছে, বাবা - গুহা থেকে’। ‘গুহা’ মেয়ের মা’র তৈরী করা আমার ঘরের [দেখতে কিন্তু স্টোররুমের মতো] সমার্থক শব্দ। এই শব্দটাও এসেছে বিগ ডাটা থেকে। চিন্তা করছি, মেয়ের মা আবার আমার ‘বিগ ডাটা’ কি না?

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 2,787 other followers